সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতা ও শরণার্থী সংকট

Posted: ডিসেম্বর 20, 2015 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

আর কতজন আইলানকে মরতে হবে?

লিখেছেন: অজয় রায়

aylan-1তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে পড়ে রয়েছে সিরীয় শিশু আইলান কুর্দির নিথর দেহ। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে ধুয়ে দিচ্ছে তার মুখ। বাবামায়ের সঙ্গে ইউরোপের উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায় তিন বছরের ছোট্ট ছেলেটি। এই ছবি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। এদিকে, ইউরোপের কোথাও সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া টপকানোর চেষ্টা করছেন শিশু কোলে ঘরছাড়া মা। আবার কোথাওবা শরণার্থীদের উপর লাঠি চালাচ্ছে পুলিশ। বইছে রক্তের স্রোত। অসহায় বাবামায়ের কোলে শিশু কেঁদে চলেছে। নিষ্ঠুর পৃথিবীর এই রকম সব ব্যাপারস্যাপার কিছুতেই সে বুঝে উঠতে পারছে না।

রাষ্ট্রসংঘের পরিসংখ্যান বলছে, এবছরে ইউরোপে চলে আসা শরণার্থীদের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছুঁতে চলেছে। এদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ শিশু। আর তিন হাজারেরও বেশি শরণার্থী ডুবে মারা গিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।[] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনও এত বড় শরণার্থী সমস্যার মুখোমুখি হয়নি ইউরোপ। স্পষ্টতই, এই সংকটের মূলে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা। পাশ্চাত্য ও তার স্থানীয় দোসররা মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর জন্য তথাকথিত ‘সুরক্ষিত করার দায়িত্বের’ মতো নানা অজুহাত খড়া করছে। প্রকৃত লক্ষ্য এই অঞ্চলগুলিতে আধিপত্য বিস্তার করা। আর প্রাকৃতিক সম্পদের, বিশেষত তেলের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। ইতিমধ্যেই তারা বহুলাংশে ধ্বংস করেছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনকে। যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও ঘরছাড়া করা হয়েছে।

সিরিয়ায় যেমন ২০১১ সাল থেকেই ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করে চলেছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার দোসর ইজরায়েল, তুরস্ক এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলি। যাদের উদ্দেশ্য হল সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাসার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এর জন্য তারা মদত জুগিয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো মৌলবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকেও। যার পরিণতিতে ব্যাপক হিংসা ছড়িয়েছে। আর সিরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন।[] এদিকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যখন বিমান হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া, গতমাসে একটি রুশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে তুরস্ক। কুর্দ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আইএস’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে যে বামপন্থী যোদ্ধারা, তাঁদের উপরেও আক্রমণ হানছে ওয়াশিংটনের মিত্র তুরস্কের সেনাবাহিনী।

এদিকে, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার দায় এড়াতে এখন মরিয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। তারা সীমান্তের সামরিকীকরণ করছে। কোথাও কাঁটা তারের বেড়া দিচ্ছে। আবার কোথাওবা দেওয়াল তুলছে। পুলিশ ও সেনা নামিয়ে দমনপীড়ন চালাচ্ছে। বৈষম্য করছে শরণার্থীদের সঙ্গে। আর তাঁদের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত তুরস্কে শিবিরে আটক করে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ যে শেনজেনব্যবস্থা অনুসরণ করে, তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এদিকে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে অতি দক্ষিণপন্থী ও নব্য ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি। জার্মানিতেই যেমন এবছরে শরণার্থীদের বাসস্থানে ২২২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।[] গতমাসে প্যারিসে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী সন্ত্রাসবাদী হামলা চালানোর পর ইউরোপীয় সরকারগুলি শরণার্থী প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। পশ্চিমা মদতপুষ্ট মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঘটানো অপরাধের জন্য সমস্ত শরণার্থীদেরকে অযৌক্তিকভাবে দায়ী করার চেষ্টা চলছে।

নব্যউদারবাদী নীতির পরিণতিতে বিধ্বস্ত হয়েছে বিভিন্ন দেশ। সাম্রাজ্যবাদীদের চাপিয়ে দেয়া সংঘর্ষে ঘরছাড়া হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। স্বৈরশাসকের দমনপীড়নের কারণেও অনেকে বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে, নানা অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত হিংসা ছড়াচ্ছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। এবছরে যেমন বিশ্বজুড়ে বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি অতিক্রম করে গিয়েছে বলে রাষ্ট্রসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে।[] তবে এই নব্যউদারবাদী বিশ্বায়নের যুগে পুঁজির অবাধ প্রবাহ পথ প্রশস্ত করা হলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। বরং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বাধার প্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে। রুগ্ন ব্যাংকগুলিকে উদ্ধার করতে ধনবাদী ব্যবস্থায় রাতারাতি শত শত কোটি ইউরো দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিপন্ন উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়ানোর বেলায়ই যত ঘাটতি।

স্পষ্টতই, শরণার্থীরা নতুন শ্রমশক্তি। যাদের দাসের মতো ব্যবহার করতে চায় শাসক শ্রেণী। এর ফলে বেকারত্ব আরও বাড়বে। উৎপাদন খরচ কমবে। কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা লোটার পথও প্রশস্ত হবে। তবে ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বহু সাধারণ মানুষ শরণার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পথে নেমেছেন। আর বিভিন্ন ভাবে তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।।

——————

তথ্যসূত্র

[] Macedonia Police Teargas Refugees as Europe Arrivals Reach 1 Million”, Dec 2, 2015, TeleSUR

[] Chinese FM meets Syrian presidential advisor”, Oct. 12, 2015, Xinhua News Agency

[] Jess Staufenberg, “More than 200 refugee homes burned or attacked in Germany”, Dec 7, 2015, The Independent

[] ‘‘World’s refugees and displaced exceed record 60 million: U.N’’, Dec 18, 2015, REUTERS

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s