কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর :: দরবার হল ও হৃদ্মাজারের স্মৃতি থেকে

Posted: মার্চ 9, 2016 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: আহমদ জসিম

Kamruzzaman_Jahangir-2অনেক সমালোচকেই লেভ তলস্তয় সম্পর্কে বলে থাকেন: মানুষ হিসেবে তাঁর অপরাধ বোধই তাঁকে শক্তিশালী সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। না, আমি মোটেও লেভ তলস্তয়ের সাথে কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের তুলনা করছি না, কিংবা তাঁর জীবনকালে সাহিত্যের যে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ হতো, সেই বিরোধগুলো থেকেও সরে আসছি না। এতটুকু আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, জীবনকালে তাঁর সাহিত্য নিয়ে আমার উদ্দেশ্য প্রণোদিত সমালোচনা ছিল না, তাই মৃত জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে লিখতে গিয়ে পূর্বের কোনো কিছু অস্বীকার করার উপায়ও রইলো না। আমি এখন প্রয়াস চালাচ্ছি সাহিত্যিক কামরুজ্জামন জাহাঙ্গীর থেকে ব্যক্তি জাহাঙ্গীর ভাইকে একটু আলাদা করে দেখার।

সেই প্রথম দেখার কথা, স্পষ্টত মনে পড়ে, কবি মনিরুল মনিরএর সাথে গিয়ে ছিলাম তাঁর পহাড়তলী রেলওয়ের সরকারি বাসভবনে। তাও তো প্রায় দেড় যুগ হয়ে গেল। সেই প্রথম দেখার কিছু দিন পরেই আমাদের দ্বিতীয় বার দেখা হলো জাহাঙ্গীর ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে। বিষয়টা একদম কাকতালীয় ছিল। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে, একটা নতুন গ্রন্থাগারের উদ্বোধন হবে। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গেলাম আমি আর কবি মনিরুল মনির। সেই অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীর ভাইকে দেখে প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে জানতে পারলাম এটাই তাঁর গ্রামের বাড়ি, তারপর সেই গ্রাম আর জাহাঙ্গীর ভাই, অনেক অনেক স্মৃতি। সব স্মৃতি বলা প্রাসঙ্গিক হবে না, তবে এইটুকু না বললেই নয়, সেই দিন আমরা দুই অপরিচিত লেখক জাহাঙ্গীর ভাই থেকে যে আতিথেয়তা, স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছিলাম এটা ছিল সত্যি বিস্ময় জাগানো। এখনও মনে পড়ে আমরা দুই তরুণ এই ভেবে কুল পাচ্ছিলাম না যে, জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের এত পাত্তা দিচ্ছে কেন? আমরা তো এখনও এমন কিছু হয়ে উঠি নাই। মনে পড়ছে তাঁর বাড়িতে বিশাল আয়োজন করে খাওয়ানো পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো, তাঁর গল্প, ‘পুত্রবধ পালা’, চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, এই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর্বে তিনি আমাদের একটা আমগাছের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলেন, এই আমগাছের মহত্ত্ব হলো, তাঁর ‘পুত্রবধ পালা’ গল্পের প্রধান চরিত্রকে রক্ষীবাহিনী নির্মমভাবে হত্যার পর এই গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে ছিল, অনেক দিন সেই লাশ কেউ নামাবার সাহস করেনি! প্রসঙ্গ ধরে আলোচনা করতে গিয়ে জানা হয়ে গেল, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাঁর গ্রামের অধিকাংশ মানুষেই সাম্যবাদী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন, তবে গ্রামের মানুষ সাম্যবাদী দল বলতেন না, বলতেন ‘প্রপেস্যারের পার্টি’। এটা অবশ্যই জাহাঙ্গীর ভাইয়ের একেবারে কিশোর বয়সের কথা। জানালেন, তিনি সাম্যবাদী দলের রাজনীতির সাথে কখনও যুক্ত হন নি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পর যুক্ত হয়েছিলেন জাসদ রাজনীতির সাথে। সেই ছিল আমাদের পরিচয়ের একেবারে প্রথম দিনকার কথা। আমরা বাড়ি ফিরে এলাম, কিছু দিন পর জাহাঙ্গীর ভাইও। একই শহরে থাকি, দু’জনেই গল্প লিখি, তিনি একই সাথে প্রকাশ করেন ‘কথা’ নামে একটি কথা সাহিত্যের ছোট কাগজ। অথচ আমাদের দু’জনের আর যোগাযোগ নেই।

সম্পর্কের দ্বিতীয় ভাগ

আমাদের সম্পর্কের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ,‘ যেভাবে তৈরি হলো একটি মিথ’এর মধ্যদিয়ে। সেটা ২০১০ সালের ঘটনা, আমার গ্রন্থের প্রকাশ উৎসবের আয়োজন করেছে কিছু বন্ধুরা। প্রকাশ উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হলো, ছোট কাগজ ‘লিরিক’ সম্পাদক ও উত্তরাধুনিক কবি এজাজ ইউসূফি আর পুষ্পকরথএর সম্পাদক কবি হাফিজ রশীদ খানকে। অনেকটা দায় সাড়া গোছের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালাম জাহাঙ্গীর ভাইকে। তিনি আবারও আমাকে বিস্মিত করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন, এলেন সকলের আগে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠানে ছিলেন শেষ পর্যন্ত। অনুষ্ঠান শেষে তিনি আমার বই এক কপি কিনে সেই বইয়ে অটোগ্রাফ নিলেন, এই পর্যন্ত শেষ হলেও মানুষটা প্রতি আমার হয়তো এত প্রেম, এত ভালোবাসা তৈরি হতো না, এখনও মনে আছে ঠিক সাত দিন পর ফোন দিয়ে তিনি আমার গ্রন্থের ৭টা গল্পের প্রত্যেকটা নিয়ে মন্তব্য করলেন এবং জানিয়ে দিলেন, সবগুলো গল্পের মধ্যে আলাদা করে তার দৃষ্টি কেড়েছে ইউনূসের নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে স্যাটায়ার করে লেখা ‘জাদুঘর’ শিরোনামের গল্পটা। একই সাথে তিনি জানিয়ে দিলেন বইটা নিয়ে তিনি আলোচনা লিখছেন, যেটা ছাপা হবে কবি হাফিজ রশীদ খান সম্পাদিত ছোট কাগজ পুষ্পকরথএ। ঘটনাগুলো এমন সময় ঘটছে, যখন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একটা প্রতিষ্ঠিত নাম আর আহমদ জসিম একই পথের এক শিশু মাত্র।

Kamruzzaman_Jahangir-3আমরা এমন এক পরস্পর বিচ্ছিন্ন সময় ও সমাজে বসবাস করি, যেখানে আত্মমৈথুন আর পরশ্রীকাতরতা আমাদের সবাইকে ভয়াবহভাবে গ্রাস করছে, সেই সময় আর সমাজে দাঁড়িয়ে কামরুজ্জান জাহাঙ্গীর আমার কাছে এক অন্যরকম বিস্ময় নিয়ে হাজির হলো, আর হবে নাই বা কেন? যেখানে অনুজদের প্রতি অগ্রজদের অবজ্ঞা রীতিমতো একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এই ফ্যাশনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, যে কারণে আমাদের শহরে সদ্য লিখতে আসা সমস্ত তরুণের অলিখিত অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি, পরিণত হয়েছিলেন, চেরাগী আড্ডার মধ্যমণি! যাকে আমি বলতাম চেরাগী আড্ডার চেরাগ (বাতি)! বলে রাখি, আমার বই প্রকাশ এবং তাঁর আলোচনা, এই সময়কাল থেকেই আমাদের এক সাথে পথ চলা শুরু। সব স্মৃতি যেন মহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠে, প্রতি শুক্রবার ঠিক সকাল ১০টার দিকে একটা ফোন কল, তারপর সেই চেনা কণ্ঠের চেনা সংলাপ: কি জসিম, কি অবস্থা?

জ্বী ভাই, ভালো।

আজ যাচ্ছি তো?

অবশ্যই!

তা হলে চলে এসো। চলে এসো মানে তাঁর রেলওয়ের সরকারি বাসভবনে, আমার এই যাওয়া জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গত পাঁচ বছর ধরে একই নিয়মে চলেছে। একই ঘটনা যেন প্রতি শুক্রবার পুনঃপ্রচার হতো, ভাবীর পোষা কুকুর দুইটার ঘেউ ঘেউ শব্দ, আমার কলিং বেল বাজানো, ভাবির দরজা খুলে দেওয়া, আমার সোজা কম্পিউটার রুমে চলে যাওয়া। এখনও কানে বাজে সেই সংলাপগুলো, , তুমি এসেছো! দাঁড়াও এখনেই উঠছি, তারপর কণ্ঠ একটু ভারী করে, আমাদের একটু চা দাও তো। তারপর ভাবীর চা নিয়ে আসা, আর ভাইয়ের মিষ্টি হাসি দিয়ে বলা: ‘আপনাকে একটু কষ্ট দিচ্ছি আর কি! ভাবি একই রকম হাসি দিয়ে: ‘আর ডং করতে হবে না, খেয়ে নাও।’ তারপর একসাথে চেরাগীর উদ্দেশে রওনা হবার আগে, স্বামীস্ত্রীর আরেকটুকু খুনসুটি, ভাই: দোয়া করিয়েন, আমরা যাচ্ছি। ভাবি: ‘ঠিক আছে আবার আসবেন।’ আমি দু’জনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি: কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর যদি একটি সৃষ্টির নাম হয়, তবে সেই সৃষ্টি শক্তির উৎসের নাম নার্গিস নাহার মেরি (কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সহধর্মিণী) যার সমর্থন আর সহযোগিতা ছাড়া হয়তো কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের পক্ষে এমন আত্মমগ্ন সাহিত্য সাধনা সম্ভব হতো না।

এক কাপ চা ও দরবার হল

আমাদের দু’জনের চেরাগীমুখী আড্ডার যাত্রাপথে তৃতীয় জন যুক্ত হলো, তাও তো অনেক বছর হয়ে গেছে! এই তৃতীয় জন কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া। পেশায় চিকিৎসক হলেও আপাদমস্তক কবি, তাঁর ঐতিহাসিক অট্টহাসি জাহাঙ্গীর ভাইয়ের খুব পছন্দ ছিল। যেদিন তিনি চেরাগীতে যেতে পারতেন না, সেদিন আমরা তাকে ফোনে রীতিমতো বিরক্ত করে ছাড়তাম। বলে রাখা ভালো, চট্টগ্রামের লেখক সাহিত্যিকদের প্রধান আড্ডাস্থল বাতিঘরকেন্দ্রিক, যেটা আগে ছিল চেরাগী পাহাড় কেন্দ্রিক। তবে বাতিঘরের সমস্ত হিসাব নিকাশ রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, তারপর আমাদের গন্তব্য হয় দরবার হলের দিকে! না, দরবার হল কোন বিশেষ স্থানের নাম নয়, লালখান বাজার চৌরাস্তার মোড়ে যে যাত্রী ছাউনি আছে, জাহাঙ্গীর ভাই সেই যাত্রী ছাউনির নাম দিয়েছেন দরবার হল! এই যাত্রী ছাউনিতে বসেই আমরা কাটিয়ে দিতাম ঘণ্টা তিনেক সময়। সাথে কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া থাকলে তো কথাই নেই! না থাকলে, বার বার ফোন করে তাকে আনিয়ে নেওয়া হতো। আর ভাগ্যধন আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতো চা, তিনি নিজে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা জানতেন না বলে আমাকেই বলতে হতো: ‘মউ, অগ্যা চারে দুঅয়্যা গরি দে।’ ( মামা একটা চা কে দুইটা করে দাও) আর ভাগ্যধন যুক্ত হলে একই সংলাপ একটু পরিবর্তন হয়ে যা দাঁড়াত: মউ দুঅয়্যা চারে তিন নোয়্যা গরি দে (মামা দুইটা চাকে তিনটা করে দাও) সেই দরবার হল এখনও আছে, আছে চা বিক্রেতা ছেলেটাও, নাই শুধু আমাদের জাহাঙ্গীর ভাই, তাই এখন ওই যাত্রী ছাউনির দিকে ফিরে তাকালে, ওটাকে বড় নীরস, এতিম অসহায়এর মতো লাগে। মনে হয়, আগে যে ছিল রাণী সে এখন হয়ে গেছে দাসী।

হৃদ্মাজারের স্মৃতি থেকে

Kamruzzaman_Jahangir-5একদিন জাহাঙ্গীর ভাইয়ের জরুরি তলব, ফোন দিয়ে বললেন: জসিম একটু চেম্বারে দেখা করো তো। তারপর চেম্বারে দেখা ও কথা: কবি শামীম রেজা নাকি তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছেন: চট্টগ্রামের মাজার ও মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কথা। আমিও ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বললাম: হ্যাঁ ভাই, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ লালশালু কিংবা আহমদ ছফার আলী কেনানের উত্থান মাজারের নেতিবাচক দিকগুলো উঠে এসেছে, কিন্তু এই অঞ্চলের জনসংস্কৃতির সাথে মাজার বিষয়টা যেভাবে জড়িয়ে আছে, সেই সংস্কৃতিটা তুলে আনতে পারলে এটা অন্যরকম কাজ হবে। তারপর থেকে শুরু মাজারকেন্দ্রিক তাঁর পাঠ আর মাজারকে কেন্দ্র করে তাঁর ফিল্ডওয়ার্ক। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাজের সঙ্গ দিতে গিয়ে আমারও দেখা হয়ে গেল চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত ছোট বড় সব মাজার। একই সাথে দেখা হয়ে গেছে একটা সৃষ্টির জন্য কতটা পরিশ্রম করতেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর! এখনও মনে পড়ে প্রতি বৃহস্পতিবার, সব মাজারেই বসে মারফতি গানের আসর, আর উপন্যাস লেখার প্রয়োজনে জাহাঙ্গীর ভাই হয়ে উঠলেন সেই সব আসরের নিয়মিত স্রোত, প্রায় তাঁর সাথে যুক্ত হতাম আমি আর কবি মাতিয়ার রাফায়েল। মনে পড়ে এই উপন্যাসের প্রয়োজনে জাহাঙ্গীর ভাই, বেশ কিছু মারফতি গানও লিখেছেন। স্মৃতিগুলো মনে পড়লে, প্রশ্ন জাগে: আচ্ছা এই উপন্যাসই কি তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ? হৃদ্মাজার উপন্যাসটার প্রত্যেকটা শব্দ তাঁর ঘাম আর শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ এই উপন্যাসটা নিয়েই ঘটেছে, তাঁর লেখালেখি জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। স্পষ্টত মনে পড়ছে, গত বছর বই মেলার আগে; এক শুক্রবার জাহাঙ্গীর ভাই হাসি মুখে জানালেন: ‘একজন প্রকাশক পাওয়া গেছে, জাগৃতি বইটা করছে, প্রকাশক বলেছে মোটামুটি ১৫০ কপির মত বই বিক্রি হলে টাকা উঠে আসবে, মার্কেটিংএ আমিও যেন একটু সহযোগিতা করি।’ আমি তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললাম: ‘আপনার জানাশোনার পরিধি তো কম নয়, পরিচিত জনদের বললেই তো, এই পরিমাণ বই চলে যাবার কথা।’ মোটামুটি ওভাবেই সব ঠিকঠাক চলছিল, প্রুফ দেখার কাজও শেষ, ঠিক প্রেসে যাবার আগে প্রকাশক শর্ত দিয়ে বসলেন ১৫০ কপি বইয়ের টাকা অগ্রিম দিয়ে দিতে হবে, প্রকাশকের চাপিয়ে দেওয়া হঠাৎ শর্তে তিনি শুধু হতাশ হন নি অপমানিতও হয়েছেন। খুব হতাশভাবেই আরেক শুক্রবার তিনি আমাকে ঘটনাগুলো জানালেন। তাঁরপর তিনি নিজেই যোগাযোগ করলেন, আশালয় প্রকাশনীর সাথে, পিন্টু রহমান নামে জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি নিয়েছিলেন, প্রুফ পাঠাবপাঠাচ্ছি করে পারকরে দিল বই মেলার অর্ধেক সময়, কিছু দিন থেকে ফোন ধরাই বন্ধ করে দিল। সেই বছর, আমি জাহাঙ্গীর ভাই, গল্পকার ফজলুল কবিরী ও কবি গল্পকার জয়ন্ত জিল্লু সহ আমরা চারজন এক সাথে গেলাম বই মেলাতে। ছিলাম ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই দুই দিন জাহাঙ্গীর ভাই আশালয় প্রকাশনের দায়িত্বশীল পিন্টু রহমানের সাথে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন, সেখানেও জাহাঙ্গীর ভাই ব্যর্থ, পিন্টু জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ফোন ধরল না, আর লিটলম্যাগ চত্বরেও আশালয় প্রকাশনীর দায়িত্বশীল কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না! সেই একই রকম হতাশা নিয়ে জাহাঙ্গীর ভাই সহ আমরা একসাথে চট্টগ্রাম ফিরে এলাম। বইমেলার একেবারে শেষের দিকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করল, চৈতন্য নামে একটা প্রকাশনী সংস্থা। জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের জানিয়ে ছিলেন, ১লা বৈশাখেই প্রকাশনী সংস্থা চৈতন্য হৃদ্মাজার বইটা বাজারে আনবে। ১লা বৈশাখ এলো এবং গেল কিন্তু চৈতন্য নামক ওই প্রকাশনা সংস্থা হৃদ্মাজার আর প্রকাশ করল না। শেষ পর্যন্ত এই বছর মেলাতে বইটা প্রকাশ করেছে, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে

সেই দিন ছিল কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ৪৯তম জন্মদিন। হঠাৎ দুপুরে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ফোন পেলাম, সেই পরিচিত সংলাপ: হ্যাঁ জসিম, কি অবস্থা? আমিও গতানুগতিক উত্তর: জ্বী ভাই, ভালো। তাঁরপর একটু ভারী কণ্ঠে বলে উঠলেন: আরে মিয়া, আমার জন্মদিন, ফেইসবুকে তোলপাড় চলছে, তোমার কোন খবর নাই। আমি, তাই নাকি? বলে ফোনটা রেখে, কম্পিউটার খুলে ফেইসবুকে ঢুকলাম। সত্যিইতো, কত মানুষের কতরকমের শুভেচ্ছা বাণী, তার মধ্যে থেকে অবশ্যই আলাদা করে দৃষ্টি কাড়লো ছোট কাগজ গল্পপত্রএর সম্পাদক মাসউদ আহমাদএর পোস্ট। সব দেখে ভেবে আমি লিখলাম: ‘ইতিপূর্বে তাঁর সাহিত্য নিয়ে আমি একাধিক বার একাধিক পত্রিকাতে লিখেছি, আজ শুধুই ব্যক্তি কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে নিয়ে লিখব। কোন পিতাহীন সন্তান, পিতার স্নেহ যদি পেতে চান, কোন ভাইহীন ছেলে ভাইয়ের ভালোবাসা যদি পেতে চান, কোন নিঃসঙ্গ মানুষ যদি বন্ধুত্বের সঙ্গ পেতে চান, তবে চলে আসুন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কাছে, আলাপ করতে পারেন, গভীর জ্ঞান তথ্য থেকে স্থূল (প্রচলিত অর্থে) যৌনতা পর্যন্ত। তিনি আমাদের চেরাগীর চেরাগ, আড্ডার মধ্যমণি। যদি তিনি গ্রামের দুষ্ট বালকের মতো বাল্য বিবাহ করতেন, তবে আমাদের কাছাকাছি বয়সের তাঁর সন্তান থাকতে পারতো। তবুও আমি আমার জীবনকালে তাঁকে হারাতে চায় না।’ তিনি আমার পোস্টএ কমেন্ট করলেন: হা হা হা, তুমি একটু বেশিই বলো।

তারাপর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আমরা দু’জন একসাথে চেরাগীতে গেলাম, দ্রুত রোগী দেখা শেষ করে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া। ভাগ্যদা, আমাদের একটা অভিজাত রেস্টুরেন্টএ নিয়ে পেট ভরে খাওয়ালেন, এবং খাওয়া শেষে জাহাঙ্গীর ভাইকে কিনে উপহার দিলেন, কমলকুমার মজুমদারএর গল্প সমগ্র। শেষ আমরা তিনজন একসাথে চলতে শুরু করলাম দরবার হল (লালখান বাজারের যাত্রী ছাউনি)-এর দিকে। পথে শুরু হলো জাহাঙ্গীর ভাইয়ের খুনসুটি। জসিম, তোমার জীবন দশায় আমাকে হারাতে চাও না, আমি মরে গেলেই তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাব! তাই না? আমি দ্রুত বলে উঠলাম, না, না; আমি আসলে কথাটা বস্তুগত অর্থে বললাম। তখন কি বুঝে কথাটা বলেছিলাম, এখন আর মনে নেই। তাঁর মৃত্যুর এক বছর গত হলো, এখন আমি বাস্তব উপলব্ধি থেকেই বলছি: কোন সৃষ্টিশীল মানুষেরই মৃত্যু হয় না, সৃষ্টির প্রযোজনে না হোক নিদেন পক্ষে ইতিহাসের প্রয়োজনে হলেও বেঁচে থাকেন। এখন শুধু কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর সাহিত্য পর্যালোচনার সময় এসেছে মাত্র।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s