লিখেছেন: মহসিন শস্ত্রপাণি

matin-bairagiদীর্ঘদিন ধরে পথচলার সাথী কবি মতিন বৈরাগীর সত্তর বছরে যাত্রা উপলক্ষে অজস্র শুভেচ্ছা জানাই। তিনি পৃথিবীর আলোহাওয়ায় নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ মেলে তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়েছিলেন বরগুনার লাকুরতলা গ্রামে, ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর। তিনি কবিতাপ্রেমে একগ্রতার সাথে মগ্ন আছেন কৈশোরকাল থেকেই এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় মগ্ন থাকবেন। অন্য কোনো বিষয়ে তাঁর প্রেম এতো গভীর ও অনড় নয়। জীবনের নানা আঘাত ও সংকটে তাঁর কবিতাপ্রেম এতোটুকু টলেনি। দুএকটা ছোট গল্প ও সামান্য কিছু গদ্য রচনায় মন দিলেও কবিতাই তাঁর সব। কবিতার সঙ্গে জীবনযাপনে তাঁর যতো সুখ, যতো আনন্দ।

কবিতা সাধনায় মতিন বৈরাগীর মূল মন্ত্র সমাজ বদলের ও জনগণের মুক্তির সংগ্রাম। অনেকের মতোই তাঁর চেতনায়ও কবিতার ভাষায় আত্মপ্রকাশের আকুতি জেগেছিল কিশোর বয়েসেই। তবে, সেআকুতি প্রকাশের ভাষা আয়ত্তে আসার পূর্বেই তাঁর পরিচয় হয় জনগণের মুক্তি ও সমাজ বদলের সংগ্রামের বৈজ্ঞানিক মতাদর্শের পতাকাবাহী কর্মীদের সঙ্গে। সেই সূত্রে শুরু হয় তাঁর ওই মতাদর্শ জানার বোঝার অবিরাম অনুশীলন। শ্রেণীভেদ, শোষণবঞ্চনা ও পীড়ন, অনাচারঅসঙ্গতি, লোভঘৃণাক্রোধ এইসব সমাজবাস্তবতার অভিঘাতে তাঁর কিশোর চেতনায় যেসব স্পষ্ট ও প্রচ্ছন্ন প্রশ্ন জেগেছিল, সে সবের জবাব সন্ধানে শুরু হয় তর্ক ও অধ্যয়ন, আলোচনা ও পুনরালোচনা। একই সঙ্গে চললো যেসব প্রশ্নের জবাব গ্রহণযোগ্য মনে হলো সে সব আর যেসব নিয়ে সংশয় থেকে গেলো তা সব নিয়ে কবিতার ভাষায় উপমায়উৎপ্রেক্ষয়চিত্রকল্পে, কথা ও কাহিনী বর্ণণায় প্রকাশের বিরামহীন চর্চা।

কবিতাঅঙ্গে প্রতিস্থাপিত তাঁর এই মানসপ্রতিচ্ছবি তর্ক ও অধ্যয়ন থেকে খুঁজে পাওয়া এবং জবাব নাপাওয়া প্রশ্নবিষয়ে সংশয় আর সেই সাথে সমাজবাস্তবতার অভিঘাতে চেতনা বিদীর্ণ করা বেদনাবোধ ও ওই বোধসঞ্জাত ঘৃণাক্রোধক্ষোভ ও দ্রোহাত্মক উচ্চারণ কাব্যকলার নান্দনিক শর্ত পূরণ করছে কিনা তা যাচাই করার সুযোগ তিনি পেলেন কবিলেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠন উন্মেষএ যোগ দিয়ে। পেয়ে গেলেন তাঁর কাব্যানুশীলনের পথসঙ্গীদের, যাদের মধ্যে দুজনের নাম অবশ্যই উল্লেখ্য। একজন অকাল প্রয়াত কবি সমদ্র গুপ্ত এবং অন্যজন কবি মুনীর সিরাজ। তাঁদের সাথে একত্রে আরো শক্ত মুঠিতে আঁকড়ে ধরলেন মতাদর্শের ও অঙ্গীকারের পতাকা। মতিন বৈরাগীর কাক্যকৃতি অথবা ‘উন্মেষ’এর পরিচর্যায় যারা বেড়ে উঠেছেন তাদের কবিতা অথবা অন্য কোনো কৃতি বোঝার জন্যে ওই মতাদর্শ ও অঙ্গীকারের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। নইলে মতিন বৈরাগী কিংবা ‘উন্মেষ’এর অন্য কারো সৃষ্টি বিচার বা অনুধাবন সম্ভব নয়। আর একথাও স্মরণ রাখা জরুরি যে, মতাদর্শগত দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকারের দাবি ‘উন্মেষ’ কখনো কারো ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেনি প্রত্যেকেই আপন অনুভব ও উপলব্ধির নির্দেশেই চর্চা চালিয়েছেন। মতিন বৈরাগীর বেলায়ও সে কথা সত্য। সফলতাঅসফলতা অনেকগুলো শর্তের ওপর নির্ভর করে। সে সবের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা এবং মেধা ও মনন চর্চায় কালের আনুকূল্য আর সামাজিক পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষভাবে বিবেচ্য। সম্মিলিত চর্চা ও পরিচর্যা ছাড়া ব্যক্তিসত্তার বিকাশ পূর্ণতা পেতে পারে না সেটা যে রূপেই হোক। নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শে সংগঠিত রূপে হোক কিংবা সতীর্থদের আড্ডা রূপেই হোক। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মতিন বৈরাগী এবং অন্যরা ‘উন্মেষ’এ সে পরিচর্যা পেয়েছেন ও অন্যকে দিয়েছেনও ঠিকই, কিন্তু প্রত্যাশিত কালের আনুকূল্য ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা তাঁরা পাননি। তা না পেয়ে হতাশ হয়ে তাঁরা হাতের কলম ফেলে দেননি উজান স্রোতে দাঁড় টেনেই চলেছেন।

কবিতাপ্রেমে নিবেদিত কবি মতিন বৈরাগীর কবিতার প্রধান সুর বেদনাতাড়িত ক্ষোভ ও বিষণ্নতা। তবে তা মোটেও হতাশাসঞ্জাত নয়। প্রত্যাশা পূরণ নাহবার বেদনা তাঁকে বিষণ্ন করে ঠিকই, তবে চেতনায় হতাশার অধিকার কায়েম তিনি প্রতিহত করেন সচেতনভাবেই। যে কোনো কবির মতোই তাঁর চেতনাও সাধারণের চেয়ে অধিক মাত্রায় স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। মানুষের বেদনা, কান্না, হাহাকার কবির চেতনায় তো প্রতিধ্বনি তুলবেই। কিন্তু কবি মতিন বৈরাগী হতাশাবাদী নন, আশাবাদী ও প্রতিবাদী। তাই এই বিষণ্নতার কালেও কবি দ্বিধাহীন। তাঁর কবিতায় বেদনা ও বিষণ্নতাকে অতিক্রম করে জেগে ওঠে ক্ষোভ, ক্রোধ, ঘৃণা ও দ্রোহের উচ্চারণ। তিনি তাঁর বিশ্বাসের কথা, আশার কথা এবং স্বপ্নের কথা বলেন স্পষ্ট ভাষায় ও দৃঢ়তার সাথে নিসংশয়ে। এমন কি, কিছুটা অহংকারের ভাষায় কবি বলেছেন আমার বিশ্বাস সমাজতন্ত্রে। তাতে তাঁর কবিতার পাঠক সীমিত হয়ে যাবে কিনা সে ভাবনা তাঁকে বিচলিত করে না। পাঠকপ্রিয়তার লোভে আসঙ্গলিপ্সা ও যৌনতার কাছে নিজেকে কখনোই সমর্পণ করেননি তিনি।

দীর্ঘ কবিতার প্রতি বৈরাগীর বিশেষ টান আছে। তাঁর দীর্ঘ কবিতাগুলোতে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে প্রাঞ্জল ভাষায়, গদ্য ছন্দে। অলংকারের বাহুল্য নেই। তবে, লাগসই উপমা ও চিত্রকল্প দীর্ঘ কবিতাকে ব্যঞ্জনাময় করেছে অবশ্যই। তাঁর দীর্ঘতম কবিতা অন্তিমের আনন্দধ্বনি এক কবিতাতেই এক গ্রন্থ। আমাদের কালে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। এ কাব্যে বর্তমান ও অতীত ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শন প্রসঙ্গ, যুদ্ধ ও দখল, রাজনীতি ও নেতৃত্ব, বীরত্ব ও কাপুরুষতা, প্রকৃতি ও প্রতিবেশ, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ইত্যাদি প্রসঙ্গ দুই চরিত্রের কথোপকথনের মধ্যদিয়ে বর্ণিত। এর সাথে যদি প্রণয় ও বিরহ এবং বিলাপ ও শোকগাথা যুক্ত হতো তবে বোধহয় মহাকব্যর মর্যাদা পেত কাব্যখানি। অবশ্যই বিভিন্ন ছন্দে রচিত ধ্রুপদ মহাকাব্য’র তুল্য নয় টানা গদ্য ছন্দের আধুনিক মহাকব্য। এটি ছাড়াও তাঁর দীর্ঘ কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সক্রেতিস ক্রিতো সংলাপপলায়ন (খরায় পীড়িত স্বদেশ), মানুষের লাশ(বেদনার বনভূমি), গল্পপ্রাচীনের উপাখ্যান (অন্ধকারে চন্দ্রালোকে) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ‘গল্প’ বাদে বাকী ৪টি কবিতার প্রত্যক্ষ উৎসসূত্র আছে। ‘সক্রেতিস ক্রিতো সংলাপ’ ইতিহাসের কাহিনী নির্ভর। প্রাচীনের উপাখ্যানও তাই রোমের দাস বিদ্রোহের কাহিনীর একটা অংশ। পলায়ন একটি প্রকাশিত গল্প (কাশেম পালিয়ে গেলো / জনশ্রুতি) এবং মানুষের লাশ উন্মেষএর এক সাহিত্য সভায় পঠিত এক তরুণে গল্প অবলম্বনে। কিন্তু গল্প কবিতাটির তেমন কোনো উৎস সূত্র নেই আসাযাওয়ার পথে দেখা মাংসের দোকান কবিতা নির্মাণের উৎস সূত্র হিসেবে কাজ করেছে কবির চেতনায়। তেমনটা তো অন্য যে কোনো কবিতার বেলায় হয়ে থাকে। কিন্তু এই কবিতায় বর্তমানকালের রাজনৈতিকসামাজিক বিষয়ের যে কাব্যময় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়েছে তা কেবল এই কবির কবিতাগুলোর মধ্যেই নয় সমকালের কাব্য চর্চায়ও এক অনন্য নিদর্শন। কবিতাটি ঝরনাধারার মতো বেরিয়ে এসেছে কবির চৈতন্য থেকে এবং পূর্ণ রূপলাভ করার পরই উদ্ভাসিত হয়েছে তার রূপকের অর্থ ও ব্যঞ্জনা।

শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থে (একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৫) কবি মতিন বৈরাগী কবিতাপাঠকের সামনে উপস্থিত হয়েছেন কিছুটা ভিন্ন রূপে। অগ্রন্থিত কিছু কবিতার সঙ্গে কবি একত্রিত করেছেন ছয়টি কাব্য থেকে যেগুলোকে তিনি উৎকৃষ্ট মনে করেছেন। উৎকৃষ্ট কবিতা নির্বাচনে তাঁর বিচারবিবেচনার সাথে অন্য কোনো কাব্যবিচারক একমত নাও হতে পারেন। সেটা বড়ো কথা নয়। কবির নিজের বাছাই করা শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় কবি মতিন বৈরাগীকে যারা এতোদিন একভাবে চিনেছেন ও বোঝার চেষ্টা করেছেন তাদের কপাল হয়তো একটু কুঁচকাতে হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কবিতার নান্দনিকতা তাঁর কাছে ছিল পোশাকের মতো। শ্রেষ্ঠ কবিতার কিছু কবিতায় তা যেন আত্মা হয়ে উঠেছে। কবিতা নির্মাণের ধরণ বা কৌশল এবং কবির চিন্তা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে তা কি হয়? কবিতা বা যে কোনো শিল্প সম্পর্কে কখনোই শেষ কথা বলা যায় না। তবে একথা পষ্ট করেই বলা যায় যে, সমাজ বদলের চিন্তা বা মানুষের মুক্তির চিন্তা কবি মতিন বৈরাগী ত্যাগ করেননি।

তাঁর জীবন, সমাজ ও কাল অধ্যয়ন এবং কবিতা চর্চা আরো সমৃদ্ধ হোক, উৎকৃষ্ট হোক, ঊজ্জ্বল হোক সত্তর বছরে যাত্রায় এই কামনা করি। আর কামনা করি সুস্থসক্রিয় দীর্ঘ জীবন।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s