অন্তিমের আনন্দধ্বনি’ শীর্ষক কাব্য-সংকলনটি এখানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো তার প্রথম কিস্তি।

অন্তিমের আনন্দধ্বনি

অন্তিমের আনন্দধ্বনি

. প্রথম প্রভাতে

——————————————-

প্রথম প্রভাত, পাখিদের কলোকাকলির সুরেলা আলাপ

পায়ের আওয়াজ নাস্তার টেবিলে টুংটাং তস্তুরী প্লেটের ঠন ঠন

জায়নামাজ, কয়টা সংবাদপত্র হেডলাইন স্পষ্ট

তসবির দানাগুলো উপর আর নিচয়ে আঙুলের গতি

চোখ সংবাদপত্রের মুখে

ছোট্টসংবাদ

সঙ্গহীন এক মানুষের অন্তিম জীবন কথা

খশ খশ শব্দ সে কি পাখার আওয়াজ?

চড়্ইুগুলোর ওড়াউড়ি ভোরের কলোরব প্রথম আলোক সোনামুখি

উজ্জ্বল আকাশ মিহিন ছড়ান

ধুমায়িত নাস্তা,

ফোলা তন্দুর

ভাবনা; ভাবনার বৃত্ত ভাঙা প্রান্ত ছুঁয়ে নানামুখ

প্রবাহিত জলস্রোত নানাদিক অনির্দিষ্টকেন্দ্রমুখি

পায়ের অওয়াজ নগরের কোলাহল আমির সংঘাত

.

ক্ষতি কী!

দূর তো দূর নয় হ্যাঁ অথবা না’য়ের সমাপ্তি

যখন গন্তব্যে তখন ঝাঁ ঝাঁ রোদের দাপটে ক্ষয়ের থাবা

ছায়ারা দীর্ঘতনু

গাছগাছালির নিশ্বাস পাতারা উড়ছে

যতদূর চোখ আকাশের দিকে সারা ব্যাপ্তীতে মৌনতা

যেন

সবকিছু স্থির মৌন এবং অলৌকিক

দু’চারটে ফড়িং ঘাসের ডগায় সবুজ বাদামী

মাটির দেয়াল জীর্ন, আলোক লেপ্টানো, স্মৃতির সাঁতার

বন্দি স্পার্টাকুস শেষ পরিণতি ঘন ছায়া

ঢোলকলমীর দোলা ধ্যানমগ্ন পীর

শরীরে রৌদ্ররোষের ক্লান্তির; ঝিমানো পাতা

কিছু ঝরা ফুল

একচিলতে বারান্দা পশ্চিমমুখী হাসপাতালের ট্রলি

ফুটো টিনের আচ্ছাদন আকাশ বৃত্তের মতো

আরাম চেয়ার, খানিকটা ভাঙা, বিপর্যস্ত নুহের নৌকা

সত্তর মানে সাত দীর্ঘযাত্রা মুখ ভর্তি দাড়ি

দুই ফালি গোঁফ রৌদ্রধারে এলানো

যুদ্ধ শেষের ক্লান্তি

শাদা চুলে হাওয়ার উড়াল

চোখের পুরু চশমা খানিকটা কাত

যেন অনুসন্ধান দিনের রবির

আসসালুমুআলাইকুম

আপনার শরীর কেমন?

প্রত্যাত্তরহীন কেবল এক কম্পিত হাত প্রসারিত

অভিব্যক্তিহীন রুগ্নক্লান্ত শীর্ণ

অভিযোগ হীন ধরিত্রিমাতার মত মমতার

করমর্দনের ঝাকুনিটুকুর এক কম্পন

মুখের রেখায় প্রকাশহীনতা

কেবলই দূরালোকে এক রেখা শেষ হাসিটুকুর ঝলক

বয়সের ভাঁজ

দুই প্রান্তের দুই বোধের করমর্দন

——————————————————————————–

.

০২. আলাপ পর্ব

——————————————-

স্বরকম্পন, তির তির জলস্রোতের মতো হাওয়ার মতো স্পষ্ট

উচ্ছ্বসিত বাতাস? কন্ঠ ক্ষীণ নিখুঁত উচ্চারণ

আপনি কেমন !

আলহামদুলিল্লাহ,

ইচ্ছে, আপনার নিঃসঙ্গ জীবন প্রসঙ্গ শ্রবন, তাই তো এসেছি

নিঃসঙ্গের অভিজ্ঞতা সে এক শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ, জগতের

দূরতো নয় নিকটও না নিজের মধ্যের কেবল দূরের কেবল নিকট

এক ধ্যান উপলব্ধির কখনও সরল কখনও ঝঞ্জাক্ষুব্ধ শেষ চন্দ্রালোকদ্যুতি

কখনও আড়াল লোক লোকান্তর ব্যাপী উর্দ্ধগামী প্রশান্তিপবন

নদীর চরার মতো ভাঙাগড়া স্থিতি নব উদ্যমের এক জাগরণ

এক আলোক বাহিরের ধুলোবালি ছাকা বর্ষাস্নাত সূর্যালোকমাখা

দুই পাঁজরের তোলপাড় তারও প্রকাশ আছে নির্দ্ধিধ সঙ্গীত আছে রূপে লাবন্যের

আলোক ভান্ডারে রৌদ্রকিরণচ্ছটা ধ্যানমগ্ন এক ঋষী

সে যে দিব্যজ্ঞান অন্তর আলোক স্পর্শাকাঙ্খায় উন্মন

জ্ঞানালোকে যার দ্বিপ্তী হাঁটার ক্লান্তির ভেতর অমেয় প্রজ্ঞার

প্রকাশে বিনম্র আমি যে তার করুণাকামী হে অগ্রজ।

প্রিয়জন

বিপ্লবী যেমন শুনেছেন সে নাস্তিক বর্তমানের সংজ্ঞায় দস্যু

তার অভিজ্ঞতা অনুভব এবং প্রকাশ দ্বিমেরুযোজন দূরত্ব

সুখকর নয় কখনও

তবু আপনার খানকায় কিছুদিন আমার আত্মগোপন সেও এক অভিজ্ঞতা

সম্ভবত সব কিছু সুত্রবদ্ধ হে মহান বন্ধু

বৃদ্ধের কপালে ঘামের চিকন রেখা

আমার জীবন অবসান কালে আপনার উপস্থিতি সত্যি মূল্যবান

প্রত্যেক মানুষ কতগুলো সীমাবদ্ধতার, এই এক অস্তিত্ব প্রমাণ

যেন সে একটা ঘড়ি তার দায় তার দেনা বহুতর তার কাজ ঠিক ঠিক সময়কে ভাগকরা

মানবিকগুণের বিকাশ এই এক নিয়ম এক আরাধনা

মানুষের লাগাতার কাজ

একজন বিপ্লবীও মানুষ, সমাজচেতন মানুষ এমন বিশ্বাস

বেশী কিছু নয় আর

নয় এমন কেউ উচ্চরীতির অতিমানব অনেক কিছুর পারঙ্গমপূর্ণ পুরুষ

ভিরুতা সাহস ইচ্ছে ও বিপরীত ভাবনা সবই মানুষের , তারপরও

জগতে সংসারে নিজের কিছুই নেই থাকে না সবই সামাজিক এক ক্রিয়া

এক অনুবর্তন

প্রতিনিয়ত একরৈখিক ভাবনার দিকে প্রসারিত

বৃত্তের চারিদিকে সমান তার গতি

সে রকম মানুষের গঠনপ্রণালী এখনও দূরপ্রস্থে

আমি সাধারণ

কথোপকথনে এমন ভঙি একজন রুগ্নমানুষের অনুতাপদৃষ্টে স্থির নয়

বিচলিত আগন্তুক

প্রচন্ড ঝড়ের ওলটপালট এক বিশ্বাসীর এক বিস্ময় আগন্তুকের

মৃত্যুর মুখের এক লোক এমনই অবিচল ও প্রত্যয়ী!

আর অজানা সময়ের ভয়ে ভীতিহীন!

তবে কি ভীষণ মানুষগুলোর মানসিক শক্তিই প্রবল?

তারা কি এমনই দুর্ভেদ্য অতিমানবীয়? এক অনতিক্রম্য বোধের?

এমন এক ভাবনার ভেতর পাহাড়চ্যুতি নুড়িকণার মতো

ধুলোর মতো উড়াল ভাবনার প্রসারিত ডানা!

———————————————————————————————————–

.

০৩. জিজ্ঞাসা

——————————–

জিজ্ঞাসা আগন্তুকের: আপনি কমিউনিস্ট, বিপ্লবী নাস্তিক

ধর্ম আপনার কর্মান্তরায়, ধার্মিকরা আপনার শত্রু

সত্যই কি তাই, ধর্মকল্যাণের বিশ্বাসে কেনই বা অবিশ্বাসী আপনি?

কেন নিরুদ্বেগ পরকাল প্রসংগে

নয় কি স্রষ্টার স্বরূপ অস্পষ্ট আপনার মধ্যে? নয় কি

এক উন্মাদনা আপনার দুইচোখে ছড়ানো অন্ধকার

তবে কি স্রষ্টা রয়েছেন বৈরীতায় আপনার অস্তিত্বে কৃপাহীন

নিস্তব্ধতা আজ তার দান আপনার প্রতি

মৃদু হাসির রেখা হঠাৎ আলোকের মতো আঁকাবাকা বলি রেখায়

খানিকটা উজ্জ্বল গহীন অন্ধকারের অরণ্যালোক

দৃষ্টমান গাছ তরু বীথি গুল্মলতা পথ রেখা

এক ধ্বনি পথিকের; শব্দ নয় ভাবনায় ভাষার বয়ান

তারপর গান হয়ে ওঠার প্রথম প্রকাশ সাহস বা বিচ্ছেদে

মিহিন সে কন্ঠবাঁজনা নানা মাত্রার

নাস্তিক সতত উচ্চারণ এক সহজ অভিধা গালাগাল ঘৃণাপুষ্ট বাক্যাবলী

চারিধারে এক করুণাসমাজের

আহা, ওই লোকটা পরকালহীণ দীর্ঘ ভ্রমণের এক পতিত আদম

শাস্তির ক্লান্তিহীন চাবুকের তলে

তার সর্বনাশ তার হাতে লেখাজোকা ইবলিশের দোস্তপেয়ার

নাই ত্রাণ নাই মুক্তি

উপস্থিতি বিপদের হাতিয়ার তরুণের বেদনার অর্বুদ

শুকনো সকল হৃদয়প্রাণ সেই তো কারণঃ নাস্তিক ! ধংস যার অনিবার্য

সত্য এই; মানুষ সমাজ ভাবনার আগারে আবেগ কাঠামো

ভুল শাসনের নির্মাণ, উগ্র ধর্মান্ধতা ভুল শাসনের সৃষ্ট এক বিশৃঙ্খলা

ভুল শাসনের নির্মাণ ভুল রাষ্ট্র ভুল সমাজ আর তার রীতিনীতি

বিশ্বাস উচ্চউগ্রতার আবদ্ধতা নিত্যক্লান্তির তৃষ্ণায় বেগবান

অবারিত সত্য আবরণে আবদ্ধ সুন্দর স্নিগ্ধ নয় ঘোলা এক আলোক

ভ্রমের দুয়ারে হাঁটে এক ছবি তুমি কেউ নও,

ঘটমান যা তা সবই এককের এক বিবেচনা কেউ শত, কেউ শত শত কোটি

ভোগ পাহাড় প্রমাণ

বাকীদের আখেরের অপেক্ষা দারুণ মৌসুম পাবার দৌড় খাবার ও ভোগের

এখন প্রদান নিরুপোদ্রব তাদের সেবায় লাগুক

প্রভুর নির্দেশ এই বাণী ধর্মের নয় ধর্মও মানুষের সমতার প্রকাশে নির্মল

আর মুক্ত কুট ব্যবহারে

বিপরীতে অপেক্ষা, প্রভুর নির্দেশ ওদের জন্যে

শাস্তির নির্দেশ কেবল শক্তিহীন মানুষের এক ভয়

এই আশ্বাস নিয়ে বিকল্প বিবেচনা, এখন

তারা পাবেনা এই হলো এক দর্শন যা ধর্মদর্শন রূপে রূপলাভ

কার সেই স্বার্থ

ভালোগুলো নিমজ্জিত অন্যায় রাষ্ট্রশক্তির হাতে

কমিউনিস্টরা প্রতারণার এই শৃঙ্খল রহস্যের উন্মোচন চায়

গ্রহণীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আর তার নির্ভেজাল

বয়ান চায়, সত্য সবারই প্রয়োজন

ভাবনা ও নিয়মরীতিতে সবার সমঅধিকার

ধর্মের চলমানতায় যুক্ত বেদনার যুক্তি

কারণ প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসে মানুষের প্রশান্তি ব্যক্তিরও

কর্মহীন ভেজাল নয় বরং প্রতিমুহুর্ত কর্মেই উপাশনা

বিনাশ্রমে ভোগ নয় প্রতিষ্ঠিত হোক সমশ্রমের ভোগ উৎপাদনে

কমিউনিস্টের সেই শ্রম বিশ্বাস; উৎপাদনে,বিবর্তনে, প্রলয়পূর্ব ধ্যান ও জ্ঞানে

তবু কমিউনিস্টরা নাস্তিক এই এক ঘৃণা পূর্ণসত্যে

রাষ্ট্রশক্তিরই নির্বাচন আঙুল তার দিকে সে অনিষ্টকারী

নাস্তিক শব্দটি বহুতর বিস্তৃত বহুত্বের ভেতরে এর অধিষ্ঠান

সত্তাগুলোর এককে মিলন একক ঐক্যের নিরঙ্কুশ মোহমুক্ত এক দর্শন

যা সকল অহঙ্কার চূর্ণির ভেতর সেই সত্য অনুভবের চারণভূমি

সেখানে আমি নেই এক বিস্তৃত আমি

অনন্ত সময়ের ভেতরে অস্তিত্বমান মানব সেও আর মানুষ নয় গাছ নয়

পশুও পাখালি নয় সবই এক বস্তুকণা সব ব্রহ্মান্ডশরীর

শেষ নেই প্রান্ত নেই আমি নেই সব আমির উপাদান

নাস্তিক নয় মুরতাদ নয় চলতি সময়ে ধার্মিক নয় মৃত্যুতেও শেষ নয়

কোনো কিছুর মৃত্যু নেই কেবল পরিবর্তনের বিবর্তিত রূপ

অনন্ত সময়ের, যার পরিমান নেই পরিমাপ নেই

দৃশ্যমানতা থেকে অদৃশ্য একরূপ;

আস্তিক্য অন্যায় বিশ্বাসে নেই, নাস্তিক্য আস্তিক্য অতিক্রম করা এক রূপ কর্ম

এক ধ্যান ব্যক্তির গমন ন্যায়ের দিকে, এও এক বিশ্বাস

সে রকম মানুষ আমি এখনও নই, সে অনেক দূরের ব্যাপার।

রুগ্নক্লান্ত মানুষটির

মুখের উপর ছড়ানো চুলগুলোর ওড়াউড়ি, সূর্য়ের বিষন্ন প্রভা পশ্চিম আকাশের

কাঁঠালের সবুজ পাতায় অপরূপ শিহরণ

বৃক্ষগুলো বিচিত্র ভঙির উৎকর্ণ সংলাপে

প্রিয় অতিথি আমার হাতে তেমন সময় আর কই

মৃত্যু আমার কাছে আশ্চর্য এক আড়াল তার

একটা হাত আগন্তুকের হাতে, বললেন:

এরকম অবস্থায় আমার প্রশ্নগুলো নিতান্ত অমানবিক

সে আমার অভিষ্ট নয় বান্ধব

মানুষটির মুখে একচিলতে রোদ মেঘলা আকাশের

যেন তিনি উৎফুল্ল খানিকটা প্রশ্নকর্তার দিকে স্থির চোখে

———————————————————————————————————————————

Advertisements
মন্তব্য
  1. অয়ন্ত ইমরুল বলেছেন:

    অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি–পড়ে মনে হচ্ছে বাংলা সাহিত্য নতুন কিছু পেতে যাচ্ছে।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s