আম্বেদকরকে ফিরে দেখা: আন্দোলনের দুই ধারার দৃষ্টিতে

Posted: জানুয়ারি 2, 2017 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: নীলিম বসু

ambedkar-marxএই উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসটাও অনেক পুরনো। চার্বাকদের ধ্বংস করেছিল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা, চৈতণ্যের আন্দোলন, গৌতম বুদ্ধের ভাবধারাকে অঙ্গীভূত করে নেয় এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থা। ফুলে দম্পতি ও পেরিয়ারের সংগ্রাম এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। মূলত পেরিয়ারের আন্দোলন দক্ষিণ ভারতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে যায় ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দ্রাবিড় আত্মমর্যাদার আত্মপ্রকাশে পেরিয়ারের সংগ্রাম ও ভাবধারার গুরুত্ব অস্বীকার করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরের ভাবধারায় গড়ে ওঠা সংগ্রাম এই সমস্ত সংগ্রামগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দলিত আন্দোলনের পরিসরে একটি মোড়।

কখনো দেশের কোনো একটি অঞ্চলে বা কখনো সারা দেশে প্রায় গত ১০০ বছর ধরেই আম্বেদকরবাদের পথে দলিত আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বারবার। মহারাষ্ট্র ও দেশের হিন্দি বলয়ে আম্বেদকরবাদী দলিত আন্দোলন এক চলমান ও শক্তিশালী ধারা। যে সময়টায় আম্বেদকরবাদের মতাদর্শ গড়ে উঠছে ও ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী দলিত আন্দোলনের ময়দানে প্রয়োগে যাচ্ছে, তখনই ভারতের মাটিতে প্রয়োগ হচ্ছিলো ও শক্তি সঞ্চয় করছিলো আরো একটি মতাদর্শে পরিচালিত অনুশীলন। সেটি হলো মার্ক্সবাদ। আম্বেদকরবাদ ও মার্ক্সবাদ তাদের ঐতিহাসিক উৎপত্তির জায়গা থেকেই ভরকেন্দ্র গড়ে তোলে একই জায়গায়, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া জনগণের মধ্যে। হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের থেকে শুরু হয়ে সমগ্র দলিত জনগণের মুক্তির উদ্দেশ্যে আম্বেদকরবাদ নিজেকে নিয়োজিত করার কথা বলে আর শ্রমজীবি জনতার ক্ষমতায়নের মতাদর্শ মার্ক্সবাদ। এই দেশে দলিতআদিবাসীসংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনতার সিংহভাগই শ্রমজীবি জনগণের প্রায় ৯৫ শতাংশ। ফলে এখানেই একসাথে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা আম্বেদকরবাদ ও মার্ক্সবাদের। মুম্বাইয়ের কমিউনিষ্ট পার্টি প্রভাবিত গিনি কামগড় ইউনিয়ানের ডাকা প্রথম শ্রমিক ধর্মঘটে তেমন সাড়া না পাওয়ার পর দ্বিতীয় ধর্মঘটে ইউনিয়ানের সাথে আম্বেদকর নের্তৃত্বাধীন ভারতীয় স্বাধীন শ্রমিক পার্টির হাত মেলানোয় ধর্মঘট চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করে। কিন্তু ঐ একবারই, আর কখনোই হাতে হাত মেলাননি মার্ক্সবাদীরা ও আম্বেদকরবাদীরা। বরং আম্বেদকরের জীবিতকালে ও তার পরেও মার্ক্সবাদীদের সাথে শুধু দূরত্ব আর তিক্ততাই বেড়েছে আম্বেদকরবাদীদের। মাঝে আম্বেদকর স্থাপিত ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টির আম্বেদকরের পরবর্তী নের্তৃত্ব দাদাভাই গায়কোয়াড় ও মহারাষ্ট্রে দলিত প্যান্থারস আন্দোলনের কিছু নের্তৃত্ব মার্ক্সবাদ ও কমিউনিষ্টদের প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখান। তখনই তারা আম্বেদকরবাদী শিবির থেকে কমিউনিষ্টদের দালাল বলে ধিকৃত হন। অন্যদিকে, কমিউনিষ্টদের মধ্যেও কেউ যখনই আম্বেদকরবাদের প্রধান উপজীব্য জাতিবর্ণব্যবস্থা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন বা আম্বেদকর ও অন্যান্য দলিত মুক্তি আন্দোলনের চিন্তকদের থেকে কিছু শেখার কথা বলেছেন তখন কমিউনিষ্টদের মধ্যে থেকেও তাঁদের সম্মন্ধে বলা হয়েছে যে তাঁরা শ্রেণী সংগ্রামের পথ পরিত্যাগ করে আত্মপরিচিতির রাজনীতিতে ভেসে যাচ্ছেন। কিন্তু কমিউনিষ্টদের সংগ্রামে বারবার সামনের সারিতে থেকেছেন দলিতআদিবাসীসংখ্যালঘু জনগনই। যখন কমিউনিষ্টরা এ দেশের জন্য সঠিক বিপ্লবী লাইনটিকে নিদৃষ্ট করে অনুশীলনে যেতে শুরু করেন তখন থেকে এই বাস্তবতা আরো পরিষ্কারভাবে সামনে আসে। এবং বিপ্লবী কমিউনিষ্টদের তত্ত্বায়িত ভারতীয় সমাজের বিশ্লেষণে ভারতীয় বিপ্লবের প্রধান বাধা হিসেবে যে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিদৃষ্ট করেন সেই সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে জাতিবর্ণব্যবস্থার অভিন্ন সম্পর্কটিও অনুধাবন করতে শুরু করেন বিপ্লবী কমিউনিষ্টরা। তাঁদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নয়া তত্ত্বায়নের থেকেই জাতিবর্ণব্যবস্থা বিরোধী সংগ্রাম ও দলিত মুক্তি আন্দোলনকে শ্রেণী সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখার সঠিক মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণটি গড়ে ওঠে।

তাও একটা দূরত্ব রয়েই গেছিলো, যে দূরত্বের উপর বারবার আঘাত এসেছে গত ২৫৩০ বছর ধরে মাওবাদী বিপ্লবী তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ ও অনুশীলন থেকে এবং বিএসপি, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার মতো তথাকথিত দলিতআদিবাসীদের পার্টিগুলির জনবিরোধী ও আপোষকামী কার্যকলাপের ফলে দলিতআদিবাসীসংখ্যালঘু জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা সচেতনতা থেকে। আজ হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের আগ্রাসনের সামনে দাড়িঁয়ে এই দুই ধারার কাছাকাছি আসার পক্ষে একটি ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সংকটময় কিন্তু সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে এই দুই ধারার মধ্যেই রয়ে যাওয়া কিছু গোঁড়ামিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আজো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিপ্লবী কমিউনিষ্ট আন্দোলন ও দলিত মুক্তি আন্দোলনকে পরষ্পরের স্বাভাবিক সাথী হিসেবে মেনে নেওয়ার পথে। ভারতীয় বাস্তবতায় গড়ে ওঠা আম্বেদকরবাদের থেকে যেমন অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া দরকার মার্ক্সবাদীদের, মার্ক্সবাদী শিক্ষক লেনিন যেমন বলেছিলেন মূর্ত অবস্থার বিশ্লেষণ দরকার কোনো অবস্থার নিদৃষ্ট কর্মপদ্ধতি স্থির করার জন্য। আবার জাতিবর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে, দলিত মুক্তি আন্দোলনে জয়লাভ করতে সাচ্চা আম্বেদকরবাদীদেরও শিক্ষা নেওয়াটা একান্ত দরকার মার্ক্সবাদের মতো একটি চলমান বৈজ্ঞানিক ও বস্তুবাদী বিশ্বদর্শনের থেকে। এটাই আজ সময়ের দাবি ও সংগ্রামের দাবি।

দলিত আন্দোলনের কর্মী ও মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী আনন্দ তেলতুম্বে কিছুদিন আগে তাঁর লেখা এক প্রবন্ধে দাবি করেছেন যে, আম্বেদকর মার্ক্সবাদীদের মতোই ভেবেছিলেন একটা সময়, কিন্তু মার্ক্সবাদীরা আম্বেদকরের ভাবনা বুঝতে পারেননি। কথাটি একদমই ঠিক। ভারতের বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণ করে আম্বেদকর যেভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থাকে দেশের জনগণের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেই ব্যাখ্যার সঠিকতা মার্ক্সবাদীরা বুঝতে ঐ সময় ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কটি বুঝতে মার্ক্সবাদীদের অনেক সময় লেগেছে। আর সেই বোঝাপড়াও সীমাবদ্ধ থেকেছিল শুধু এগিয়ে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন বিপ্লবী কমিউনিষ্টদের মধ্যেই। কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের মধ্যে সর্বস্তরে সেই বোঝাপড়া ও শিক্ষা সঞ্চালিত হয়নি। ফলে মাঠে ময়দানে সংগ্রামে মার্ক্সবাদী ও আম্বেদকরবাদীদের মধ্যে এক দুরত্ব রয়েই যায়। অথচ আম্বেদকরের বিশ্লেষণ ও তত্ত্বায়নের সাথে শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতিকে মিলিয়েই দলিত আন্দোলনের প্রয়োজনীয় রূপরেখা নির্মাণ করেছেন মাওবাদী বিপ্লবী তাত্ত্বিকেরা। বলা ভালো, আম্বেদকরবাদের রাজনৈতিক দিকটির থেকে শিক্ষা নিয়েই গড়ে ওঠে এই রূপরেখা। অবশ্যই তার সাথে ছিলো সমাজের সবচেয়ে শোষিত ও পিছিয়ে পড়া জনগণের মধ্যে কাজ করতে করতে ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্রের মূর্ত রূপটিকে বুঝতে পারা হাতে কলমে। কিন্তু আজ সময়ের প্রয়োজনটি অনেক বড়ো। আজ প্রতিটি কমিউনিষ্ট বিপ্লবী কর্মীর দরকার ভারতীয় সমাজের মূর্ত অবস্থার মূর্ত বিশ্লেষণটিকে আত্মস্থ করা ও সেই মতো প্রয়োগে যাওয়া। তার জন্য আম্বদকরবাদ যে প্রায় ১০০ বছরের তাত্ত্বিক ও প্রয়োগগত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রেখেছে তাকে জানা ও তার থেকে শিক্ষা নেওয়াটা আজ প্রতিটি কমিউনিষ্ট বিপ্লবীর ঐতিহাসিক দায়িত্ব, সময়ের দাবি। অবশ্যই তার মানে এই নয় যে, আম্বেদকরবাদকে ও আম্বেদকরকে সমালোচনাহীনভাবে মেনে নিতে হবে। কখনোই তা নয়। কিন্তু অবশ্যই ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিবর্ণব্যবস্থাকে বুঝতে আম্বেদকরের বিশ্লেষণ জানতে হবে ও আম্বেদকরবাদী আন্দোলনের ইতিহাসটিকেও ফিরে দেখতে হবে। এখানে কোনো গোঁড়ামি রাখা যে ভুল হবে, সেটা বলা যায় সহজেই। এর সাথে আম্বেদকরসহ দলিত আন্দোলনের অন্য নের্তৃত্বদের উপযুক্ত সম্মান দেওয়ার প্রশ্নটিও গুরুত্বপুর্ন। ফুলে দম্পতী, পেরিয়ার, আম্বেদকর, দাদাভাই গায়কোয়াড, দলিত প্যান্থারস থেকে আজকের জিগনেশ, এঁরা অবশ্যই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। সম্মানের দৃষ্টিতে এঁদের দেখা ও আম্বেদকরবাদকে নিয়ে এক নতুন দৃষ্টিতে বোঝাপড়া করার মাধ্যমেই দলিত আন্দোলন ও মার্ক্সবাদী আন্দোলনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মেলবন্ধনটি গড়ে উঠতে পারে।

এতো গেলো একটা দিকের কথা। এই মেলবন্ধনের আরো একটি দিক আছে। সেটি হলো দলিত আন্দোলনের দিকটি। যেটি প্রধানত আম্বেদকরবাদ দ্বারাই পরিচালিত। মার্ক্সবাদী শিবিরের দীর্ঘদিনের গোঁড়ামি, আম্বেদকর ও আম্বেদকরবাদী আন্দোলনকে যথাযোগ্য দূরে থাকে, ন্যূনতম সম্মানটিও না দেখানোয় আম্বেদকরবাদী তথা দলিত আন্দোলনের ধারাটির দিক থেকে মার্ক্সবাদীদের প্রতি এক পাঁচিল উঠে বসে আছে। আর সেই পাঁচিলকে আরো কঠিন করেছে কিছু ছদ্ম আম্বেদকরবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে আপসকারী দলিত সংগঠনের সুবিধাবাদী নের্তৃত্ব। কারণ তারা চান না মার্ক্সবাদী ধারা ও আম্বেদকরবাদী ধারা দুটির মধ্যে কোনো মেলবন্ধন হোক। কারণ তারা চান সংরক্ষণের মতো কিছু ইস্যু নিয়েই ব্যস্ত থাকুন দলিত জনগণ। দলিত জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিকে যাতে দলিত আন্দোলন না যেতে পারে সেই দিকেই তাদের নজর। ব্রাহ্মণ্যবাদের জুজু দেখিয়ে তারা নেতা হয়ে থেকে ক্ষমতার ছিটেফোঁটা পেয়েই খুশি ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে সমঝোতা করে। যদিও বিভিন্ন ঘটনায় তাদের স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়ছে বারবার জনগণের সামনে তাও তাদের প্রভাব খুব ভালোভাবেই রয়েছে। কিন্তু আম্বেদকরবাদী তথা দলিত আন্দোলনের ধারাটির সাথে মার্ক্সবাদী ধারাটির মেলবন্ধন এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতাটিকে আজ জিগনেশ মেহবনীর মতো অনেক আম্বেদকরবাদী বুঝতে শুরু করেছেন, কবির কলা মঞ্চ, সুধীর ধাওয়ালের সম্পাদনায় বিদ্রোহী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, শাম্বাজী ভগৎএর মতো অনেক দলিত আন্দোলনের কর্মীই মার্ক্সবাদের তথা কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের সাথে মেলবন্ধনের প্রয়াস জারী রেখেছেন। আনন্দ তেলতুম্বের কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। এই মেলবন্ধনের আরো বেশি প্রয়োজনীয়তা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে ৯০এর দশকে নয়া উদার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পর।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়িত পুঁজি এই নয়াউদার অর্থনীতির মাধ্যমে যে অবাধ লুঠের সুযোগটি পেয়ে গেছে তার অন্যতম দেশিয় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্র। এদের মধ্যে পুরোপুরি সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। যেটুকুও দ্বন্দ্ব রয়েছে তা অবৈরী, কোনোভাবেই বৈরী নয়। সামান্য বোঝাপড়াসমঝোতার মাধ্যমেই তার নিরসন করে চলেছে স্ম্রাজ্যবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্র। আর এখানেই আম্বেদকরবাদী আন্দোলন ও মার্ক্সবাদী আন্দোলনের দুটি ধারার মধ্যে মেলবন্ধনের ঐতিহাসিক প্রয়োজনটি তৈরি হচ্ছে। আম্বেদকরবাদের শুধু রাজনৈতিক দিক আছে এমন নয়, কোনো মতাদর্শেরই তা থাকে না। এর একটি অর্থনৈতিক দিকও আছে। সেই দিকটি যে অর্থনীতির কথা বলে তা আজকের সময়ে নয়া উদার অর্থনীতির সমতুল্য। আসলে আম্বেদকর যে অর্থনীতির পাঠ নিয়েছিলেন তা সেই সময় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির প্রয়োজনেই জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের মডেলকে সামনে তুলে ধরছিলো। ঔপনিবেশিক ভারতে রাষ্ট্রের সেই চেহারাও ছিল অনুপস্থিত। তুলনায় প্রগতিশীল সেই রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকেই স্বাধীন ভারতের জন্য আদর্শ বলে ভেবেছিলেন আম্বেদকর। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ভারত হয়ে দাঁড়ায় আধা সামন্ততান্ত্রিকআধা ঔপনিবেশিক ভারত। জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এক মিশ্র মুখোশ ধরে ভারত রাষ্ট্র। এবং আজ নয়াউদার অর্থনীতির যুগে আম্বেদকরের প্রচারিত অর্থনৈতিক লাইন সরাসরি নয়াউদার অর্থনীতির অনুকূলেই চলে যায় ঐতিহাসিক কারণেই। ১৯৩০৪০ দশকের জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনেই বিবর্তীত হয়েছে নয়া উদার অর্থনীতিতে। এই নয়াউদার অর্থনীতি ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্র একে অপরকে শক্তি জুগিয়ে চলেছে ও শোষণ করে চলেছে ভারতের জনগণকে। যে ভারতের জনগণের মধ্যে আজ ৮৭% হলেন দলিতআদিবাসীসংখ্যালঘু। আজ সাচ্চা আম্বেদকরবাদীদের এই জায়গাটা নিয়ে ভাবতে হবে, এবং সাথে এটা নিয়েও ভাবতে হবে যে সাম্রাজ্যবাদী নয়া উদার অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে মার্কসীয় অর্থনীতির চেয়ে জোরালো বিকল্প আজ আছে কিনা। অন্তত সেটা নিয়ে বোঝাপড়া করাটা দরকার।

আম্বেদকরবাদের আরো একটি দিক নিয়েও ভাবনা চিন্তার অবকাশ রয়েছে। আম্বেদকরবাদ পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবের সাথে সংঘাত থেকে উঠে আসা এক বিষয়গত বোঝাপড়ার ওপর। এখানে দ্বান্দ্বিকতার জায়গাটি অনুপস্থিত। ফলে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্ববিক্ষায় আম্বেদকরবাদ চালিত হয় নি। ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাগুলিকে বারবার নিদৃষ্ট করে তা কাটিয়ে উঠে বিকশিত হওয়ার দিকটিও অনুপস্থিত আম্বেদকরবাদে। যেভাবে ঐতিহাসিক কালপর্যায় পরিবর্তনের সাথে সাথে মার্ক্সবাদ বিকশিত হয় লেনিনবাদে, ও তারপর মাওবাদে, এই ধরনের বিকাশমান সমাজবিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারেনি আম্বেদকরবাদ অনেক সম্ভাবনা নিয়ে পথ চলা শুরু করার পরেও। তাই একটা নির্দিষ্ট সময়ে আম্বেদকরবাদ যাকে সঠিক বলে মনে করেছিল, আজো সেটিকেই সঠিক বলে মনে করে। সময় পাল্টানোর সাথে সাথে পূর্নমূল্যায়নের মাধ্যমে মতাদর্শের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা হয়ে ওঠেনি আম্বেদকরবাদের পরিমন্ডলে। সর্বহারার একনায়কত্ব ও বিপ্লবী হিংসার প্রশ্নে আম্বেদকর যে মতপার্থক্য মার্ক্সবাদের সাথে নিদৃষ্ট করেছিলেন তার পূর্নমূল্যায়ন হয় নি আম্বেদকরবাদের পথ চলায়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিতে আম্বেদকরবাদী আন্দোলনের সমগ্র ইতিহাসটিকে পর্যালোচনা করলে যেখানে বারবার দেখা যাবে যে আম্বেদকরবাদী আন্দোলন বাস্তবের প্রয়োজনেই হিংসার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এবং যেখানে যেটুকু দলিতআদিবাসীসংখ্যালঘু জনতার ক্ষমতায়ন হয়েছে তা বিপ্লবী হিংসার মাধ্যমেই স্থাপন করা গেছে। বিহারঝাড়খন্ডে রনবীর সেনাসানলাইট সেনার মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততন্ত্রের যে বেসরকারী সেনার আধিপত্য ছিল তাকে খর্ব করার পেছনে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পাল্টা বিপ্লবী হিংসার গুরুত্বই সর্বাধিক। আর.এস.এস এর মতো হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলা করে ছত্তিশগড়ের দন্ডকারণ্যে একটা স্তরে দলিতআদিবাসী জনগণের বিকল্প শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পেছেনেও কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের বিপ্লবী হিংসার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এবং এই অবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনটিকে মেটাবার এক অবশ্যম্ভাবী রাস্তা হল শ্রেণীর একনায়কত্ব। যার মাধ্যমেই সুরক্ষিত থাকতে পারে আম্বেদকরের স্বপ্নের শুরাজ (শুদ্ররাজ)। এই পূর্নমূল্যায়নগুলি করা হয়নি আম্বেদকরবাদে। যেগুলি এখন করা দরকার আম্বেদকরবাদীদের। আম্বেদকরবাদি আন্দোলন তথা দলিত আন্দোলনের ধারাটির এই দিক দিয়েই ফিরে দেখা দরকার আম্বেদকরকে।

আশার কথা, এই নতুন দৃষ্টিতে আম্বেদকরকে ফিরে দেখার কাজটি দুই ধারার মধ্যেই শুরু হয়েছে কিছুটা। গত ১ বছরের সারা দেশব্যাপী আন্দোলনে উঠে এসেছে জয় ভিমলাল সেলামএর মতো শ্লোগান, দলিত আন্দোলনের বিভিন্ন আইকন তুলে ধরা ও আম্বেদকরকে নিয়ে আগ্রহও বেড়েছে। যদিও এর বেশিরভাগটাই মার্ক্সবাদী ধারায় ঘটেছে কিন্তু সেটাও আশাব্যাঞ্জক। গুজরাটের ঊনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দলিত আন্দোলনে আমূল ভূমি সংস্কার ও দলিতদের মধ্যে জমি বন্টনের যে দাবি উঠেছে তাও ভারতের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দাবির সাথে সমতুল্য। ফলে আম্বেদকরবাদী তথা দলিত আন্দোলনের ধারাটির থেকেও বেশ কিছু আশাপ্রদ ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এখন দরকার এই নতুন ইঙ্গিতগুলিকে শক্তিশালী করা ও এর গুরুত্বকে আরো বেশি বেশি করে দুই ধারার কর্মীদের কাছেই তুলে ধরার।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s