সংঘ পরিবারের শিক্ষানীতি

লিখেছেন: নীলিম বোস

non-net-fellowship-protest-1ইতিহাস, শিল্পসংস্কৃতি, আমাদের সমগ্র সত্তাকেই নিজের ভাবনায় রাঙ্গিয়ে নেওয়াটা ফ্যাসিবাদের পুরনো কৌশল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা এটা জেনে এসেছি। দেখে এসেছি। দেশের বেশির ভাগ মানুষকে মিথ্যা অহংকার ও অলীক গৌরবের ভক্তিরসে ভাসিয়ে না দিলে ফ্যাসিবাদের পক্ষে তার অভিষ্ঠে পৌঁছানো কোনোদিনই সম্ভব নয়। আর সেটা যদি হয় ভারতের মতো দেশ তবে আরো প্রয়োজন হয়ে পড়ে এই কাজটা। কারণ এই দেশে আজো কমবেশি ৮০ শতাংশ মানুষ দিনে ২০ টাকার ওপর বেঁচে থাকেন, পুষ্টি সূচকক্ষুদা সূচকের মতো রাষ্ট্রপুঞ্জের মানব উন্নয়ন সূচকগুলিতে ভারত পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলির সমতূল্য অবস্থানে রয়েছে(কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্থানের পরে)। এরকম একটি দেশের মানুষদের সামনে রাতারাতি ‘আচ্ছে দিন’ নিয়ে আসার বা দেশটাকে ‘সুপার পাওয়ার’এ পরিনত করার খুড়োর কলটি দিয়ে আকৃষ্ট করতে গেলে ফ্যাসিষ্ট শাসকের কাল্পনিক ও অবাস্তব উজ্বলতার অতিতের রঙে আমাদের চারপাসকে ঢেকে দেওয়াটা খুবই দরকার। ফ্যাসিষ্ট সংঘ পরিবারের কাছে গৈরিকীকরণ হলো সেই দরকারকেই পূরণ করার একটি অন্যতম মাধ্যম। তাই বিজ্ঞান কংগ্রেস থেকে ইতিহাস সংসদ, গৈরিকীকরণের সুনামী আছড়ে পড়ছে বারবার। তবে গৈরিকীকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্র। হিটলার একসময় বলেছিলেন Let me control the school text books, 3rd reich will rule for the next 20 years without any internal threat.” ঠিক এই কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রটি সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র গৈরিকীকরণের। এই গৈরিকীকরণ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক মধ্যযুগীয় উল্লাসের মধ্যে। যার থেকে ফুটে বেরোয় সামন্ততান্ত্রিকতা। আর ঐ মধ্যযুগীয় উল্লাসের পেছেনেই থাকে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চাল। কারণ ফ্যাসিবাদ মানেই রাষ্ট্রের সাথে কর্পোরেশনের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’। আর বেসরকারিকরণ ছাড়া বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির মুনাফা বৃদ্ধির রাস্তা বন্ধ। তাই শিক্ষার বেসরকারিকরণ চলে গৈরিকীকরণের সাথে হাতে হাত ধরে।

গৈরিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের আঘাত ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে নেমে আসছে মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে FYUP (Four Years Undergraduate Plan বা চার বছর মেয়াদী আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কার্যক্রম এফওয়াইইউপি) চালু করার মাধ্যমে ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বিলের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণের অবাধ আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল আগের ইউপিএ সরকারই। তখন সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক ফ্রন্ট বিজেপী ও ছাত্র সংগঠন এবিভিপি নানা মাত্রায় এর বিরোধিতায় নামলেও ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটা কথাও খরচ না করে সেগুলিকে অবাধে চলতে দিচ্ছে। এফওয়াইইউপি প্রবল আন্দোলনের চাপে এখন প্রত্যাহার হয়ে গেলেও ২০০৫ সালে ভারত সরকারের সাথে ডব্লিউটিওর স্বাক্ষরিত শিক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিতেই রয়েছে এটি, যেভাবে সেই চুক্তির অন্য নানা দিকগুলিকে প্রয়োগ করতে নেমেছে মোদি সরকার তাতে যেকোনো মূহুর্তে এফওয়াইইউপিএর পূর্নআবির্ভাবের সম্ভাবনা খুবই উজ্বল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা একটু পরে আসবো, আমাদের আসতে হবেই। ক্ষামতায় আমার পরই শিক্ষা সংক্রান্ত নানা কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পদে সংঘ পরিবারের পেটোয়া লোকজনদের বসানোর মাধ্যমে শুরু হয় এই পর্যায়ে গৈরিকীকরণের কাজ। সংঘ পরিবারের প্রতিনিধিরা মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী(শিক্ষা এই মন্ত্রকেরই অধীন) স্মৃতি ইরানীর সাথে দেখা করে রামায়নমহাভারতগীতাকে স্কুল সিলেবাসের অর্ন্তভুক্ত করার দাবী জানান। এখানেই তারা শেষ করেননি, তারা রামায়নমহাভারতকে ইতিহাস ও গীতাকে অবশ্যপাঠ্য নীতিশিক্ষা হিসাবে সিলেবাসের অর্ন্তভুক্ত করার দাবী তোলেন। গৈরিকীকরণের প্রথম স্পষ্ট আক্রমণটা এই পর্যায়ে শুরু হয় প্রথাগত শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে। সেটা বোধহয় যাতে প্রথমেই বেশি প্রতিরোধের সামনে যাতে না পড়তে হয় সেই কারণে(যদিও সেই অনুমান ভুল বলে প্রমানিত হয়েছে পরবর্তীকালে)। পুনে ফিল্ম আন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিটুট অব ইন্ডিয়া, যা একটি সরকারি চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, সেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয় বহুদিনের বিজেপী কর্মী গজেন্দ্র চৌহানকে। যার ফিল্ম সংক্রান্ত বিষয়ে অবদান শুন্য। ৯০এর দশকে দূরদর্শনে মহাভারত সিরিয়ালে যুধিষ্টিরের চরিত্রে অভিনয় সহ কয়েকটি অতি নিম্নমানের ফিল্মে তিনি ততোধিক নিম্নমানের অভিনয় করেছেন। তার সাথে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কমিটি, যা ফিল্ম আন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিটুট অব ইন্ডিয়া সোসাইটি নামে পরিচিত, তাতে এমন কিছু লোকজনকে নিয়োগ করা হয় যাদের যোগ্যতা নিয়ে মুম্বাই হাইকোর্ট ও প্রশ্ন তুলেছিল। এদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানে আনন্দ পট্টবর্ধনের বিখ্যাত ডকুমেন্টারি ‘রাম কে নাম’ ও ‘জয় ভিম কমরেড’ দেখানোর সময় চালানো হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া পুনের স্থানীয় এবিভিপি নেতা আছেন, আছেন ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদির হয়ে প্রচার ফিল্ম তৈরি করা ‘ফিল্মমেকার’(!)। এর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ও সারা দেশের গণতান্ত্রিকধর্মনিরপেক্ষ জনগণ যেমন আন্দোলনে নামেন তেমনই ফিল্ম দূনীয়ার নামী ব্যাক্তিত্বরাও পাসে এসে দাঁড়ান সক্রিয়ভাবে। তখনই ঝুলি থেকে দ্বিতীয় বেড়ালটিকে বার করে সংঘ পরিবার। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় আন্দোলন না বন্ধ করলে প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারিকরণ করে দেওয়া হবে বলে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের দায় সরকার নেবে কেন সেই প্রশ্ন তুলেও বেসরকারিকরণের জমি তৈরি করার চেষ্টা করা শুরু হয়ে যায়। আসলে প্রথমে উচ্চশিক্ষাকে ও পরে সমগ্র শিক্ষাক্ষেত্রকেই পন্যে পরিনত করাটাই এই মূহুর্তে সাম্রাজ্যবাদের কাছে প্রচন্ড প্রয়োজন। পুনে এফটিআইআইএর ক্ষেত্রে এর সাথে শিল্পের ওপর পুঁজির পূর্ন নিয়ন্ত্রনটাও যুক্ত হয়ে যায়। গৈরিকীকরণ ও বেসরকারীকরনের হাত মেলানোর প্রথম নিদর্শন।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মোদি সরকার ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন (ইউজিসি) একটি সময়ের নিরিখে অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান বলে এটির অবলুপ্তি ঘটানোর ভিত্তি তৈরি করছিল। যা করা গেলে কলেজবিশ্ববিদ্যালয়গুলি বাধ্য হবে আরো বেশি করে কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য। বেসরকারিকরণের পথ আরো সুগম হয়। সেই কাজটির দিকে প্রথম পদক্ষেপ ছিলো ইউজিসি নননেট ফেলোশিপ বন্ধ করে দেওয়া। মাস্টার ডিগ্রি পাস করার পর বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ও কিছু রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় এই ফেলোশিপ খাতে টাকা পায় ইউজিসিএর থেকে। যেহেতু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা করার প্রধান যোগ্যতা নির্নায়ক পরীক্ষা, এনইটি (ন্যাশনাল ইলিজিবিলিটি টেস্ট নেট)এর মাধ্যমে খুব অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রীই গবেষণার সুযোগ পান, এবং এমন অনেক বিষয় গত ১০১৫ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যেগুলিকে নেট পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করেনি কোনো সরকারই। নননেট ফেলোশিপ খাতে পাওয়া টাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়গুলিতে গবেষণার জন্য খরচ করে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রায় এই সমস্ত বিষয়গুলিই সমালোচনামূলক, যা প্রকৃতিগত ভাবেই সাম্রাজ্যবাদসামন্তবাদ বিরোধী। ফলে সরকার ও রাষ্ট্র বিরোধী গঠনমূলক ভাবনা প্রচার করে সেগুলি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। ফলে গবেষণার ক্ষেত্রে যাতে ছাত্রছাত্রীরা সেগুলি থেকে দূরে থাকে সেই কারণেই নেট সেগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হ্য়নি। এই বিষয়গুলিতে গবেষণা স্বার্থে ও সামগ্রিকভাবে গবেষণার কাজকে যতটা সম্ভব প্রসারিত করার প্রয়োজনেই নননেট ফেলোশিপ সমস্ত অপ্রতুলতা সত্বেও গুরুত্বপূর্ন। ইউজিসিএর কমিটি ভেঙ্গে যাওয়ার আগে হওয়া শেষ মিটিংএ এই নননেট ফেলোশিপ তুলে দেওয়ার সিধান্ত নেওয়া হয়। আসলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ঐ ২০০৫এর ডব্লিউটিওএর সাথে ভারত সরকারের চুক্তি। যার মধ্যে রয়েছে প্রথমে উচ্চশিক্ষা ও তারপরে গোটা শিক্ষাক্ষেত্রকেই আস্তে আস্তে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে যার শুরু হলো মাত্র। একদিকে কর্পোরেট স্বার্থে ও নির্দেশে রচিত হবে, পরিচালিত হবে শিক্ষানীতি। অন্যদিকে বর্নব্যবস্থাভিত্তিক ভারতীয় আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে শিক্ষা হয়ে উঠবে উচ্চবর্নের হিন্দুদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্ষেত্র(যদিও এখনো সেই বাস্তবতাই চলেছে)। কারণ এই ব্যবস্থায় উচ্চবর্নের হিন্দুরাই এই সমাজে আর্থিক ভেবে সবচেয়ে উপরের দিকে থাকা অংশ। গৈরিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ প্রক্রিয়া সাফল্যের দিকে এগোবে আরো।

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আরেক সংঘ পরিবারের একনিষ্ঠ কর্মী সুব্রামনিয়াম স্বামীর নাম কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ভাবনাচিন্তা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শিক্ষার গৈরিকীকরণের দিকে আরেক সম্ভব্য ও মারাত্মক পদক্ষেপ। পুনে এফটিআইআইএর ছাত্ররা টানা ১৫০ দিন ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার পর, রিলে অনশন অনিদৃষ্টকালীন অনশন চালানোর পর আবার ধর্মঘট, অনশন তুলে নিলেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তাঁদের প্রতিবাদ জারী রয়েছে। নননেট ফেলোশিপ নিয়ে দিল্লি সহ সারা দেশের ছাত্রছাত্রীরা শুরু করেছেন অক্যুপাই ইউজিসি আন্দোলন। দিল্লির ইউজিসি অফিসের সামনে তাঁরা চালিয়ে চলেছেন অনিদৃষ্টকালীন অবস্থান। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বারবার আক্রমণ সত্বেও দমেনি আন্দোলন। এই ছবিগুলির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষৎএর আশা ও সম্ভাবনা। সেই আশা ও সম্ভাবনার জয় হবে নাকি জয় হবে গৈরিকীকরণের ও বেসরকারিকরণের আশঙ্কার তার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। আপাতত আমাদের কাজ ঐ আশা ও সম্ভাবনার মোর্চায় মাটি কামড়ে পড়ে থাকা।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.