ব্রাজিলে সংসদীয় অভ্যুত্থান :: হুমকির মুখে গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব

Posted: মে 26, 2016 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

দিলমা রৌসেফকে ইমপিচ করেছে চোরের দল নোয়াম চমস্কি []

দিলমা রৌসেফব্রাজিলের সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেট রাষ্ট্রপতি দিলমা রৌসেফেকে সংসদীয় বিচারের মুখোমুখি করার পক্ষে ভোট দিয়েছে গত ১২ মে। ৫৫২২ ভোটে এ বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়।[] সিদ্ধান্তের পরেই দিলমাকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ব্রাজিলিয়ান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট পার্টি (পিএমডিবি)-র নেতা, উপরাষ্ট্রপতি মাইকেল তেমের।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত মাসে দিলমার বিরুদ্ধে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রস্তাব গৃহীত হয় সেদেশের সংসদের নিম্নকক্ষেও। এদিকে, সম্প্রতি একটি জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, দুইতৃতীয়াংশ ব্রাজিলীয় মনে করেন সাংসদরা অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তাদের নিজেদের স্বার্থে।[]

দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিল। আর দিলমা দেশটির প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি। যিনি পাঁচ কোটিরও বেশি ব্রাজিলবাসীর ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত। কিন্তু এখন তিনি অভিশংসনের মুখে পড়েছেন। অথচ ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কোনও অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নেই। তার বিরুদ্ধে কেবল বাজেটআইন ভাঙার অভিযোগ। তিনি সরকারি কোষাগারের ঘাটতি গোপন করেছিলেন। যা পূর্বতন রাষ্ট্রপতিরাও করেছেন। এদিকে অভিশংসন প্রস্তাব আনার উদ্যোগের দুই মূল হোতা মাইকেল তেমের এবং সংসদের নিম্নকক্ষের সভাপতি এদোয়ার্দো কুনহার বিরুদ্ধেই বরং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সভাপতির পদ থেকে কুনহাকে বরখাস্তও করেছে দেশটির শীর্ষ আদালত।

দিলমা এই অভিশংসন প্রক্রিয়াকে সংসদীয় অভ্যুত্থান আখ্যা দিয়েছেন। দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলও আগেই জানান, এক্ষেত্রে পূরণ হয়নি অভিশংসনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আইনী শর্ত। যেমন, ‘অপরাধের দায়’ থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। আর ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, এই অভিশংসন প্রক্রিয়ার ফলে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

ব্রাজিলে দিলমার নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির সরকার পতনের জন্য বিশেষত গত কয়েক মাস ধরে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিগুলি। যাদের মদদ যুগিয়েছে কর্পোরেট মিডিয়া ও সাম্রাজ্যবাদ। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল ও ‘বামঘেঁষা’ সরকারগুলির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে ক্রমাগত উসকানি দিয়ে চলেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। যার উদ্দেশ্য এঅঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করা। ব্রাজিলে যেমন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করার জন্য চরম দক্ষিণপন্থীদের তহবিল যুগিয়েছে মার্কিন ধনকুবেরদের প্রতিষ্ঠানগুলি। মার্কিন মুলুকে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণও দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে আরও খবর, লিলিয়ানা আয়াল্দে নামক এক ‘নরম অভ্যুত্থান’ বিশেষজ্ঞকে ব্রাজিলে পাঠিয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামা।

এখন দিলমা সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় ছেদ পড়েছে তার দল ওয়ার্কার্স পার্টির টানা তের বছর ক্ষমতায় থাকার যুগে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওয়ার্কার্স পার্টির জাতীয়তাবাদী সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক সরকার ব্রাজিলে সীমিত পরিসরে হলেও প্রগতিশীল সংস্কারের কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল তারা যেমন বোলসা ফ্যামিলিয়া, মাসমেডিকোস, মি কাসামি ভিডা এবং হামব্রে সেরো। যা সেদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আংশিকভাবে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। জাতি ও বর্ণ বৈষম্য মোকাবেলায় নজর দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল। ফলে ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত কর্তৃত্বকারী শ্রেণীগুলির ক্ষমতা কিছুটা হলেও খর্ব হয়। সেজন্যেই ব্রাজিলের শাসকশ্রেণী দিলমার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটায়। আর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া সরকার এখন পুরোমাত্রায় নয়াউদারবাদী নীতি রূপায়ণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। যাতে বহুজাতিক সংস্থাগুলি ব্রাজিলের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত তেল, খনিজ, জল ও জীব বৈচিত্র আরও অবাধে লুট করতে পারে।

এদিকে পুঁজিবাদী বিশ্বে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতেও। ব্রাজিলীয় অর্থনীতিতে মন্দার প্রভাবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১০.৯ শতাংশে।[] ওয়ার্কার্স পার্টির সরকারও বিশেষত গত কয়েক বছর ধরে ক্রমেই ব্যয় সংকোচনের পথে হেঁটেছে। তাদের সংস্কারবাদী আপসকামী নীতির দরুন সমস্যা আরও বেড়েছে। ফলে সাম্প্রতিককালে লুলা ডি সিলভার উত্তরসূরী দিলমার জনপ্রিয়তা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায়।

অপরদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা পেট্রোব্রাস নিয়ে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সেদেশের বহু রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে। যার মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির কিছু নেতাও রয়েছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এক্ষেত্রে মূলত দিলমার দলকেই নিশানা করেছে কর্পোরেট মিডিয়া। কিন্তু আরও ব্যাপক দুর্নীতিতে জড়িত অন্যান্য দলের নেতাদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। এসমস্ত কিছুর মধ্যেই ব্রাজিলে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। যার সুযোগ নিয়ে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটানো হলো।

ব্রাজিলের জনসাধারণ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি ও প্রতিবাদী সামাজিক আন্দোলনগুলি অবশ্য এই অভ্যুত্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর গণতন্ত্র রক্ষা করতে তারা পথেও নেমেছে।।

তথ্যসূত্র

[] “Noam Chomsky: Brazil’s President Dilma Rousseff “Impeached by a Gang of Thieves””, May 17, 2016, Democracy Now!

[] “Dilma Impeached for a Crime She Did Not Commit, Says Defense”, May 12, 2016, Prensa Latina

[] “66% of Brazilians Say Congress Voted Coup for Their Own Benefit”, May 22, 2016, TeleSUR

[] “Brazil’s unemployment rate rises to 10.9% in Q1 of 2016”, May 21, 2016, Xinhua News Agency

Advertisements
মন্তব্য
  1. Nafis বলেছেন:

    সমাজতন্ত্রই সেরা

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s