মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকী ও তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

Posted: জুলাই 30, 2016 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

gpcr-1966-2

লিখেছেন: অজয় রায়

গত ১৬ই মে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ৫০ বর্ষপূর্তী হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৫৬ সালে পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা ও চীনের প্রারম্ভিক নেতিবাচক অভিজ্ঞতার নিরিখে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের (১৯৬৬১৯৭৬) সূচনা করা হয়েছিল মাও সেতুঙএর নেতৃত্বে।[] চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেকার যে শক্তিগুলি পুঁজিবাদ পুন:প্রতিষ্ঠা করার পক্ষপাতি ছিল, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ জনসাধারণকে সংগঠিত করা হয়েছিল। পার্টি ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার বিশেষ সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে বিদ্রোহ করার অধিকার দেওয়া হয়। যখন স্লোগান ওঠে, সদর দপ্তরে কামান দাগো। স্পষ্টতই সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অর্থ হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টিকে জনগণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত হতে হবে। এটাই মাও সেতুঙএর সূত্রায়িত গণলাইন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীনের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল সর্বহারার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী এক জাতীয়, জনপ্রিয়, গণতান্ত্রিক বিপ্লব। যার পরবর্তীকালে ১৯৫৬ সালেও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে গুরুতর বিতর্ক চলে, যখন লিউ শাও চি এবং তেং শিয়াও পিংএর মতো পার্টির মধ্যেকার সংশোধনবাদী অংশ ধনতন্ত্রকে সংহত করতে চেয়েছিল। কিন্তু মাও সেতুঙএর নেতৃত্বে পার্টির একাংশ এর বিরোধিতা করে এবং সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। মহাউল্লম্ফন বা গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডএর পরবর্তীকালে সূচনা করা হয় সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। যে বিপ্লব চীনে এক দশক ধরে পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ করে। আর সর্বহারার একনায়কতন্ত্রকে মজবুত করে। যখন রাজনীতিকে নেতৃত্বে রাখার ধারণা অনুসরণ করা হয়। সোভিয়েত মডেলের ধাঁচে একপেশে ভাবে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিবর্তে উৎপাদিকা শক্তি, উৎপাদন সম্পর্ক ও উপরিকাঠামোর মধ্যেকার সম্পর্কের পথ উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়। জনগণতন্ত্রের লক্ষণীয় প্রসার ঘটে এসময়। শহর ও গ্রাম, কায়িক এবং মানসিক শ্রম আর ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যেকার শ্রমবিভাজন থেকে উদ্ভূত বিভেদ কমাতেও পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়। ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের সামিল করা এবং উৎপাদনশীল শ্রমে পার্টি কর্মীদেরকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সেই সঙ্গে গণতত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা চালু হয়।

gpcr-1967

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া মতাদর্শকে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়। আর সর্বহারার মতাদর্শকে উৎসাহদান করা হয়। সংশোধনবাদ সমূলে উৎপাটন করে এমএলএম মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্পষ্টতই সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদলেনিনবাদের তৃতীয় স্তর রূপে বিকশিত হয় মাও সেতুঙএর মতাদর্শ। পুরানো সমাজের অবশেষ সমস্ত আবর্জনা সাফ করা, শোষক শ্রেণীর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পুরাতন ধ্যানধারণা, রীতিনীতি ও অভ্যাসগুলির বিলোপ ঘটানো এবং সর্বহারার নতুন ধ্যানধারণা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও অভ্যাসে উৎসাহদানের উদ্যোগ নেওয়া হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে। জনসাধারণের মনের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এসময় চীনে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ প্রক্রিয়াও জোরদার হয়। শিল্প, কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটে। জনসাধারণের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাপক ভাবে প্রসারিত হয়। পরিকাঠামো তৈরি হয়। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে জোরদার করতেও সহায়তা জুগিয়েছিল সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তবে যেটা লক্ষণীয়, সংশোধনবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সাফল্যের ইতিহাস বিকৃত করতে এখনও ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

china-cult-rev

সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় জনগণের গণতন্ত্র সম্প্রসারিত করতে রেড গার্ড বা লাল রক্ষী (গণমিলিশিয়া) এবং পিপলস্‌ কমিটির মতো কিছু নতুন প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে নানা সমস্যা দেখা দেয়। কমিউনিস্ট মহলের একাংশের মতে, এর জন্য আরও প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলি উপযুক্ত ভাবে তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। তরুণদের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণেও জটিলতা বাড়ে। তাছাড়া একাংশের মধ্যে অতি বামপন্থার ও ব্যক্তিপূজার ঝোঁক দেখা দেয়। যার ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি হয়েছিল। আর তার সুযোগ নেয় দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদীরা যারা আক্রমণের নিশানায় ছিল, তারা অন্তর্ঘাত ঘটায় ও নকল লাল রক্ষীদেরকে সংগঠিত করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে।

mao-funeral-1976

মাও সেতুঙএর আমলে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সবসময় যে সরাসরি পরিচালিত হয়েছিল এমনটাও নয়। মাও সেতুঙ প্রায় শয্যাশায়ী ছিলেন। আর তাঁর মৃত্যুর পরেই ১৯৭৬ সালে তেংহুয়ার মতো সংশোধনবাদীদের নেতৃত্বে প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান সংগঠিত হয় চীনে। তথাকথিত সংস্কারের নামে পুঁজিবাদ পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এতে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক শিক্ষা নস্যাত হয়ে যায় না। বরং মাও সেতুঙএর শিক্ষার সত্যতাই প্রতিপন্ন হয় যে, সমগ্র সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী ও শ্রেণী দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। আর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের অধীনে লাগাতার বিপ্লব চালিয়ে যাওয়া জরুরি। সমাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ ঘটিয়ে সাম্যবাদের পথে যাওয়ার জন্য বহু সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

বর্তমানে চীনে তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির নামে আসলে চীনের বৈশিষ্ট্যসহ পুঁজিবাদ চলছে। যার পরিণতিতে সেদেশে পুঁজিবাদের সবথেকে নেতিবাচক পরিবেশগত ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যাচ্ছে। দারিদ্র বৈষম্য অনেক বেড়েছে। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষা রিপোর্টে যেমন দেখা গেছে, চীনের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ পরিবারের হাতে রয়েছে দেশের সম্পদের এক তৃতীয়াংশ। আর চীনের দরিদ্রতম ২৫ শতাংশ পরিবার দেশের মোট সম্পদের মাত্র ১ শতাংশের মালিক।[] সেই সঙ্গে ব্যাপক ভাবে বেড়েছে বেকারত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা সঙ্কুচিত হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরিও অত্যন্ত কম। যার সুযোগ নিয়ে যথেচ্ছ মুনাফা লুটছে দেশীবিদেশী বড় পুঁজিপতিরা। তবে যেটা লক্ষণীয়, সেদেশের নতুন পুঁজিবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে খেটে খাওয়া মানুষ, বিশেষত তাঁদের বামপন্থী অংশ এখনও সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পদ্ধতি ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

teng-xinping-and-cong-1992

মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক থেকেই শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। আর বিপ্লবী পার্টি ও গণসংগঠনগুলির মধ্যে তা এখনও অনুশীলন করা জরুরি। যেমন, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা তৎসহ গণলাইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করে আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার মোকাবিলা করা দরকার। এক বিভাজিত হয় দুইতে এই নীতি কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে অসর্বহারা ও সর্বহারা প্রবণতাগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব সবসময়েই চলে। সেজন্য উপযুক্তভাবে দুই লাইন সংগ্রাম পরিচালনা করা দরকার ঐক্যসংগ্রামরূপান্তরের লক্ষ্যে।

এদিকে বর্তমানে বিশ্বের নানা প্রান্তে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলছে। নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের মাধ্যমে শোষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। অসাম্য এবং দারিদ্র আরও তীব্র হচ্ছে। অক্সফেম’র দেওয়া তথ্য অনুসারে, এখন বিশ্বের এক শতাংশ ধনীতম ব্যক্তিদের সম্পদের পরিমাণ ছাপিয়ে গিয়েছে বাকি নিরানব্বই শতাংশ মানুষের মোট সম্পদের পরিমাণ।[] এদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসররা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যা সংগঠিত করছে। মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টাও হচ্ছে।

স্পষ্টতই পুঁজিবাদ দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটে পড়েছে। নিপীড়িত দেশগুলির ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার মূল দ্বন্দ্বও তীব্র হচ্ছে। পরিণতিতে সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব আর সর্বহারা এবং বুর্জোয়াদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের মতো অন্যান্য সমস্ত দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এর মধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হচ্ছে। যখন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও ধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছেন মেহনতি জনসাধারণ। যাদের রাডিকাল অংশ সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন; আর আধুনিক সংশোধনবাদ ও সঙ্কীর্ণতাবাদের মোকাবিলা করে এমএলএম মতাদর্শকে নিজ নিজ দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী সৃজনশীল ভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে লড়াই করছেন। যা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাকেই প্রমাণ করছে।।

তথ্যসূত্র

[] Dongping Han, ‘‘Farmers, Mao, and Discontent in China: From the Great Leap Forward to the Present’’, 2009 › Volume 61, Issue 07 (December), MONTHLY REVIEW

[] Shannon Tiezzi, ‘‘Report: China’s 1 Percent Owns 1/3 of Wealth’’, January 15, 2016, The Diplomat

[] Jason Hickel, “Global inequality may be much worse than we think”, April 8, 2016, The Guardian

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s