কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশ ও বৌদ্ধিক পশ্চাদপদতার প্রকল্প

লিখেছেন: শুভদীপ

non-net-fellowship-protest-1কিছুদিন আগে ইউজিসি চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন নন এনইটি (ন্যাশনাল ইলিজিবিলিটি টেস্ট নেট); অর্থাৎ জাতীয় যোগ্যতা পরীক্ষা উত্তীর্ণ না হওয়াদের ক্ষেত্রে গবেষণার কাজে বরাদ্দ স্কলারশিপ আর দেওয়া হবে না আর। অর্থাৎ গবেষণার কাজে স্কলারশিপ পেতে হলে থাকা জরুরি। এতদিন নন নেট এম.ফিল গবেষকদের মাসে ৫ হাজার টাকা এবং পি.এইচডি দের ক্ষেত্রে মাসে ৮ হাজার টাকা দেওয়া হতো; যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সেটিও আবার ছাঁটাই হচ্ছে। এমনিতে ২০১৫১৬ অর্থবর্ষে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হয়েছে ৬৯,০৭৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ শতাংশ। কিন্তু মাস দুয়েক আগে সেই বরাদ্দ থেকে ছাঁটাই হয়েছে আবার তিন হাজার কোটি টাকার মতো। এই অর্থ মূলত বরাদ্দ করা হয়েছিল আইআইটি, এনআইটির পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য এবং আরও ৭টি আইআইটি গড়ে তোলার জন্য। এই ছাঁটাইয়ের ফলে এনআইটিতে ফি বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশের মতো।

অন্যদিকে, এই কর্পোরেট প্রেমী মোদি ইউজিসির বরাদ্দ কমিয়েছে ৩২ শতাংশ এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন এন্ড রির্সাচ (আইআইএসইআর)’এর বরাদ্দ কমিয়েছে ২৫ শতাংশ। সার্বিকভাবে আগের বছরের বাজেটের তুলনায় এ বছর শিক্ষাখাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো ছাঁটাই করা হয়েছে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছাঁটাই এবং কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশের পথ প্রশস্ত করার প্রবণতা নতুন কিছু নিয়। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এর চলন। আসলে ঔপনিবেশিক শক্তি যেমন স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তির উপর কব্জা করতে চাই, তেমনি জ্ঞানভাণ্ডারও নিজের মুষ্টিবদ্ধ করে রাখতে চায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতে সায়েন্স ন্ড রির্সাচ ছিল খুবই সীমাবদ্ধ; উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যতোটুকু প্রয়োজন ছিল ততোটুকুই চালানো হতো। স্বাধীন ভারতে এসে সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে বড় বড় কতগুলি গবেষণা কেন্দ্র খোলা হলেও তা কর্পোরেট পুঁজির দাসত্ব করে গেছে।

১৯৬৪ সালে কোঠারি কমিশন সুপারিশ করেছিল, শিক্ষাকে লাভজনক ক্ষেত্র হিসাবে দেখা উচিৎ না। পরবর্তী বি জি খের কমিশনের বক্তব্য ছিল জিডিপির ১০ শতাংশ শিক্ষাখাতে খরচ করা হোক। কিন্তু সমস্ত কিছুকে ডাস্টবিনে ফেলে বেসরকারিকরণের গতি বেড়েছে বহুগু.আর রাজেশ্বরীর রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সপিন্ডেচার ডাটা কালেকশন এন্ড রিলিভেন্ট ইস্যুজ প্রবন্ধে দেখা যাচ্ছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে বেসরকারি বরাদ্দ বেড়েছে ৪৮.৪২ কোটি থেকে ৬৩.৭৯ কোটি টাকা। বিষয়টি বেশ পরিষ্কার। এবার বর্তমান দশকের কথায় আসা যাক; রির্সাচ এন্ড ডেভলপমেন্ট খাতে ভারতে খরচ করা হয় বাজেটের শূন্য দশমিক ৯ শতাংশঅন্যান্য দেশের মধ্যে রাশিয়া খরচ করে ১.১২ শতাংশ, ব্রাজিল ১.২৫ শতাংশ এবং চীনের ক্ষেত্রে ১.৮৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, যা মোট জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ হওয়া দরকার। (ন্যাচার ডট কম) এই বিশাল ঘাটতি ঢাকার জন্য দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো রির্সাচ এন্ড ডেভলপমেন্ট খাতে সরকার ১ শতাংশ ব্যয় করবে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে বিনিয়োগ করবে ১ শতাংশ

non-net-fellowship-protest-2এছাড়াও ইউজিসি চেয়ারম্যানের নন নেট স্কলারশিপ বন্ধের পিছনে যে মেধার যুক্তি দিচ্ছেন; নেট না পাশ করলে স্কলারশিপ মিলবে না। সেটি আদতে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের গবেষণা ক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার এবং জ্ঞানকে পুঁজির কুক্ষিগত করে রাখার প্রচেষ্টা ভিন্ন কিছু নয়; তা প্রমাণ হয় রিচার্ডা ফন নুরডেনের সমীক্ষা থেকে সেখানে দেখা বলা হয়, প্রতি ১০ হাজার জন জীবিকা নির্বাহীর মধ্যে ভারতে ৪ জন গবেষণা ক্ষেত্রে আসেন, যা রাশিয়া বা আমেরিকার ক্ষেত্রে ৫৮ এবং ৭৯ জন। অন্যদিকে, ভারতে গবেষণার আউটপুটের দিকে নজর দিলে সরকারের সব ঢাক ফেঁসে যায় ২০১৩ সালে সাউথ কোরিয়া পেটেন্ট ফাইল করেছে ৪ হাজার চারশোটি, আমেরিকা নয় শো দশটি, চীন পাঁচশো একচল্লিশটি, ভারতের সংখ্যা সেখানে সতেরো। কাছাকাছি থাকা দেশ বলতে অর্থনৈতিকভাবে জর্জরিত ব্রাজিল, যদিও তাদের পেটেন্ট সংখ্যা ভারতের দ্বিগুণ ৩৪টি। প্রতিবছর ভারতে ‘নেট’ নামক গবেষণার জন্য বাছাই করার পরীক্ষা হয় বছরে দুবার। এই পরীক্ষার ব্যাপারটা অনেকটা হাতিগরুঘোড়াবাঘকে বট গাছে চড়ে যোগ্যতা প্রমা করতে বলার মতো। বছরের পর বছর গবেষণাকে সঙ্কুচিত করে এক জায়গাতে রাখতে এই পরীক্ষাটি সফল। সুতরাং, নেটপাশ করলে তবে স্কলারশিপ পাওয়া যাবে এই বক্তব্য রেখে, মেধার নাম করে শিক্ষার অধিকার হরণ করা ছাড়া আর কিছুনা। এই ভাঁওতাবাজির বাইরে চোখ ঘোরালে দেখি; ভারতের অন্যতম গবেষণা কেন্দ্র সিএসআইআরএর ৩৫টি গবেষণাগারের মধ্যে ২৫টিতে স্থায়ী পরিচালক নেই। দিল্লিসিএসআইআর সদর দফতরেস্থায়ী পরিচালক নেই। এমনকি গবেষণার জন্য গবেষক ছাত্রছাত্রীরা ন্যূনতম সুযোগসুবিধাও পাইনা। গবেষণার সুবিধার জন্য বিদেশ ভ্রমণে যেতে চাইলে বা কোনো সেমিনারে যোগ দিতে চাইলে কোনো প্রকার সরকারি সুবিধা তারা পা না। আসলে পরিকাঠামোঅর্থ বরাদ্দ কমিয়ে গবেষণা ক্ষেত্রকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার একটি পর্দা এই নেট নামক ধাপ্পাবাজি এবং ইউজিসির নতুন নিয়ম। মেধা নিয়ে প্রচুর কচকচানি আবার ফাঁপা হয়ে পড়ে এবং আসল চেহারা সামনে এসে পড়ে যখন দেখা যায় ৫ বছরের ডক্টরেট প্রোগ্রাম শেষে পোস্ট ডক্টরেট করার সময় প্রায় ৮২ শতাংশ মেধা পাচার হয় বিদেশে।

non-net-fellowship-protest-3আগামী ডিসেম্বরে লাইবেরিয়াতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও)এর সম্মেলন। দালাল মোদির প্রভুরা বসে থাকবেন উপহারের আশায়। ভক্ত মোদিও উপহার তৈরি করে ফেলেছেন অনেকগুলি কৃষক শ্রমিকবিরোধী আইন, গেরুয়াকরণ এবং সর্বপরি নন নেট ফেলোশিপ বন্ধ করে গবেষণা ক্ষেত্রকে সংকুচিত করা কর্পোরেটের দাপট বৃদ্ধির রাস্তা প্রশস্ত করা। আর আমাদের সামনের দিন জোর লড়াই। এই লড়াইটা সবার, কারণ শিক্ষা বাজারে কেনাবেচার জিনিস না আমাদের অধিকার । এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার মানুষের হাজার হাজার বছরের শ্রমের দান। বিশ্বের শিক্ষাক্ষেত্র জুড়ে কর্পোরেট হাঙরদের দাপট চূর্ণ করে এগিয়ে চলা চিলির এবং আফ্রিকার ছাত্র আন্দোলনই দিশা দেখাচ্ছে আমাদের। বিশ্বজুড়ে চলা ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে কর্পোরেট প্রভুদের কথিত আচ্ছে দিন রুখে দিয়ে, দেশের মেহনতি জনগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকৃত আচ্ছে দিন নিয়ে আসার লড়াই জারি রয়েছে।

লেখক :: ছাত্র সংগঠন ইউএসডিএফএর কর্মী (পশ্চিমবঙ্গ)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s