গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা এবং সাধারণের জিজ্ঞাসা

Posted: জুলাই 5, 2016 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

comando-operation-1গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি আরো বেশ কিছুদিন বড় ইস্যু হিসেবেই সামনে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। অন্তত এই মাপের বড় কোনো ইস্যু সামনে না আসা পর্যন্ত তা টিকে থাকবে। সেই সঙ্গে এটি এখানকার ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলকও বটে। সবাই যার যার হিসেব কষছে। ওই সন্ত্রাসী হামলার পর কেউ বিদেশি শক্তির দ্বারস্থ হতে উপদেশ দিচ্ছেন, কেউ আবার নিরাপদ দূরত্বে থেকে দেখে যাচ্ছেন। সরকার এতে ‘দেশীয় জঙ্গি’ খুঁজে পাচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ জামায়াতবিএনপি, বা আইএসআই খুঁজে যাচ্ছে। আর অতিউৎসাহীরা সবকিছুতেই লাফাচ্ছেন!

তবে আমার মতো সাধারণের রয়েছে অনেক প্রশ্ন – ওই ঘটনার পর গায়েব হওয়া মানুষগুলো কোথায়? ওই রাতে বা কমান্ডো অপারেশনের প্রকৃত ঘটনা কি আমরা জানতে পারবো? সেদিন সেখানে কয়জন মানুষ উপস্থিত ছিলেন, আর তাদের মধ্যে কে কোথায় রয়েছে, অথবা কারা কিভাবে নিহত বা আহত হুয়েছেন, সেই তালিকা কি আমরা পাবো? অথচ এই তথ্য জানার অধিকার সাধারণদের রয়েছে।

13600252_10210046721354347_7709384231306595499_n

দুয়েকদিন ধরে ওই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তিনজন মানুষের নাম সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। তারা হলেন – নিবরাস ইসলাম, যিনি সন্ত্রাসী হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রকাশিত সন্ত্রাসীদের ছবিতেও তিনি ছিলেন। ডি.কে হোয়াং প্রকাশিত প্রথম ভিডিওতে তাকে রাইফেল্ল হাতে কিছুটা ইতস্তত পায়চারি করতে দেখা যায় (লিঙ্ক)

হাসনাত করিম, যাকে সপরিবারে জিম্মি চরিত্রে দেখা যায়। আবার হামলাকারীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শলাপরামর্শ করতেও দেখা যায় ডি.কে হোয়াংএর দ্বিতীয় ভিডিওতে, যেখানে অন্য জিম্মিদের টেবিলে মাথা নিচু করে রাখতে দেখা যায়। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ২০১২ সালে হিজবুত তাহরিরের পক্ষে প্রচারণার অভিযোগে তার তৎকালীন কর্মস্থল নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়।

13565433_10208211684063325_1791507143_n

suspectআলোচিতদের মধ্যে তৃতীয়জন হলেন ফারাজ আইয়াজ হোসেন, যিনি ওই সন্ত্রাসী হামলায় জিম্মি ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিহত হন বলে খবর পাওয়া যায়। যাকে কোনো কোনো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম এবং কিছু অতিউৎসাহী সাংবাদিক বন্ধু জাতীয় বীরএর তকমা দিতেও ছাড়েননি। ফারাজের চাচার বরাতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, তিনি নাকি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রেহাই পেয়েও বন্ধুদের ছাড়া ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানান, এরপর বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ দিতে হয় তাকেও। কিন্তু বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। অভিযোগ উঠেছে ডি.কে হোয়াং-এর ধারণ করা দ্বিতীয় ভিডিওতে হাসনাত করিমের সঙ্গে যে বন্দুকধারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তিনি ফারাজ, অর্থাৎ তিনি নিজেও ওই সন্ত্রাসী চক্রেরই অংশ! ওই ভিডিও-র টেম্পো কমিয়ে দেখলে কিছু প্রশ্ন জাগতেও পারে। ওই বন্দুকধারীর সঙ্গে ফারাজের সাম্প্রতিক সময়ে তোলা ছবির সাদৃশ্য, শারীরিক কাঠামো বা বন্দুকধারীর পরিহিত কেডস-এর দিকে খেয়াল করলে সাদৃশ্য পাওয়া যায় (লিঙ্ক)। উল্লেখ্য, ফারাজ আইয়াজ হোসেনের নানা ট্রান্সকম গ্রুপ এবং দেশের প্রথমসারির দুটি দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের মালিক।

কমান্ডো অপারেশনে নিহতের তালিকায় বলা হয়, ছয় সন্ত্রাসী নিহত হন অপারেশন থান্ডারবোল্ট, অথচ ছবি আসে পাঁচজনের। খবরে প্রকাশ, আইএসপ্রকাশিত পাঁচ ব্যক্তির ছবির পঞ্চমজনের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। ফেসবুকের ছবি দেখে বাবা বদিউজ্জামান তার ছেলে শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলকে শনাক্ত করেন বলে জানানো হয়। তবে তার পরিবারের সদস্যরা অপারেশনে নিহতদের সঙ্গে উজ্জ্বলের ছবি মেলাতে পারছেন না! আবারও প্রশ্ন, ওই পাঁচজনের ছবি প্রকাশে হামলার সমন্বয়কারীর ভুলে উজ্জ্বলের ছবি আগেপরে প্রকাশিত হয়ে গেলো না তো?

13567455_1372935822720625_3231021551216872403_n
খবরে বলা হচ্ছে
, ওই পাঁচজনের মধ্যে একজন ওই রেস্টুরেন্টেরই সহকারি শেফ সাইফুল ইসলাম বলে দাবি করেছে তার পরিবার। মরদেহের ছবিতেও তাকে রান্নাঘরের কাপড় পরিহিতই মনে হচ্ছিলো। পুলিশ জানিয়েছে, এটা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয় যে, ওই শেফ সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে ছিলেন কিনা (লিঙ্ক)

এর পরেও প্রশ্ন ওঠে, অপারেশনে ছয়জন নিহত হলে ছবি পাঁচজনের প্রকাশিত হলো কেন? তাহলে ষষ্ঠজন কে? তার পরিচয় কি? একজনকে আটক করার কথা বলা হয়েছিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তার পরিচয় কি? তিনি কি সেই নিখোঁজ শাওন? (লিঙ্ক) এ বিষয়টিও পরিষ্কার করেনি পুলিশ কর্তৃপক্ষ। এর আগে আইজিপি শহীদুল হক জানিয়েছিলেন, ‘গুলশানের নিহত (সন্ত্রাসী) ছয়জনই বাংলাদেশী এবং এদের মধ্যে পাঁচজনকে পুলিশ জঙ্গি হিসেবে আগে থেকেই খুঁজছিলো।’

যদ্দুর জানা গেছে, হলি আর্টিজানে সিসিটিভি ছিলো, আর সিসিটিভি যদি আগে থেকে বন্ধ করে না দেওয়া হয়, তাহলে সেই ফুটেজ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আর তদন্তকারীরা নিশ্চয় আরো অনেক কিছুই খতিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আরো অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে। হাসনাত করিমও হাতের মুঠোতেই রয়েছে। তবে সেখানে তখন কতোজন উপস্থিত ছিলেন, তাদের বর্তমান অবস্থান কি, এসব বিস্তারিত তথ্য সাধারণের সামনে আসবে কিনা, তা নিশ্চিত হতে পারছি না। আর এমন সবকিছু লুকিয়ে রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে এডওয়ার্ড স্নোডেনদের মতো হুইসেল ব্লোয়ারদের এখন খুব বেশি প্রয়োজন এই সমাজের সাধারণ মানুষগুলোর জন্য।

এবার একটি বিষয় আরো পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে। আমার মতো সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগানোর ক্ষেত্রে বিকল্প সূত্রই আলোর দিশারী হয়ে সামনে এসেছে। এক বিদেশি নাগরিকের ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিও হয়ে ওঠে সর্বজনীন তদন্তের ক্ষেত্র। আর এজন্য সেই কোরীয় নাগরিক, ডি.কে হোয়াং – যিনি পাঁচটি ভিডিও আপলোড করে ধামাচাপা দেওয়ার হিসেবে ‘গণ্ডগোল’ বাঁধিয়েছেন, তাকে স্যালুট জানাই। সেই সঙ্গে অতিউৎসাহীদের জন্য করুণা রইলো।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, এই হামলার অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। এর ভিত্তি তৈরিতে শাসকশ্রেণীর প্রতিটা অংশ সর্বদাই চরমভাবে কার্যকর থেকেছে।

হেফাজতের উত্থান, জামায়াতের সঙ্গে সখ্যতাবিরোধিতার দ্বৈত সম্পর্ক, দেশে ইসলামের সবচেয়ে বড় ‘রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদের আইনগত ভিত্তিটা আরও প্রখর করে তুলেছেন। সেই সঙ্গে রয়েছে কথিত সেক্যুলারিজম। যে কারণে কথিত প্রগতিশীলরা তাকেই মন্দের ভালো বলে গণ্য করে। এমনকি যে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের ধর্ম, বিশ্বাস, অথবা আত্মপরিচয়ের জন্য, তারাও এখন পর্যন্ত ‘মন্দের ভালো’ খোঁজাটা ছাড়েননি!

বাঙলাদেশে সেক্যুলারিজমকে মূলত একটি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে সেক্যুলারিজমের নামেও আদতে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শারিয়াকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গঠন করে তাকে সেক্যুলার বলতেও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পিছপা হবেন না।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো ইসলামকে তাদের ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর ধর্ম যেহেতু সংবেদনশীল বিষয়; সেই সঙ্গে এ ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত বিষয় হলো – ‘ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করা যায় না’ – একে আঁকড়ে ধরেই ক্রমাগত বেড়ে উঠছে ফ্যাসিবাদের মহীরুহ। তবে শোষণ যতো বাড়বে, প্রতিবাদপ্রতিরোধবিদ্রোহবিপ্লবের সময়টুকুও ততোই সন্নিকটে আসবে। দরকার কেবল ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।।

৫ জুলাই ২০১৬

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s