রোহিত ভেমুলার মা-কে অনিকেত আমভোরের মায়ের চিঠি

Posted: মার্চ 12, 2016 in আন্তর্জাতিক, সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

রোহিতের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি,

aniket rohithরোহিতের সুইসাইড নোট পড়ার পর থেকে আমার কেমন অস্বস্তি এবং দমবন্ধ লাগছে। শাস্তির নামে সাত মাসের ফেলোশিপ বাতিল করে দেওয়া, হোস্টেল থেকে বহিস্কার এসবই একজন গবেষক হিসাবে তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। যদিও এটা খুবই দুঃখজনক যে, রোহিত তাঁর চিঠিতে কাউকে দোষারোপ করেনি। রোহিত এবং অনিকেতের মধ্যে চিন্তাভাবনার মিল আমার চোখে পড়েছে এবং আমি বোঝার চেষ্টা করছি যে, কী রকম যন্ত্রনার মধ্যদিয়ে তারা গেছে। অনিকেত কোনো চিঠি লিখে যায় নি, কিন্তু ওর ডাইরির আনাচে কানাচে, কবিতার টুকরো পড়ে আমি বুঝতে পারলাম যে, জীবনের শেষের দিকে তাদের মানসিকতা একই ছিল।

অনিকেত আবার সাম্যের কথা বলতো, এমনকি তার বন্ধু, সহপাঠী যারা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সমানাধিকারের জন্য লড়াই করছে তাদের প্রতি সমানুভূতিশীল ছিল। আবার সে তাঁর মাবাবার প্রতি উদ্বিগ্নও থাকতো। জাতিবর্ণ ব্যবস্থা, সংরক্ষ, ভগবান এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতো। সমাজে জাতির্ণ ব্যবস্থা নিয়ে বৈষম্যমূলক মানসিকতা, যা সেই আইআইটি প্রবেশাধিকার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থেকেই তাকে প্রতি পদে পদে সহ্য করতে হয়েছে।

কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীর সাথে লড়াই করতে গিয়ে একজন মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই শূণ্যতা তাকে গ্রাস করতে থাকে যা আমার ছেলে এবং রোহিত দুজনের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। একজন সংবেদনশীল মানুষ, যে নিজের স্বপ্ন নিয়ে অনেক ভাবে তার পক্ষে এটা খুবই ভয়াবহ। এইসব মানুষ তাদের স্বভাবগত প্রকৃতি থেকেই কাউকে দোষ দিতে পারে না, কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে যখন সে নিজের লড়াই লড়তে লড়তে স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন তারা নিজেকে একা মনে করে। কী আমার অনিকেতকে এতো ভাবাতো? আমরা সর্বক্ষ যে ছেলেটাকে হেসে খেলে, অন্যদের নকল করে, গান গেয়ে কাটাতে দেখি আইআইটিতে এমনকি হয়ে গেল যে, সে ছেলে হাসতে ভুলে গেল? মৃত্যুর পর ডাক্তার বলেছিল যে, অনিকেত ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু যে ছেলের প্রথম থেকেই অংক এবং বিজ্ঞান প্রিয় বিষয় সে কী করে ঘাবড়ে যেতে পারে?

আইআইটিতে একাকিত্ব এবং চোরাগোপ্তা অনেক অপমান অনিকেতকে গ্রাস করেছিল। সব সময় সরাসরি না হলেও প্রতিদিনের আলোচনা, উপদেশের নামে এবং কখনো কখনো বন্ধুদের টিপ্পনি, এমনকি ফ্যাকাল্টি সদস্যদের কাছ থেকেও তা শুনতে হয়েছে। শুধু আইআইটি কেন, অন্যান্য নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এসব স্বার্থপর মনমানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। যারা সংরক্ষণে(কোটা) মাধ্যমে এসব জায়গায় ভর্তি হয়, তাদের সাথে বন্ধুত্বের ভান দেখিয়ে বলা হয়, দেখো, তোমার আর আমার তো একই অর্থনৈতিক অবস্থা, অথচ তুমি কিনা বিশেষ সুযোগসুবিধা পাচ্ছো, তোমার জাতের জন্য সংরক্ষণ প্রথা তুলে দেওয়া উচিত; সেই সাথে আরো অনেক কথাই বলা হয়।

এ জন্যই বোধ হয়, অনিকেত এই জাতপাত ব্যবস্থার উৎস জানার জন্য আগ্রহী হতে শুরু করে। বৈদিক যুগে ধর্ম, বই এবং এইসব বইয়ে লেখা জিনিসপত্র একবিংশ শতাব্দীর মানুষ হয়েও এইসব সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব তুলে ধরার চেষ্টা চলছে আর অদ্ভুতভাবে একে বৈজ্ঞানিক মোড়ক দেবারও প্রচেষ্টা রয়েছে। এসব ধ্যানধারণা এখনও ওখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। কিন্তু জাতপাতের বিভেদজনিত কোনো সমস্যা হলে এখানে কোনো সমর্থনের ব্যবস্থা নেই। এসব সমস্যার কোনো কাউন্সেলিংও হয় না। এগুলোকে কোনো সমস্যার মধ্যেই ধরা হয় না এবং যে কোনো কোটার শিক্ষার্থীকে এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, এটাই সত্যি ধরে নিয়ে এসব সমস্যার সমাধানগুলোকেই বাতিল করে দেওয়া হয়। সংরক্ষণে মাধ্যমে কোনো শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানে আনলে সেটাকে ঘোর অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। সবর্ণদের মতে, কেউ যদি কোটার মাধ্যমে ঢোকে, তাহলে তাকে ওদের যুক্তিমীমাংসা এসব শুনতেই হবে। অনিকেত এবং ওর মতো আরো অনেককেই সমানুভূতির সাথে দেখা হয় না। আসল ব্যাপার এড়িয়ে গিয়ে, তাদের নিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক চাপ, এবং নিজেদের অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার দরু নাকি এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এই হচ্ছে সবর্ণদের বক্তব্য।

অনিকেত নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল। আমি কে এই প্রশ্নটা বারে বারে কেন তাকে বিধ্বস্ত করতো? আইআইটিতে এসে কেন সে গ্রহ, নক্ষত্র, আত্মা অবিনশ্বর, অন্য জগৎ, পরোলৌকিক জগৎ এসব নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল? আমি এখনও বুঝিনা কীভাবে সেই আশাবাদী, সৃষ্টিশীল মননের ছেলেটার হাসিখুশি একেবারে মুছে গেল? একমাত্র অপরাধ হলো, আমরা তাকে সার্টিফিকেট দিয়ে বোম্বে আইআইটিতে পড়তে পাঠিয়েছি। হয়তো অন্য কোনও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়লে এরকম আলোচনা এবং উপদেশ, যা তাকে মানসিকভাবে দূর্বল করে দিয়েছিল, এ সব হতো না। কে আমার সংবেদনশীল সক্ষম মিশুকে ছেলেকে বলেছিল সে অক্ষম? আমরা যে সব চিঠি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল কেন্দ্রগুলোতে যেমন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, এসসি কমিশন ইত্যাদিতে পাঠিয়েছিলাম, সেগুলোর এখনো কোনও উত্তর পাইনি। আমাদের অনেক অনুনয় বিনয়ের পর আইআইটি বোম্বে তদন্ত কমিশন খুলে একটা উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মধ্যে কোনো পরিবর্তনই হয়নি, তদন্ত রিপোর্টে কি এসছে তাও আমাদের জানানো হয়নি আমাদের হয়তো জানানোর প্রয়োজনই বোধ করেআমরা নিজেদের চোখে খুবই ছোট হয়ে গেছি। কিন্তু রোহিতের ঘটনা আরেকবার এই বিষয়টাকে ঘোষণা করল। রোহিত আর অনিকেত দুজনে আলাদা অবস্থার মুখোমুখি হলেও ওদের লড়াইয়ের কারণটা একই ছিল। কে জানে কতদিন আমাদের ছেলেমেয়েদের, আড়ালে এই জাতিবর্ণ ব্যবস্থার সাথে লড়তে হবে? আমারাও লড়ছি।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভই একমাত্র আশার উদ্রেক করছে। হয়তো এই নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থাকে তারাই জাগিয়ে তুলতে পারবে। রোহিতের পরিবার এবং দলিত সমাজের মানুষদের প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে যে কষ্ট পেতে হয়, তার জন্য কিছু ইতিবাচক আশ্বাসের অপেক্ষায় আছি।

.

ইতি

সুনিতা আমভোরে

———————–

[২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বোম্বে আইআইটি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অনিকেত আমভোরে আত্মহত্যা করেন। একজন দলিত ছাত্র হিসাবে প্রতিদিনের অপমান, কটুক্তি তাকে এই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। সম্প্রতি রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনায় সারা দেশ যখন উত্তাল তখন অনিকেতের মা সুনিতা আমভোরে রোহিত ভেমুলার মাকে একটি চিঠি লেখেন। উক্ত চিঠিটি তারই বাংলা তর্জমা। অনুবাদ করেছেন সৃজনী কর।]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s