তুরস্কের সেনা অভ্যুত্থান সম্পর্কে কিছু কথা

Posted: জুলাই 17, 2016 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা শেষে এরদোয়ানফ্যাসিবাদী এরদোয়ান এ যাত্রায়ও বেঁচে গেলেন

কিন্তু তুরস্কের ওই ক্যু প্রচেষ্টায় কিছু প্রশ্ন সামনে ওঠে এসেছে

১। এরদোয়ানের সমর্থক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মাসখানেক আগেই প্রতিবেদন দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর মধ্য থেকে ক্যু প্রচেষ্টা হতে পারে। এমনকি তারা নাকি সেনা কর্মকর্তাদের নামও উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু কেন??

২। ক্যু পরিকল্পনাকারী বা বিদ্রোহী সেনা সদস্যরা কি এতোটাই অবুঝ যে, কেবল ফেসবুক, টুইটারকেই অনলাইনের যোগাযোগ মাধ্যম বলে মনে করেছিলো, মোবাইল নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন আইএসপির ইন্টারনেট, এমনকি মোবাইল ইন্টারনেট পর্যন্ত খোলা ছিলো। মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই এরদোয়ান যোগাযোগ রক্ষা করতে পেরেছিল বলে জানা যায়। তাহলে প্রশ্ন আসে, এমন কাঁচা পরিকল্পনায় সেনাবাহিনীর জেনারেল পর্যায়ের কর্মকর্তারা কিভাবে জড়িত হতে পারেন? নাকি পরিকল্পনায় স্যাবোটাজ হয়েছিলো??

৩। ক্যু প্রচেষ্টার খবর জানাজানি হওয়ার পর টেলিভিশন স্টেশনে বিবৃতি প্রচার করার পরেও সব টিভি/বেতার কেন্দ্র তারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। কিন্তু কেন? যে মাপের সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের অধীনস্ত ব্যাটালিয়ন ক্যু প্রচেষ্টায় অংশ নেয়, তাতে প্রধান সম্প্রচার কেন্দ্রগুলো এবংফ এক্সেস কন্ট্রোল তাদের হাতে আসতে ১ ঘন্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। বসফোরাস ব্রিজ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম লাইভ স্ট্রিমিং করছিলো, কিন্তু তাও বন্ধ করা হয়নি। কতোই না গণতান্ত্রিক ক্যু প্রচেষ্টা!!

বিদ্রোহী সেনাদের আত্মসমর্পণ

৪। দুই ঘন্টারও বেশি সময় পর এরদোয়ান ফেইস টাইম ব্যবহার করে ভাষণ দিলেন। আর তা সংবাদমাধ্যমসহ সারা বিশ্বে পৌঁছে গেলো। যা আটকে দেওয়ার কৌশলটা ক্যু পরিকল্পনাকারীরা জানতেন না এমনটাও নয়। কিন্তু তা হতে দেওয়া হলো।

৫। সামরিক ক্যু প্রচেষ্টার মানেই হলো সমরাস্ত্রের জোরে ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। আর সেখানে বিরোধী পক্ষ সামনে আসলে রক্তপাত সুনিশ্চিত। অথচ এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় জড়ো হওয়া শুরু করার সময়, বা ট্যাঙ্কে উঠে লম্ফঝম্ফ করার সময়েও বন্দুকে তালা মেরে রেখেছিলো ওই বিদ্রোহীরা। অথচ দরকার ছিলো, অস্ত্রের জোরে ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের রাস্তা থেকে উচ্ছেদ করা।

বিদ্রোহী সেনাদের পেটাচ্ছে এরদোয়ান সমর্থকরা

৬। বিদ্রোহীরা কি ফুলেল শুভেচ্ছা প্রত্যাশা করছিলেন? হ্যাঁ, ফুলেল শুভেচ্ছা তারা হয়তো পেতেন, এমনকি এরদোয়ানের অনেক মন্ত্রীও নতুন সামরিক সরকারে আসতে পারতো, কিন্তু তা হতে নির্ভর করে ক্ষমতা পোক্ত হওয়ার ওপর। যা তারা করতে পারেননি।

৭। এরই মধ্যে তুরস্কের সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃপক্ষ হাই কাউন্সিল অব জাজেজ অ্যান্ড প্রসিকিউটর (এইচএসওয়াইকে) দুই হাজার ৭৪৫ জন বিচারককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু জানিয়েছে, অব্যাহতি দেওয়া বিচারকদের মধ্যে এইচএসওয়াইকের পাঁচ সদস্যও রয়েছেন। অর্থাৎ বিচার বিভাগও এরদোয়ানের পুতুলে পরিণত হবে এর মধ্য দিয়ে।

তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম জানিয়েছেন, ১৬১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৪০ জন। অন্তত ২ হাজার ৮৩৯ জন সেনা সদস্যকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ১০৪ জন বিদ্রোহী সেনা সদস্যের নিহত হওয়ার কথা। এমনকি তাদের একটা বড় অংশ থেকে আহত হয়েছেন এবং গ্রেফতারের পর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এরদোয়ান সমর্থকদের উল্লাস

এখন চলবে একের পর এক বিচারিক গণহত্যা। আর বিরোধী পক্ষকে মামলা দিয়ে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হবে। আর এর মধ্য দিয়ে তুর্কি সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলা হবে ওয়াহাবিবাদের ছাঁচে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ক্যুদেতায় লাভটা আসলে কার হলো?

ওই ক্যু প্রচেষ্টায় একমাত্র লাভবান হয়েছেন, ওয়াহাবিবাদের নতুন পুরোধা এরদোয়ান। অচিরেই সেনাবাহিনী পরিণত হবে তার ব্যক্তিগত বাহিনীতে।

আমার আশঙ্কা, ওই ক্যু পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে জেনেও তা নিয়ে এরদোয়ান কিছু করেননি, তা হতে পারে না। তিনি ভেতরে ভেতরে সব জেনে, উল্টো চাল খেলেছেন, তার নিজেদের সেনা ও কমান্ডো সদস্যদের মাধ্যমে। এটাই ছিলো তার মাস্টারপ্ল্যান।

জাতীয় পরিসরে একমাত্র সেনাবাহিনীতেই তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিলো না। যেহেতু সেখানে আতাতুর্কের চিন্তা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগেও দুইবার এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সেনা অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু তা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আসেনি। আর তাই ওই প্রতিষ্ঠানে ক্যু প্রচেষ্টা আবারও হতে পারে খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়। আর সেখানেই গোয়েন্দা প্রতিবেদন কাজে লাগিয়ে উল্টো চাল খেলেছেন এরদোয়ান। ফ্যাসিবাদী ওয়াহাবিবাদের মোক্ষম খেলায় কেবল টিকে গেলো না, আরো শক্তিশালী হলো এরদোয়ান।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তার ডিসপ্লে এখন নিয়মিত হতে থাকবে। আর এর পেছনের কথাগুলো চাপা পড়ে যাবে ওই দেশপ্রেমিক বিদ্রোহী সেনাদের কবরে।

উল্লেখ্য, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে কোনো দিক থেকেই আসতে পারে। ফ্যাসিবাদ নিজেই তার কবর রচনা করে চলে। অভ্যুত্থান (সামরিক/বেসামরিক) বা কথিত ভোটের রাজনীতিতে শাসকশ্রেণীর এক অংশ থেকে অপর অংশে যে ক্ষমতার হাত বদল হয়, তাতে শাসকশ্রেণীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই একটি অংশ নিরঙ্কুশ হতে পারে না। কিন্তু তুরস্কের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, কর্তৃত্ববাদী এরদোয়ান নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দিকেই এগোচ্ছেন ফ্যাসিবাদের ষোলকলা পূর্ণ করার পথে। আর এ থেকে বর্তমান বাঙলাদেশের অবস্থাও আমরা খানিকটা নিরূপণ করতে পারি। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সামরিক/বেসামরিক যেদিক থেকেই আসুক না কেন, তা গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কর্পোরেট সেনাবাহিনী বিষয়টা একেবারেই ভিন্ন। যেখানে কোনো সেনাবাহিনী নিজেই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। যা আমরা বাঙলাদেশ, পাকিস্তান বা মিশরের সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু তুরস্কের সেনাবাহিনী কর্পোরেট সেনাবাহিনী নয়। উল্লেখ্য, মিশরে ক্যু হওয়ার পর আমি তীব্রভাবেই তার সমালোচনা করেছিলাম।

তুরস্কে কমিউনিস্টরা তো বটেই, এমনকি গণতন্ত্রী বা কুর্দিরাও ফ্যাসিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যে ক্রমাগত কোণঠাসা। তুরস্কের নির্দিষ্ট অবস্থার প্রেক্ষিতেই আমি আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। তা সাধারণ কোনো লাইন নয়, অথবা এর সরলীকরণ করাটাও ভুল। নির্দিষ্ট বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ওই বিদ্রোহকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করি

১৭ জুলাই ২০১৬

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s