লিখেছেন: সৌম্য মন্ডল

mohan-bhagwat-owaisiগত ৩ মার্চ আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) প্রধান মোহন ভাগবত বলেন যে, এবার এই দেশের যুবকদের ভারত মাতা কি জয় এই স্লোগান তোলার জন্য শিক্ষা দিতে হবে। এর আগেও জেএনইউ (জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়) বিতর্কের সময় বহুবার আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি সাংবাদিকদেরও দেশপ্রেমের প্রমাণ স্বরুপ ভারত মাতা কি জয় বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে আরএসএসএর পক্ষ থেকে। তার প্রেক্ষিতে মজলিসইত্তেহাদুল মুসলিমেন বা এমআইএম বিধায়ক আসাদুদ্দিন ওয়েসি গত ১৩ তারিখ লাতুরে একটি মিছিল সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় মোহন ভগবৎকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন যে, তার গলায় ছুরি ধরা হলেও তিনি ভারত মাতা কি জয় বলেবেন না, কারণ ভারতের সংবিধান সেটা করতে বলে না। জাভেদ আখতার রাজ্যসভায় শেষ ভাষণে আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে তুলোধোনা করে বলেন যে, সংবিধান তো শেরওয়ানি বা টুপি পরতেও বলেনি। ভারত মাতা কি জয় বলাটা হলো অধিকার।

এই সময় রাজ্যসভার ভিডিওতে দেখা যায় যে, অন্যান্য দলের সাংসদদের সাথে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন এর সদ্য প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক তথা তরুণ তুর্কি সিপিএম সাংসদ ঋতব্রত বেঞ্চ থাবড়িয়ে জাভেদ আখতারকে সমর্থন জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের বিধানসভায় বিজেপি, কংগ্রেস, শিবসেনা, এনসিপি বিধায়কদের ঐক্যবদ্ধ দাবির ভিত্তিতে বিধানসভা থেকে আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে বহিষ্কার করা হয় ভারত মাতা কি জয় স্লোগান না দেওয়ার জন্য। ওয়েসির রাজনৈতিক মতামত এখানে বিচার্য নয়। বিচার্য আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু।

এখন প্রশ্ন হলো দুটি প্রথমত, ভারতের সংসদে বা বিধানসভায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে থাকতে গেলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হওয়ার সাথে সাথে ভারত মাতা কি জয় স্লোগান দিতে পারাটা জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতার সংবিধানসম্মত মাপকাঠি কিনা, যেটার অভাবে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে বহিষ্কার করা যায়? আর জাভেদ আখতার এটা বললে ভাল হতো যে, ভারত মাতা কি জয় স্লোগান দেওয়াটা যেমন তার মতে অধিকার, তেমনি না দেওয়াটাও অধিকারের মধ্যেই পড়ে কিনা? কারণ ঐ ভাষণেই জাভেদ আখতার সঠিকভাবেই ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্র নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন যে, ভারতকে এগিয়ে যেতে হবে, তাই ভারতের সাথে প্রতিবেশী অনুন্নত দেশগুলোর তুলনা না করে ইউরোপীয় দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের সাথে তুলনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কে এই ভারত মাতা? যার জন্য সংসদে শাসকবিরোধী, ডান মধ্য বাম তরুণ তুর্কি সবার নজিরবিহীন ঐক্য হয়ে যাচ্ছে! ভারত মাতা কি ভারতীয় মায়েদের প্রতিনিধি? ভারত মাতা কি জাতপাতের ঊর্ধ্বে? ভারত মাতা কি ধর্ম নিরপেক্ষভাবে ভারতের প্রতিনিধি? ভারত মাতা কি ঘাঘরা বা বোরখা পরেন? ভারত মাতার কি মাত্র দুটো শাড়ি, একটা কেচে আরেকটা পড়েন? ভারত মাতার গায়ের রঙ কি কালো? অথবা কালো না হয়েও ক্ষেতে ধান বুনতে গিয়ে রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছেন? ভারত মাতা কি অপুষ্টি, রক্ত স্বল্পতায় ভোগেন? ভারত মাতা কি সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যান? ভারত মাতার কি পিঠে, পায়ে স্বামীর মারের দাগ? ভারত মাতা কি বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার? ভারত মাতার কি চোখ ছোট, নাক বোঁচা? যৌনাঙ্গে বা নাকের ছিদ্রে কি আফসপা বা armed forces special power act গোঁজা থাকে? ভারত মাতা কি রোজ সকালে শিশু কোলে নিয়ে শহরে আসেন লোকের বাড়ির বাসন মাজতে? ভারত মাতার পেট চিরে তার সন্তানের ভ্রূণকে তলোয়ারের ডগায় গেঁথে কি জয় শ্রীরাম, হর হর মহাদেব স্লোগান দেওয়া হয়? ছত্তিশগড়ে কি সেনারা ভারত মাতার স্তন টিপে মাওবাদী কিনা পরীক্ষা করে?

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, ভারত মাতার জন্ম উনিশ শতকে। দেশকে পিতৃভূমি হিসেবে কল্পনা করার ইউরোপীয় পরম্পরার বিরুদ্ধে দেশকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা মাতৃভূমি হিসেবে কল্পনা করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ব্রিটিশের সংস্পর্শে আসা ভারতীয় ভদ্রলোক সম্প্রদায় তাদের সমাজে নারীদের অশিক্ষা, পর্দাপ্রথা, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ নিয়ে লজ্জায় পড়তেন। নারীদের প্রতি কিছুটা মাত্রায় দয়াপ্রবণ হয়ে সমাজ সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিলেন, এবং মেমদের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের যোগ্য, ইংরেজি নোভেল পড়তে পারা পত্নীর যোগান তৈরি করতে খানিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক সরকার নারীদের শিক্ষিত করতে চেয়েছিল, কারণ তাদের আশা ছিল যে, ইংরেজি শিক্ষিত মায়েরা রাজানুগত সন্তানই জন্ম দেবে।

অন্যদিকে, মিশনারি, উপযোগিতাবাদী ব্রিটিশের সমালোচনার মুখে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের একাংশ প্রবল রক্ষণশীল হয়ে পড়েন এবং আপেক্ষিক মুক্ত ইউরোপী নারীর বিরুদ্ধে ভারতীয় নারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে মাতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। ভারতীয় নারীর সামন্ততান্ত্রিক পিতৃতন্ত্রের কাছে দাসত্বকে মহিমাম্বিত করা হয়। বিবাহের বয়স ১০ থেকে বাড়িয়ে ১২ করা, সতীদাহ রোধ, বিধবা বিবাহ চালু প্রভৃতি সমাজ সংস্কারের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের মতো হিন্দু সমাজপতি বাবুরা রীতিমতো আন্দোলন শুরু করে দেন। ১৮৯০ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে সংবাদপত্রে এইসময় একটি খবর প্রকাশিত হয়, যাতে জানা যায় যে, ১১ বছরের বালিকাবধূ ফুলমণি তার ৪০ বছর বয়স্ক স্বামীর সাথে যৌনসঙ্গমের কারণে মারা যায়। এই বিষয়ে আইনি বিধানের জন্য সংস্কারবাদীরা ব্রিটিশদের চাপ দিলে রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদীরাও বাল্যবিবাহের সমর্থনে জোরদার প্রতিবাদ এবং প্রচার আন্দোলন শুরু করে। এই খুচরো সংস্কারগুলোকে তারা ভারতীয় সংস্কৃতিকে অযাচিত ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতেন, তাছাড়া ব্রিটিশ দাপটের কাছে ভারতীয় পৌরুষের সার্বভৌমত্ব একমাত্র অন্তপুরে নারীদের পরেই টিকে ছিল এবং তাতে কোনো রকম আঘাত ছিল বাবুদের না পসন্দ

পূর্ণ নারীত্বের ভাব পূর্ণ স্বাধীনতা। সতীত্বই আধুনিক হিন্দু নারীর জীবনের মুখ্য ভাব। বৃত্তের কেন্দ্র পত্নী এই কেন্দ্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তাহার সতীত্বের পর। এই প্রকার ভাবের আতিশয্য হইতেই হিন্দু বিধবারা মৃত পতির চিতায় আত্মবিসর্জন করিত। সম্ভবত পৃথিবীর অন্যান্য নারীদের অপেক্ষা হিন্দু নারীগণ অধিকতর ধর্মশীলা ও আধ্যাত্মিকভাবসম্পন্না। যদি আমরা চরিত্রের এই সুন্দর গুণরাজি রক্ষা করিতে পারি এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নারীগণের বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতিসাধন করিতে পারি, তাহা হইলে ভবিষ্যতের হিন্দুনারী জগতের আদর্শ নারী হইবে। (বিবেকানন্দ বাণী ও রচনা, প্রথম খণ্ড)

স্পষ্টতই একদিকে ব্রিটিশরা সভ্যতা শেখাতে চেয়েছিলো নেটিভদের, অন্যদিকে দেশীয় সমাজপতিদের আঘাতপ্রাপ্ত পৌরুষ দুয়ের মধ্যখানে ভারতীয় নারী! ভারতীয় সমাজ সংস্কারকরা, ব্রিটিশরা বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা কেউই নারী মুক্তি চাননি, ভাবতে পারেননি নারীদের গৃহ শ্রম, যৌন দাসত্ব থেকে মুক্তির কথা, ভাবতে পারেননি যে, নারীরাও পুরুষের সমান চেতনা ও মর্যাদার অধিকারী। বরং নতুন ভদ্রলোকদের উপযোগী নারী বা নারীদের সামাজিক অবস্থা নিয়ে ব্রিটিশের কাছে হীনমন্যতা ঢাকা ছিল উদ্দেশ্য। নারীদের ভালমন্দ পুরুষরাই ভেবে দিয়েছে। সংস্কার আন্দোলনেও ছিলনা নারীদের উপস্থিতি। তবুও পণ্ডিত রমাবাঈএরতো কয়েকজন শিক্ষিত নারী পতিভক্ত সাধ্বী স্ত্রীমাতৃত্বের মধ্যে বেঁধে দেওয়া লক্ষণরেখাকে অতিক্রম করেছিলেন। রমাবাঈ দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত বিবাহ করেননি এবং শেষে এক শূদ্র পুরুষকে বিবাহ করেন এবং পরবর্তীতে একজন স্বাধীন সমাজ কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তৎকালীন প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারকদের হেনস্থার সঙ্গে লড়াই করেই তাঁকে এগোতে হয়েছিল।

পাশ্চাত্য সমাজের হাওয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় নারীর মাতৃত্ব, ভারতীয় নারীর বিশেষত্ব হিসেবে ঘোষণা এবং দেশকে মায়ের সাথে তুলনা একদিকে যেমন একের পর এক সন্তান প্রসবের শারীরিক যন্ত্রণা, অন্তপুরে আটকে থাকা, সন্তান প্রতিপালনে ও গৃহশ্রমে একক দায়িত্বকে এক মহান ভাব প্রদান করলো অন্যদিকে, ভারত মাতার চিত্রকল্প সামনে রেখে ব্রিটিশবিরোধী এক জাতীয়তাবাদ জন্ম নিলো। ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র বন্দে মাতরম রচনা করেন। পরবর্তীকালে এই গানটিকে তিনি তাঁর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ ব্যবহার করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হলো ভারতে ব্রিটিশ দখলদারির একেবারের গোড়ার দিকের বিদ্রোহ, যাকে ইতিহাসে সন্ন্যাসীফকির বিদ্রোহ নামে জানা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র এই বিদ্রোহকে সন্যাসীদের বিদ্রোহ হিসেবে দেখালেও এবং এতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা আরোপ করলেও সুপ্রকাশ রায় প্রমুখ ঐতিহাসিকরা সন্ন্যাসীফকির বিদ্রোহকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে দেখিয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গবেষণাসমৃদ্ধ খোয়াবনামা উপন্যাসে সন্ন্যাসীফকির বিদ্রোহের অসামান্য রেফারেন্স পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র মূলত বন্দেমাতরম গানে হিন্দু দেবী দুর্গাকে দেশ মাতা হিসেবে দেখিয়েছেন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে বন্দেমাতরম গানটি গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু ১৯৩৭ সালে তিনি নিজে তৎকালীন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাস চন্দ্র বসুকে একটি চিঠিতে লেখেন যে, যেহেতু বন্দেমাতরম গানটি একান্তভাবে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিজড়িত, তাই এটাকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করাটা ঠিক নয়। কারণ এর মূলভাবটি দূর্গা বন্দনার। কাজেই কোনো মুসলমান দেশবাসী কোনো হিন্দু দেবীর মূর্তিকে স্বদেশজ্ঞানে দেশভক্তি সহকারে উপাসনা করবে, এমন প্রত্যাশা করাটা ভুল। ১৯০৪০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ভারত মাতার চিত্র অঙ্কন করেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ভারত মাতার নির্মাণে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব থাকলেও ছবিটা ছিল পরাধীন দেশের প্রতীক এক মলিনবেশ সন্ন্যাসিনীর।

Although not the first author to emphasize the mother for political purposes, Bankimchandra Chattopadhyay (1838-94) transforms Bharat Mata into a fully fledged Hindu goddess and symbol of India who is experiencing difficult times; her children are indifferent to her sufferings, and they need to awaken to the dire conditions and act. In 1875, Bankim Chandra composed Bande Mataram, a song about a benign goddess figure, which becomes an anthem for Indian nationalists in their struggle for liberation from British hegemony.”- Carl Olson (scroll.in থেকে নেওয়া)

তৎকালীন সরকারের চোখে হিন্দু সন্ত্রাসবাদী অরবিন্দ ঘোষ ব্রিটিশদের থেকে ভারতের আজাদির লড়াইয়ে এই রুপকের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন, যা কিনা পরাধীন ভারতবাসীকে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

বিশ শতকের মধ্যশ্রেণীর আজাদ ভারতের জন্য সশস্ত্র উপায়ে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের বহু আগে থেকেই গ্রামীণ কৃষক, তাঁতি, কারিগর হিন্দুমুসলমান, নিচু জাত, আদিবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী, সামন্তশোষণ বিরোধী লড়াই লড়েছে। কিন্তু অনেক পরে শুরু করেও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সশস্ত্র বিপ্লবী লড়াইয়ে হিন্দু প্রতীক ব্যবহারের ফলে হিন্দুমুসলমানের ঐক্যবদ্ধ ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম গড়ে ওঠেনি। যদিও ব্রিটিশের চোখে হিন্দু সন্ত্রাসবাদীরা বা আমাদের চোখে বিপ্লবীরা বেশিরভাগই ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীকালে ভারতে সেক্যুলার বামপন্থী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, যেমন মানবেন্দ্রনাথ রায়, স্বামী বিবেকানন্দের ভাই ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, গণেশ ঘোষ, সতীশ পাকড়াশি, শিবদাস ঘোষ, সুশীতল রায় চৌধুরী প্রমুখ বিপ্লবীরা। অন্যদিকে, ছিলেন আরেক ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী যারা ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে প্রচার করতেন এবং ব্রিটিশের ছত্রছায়ায় গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখতেন। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে প্রধান কাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। বলা বাহুল্য, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বামপন্থী বা ব্রিটিশ বিরোধী হিন্দু বিপ্লবীদের বিরুদ্ধেই নিজেদের ভূমিকা রেখে গেছেন এবং ব্রিটিশকে সাহায্য করে গেছেন। আর এই হিন্দু জাতীয়তাবাদীরাই ১৯২৫ সালে গঠন করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের আগে যারা আজাদির বিরোধী ছিলেন, আজ তারাই জেএনএউ বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আজাদির স্লোগানের বিরোধী। ১৯৪৭র আগে যারা হিন্দুমুসলমান দাঙ্গা লাগিয়ে ব্রিটিশের সেবা করেছিলেন, আজ তারাই সংসদে বসে মেক ইন ইন্ডিয়ার নামে শ্রমিক বিরোধী, পরিবেশ বিরোধী আইন পাশ করাচ্ছে, দাঙ্গা বাধিয়ে দেশের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিভেদ আনছে, ছত্তিগড়ের আদিবাসীদের পর নামিয়ে আনছে নারকীয় সামরিক অভিযান, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থে।

এবার দেখা যাক, আরএসএস যে ভারত মাতার জয় এই উচ্চারণকে বিধানসভা, এমনকি ভারতে বসবাসের যোগ্যতা হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং যার উপর ভিত্তি করে বিরোধীদের সহমতে আনতে পারলো, এমনকি সিপিএম (কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মার্ক্সবাদী)-এর সাংসদের পর্যন্ত বেঞ্চ থাবড়ানো সমর্থন পেলো, সেই ভারত মাতার ছবিটি। আরএসএসএর অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে যে ভারত মাতার ছবি আছে, তিনি একজন ফর্সা, সোনার অলংকার পরে থাকা এক হিন্দু দেবী, যার হাতে ভারতের জাতীয় তেরঙ্গা পতাকা নেই, আছে হিন্দুত্বের প্রতীক গেরুয়া পতাকা। ভারত মাতা সিংহের উপর হেলান দিয়ে বসে আছেন এবং পিছনে একটি মানচিত্র যা ভারতের বর্তমান সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ছবির পাশে বন্দেমাতরম গানটির একটি স্তবক আছে। প্রসঙ্গত বন্দেমাতরম এর মোট ছয়টি স্তবক। এর মধ্যে বেছে একটি স্তবক দেওয়া হয়েছে আরএসএস এর অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে ভারত মাতার ছবিটিতে। পাঠকের সুবিধার জন্যে সেই একটি স্তবকটি বাংলা হরফে দেওয়া হলো

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী কমলা কমলদলবিহারিণী বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং নমামি কমলাম্ অমলাং অতুলাম্ সুজলাং সুফলাম্ মাতরম্ বন্দে মাতরম্

প্রশ্ন হলো, কোনো এক বিশেষ ধর্মের দেবী কি করে একটি সেক্যুলার দেশের সমার্থক হয়? কেন মূর্তি পূজোয় অবিশ্বাসী বা কোনো অহিন্দু বা ধর্মবিহীন মানুষ দেশপ্রেমের নামে উগ্র হিন্দু ফ্যাসিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে ভারত মাতা কী জয় বলবেন? ঔপনিবেশিক আমলে ভারত মাতা যেমন এক অংশের কাছে ব্রিটিশ বিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিল, তেমনি ছিল ব্রিটিশপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদেরও প্রতীক। আজ সেই ব্রিটিশপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশমার্কিন পুঁজির পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভারতে এক হিন্দু ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করতে চাইছে, আর আজ সেই দেশবিরোধী হিন্দু ফ্যাসিবাদের প্রতীক হলো ভারত মাতা। ভারতের বিভিন্ন ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি, ধর্মের বৈচিত্র্য বিরোধী এক আগ্রাসী হিন্দুত্বের প্রতীক। শুধু তাই নয়, দেবীত্বের নামে ভারতীয় নারী যেভাবে পুরুষতন্ত্রের জোয়ালে পিষ্ট হয়েছে, ওই ভারত মাতা তারও প্রতীক। যশোধরা বাগচি যেমন মনে করেন, মাতৃত্বের এই ভাবাদর্শ নারীদের শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে কল্পকাহিনী তৈরি করে তাদের বিশেষভাবে প্রজননের ভুমিকায় সীমাবদ্ধ রাখে এবং তাদের প্রকৃত বিকাশের পথগুলিকে বন্ধ করে দেয়। প্রসঙ্গত ফ্যাসিবাদের গড ফাদার বেনিতো মুসলিনি প্রচার করতেন নারীদের প্রধান কাজ বীর যোদ্ধার জন্ম দেওয়া।

আমি কখনোই ভারত মাতা কি জয় বলবো না, বরং বলবো দুনিয়া থেকে কাঁটাতার চুলোয় যাক; ভারতের উপর মার্কিনসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী খবরদারি বন্ধ হোক; বাংলাদেশনেপালশ্রীলঙ্কা থেকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বন্ধ হোক; কাশ্মি, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, সিক্কিমে ভারতের দখলদারিত্ব বন্ধ হোক। দুনিয়ার মজদুর এক হও।

Advertisements
মন্তব্য
  1. Dhritiman বলেছেন:

    দুর্দান্ত কমরেড, চালিয়ে যাও ভাই, সঙ্গে আছি, থাকব…

  2. Dwijapada Bouri বলেছেন:

    Good article……carry on….

  3. Nafis বলেছেন:

    অসাধারণ

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s