লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

আজাদি বনাম দেশপ্রেম

umar khalid-1দেশপ্রেমীদের হাতে পড়ে আজাদি শব্দটাকে লাঞ্ছিত হতে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। দিল্লির (জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়) জেএনইউ থেকে কলকাতার যাদবপুর, সর্বত্র এই লাঞ্ছনা লক্ষ্যনীয়। সাধারণভাবে ইতিহাস বইয়ে স্বাধীনতাগণতন্ত্র শব্দ দুটোকে আমরা পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এদেশের প্রধান শাসকদলের লম্ফঝম্ফ দেখে মনে হচ্ছে কেউ যদি স্বাধীনতা চায় তাহলে তার গণতন্ত্র হরণ করাটাই যেন আজ এদেশে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে! সম্প্রতি জেএনইউএর ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সভাপতি কানহাইয়া কুমারের গ্রেপ্তার; অপর তিন ছাত্র উমর খালিদ, অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও অশ্বত্থীকে জঙ্গী বলে দেগে দিয়ে গ্রেপ্তারের ষড়যন্ত্র; একাধিক ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে সিডিশান আইনে মামলা দায়ের করা, অধ্যাপক এস আর গিলানিকে গ্রেপ্তার, এসব তো আছেই। এমনকি ন্যায়ালয়ে আইনের রক্ষকদের সামনে অভিযুক্তকে মারধর করা এবং এ হেন বেআইনী কাজ করার পরেও প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরানো, এক চরম ত্রাসের রাজত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঘটনার ঘনঘটায় বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।

প্রথমত যে প্রশ্নটা আসছে, তা কানহাইয়া কুমারের গ্রেপ্তারের যৌক্তিকতা নিয়ে। এটা আজ প্রায় দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, কানাহাইয়া কুমার এমন কোনও শ্লোগান দেননি, যা থেকে তাকে কাশ্মিরে চলমান জাতিসত্তা আন্দোলনের সমর্থক বলা যেতে পারে, বা পাকিস্তানের সমর্থক বলা যেতে পারেএ নিয়ে আজ আর খুব একটা বিতর্কের অবকাশও নেই। তাই তাকে সিডিশান আইনে ফাঁসানো যে অন্যায়, তা বলতে আজ আর হিম্মতের দরকার হয় না (যদিও দিল্লি পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানহাইয়া কুমার হোস্টেলে গরুর মাংস খাওয়ার আয়োজন করেছিল এবং নবরাত্রির সময় মহিষাসুর পূজোর উদ্যোগী হয়েছিল, দেশদ্রোহী হওয়ার জন্য এটাই নাকি যথেষ্ট!) এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেউ যদি কাশ্মির মাঙ্গে আজাদি শ্লোগান দেয় কিংবা আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরোধিতা করে, অথবা এসআর গিলানির নিঃশর্ত মুক্তির দাবি তোলে, তাহলে সেটাকেও কি আমরা দেশদ্রোহিতা বলতে পারি? এটা কি ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই অঙ্গ নয়? কারুর মনে যদি আফজাল গুরুর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বা কেউ যদি মনে করেন আফজাল গুরু যে মতে বিশ্বাস করতেন, তাতে তাঁর কোনও দোষ নেই, বা কেউ যদি অধিকার আন্দোলনের দৃষ্টিকো থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে থাকেন এবং সেই দৃষ্টিকো থেকে আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরোধিতা করেন, তাহলে তা কি দেশদ্রোহ? কারোর যদি মনে হয় কাশ্মির, মনিপুর থেকে আফস্পা আইন অবিলম্বে তুলে দেওয়া উচিত, কিংবা মনে করেন একজন মানুষ যদি সন্ত্রাসবাদীও হন, তাকে পুলিশ ভুয়ো সংঘর্ষের (ফেইক এনকাউন্টার) নামে হত্যা করতে পারে না এবং সে যদি তার এই মতগুলো প্রকাশ্যে জানায়, তাহলে কি তা দেশদ্রোহিতা? তাহলে কি নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারটাও এখন থেকেদেশদ্রোহিতা? প্রশ্নটা আসলে গোড়ায়।

rss-lawyersকারা দেশপ্রেমী? যারা একদিকে দেশের মানচিত্রের আকৃতির একটা কল্পিত ভারত মাতার ছবি এঁকে রাস্তায় ভারত মাতা কি জয় শ্লোগান দিয়ে গলা ফাটায়, অন্যদিকে দেশের জমি, খনি, অরণ্য, নদী, পাহাড় এমনকি আকাশকে পর্যন্ত সস্তায় তুলে দেয় বিদেশী বহুজাতিক সংস্থার হাতে? যারা দেশের কৃষি ক্ষেত্রকে বহুজাতিক সংস্থার হাতে তাদের লাভের স্বার্থে তুলে দিয়ে লক্ষ লক্ষ দেশবাসী কৃষককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করে? যারা বিদেশী বহুজাতিক সংস্থাদের স্বার্থে, শ্রম আইন সংস্কার করে এদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারকে কেড়ে নেয়? যারা ব্যাংক, বিমাসহ লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলোকে বেপরোয়াভাবে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেয়? যারা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন শেয়ার বাজারের ফাটকাবাজদের হাতে তুলে দিয়ে এদেশেরই একটা বড় অংশের প্রবীন নাগরিকের জীবনে বিপন্নতা নিয়ে আসার ষড়যন্ত্রে সামিল হন? যারা কার্গিল যুদ্ধে নিহত দেশের সেনার কফিন কেনার বরাদ্দ থেকে পর্যন্ত কাটমানি খায়? যারা মার্কিন ওষুধ ব্যবসায়ী লবিকে খুশি করতে, এদেশের ওষুধের মূল্য নির্ধারণের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে, জীবনদায়ী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে পাঠিয়ে দেয়? যারা দেশের সম্পদ দখলের জন্য দেশের মূলবাসীদের প্রতিদিন, প্রতি নিয়ত ভিটে মাটি চাটি করছে? জীবন জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করছে? যারা দেশের লক্ষ কোটি শ্রমজীবি জনতার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে মার্কিন শিল্পপতিদের খুশি করতে ব্যগ্র হয়ে, ঘন ঘন বিলেত যাত্রা করছেন? দেশপ্রেমী কারা? যারা এদেশেরই সংখ্যালঘু জনগণ, যাদের অধিকাংশরাই এদেশটা স্বদেশ মনে করেন, তাদের উপর গণহত্যা চালায়? যারা রামরাজত্ব ফিরিয়ে আনার নামে দেশটাকে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়? যে রামরাজত্বে নারীকে সতীত্ব প্রমাণে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়? যে রামরাজত্বে শুদ্র হয়ে জ্ঞানচর্চ্চা করার, তথা বেদ পাঠের অপরাধে শম্বুককে মৃত্যদণ্ডে দন্ডিত করা হয়! কারা দেশপ্রেমী? যারা বিজ্ঞান মনস্ক মানুষদের গুপ্তহত্যা করে অপবিজ্ঞান ফেরি করে বেড়ায়? দেশপ্রেমী কারা? যারা এদেশের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করতে চায়? ধ্বংস করতে চায় এদেশের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসকে? দেশপ্রেমী কারা? যারা আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে বারবার নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছে? আদালত বিচারাধীন বন্দীকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করার আগেই তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী চিহ্নিত করে শারীরিক নিগ্রহ করতে উদ্যত হয়েছে? এমনকি খুন করবার হুমকি দিচ্ছে?? ধোলাই দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলছে? আদালতে বিচারাধীন মামলার তোয়াক্কা না করে এ দেশের ঐতিহ্যশালী মসজিদকে ভেঙে দিয়েছে? ধর্মের নামে পরধর্মের মানুষকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়েছে? যারা সংখ্যালঘু নারীর পেট চিরে গুজরাটে গর্ভের সন্তানকে বের করে এনে তলোয়ারের ডগায় নাচিয়েছে? এরা দেশপ্রেমিক? এর নাম দেশপ্রেম?

umar-khalid-anirbanকারাই বা দেশদ্রোহী? যারা দাবী করেন, এ দেশের সমস্ত সম্পদের উপর এ দেশেরই মানুষের অধিকার? যারা মনে করেন, ধর্মবর্ণসম্প্রদায় নির্বিশেষে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকবার ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করবার অধিকার রয়েছে? যারা স্পর্দ্ধার সঙ্গে দাবি তোলেন এ দেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে? তারা দেশদ্রোহী? যারা এদেশের প্রতিটি মানুষকে যুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ করতে চান? যারা চান, দেশটাকে একটা প্রকৃত অর্থেই সার্বভৌমিকগণতান্ত্রিকধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে? যারা ভাবেন, এ দেশটা একটা নিপীড়িত জাতিসত্তার কারাগার না হয়ে, প্রতিটি জাতিসত্তার স্বেচ্ছা মিলনের ভিত্তিতে গঠিত প্রকৃত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠুক? যেখানে প্রতিটি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারটি সুনিশ্চিত হবে, এমনকি তার বিছিন্ন হওয়ার অধিকারও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে। তারা দেশদ্রোহী? যার চান, আফস্পা, টাডা, পোটা, মোকা, ইউএপিএর মতো দানবীয় গণবিরোধী কানুন বা সিডিশানের মতো ঔপনিবেশিক আইনের দমবন্ধকর অবস্থা থেকে এদেশটাকে মুক্ত করতে? যারা স্বপ্ন দেখেন, সমস্ত ধরনের শোষ, বৈষম্য, নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটা স্বদেশ যেখানে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার, ধর্মাচরণের অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী চলার অধিকার, খাদ্যাভ্যাসের অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুনিশ্চিত করা হবে? যারা চান, জাতিবর্ণ ব্যবস্থার নিগড় ভেঙ্গে এদেশের দলিত ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা গর্বের সাথে তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন?

আজাদি শব্দটার একটা বৃহত্তর পরিসর আছে। জেএনইউ বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কাশ্মির মাঙ্গে আজাদির পাশাপাশি যখন বলেন মনুবাদ সে আজাদি, পুঁজিবাদসামন্তবাদ সে আজাদি, মেহেঙ্গাই সে আজাদি আবার গিলানি মাঙ্গে আজাদি তখন আমরা দেখি আজাদি শব্দটার প্রকৃত অর্থেই একটা বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাচ্ছেআজাদি মানে তো মুক্তি! আজাদি মানে তো স্বাধীনতা। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা! তা এই আজাদি শব্দে ভারতের শাসকদের এত ভয় কেন? আজ তো বরং আমাদের নতুন করে ভাববার সময় এসেছে যে, কেন কোন পরিস্থিতিতে রোহিত ভেমুলা কিংবা অনিকেত আম্ভোরে কিংবা পশ্চিমবঙ্গে চুনিকোটালরা স্রেফ দলিত কিংবা আদিবাসী আত্মপরিচয়ের কারণে লাঞ্ছনা সহ্য করতে করতে একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হ? কেন কাশ্মিরের মায়েরা তাদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে পায় না? কেন মনিপুরের মায়েদের সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের সামনে গিয়ে নগ্ন হয়ে বিক্ষোভ দেখিয়ে বলতে হবে ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস? কেন ইরম শর্মিলা চানুর মতো একজন কবিকে দশক অতিক্রান্ত সময় ধরে অনশন চালিয়ে দাবি জানাতে হয় আফস্পা আইন বাতিল করো?

ঘটনা এটাই যে স্মৃতি ইরানিরা একদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে, কিন্তু রোহিত ভেমুলারা চীরদিন বেঁচে থাকবেন। জোর করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে কিংবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলে পরেই যদি সব শেষ হয়ে যেত, তাহলে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর পর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ছাত্রছাত্রীশিক্ষকশিক্ষিকারা তাঁর মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হতো না। বলতো না, এটা একটা প্রাতিষ্ঠানিক খুন! আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধেও আজো মানুষ তাহলে সোচ্চার হতো না! বলতো না, এটা একটা জুডিশিয়াল মার্ডার! আর কথিত, স্বঘোষিত দেশপ্রেমিকদের চিরকাল তাড়া করে বেড়াবে এইসব দেশদ্রোহীদের ভূত!

কারা দেশপ্রেমী? কারা দেশদ্রোহী?

V_D_SAVARKARআজ যারা ভারত মাতা কি জয় শ্লোগানে দশ দিক কাঁপাচ্ছে, তারা কেমন দেশপ্রেমিক? একটু ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানো যেতে পারে। আজকের দেশপ্রেমিক সংঘ পরিবারের মূল অংশটি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ এমন একটা সময় গড়ে ওঠে, যখন আমাদের দেশটা ছিল ব্রিটিশের হাতে পরাধীন। সেটা ১৯২৫ সাল। হাজার হাজার তরু, তরুণী তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। এমনই এক সময় সংঘ পরিবার এলো হিন্দুত্বের ধ্বজা নিয়ে। কিন্তু তার আগে একটা মজার ইতিহাস আছে। আমরা জানি, সংঘ পরিবারের অন্যতম আইডল হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। তিনিই ১৯২১ সালে হিন্দুতভ : হু ইজ হিন্দু নামে একটি বই লেখেন, যেখানে প্রথম তিনি হিন্দুত্বের তথা হিন্দু জাতি সম্পর্কিত এক উদ্ভট ধারণাকে সামনে আনেন। তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বএর ধারণার সেই শুরু। সাভারকারের মতে, যারা এ দেশটিকে শুধুমাত্র জন্মভূমিই মনে করেন না, সাথে সাথে পূণ্যভুমিও মনে করেন, তারাই হিন্দু। মুসলমানরা এদেশটাকে জন্মভূমি মনে করলেও, ধর্মের দিক থেকে তাদের পবিত্রভূমি হলো আরব, খ্রীষ্টানদের পবিত্রভূমি হলো জেরুজালেম অতএব তারা হিন্দু নন। বলা বাহুল্য, সাভারকারের হিন্দুত্বের এই উদ্ভট সংজ্ঞা তার নিজস্ব মস্তিস্কপ্রসূত। আজ অবধি কোনও দেশে কোনও সমাজবিজ্ঞানীর বয়ানে জাতির এমন সংজ্ঞা আমরা আর শুনিনি! সাভারকার শুধু হিন্দুজাতির সংজ্ঞা দিয়েই থেমে থাকলেন না, পাশপাশি তিনি রাজনীতির হিন্দুকরণ এবং হিন্দুত্বের সামরিকীকরণএর কথাও বলেছিলেন। এছাড়াও এই বইটিতে ছিল সাম্প্রদায়িকতার নানা ইন্ধন। বিকৃত ইতিহাসের জ্বলন্ত সংস্করণ হলো এই বইটি।

এই সাভারকার কিন্তু প্রথম জীবনে ছিলেন একজন ব্রিটিশবিরোধী দেশপ্রেমিক, যিনি ইন্ডিয়াস ওয়ার অফ ফ্রিডম নামে একটি বই লিখে ব্রিটিশের চক্ষুশুল হন। কারণ বইটিতে সশস্ত্র পথে পূর্ণ স্বরাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে, ইন্ডিয়া হাউস নামক একটি বিপ্লবী দলের সাথে সংস্রব রাখার কারণে তাকে সিডিশন মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। মামলা চলাকালীন তিনি গ্রেফতার অবস্থায় মার্সেলিস বন্দরে পৌঁছানোর পথে এসএস মোরিয়া জাহাজ থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন। পরে বিচারে তার দুটি মামলায় দুবারের জন্য যাবজ্জীবন সাজা হয়। জেলে যাবার পরই কিন্তু বিপ্লবী সাভারকারের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে। ফলশ্রুতিতে, তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একটি চিঠি লিখে বসেন। ১৯১৩ সালের ১৪ নভেম্বর লেখা তাঁর এই চিঠিটি কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রকের গেজেটিয়ার ইউনিটের পেনাল সেটেলমেন্ট ইন আন্দামান নামক একটি বইয়ে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর টাইমস অফ ইন্ডিয়া ২০০২ সালের ৪ মে পুনরায় তা প্রকাশিত হয় হিন্দুতভ হিরো সাভারকার হ্যাড বেগড ব্রিটিশ ফর মার্সি শিরোনামে। চিঠিটিতে তিনি লেখেন, যদি সরকার তার বহুবিধ বদান্যতায় আমাকে মুক্তি দেন, আমি সংবিধানসম্মত প্রগতি এবং ইংরেজ সরকারের প্রতি আনুগত্যের সবচেয়ে একনিষ্ঠ না হয়ে পারি না। তাছাড়া সাংবিধানিক পথে আমার এই পরিবর্তন ভারত ও তার বাইরে থাকা বহু বিপথগামী তরুণদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবে, যারা এক সময় আমাকে তাদের পথ প্রদর্শক ভেবেছিলেন। সরকার যেমন চাইবে আমি তেমন সেবা করতে প্রস্তুত, কারণ বিবেকের তাড়নায় আমার পরিবর্তন বলে আমি আশা রাখি আমার ভবিষ্যত ব্যবহারও অনুরূপ হবে। মহান রাজন ছাড়া কেই বা করুণাময় হতে পারেন; আর সরকারের পৈতৃক আবাসে ফিরে যাওয়া ছাড়া উড়নচণ্ডে সন্তান আর কি বা করতে পারে

এরপর, আট বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি যখন ১৯২১ সালে মুক্তি পেলেন, সে বছরই তিনি লিখলেন হিন্দুত্ব নিয়ে তাঁর কুখ্যাত বইটি। বলা বাহুল্য হিন্দু মুসলিম ঐক্যকে ফাটল ধরিয়ে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকে দূর্বল করতে এই বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এবং ব্রটিশরাজকে তা প্রভূত সহায়তা করে। এই বইয়ের প্রেরণায়ই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে আরএসএস। আরএসএস কখনোই ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে অংশ নেয়নি, ল্টো তারা মুসলমানরা প্রধান শত্রু এই বিকৃত ধারণা সামনে এনে একশ্রেণীর মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, যতবারই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র রূপ পেয়েছে, ততবারই সাম্প্রদায়িক শক্তি পিছু হটেছে। আবার আন্দোলনে ভাঁটার সময় তারা কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে সংঘ পরিবার আজকে দেশপ্রেমের ঠিকাদারিত্ব নিতে উদগ্রীব তাদের প্রতি ব্রিটিশের কি মনোভাব ছিল? সেন্ট্রাল প্রভিনেন্সকে লেখা ৭ জানুয়ারি ১৯৪৪এর আই বির রিপোর্টে আর টটেনহ্যাম জানাচ্ছেন, প্রস্তাব করা হচ্ছে গোলওায়ারকারকে সতর্ক করে দেওয়া হোক, এই সংগঠনের কাজকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখতে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তিনি নিজেই না চটাতে ব্যতিব্যস্ত, তাই আমরা এই প্রস্তাব না ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম। (আধুনিক ভারত ও সাম্প্রদায়িকতাবাদ বিপান চন্দ্র)

ডি আর গয়াল নামক একজন প্রাক্তন আরএসএস সদস্য, যিনি ১৯৪২ সালে আরএসএসএর সংস্রব ত্যাগ করেন, তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ : পয়জনাস ট্রি বইটিতে আরএসএসএর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে স্বেচ্ছাসেবীদের বিরত রাখার বিষয়টি ফাঁস করে দিয়েছেন। ব্রিটিশ বিরোধিতাকে সংঘ পরিবার যে একটা প্রতিক্রিয়াশীল কাজ বলে মনে করতো, তা বোঝা যায় সংঘ পরিবারের অন্যতম প্রাণপুরুষ গোলওয়ালকরের একটি মন্তব্যে। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং সাধার শত্রুর তত্ত্ব (পড়ুন হিন্দু মুসলিম উভয়ের সাধারণ শত্রু ব্রিটিশ এই তত্ত্বলেখক), যা জাতি সম্পর্কে আমাদের ধারণার ভিত্তি, আমাদের বঞ্চিত করেছে প্রকৃত হিন্দুজাতীয়তার ইতিবাচক এবং প্রেরণাদায়ী সারবস্তু থেকে এবং বেশিরভাগ স্বাধীনতা আন্দোলনকে পরিণত করেছে ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে। ইংরেজ বিরোধী হওয়াকেই মনে হচ্ছে দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ। এই প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা মুক্তি সংগ্রামের সমগ্র গতিপথ, তার নেতা নির্ধারণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বস্তুতপক্ষে ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এদেশে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত করেন, তাকেই শক্তিশালী করতে সংঘ পরিবার মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল। ভাবুন একবার যখন এদেশে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে হাজার হাজার তরু তরুণী, ছাত্রযুব আত্মত্যাগে সামিল হচ্ছেন, তখন গোলওয়ালকর তাদের দেশপ্রেমকে প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা বলে চিহ্নিত করছেন। আজ কি আকালের দিন এলো, তাদের কাছ থেকে আমাদের দেশপ্রেমএর পাঠ শিখতে হবে। আপনারাই ভাবুন কাদের আপনি দেশপ্রেমিক মানবেন মঙ্গল পাণ্ডে, তিতুমী, সিধুকানু, ক্ষুদিরাম, ভগৎসিং, মাষ্টারদা সূর্য সেনদের মতো প্রতিক্রিয়াশীলদের; নাকি আরএসএসবিজেপিবজরং দলের দেশপ্রেমিকনেতাদের!

মোদ্দা কথা

democracy-1-1আসলে গণতন্ত্র কিংবা দেশপ্রেম কোনটাই শ্রেণীনিরপেক্ষ কোনো ধারণা নয়। যদিও তথাকথিত গণতন্ত্রপূজারীরা একথা শুনলে ভুরু কুঁচকোয়। কিন্তু ঘটনা হলো এটাই যে, এদেশের শাসকের কাছে গণতন্ত্র মানে হলো টাটা, আম্বানি, আদানিদের জন্য গণতন্ত্র আর ব্যাপক মেহনতি মানুষদের জন্য গণতন্ত্রহরণ। একটা ছোট্ট উদাহরণ থেকেই একথা স্পষ্ট হবে। সম্প্রতি আম্বানিআদানিদের মতো ধনকুবেরদের কোটি কোটি টাকার ব্যংক ঋণ মোদি সরকার মুকুব করে দিয়েছে অথচ যখন ঋণের দায়ে প্রতিদিন কৃষকেরা আত্মহত্যা করছেন, তখন এব্যাপারে সরকারের কোনো মাথা ব্যাথা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মহারাষ্টে এক মাসে যখন কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা ১২৪ এসে দাঁড়িয়েছে, তখন বিজেপির উত্তর মুম্বইয়ের সাংসদ গোপাল শেট্টি মন্তব্য করেছেন, আত্মহত্যা করা চাষিদের একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে! এর থেকেই পরিস্কার যে, মোদি সরকার কাদের গণতন্ত্র রক্ষা করছে আর কাদের গণতন্ত্র হরণ করছে! মোদি সরকারের জমানায় কারা স্বাধীনতা ভোগ করছে আর কারা দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন। শুধু মোদি সরকার কেন, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে আজ অবধি কখনো, কোথাও সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য সংগ্রাম করলেই রঙবেরঙের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো তাদের উপর দমন অভিযান চালিয়েছে। সে বাস্তুহারা মানুষদের উপর মরিচঝাঁপিতেই হোক, কিংবা ভুপাল দূর্ঘটনার শিকার মানুষদের বা তাদের পরিবার সদস্যদের ক্ষতিপূরণের ন্যায্য দাবীর সংগ্রামেই হোক; জলজঙ্গলজমিনের অধিকারের জন্য সংগ্রামরত নন্দিগ্রাম, সিঙ্গুর, কলিঙ্গ নগর, পস্কোর মানুষদের সংগ্রামই হোক; পরিবেশের দাবিতে সংগ্রামরত কুদানকুলামের ও জায়িতাপুরের জনতার সংগ্রামই হোক বা কৃষকদের অধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত নকশালবাড়ি, ভোজপুর, জাগিত্তাল, লালগড়, নারায় পাটনার সংগ্রামই হোক; কিংবা জাতিসত্তার আন্দোলনগুলোর উপরই হোক সর্বত্র রাষ্ট্রীয় দমনই একমাত্র পথ হিসাবে এ দেশের শাসকশ্রেণীর কাছে বিবেচিত হয়েছে!

যখনই কোনো কৃষক আন্দোলন দানা বেঁধেছে, তখনই রাষ্ট্র সামন্তপ্রভুদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। যখনই কোথাও শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে, তখনই রাষ্ট্র মালিকশ্রেণীকে সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। এমনকি পিএফ, গ্র্যাচিউটির মতো ন্যায্য পাওনাগুলো কেড়ে নেওয়া সত্ত্বেও এদেশের চটকল ও চা বাগান মালিকরা বুক ফুলিয়ে ঘুড়ে বেরাচ্ছে। সরকার তাদের এহেন জামিন অযোগ্য বেআইনী কার্যকলাপ নিয়ে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। উল্টো শ্রমিকরা এসব নিয়ে আন্দোলন করলে তাদের পর নেমেছে পুলিশের লাঠিগুলি। যখনই জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মানুষ তাদের জীবন, জীবিকা, বাসস্থানের জন্য লড়াই চালিয়েছে তখন রাষ্ট্র নির্লজ্জভাবে সেই সব অসহায় মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁত নখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শাসকশ্রেনীর যখন, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন সর্বত্র ছবিটা একই। তাই গোপাল কাহারদের আর এদেশের গণতন্ত্র বাবুকে চেনা হলো না! আর যখন শাসকশ্রেণী চূড়ান্ত আর্থিক সংকটে জর্জরিত হয়েছে। সংকট এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, একদিকে জনগণের সংগ্রামগুলো তীব্রতর হয়েছে, অন্যদিকে তা শাসকশ্রেণীর মধ্যেকার দ্বন্দ্বের তীব্রতাকেও আরো বাড়িয়েছে তখন সংকটের ত্রাতা হিসাবে উগ্রজাতীয়তাবাদের মুখোশ পড়ে ফ্যাসিবাদী কোন শক্তি সম্ভবানি যুগে যুগের আশ্বাস নিয়ে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে। আজকের উগ্রজাতীয়তাবাদের নামে দেশদ্রোহী অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান এমনই একটা সময়ের ইঙ্গিতবাহী। প্রকৃত গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে তাই এর বিরুদ্ধে যেমন ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, পাশাপাশি সতর্ক থাকতে হবে কোনোভাবেই যেন এদের প্রচারের (পড়ুন এদের মিথ্যার বেসাতির) শিকার না হয়ে পড়ি।।

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

Advertisements
মন্তব্য
  1. কমরেড নাফিস বলেছেন:

    অসাধারণ লিখেছেন।এটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দেব

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s