মতিন বৈরাগী :: ‘সারাটি জীবন বিরুদ্ধতার ডালে’

Posted: নভেম্বর 15, 2015 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: গোলাম কিবরিয়া পিনু

matin-bairagi-7কবি মতিন বৈরাগীর জন্ম ১৬ নভেম্বর ১৯৪৬। এবছরের ১৬ নভেম্বর তাঁর ৭০তম জন্মদিন। তাঁর জন্মদিনের সময় পড়ছিলাম তাঁরই কবিতা সমগ্র গ্রন্থটি। এই গ্রন্থে ১০টি কাব্যগ্রন্থের কবিতা আছে, অনেক কবিতা একসঙ্গে পড়ে একজন কবির পরিচয় ভালোভাবে পাওয়া যায় একজন পাঠক হিসেবে। এই গ্রন্থটি বের হয় ২০০৮ সালে, তারপর আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছে তাঁর। তাঁর কবিতা সম্পর্কে এক ধরনের বিবেচনা আমার আগে থেকেই ছিল, তাঁর কবিতা পড়ছি বহুদিন হলো ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, আমার যে বিবেচনা স্থির হয়েছিল তাঁর কবিতা সম্পর্কে, সেই বিবেচনায় আরও কিছু বোধ পাঠক হিসেবে সম্পকির্ত হলো নতুনভাবে।

তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছেন, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত মূলভাবে সক্রিয় থেকেছেন এই ৭০ বছর অবধি একমাত্র কবিতায়। তাঁর কবিতাগ্রন্থগুলো হলো : বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন (১৯৭৭), কাছের মানুষ পাশের বাড়ি (১৯৮০), খরায় পীড়িত স্বদেশ (১৯৮৬), আশা অনন্ত হে (১৯৯২), বেদনার বনভূমি (১৯৯৪), অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি (১৯৯৮), অন্ধকারে চন্দ্রালোকে (২০০০), দূর অরণ্যের ডাক শুনেছি (২০০৫), স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার গল্প (২০০৭) এবং অন্য রকম অনেক কিছু (২০০৮)। এই ৮টি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে তাঁর ‘কবিতা সমগ্র’ গ্রন্থটি। এর পরবর্তী সময়ে আরও দু’টি কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছে, খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি (২০১২) এবং দুঃখ জোয়ারের স্রোতে (২০১৪)

তাঁর কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে. তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষের শৃংখল মুক্তির কথা ভেবেছেন, দৃঢ়ভাবে আন্তরিকভাবে ও বিশ্বাসের সাথে; তা শেষ অবধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে স্পষ্ট হয়নি বলে তার মধ্যে বেদনাবোধ জেগেছে। শুধু তাই নয়, এই বেদনাবোধের সাথে তাঁর আকাক্সক্ষা নির্মাণের পথে ভাঙনদ্বন্দ্বআপোষভুলও জড়িয়ে আছে। এইসবের বোধ তাঁর কবিতায় খণ্ডে খণ্ডে মূর্ত হয়েছে বিশেষভাবে, পাশাপাশি প্রকৃতিভালোবাসা ও মানুষ সম্পর্কিত বিবিধ দিকও কবিতায় ভাষা পেয়েছে।

একটা কবিতার উদাহরণ দিই, বিপ্রতীপ নামের কবিতা, লিখেছেন

কখনো রয়েছো খুব কাছাকাছি কখনো গিয়েছো দূর

কখনো হৃদয়ে হাহাকার তুলে বাজাও বিষাদ সুর

কখনো তোমার তিতিরের প্রাণ বনের মোহন সাজ

কখনে আনন্দ অমল আশারা বিবেকের কারুকাজ

মতিন বৈরাগী ছন্দ ও মিলবিন্যাসে উল্লিখিত কবিতাটি রচনা করলেও এই আঙ্গিকের কবিতা তিনি খুব বেশি লেখেননি। তাঁর বেশির ভাগ কবিতা রচনা করেছেন গদ্যে, আর কখনো কখনো ছন্দের দোলা দিয়ে এক ধরনের স্পপন্দনও তিনি সৃষ্টি করেছেন। কবিতায় অন্যান্য শিল্পশর্তও পূরণ করেছেন। উপমাউৎপ্রেক্ষা ও বিভিন্ন অলংকারের সাজুয্যেও কবিতা রচনা করেছেন তিনি।

তিনি মানুষের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, এইভাবে

অবশেষে কী থাকে একজন পতিত মানুষের!

হাতের আঙুলে লেগে থাকা কিছু ধুলো

কয়েকটা খুচরো পয়সা

চেনা মানুষের অচেনা কিছু মুখ

আরো কিছু অসুখবিসুখ।

(টুকরো কবিতা ০২)

উল্লিখিত কবিতার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির বেদনাবোধ ও পরাজয়ের অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। এরকম অনেক কবিতা পাঠককে নিয়ে যাবে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জগতে, সেই জগৎ মনে হবে তার একান্ত জগৎ। এইভাবে পাঠকের অভিজ্ঞতার রসায়নও হয়ে ওঠে কবির কবিতার ভিত্তি রচনার মূলরস।

সংবাদ শিরোনাম নামের কবিতার মধ্যে দিয়ে উত্তবঙ্গের মঙ্গার বেদনা উচ্চকিত করেন

লবণ দিয়ে কচু খাও

মরে যাও রাত্রিটা পোহাবার আগেই

তবুও বাড়াও না হাত বিত্তের পাহাড়ে

আওয়াজ তোল না, হিংসায় হিংস্রতায়

দুই চোখে জ্বালাও না বারুদ।

এই কবিতায় যেমন আর্তস্বর আছে, তেমনি আছে জেগে না ওঠার আকুতি। এখানে কবি সরাসরি বেদনাবোধ থেকে অনেকটা উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, কেন মানুষ বঞ্চনার মধ্যে থেকেও চুপচাপ থাকবে, নিথর থাকবে!

কবি মতিন বৈরাগীর আশা অনন্ত হে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার শিরোনাম একজন মানুষের প্রতি। এই কবিতাটি একটি দীর্ঘ কবিতা, ১৬৪ লাইনের কবিতা। এরকম দীর্ঘ কবিতা তাঁর আরও আছে। কিন্তু এই কবিতাটিতে কবির স্বপ্নবান মানুষের ছবি আছে, পাশাপাশি আছে দোলাচল চিত্তের আপোষকামী মানুষের মুখ, আছে এভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট। আলোআঁধারের রং আর স্বপ্নের দোলায় এবং প্রতিকী ব্যঞ্জনা ও চিত্রকল্পে চেতনার বিভিন্ন অভিঘাতে এই কবিতাটি কবির কাব্য স্বভাবের বিশেষ উদাহরণ হয়ে আছে।

আজ রাতে আকাশে চাঁদ নেই আর

পৃথিবীও অন্ধকার

আমার চোখের গহ্বর থেকে হেঁটে আসছে স্মৃতির শব্দ, গান

নানা ভঙ্গির মানুষ

এভাবে এক ধরনের নাটকের পর্দা তুলে বহু দৃশ্যের ছবি এই কবিতায় এক এক করে উন্মোচন করেন কবি। বলেন আরও

দ্বিখণ্ডিত মস্তক কর্তিত হাত পা বিচ্ছিন্ন আঙুল

কোন জেলের জালে ধরা পড়বে উপড়ানো চোখ মাছের মতন?

কবির এ জিজ্ঞাসা, তা পাঠককেও অনুরণিত করে। এই কবিতায় বিভিন্ন অনুষঙ্গ কবিকে বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে জাগিয়ে তোলে, সেই জাগিয়ে তোলার প্রেষণা পাঠকের মর্মে এসে পৌঁছে অবশেষে। কবি বলেন

মানুষ ববহৃত হয়ে হিম হয়ে গেছে

মানুষ কি হারিয়ে গেছে

কোথায় হারালো তার বীরত্ব সাহস?

কবির আরও প্রশ্ন

নিজেকে বদলাবে কে, কোথা সেই সাহসী পুরুষ?

সবাইতো বদলিয়েছে নিজেকে নিজেরাই যে যার মতো

তেভাগা থেকে তেলেঙ্গানা নাচোলের পরে নকশাল বাড়ি

কৃষকের মুক্তির মহা সংগ্রামে যারা প্রাণ দিয়েছিলো

তাঁরাও কি বদলে গেছে?

কবি তাঁর এক জীবনে বদলে যাওয়া মানুষের চারিত্র্য দেখে দেখে অনেকটা আহত হয়েছেন এবং আশাহতের জায়গায় থেকে বেদনাময় জিজ্ঞাসা উচ্চকিত করেছেন এই কবিতার পংক্তিতে। কবি মূল্যায়নও করেছেন বিপ্লবীদেরও, যারা ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে সুবিধে নিয়েছে পকেটে। তারা তো কবির উচ্চারণে এভাবে মূর্ত হয়েছে

যারা কেবল জানালা দিয়ে দেখেছে আকাশ

যারা রোদকে বলেনি রোদ মানুষকে মানুষ

আবার সময়ের টানে বিলীন হয়েছে নানা সুবিধার উৎসবে।

আর একারণে কবি তাঁর বোধ দিয়ে বলেন

জমাট বেঁধে থমকে আছে একালের সীমাহীন অন্ধকার।

কবি এসমাজের বৈষম্য আর বিভিন্নমুখী কষ্টবোধ নিয়ে অনেকটা অভিমান করে এক ধরনের বিপরীতমুখী উচ্চারণে আমাদের চেতনার উন্মীলন ঘটাতে আগ্রহী। ‘চাই নির্বাসন’ কবিতায় তিনি বলেন

ঝরুক আগুন বৃষ্টি,

মাটি পুড়ে যাক,

ক্লান্তিরা নুয়ে এসে মিশে যাক মাটিতে পাথরে পর্বতে

অনন্ত দুঃখের দেশের জলন্ত রেণুরা এসে গিলে ফেলুক

একটি মানুষের সুষম হৃদয়।

এ রকম এক নির্বাসনে আজকাল যেন যেতে ইচ্ছে করে।

কবি মতিন বৈরাগী তাঁর ‘কবিতা আমার’ কবিতায় প্রকৃত কবির মতই অপূর্ণতার কষ্ট নিয়ে বলেছেন

সারাটি জীবন বিরুদ্ধতার ডালে

ছিলাম দাঁড়িয়ে এবং এখন হালে

বৈরী হাওয়ায় ঝরছে ধুলোর ধরা

কবিতা আমার হলো না স্বয়ম্ভরা

কবি মতিন বৈরাগী আমাদের অনেকের পরিচিতজন, কবি ও প্রিয় মানুষ। তাঁর ৭০তম জন্মদিন, আমাদের কাছেও আনন্দের। অন্যদিকে কবি হিসেবে দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা ও তাঁর কবিতার মূল্যায়ন, আমাদের সময়কালের নিরিখে বিবেচনারও দাবী রাখে। কোনো সমালোাচক আরও গভীরতায় তাঁর কবিতা মূল্যায়ন করবেন সেই আশা আমরা করতে পারি।

———————————

. গোলাম কিবরয়া পিনু :: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s