লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

Bajrangi-Bhaijanগত ১৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে ভারত সহ সারাবিশ্বে মুক্তি পেয়েছে কবির খান পরিচালিত ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। মুক্তির পরপরই সিনেমাটি বিরাট সাফল্যের মুখ দেখেছে, বলিউডের সিনেমার ইতিহাসে বেশ কয়েকটি রেকর্ড ভঙ্গের দিক থেকে প্রথম অথবা দ্বিতীয় স্থানে নাম লিখিয়েছে। চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকায় অভিনয়কারী প্রখ্যাত ভারতীয় অভিনেতা সালমান খান সিনেমার প্রযোজক। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ সব স্থানেই দর্শকবৃন্দ চলচ্চিত্রটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভারতপাকিস্তান সম্পর্ককে ঘিরে কাহিনী আবর্তিত হওয়ায় দৃশ্যমান ঘটনাবলির অন্তরালে এর নিগূঢ় রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকের কাছে ভিন্নমাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছে। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন।

চলচ্চিত্রের কাহিনী হলো মোটামুটি এ রকম

পাকিস্তানঅধিকৃত কাশ্মীরের এক পার্বত্য গ্রামাঞ্চলে ৮৯ বছরের বাচনপ্রতিবন্ধী শিশু শাহিদাকে (হর্ষালি মালহোত্রা) তার মা দিল্লিতে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরবারে নিয়ে যান আরোগ্যের উদ্দেশ্যে। ফিরতি পথে রাতের বেলা ভারতীয় ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যাত্রাবিরতি করলে ঘুম থেকে জাগ্রত শাহিদা ট্রেন থেকে নেমে মেষশাবকের সাথে ক্রীড়ায় মত্ত হলে ট্রেন ছেড়ে দ্যায় এবং শাহিদা ট্রেনে উঠতে ব্যর্থ হয়। স্থানটি ভারতপাকিস্তান সীমান্তবর্তী হরিয়ানা প্রদেশের অন্তর্গত কুরুক্ষেত্রের নিকটবর্তী। কুরুক্ষেত্রে তার দেখা হয় জনৈক হনুমানভক্ত পবন কুমারের (সালমান খান) সাথে। মহৎহৃদয় যুবক পবন, যিনি সিনেমায় পরিচিত হন ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ হিসেবে, মূক বালিকাটির পিতৃমাতৃহীন অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে নিয়ে হাজির হন হবু শ্বশুরের বাড়িতে। কিন্তু শাহিদা মুসলমান, তদুপরি পাকিস্তানি এই সত্যটি বাড়িতে প্রকাশ হয়ে পড়লে সেখানে তার জায়গা হয় না। বৈধঅবৈধ কোনো পথে সুবিধা করতে না পেরে পবন কুমার নিজেই শাহিদাকে নিয়ে রওনা হন ভারতপাকিস্তান সীমান্তের উদ্দেশ্যে। অবৈধভাবে সীমানা পাড়ি দিতে গিয়ে পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। তার সত্যনিষ্ঠা, সততা এবং উদ্দেশ্যের প্রতি অনড় প্রত্যয় দেখে পরাভূত হন বাহিনীর প্রধান। তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর অনেক চড়াইউৎরাই পার হয়ে, এক পাকিস্তানি টেলিভিশন সাংবাদিকের (নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী) সহায়তায় শাহিদাকে শেষাবধি আজাদ কাশ্মীরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এর মধ্যে পবন কুমারকে তার সত্যনিষ্ঠতা ও শাহিদার প্রতি কর্তব্যবোধের কারণে আবারও বিপদে পড়তে হয়, শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছেও ধরা পড়ে যান তিনি। অবশেষে ভারতপাকিস্তান দুই দেশেই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে পুলিশের বড়কর্তা তাকে মুক্তি দিতে মনস্থ হন। পবন সীমান্ত পার হওয়ার সময় উভয় দেশের বহু নাগরিক সীমান্তে জড়ো হয়। তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল শাহিদাও। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার মুহূর্তে কণ্ঠে ভাষা খুঁজে পায় সে, ‘জয় শ্রীরাম, মামা’ বলে ডেকে ওঠে পবন কুমারকে।

আপাতত এই হলো সিনেমার কাহিনীর অতি সংক্ষিপ্ত বয়ান। একেবারে মধুরেণ সমাপয়েৎ, ইংরেজিতে যাকে বলে win-win situation, এ হলো তাই। একটি শিল্পকর্ম হিসেবেও সিনেমাটি উপভোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। সালমান খান আর হর্ষালি মালহোত্রার অভিনয়দক্ষতাও অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইতোমধ্যে চলচ্চিত্রবোদ্ধারা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’কে সালমান খানের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এখানে যখন ভারতপাকিস্তান সম্পর্ক, সীমান্ত, কাঁটাতার, পবন কুমারের পরিচয় প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে সেখানে শুধু বিনোদনের উপাদান হিসেবে না দেখে এই সিনেমার পেছনের রাজনীতিটাকে উন্মোচন করার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে মন। সিনেমাটি যখন নির্মিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে তখন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান, প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়গুলোও সামনে চলে আসে। এই সব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নেয়া ছাড়া এই সিনেমার বক্তব্যের গূঢ়ার্থ উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না।

অতীতে ভারতপাকিস্তান সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বলিউডে ‘গাদার’, ‘বর্ডার’, ‘মিশন কাশ্মীর’, ‘কেয়ামত’ সহ যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সেখানে পাকিস্তানকে এক শত্র“রাষ্ট্র হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে। সিনেমাগুলোর ভাষা ছিল আক্রমণাত্মক, খলনায়ক হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং তার প্রতিনিধিগণ। এই ধরনের চলচ্চিত্র তখন ভারতবাসীর মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের পালে হাওয়ার যোগান দিত বেশ করে। পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ভারতমাতাকে রক্ষার পবিত্র প্রত্যয়ে উদ্দীপিত করত জনতাকে। সেদিক থেকে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’এর বক্তব্য, তার কাহিনী উপস্থাপনের আঙ্গিক অনেকটাই যেন সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতাপূর্ণ। পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, সাংবাদিক, কিংবা পুলিশের বড়কর্তা এখানে উপস্থিত হন মানবিক চরিত্র নিয়ে। পাকিস্তানি কাশ্মীরের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত লোকজন যখন ভারত প্রসঙ্গে কথা বলেন তখন তাদের মুখে একটি বিরূপ মন্তব্যও শোনা যায় না। মনে হতে থাকে ভারতপাকিস্তানে নাগরিক ও রাষ্ট্রপর্যায়ে বোধহয় বন্ধুত্বের সুবাতাস বইছে নিকট অতীতের সকল বৈরিতা ভুলে। আসলেই কি তাই? ভারত রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান কিংবা তৎপরতা কি সে কথাই বলে?

সমগ্র এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রণনৈতিক লক্ষ্য, ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে তার নড়বড়ে অবস্থানের দরুন সামরিক স্থাপনা ও মনোযোগ এই অঞ্চলে সরিয়ে এনে এখানে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের যে প্রকল্প, তার পথে প্রধান অন্তরায় হলো চীন। বিশাল ভূখণ্ড ও জনসংখ্যাবিশিষ্ট চীন বর্তমানে শুধু এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্বে অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পথে। অন্যদিকে এশিয়ায় ভারত এখন চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও সামরিকঅর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত এখনো চীনের সমকক্ষ হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হয় নি, কিন্তু তার পরাশক্তি হওয়ার আকাক্সক্ষা ও প্রবণতাকে হিসেবের মধ্যে নিতে হচ্ছে চীনকে তার নিজের স্বার্থে। দক্ষিণ চীন সাগর তো বটেই, ভারত মহাসাগরের ধারে অবস্থিত মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান প্রভৃতি রাষ্ট্রের সমুদ্র বন্দরে নিজের অবস্থান সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে চীনের লক্ষ্য হচ্ছে ভারতকে সমুদ্রপথে চারিদিক থেকে ঘেরাও করা। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে ভারতচীনের ‘শীতল যুদ্ধ’ বেশ ভালোভাবেই দেখা গেছে শ্রীলঙ্কার নির্বাচন উপলক্ষ্যে। চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে প্রেসিডেন্ট মহিন্দ রাজাপাকষেকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে তামিল বিদ্রোহ দমনে ‘সফল’ বিবেচিত রাষ্ট্রনায়ক রাজাপাকষের গত ফেব্র“য়ারির নির্বাচনে ভাগ্যবিড়ম্বনার কারণ হিসেবে ভারতের পক্ষপুট থেকে তার সরে যাওয়ার প্রবণতাকে দায়ী মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে মালদ্বীপের ক্ষমতাকেন্দ্রে দুই পক্ষের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে উঠেছে তার পেছনেও রয়েছে ভারতচীন লড়াইয়ের প্রচ্ছন্ন আভাস। কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ অথবা ভুটানে চীনের দূতাবাস স্থাপন নিয়েও রয়েছে দুটি দেশের দ্বন্দ্ব। এশিয়াতে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বড় শত্র“’ চীনের হস্তক্ষেপকে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থগত সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একচেটিয়া আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ যুক্তরাষ্ট্র এতদঞ্চলে ভারতের আধিপত্যকামী ভূমিকাকে মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে বারাক ওবামার ভারত সফর দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করে ভারতযুক্তরাষ্ট্রের যৌথ পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

ভারত এখন আর দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে না। ভারতীয় শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা মনে করেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রয়েছে এক ‘অভিন্ন স্বার্থ’ এবং সেই স্বার্থ হলো ভারতীয় বড় পুঁজির স্বার্থের ছাঁচে ঢালাই করা। ভারত তাই আর দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রাষ্ট্রের শত্র“ নয়, সে হলো এতদঞ্চলের অভিভাবকস্বরূপ। বিগত পাঁচ দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী যদি কোনো রাষ্ট্রকে বলা যেতে পারত সেটা হলো পাকিস্তান। অন্য কোনো রাষ্ট্রই সে অর্থে ভারতের প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্চ করে সেভাবে কখনো দাঁড়ায় নি। এই সময়কালের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের সাথে তিনটি প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়ে। সেই পাকিস্তানের পথহারানো মূক বালিকা শাহিদাকে তার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, তার মুখে ভাষা যোগানোর দায়িত্ব নিচ্ছেন ভারতীয় হনুমানভক্ত যুবক পবন কুমার। সত্যই বটে, পাকিস্তানই যদি এখন ভারত রাষ্ট্রের দেখানো পথে চলতে বাধ্য হয়, তার মুখের ভাষায় কথা বলে তখন দক্ষিণ এশিয়ার অবশিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কোন ছার। বাস্তবিক সেটাই হচ্ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, সামরিকবেসামরিক আমলা ও পদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, র‌্যাববিজিবিএনএসআইডিজিএফআই প্রধানদের মুখের কথা শুনলেই বোঝা যায় তারা আজ কাদের ভাষায় কথা বলছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যত্রও ভারতবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো হয় ক্ষমতা থেকে অন্তর্হিত, অথবা নিজেদের পিঠবাঁচানোয় ব্যস্ত আছে।

কেবল এটুকুই সব নয়। ভারতীয় বড় পুঁজি বহু আগে থেকেই সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তৎপর রয়েছে। এই প্রয়োজনে সে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে সাধ্যানুযায়ী পরিবর্তন আনছে, ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার করছে বিভিন্ন দেশের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর বিন্যাস। কিন্তু ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে সে দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা লাভ করেছে এক নতুন মাত্রা। বিজেপি হলো ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও চরম প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) পরিবারের সদস্যভুক্ত রাজনৈতিক দল। আরএসএসএর আদর্শের অনুগামীদের বাছাইকৃত অংশ বিজেপির শীর্ষপদগুলো অধিকার করে আছেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষিতে আরএসএসএর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর তৎপরতাও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। সম্প্রতি আরএসএসএর উৎসাহী সমর্থক রাজনৈতিক নেতাদের পৌরোহিত্যে শুরু হয়েছে ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ভারতের মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করা। আরএসএসএর নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী ভারত হলো ‘হিন্দুদের দেশ’ এবং অন্যান্যরা হয় বহিরাগত নাহয় পুরুষানুক্রমে ধর্মান্তরিত। সুতরাং হয় তাদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘ঘরে ফিরতে’ হবে, নাহলে বিতাড়িত অথবা খুন হয়ে যেতে হবে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তাই দেখা গেল অহিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানত মুসলিমখ্রিস্টানদের বাসস্থান, মসজিদগির্জা প্রভৃতি আক্রান্ত হচ্ছে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী, মিডিয়া, রাজনৈতিক নেতানেত্রীগণ এসব কর্মকাণ্ডের সাধ্যমতো বিরোধিতা করে এলেও ভারতের বৃহৎ পুঁজির আশির্বাদপুষ্ট হিন্দুত্ববাদী আদর্শ, এর প্রচারক সংগঠন ও ক্ষমতাকাঠামোর কাছে তারা অসহায়।

কিন্তু শুধু বর্তমানেই নয়, ২০০২ সালে গুজরাটের আহমেদাবাদে যে দুই সহস্রাধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিল তার পেছনেও ছিল আরএসএসএর ‘হিন্দু ভারত’ গঠনের ঘৃণ্য চক্রান্ত। ঐ মুসলিমনিধনযজ্ঞের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন বাবুভাই প্যাটেল, যিনি ‘বাবু বজরঙ্গি’ হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে গুজরাটে ৯৭ জন মুসলমানকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই বাবু বজরঙ্গি হলেন আরএসএসএর ভাবাদর্শে গঠিত জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরঙ্গ দলের নেতা। উল্লেখ্য, এই বজরঙ্গ দলও সংঘ পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বজরঙ্গ দলের একটি ঘোষিত লক্ষ্য হলো অযোধ্যায় রামমন্দির, মথুরায় কৃষ্ণমন্দির এবং বানারসে বিশ্বনাথ মন্দির নির্মাণ করা। এরা প্রকাশ্যেই ভারতের মুসলিম, খ্রিস্টান সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী এবং বামপন্থী সহ অন্যান্য প্রগতিশীল শক্তিকে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক পরিচয়, যেটা হলো তাদের ভাষ্যমতে হিন্দুত্ববাদ ছাড়া আর কিছুই নয়, তার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। অনিবার্যভাবেই বজরঙ্গ দলের সকল প্রকার তৎপরতার লক্ষ্যবস্তু যে ভারতবর্ষের অহিন্দু জনগোষ্ঠী এবং হিন্দুত্ববাদবিরোধী প্রগতিশীল শক্তিই হবে তাতে আর সন্দেহ কী? এই বজরঙ্গ দলের নেতা হিসেবেই বাবু বজরঙ্গি ২০০২ সালে গুজরাটে উপর্যুক্ত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে তার একটি সাক্ষাৎকার গোপন ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি গুজরাট হত্যাকাণ্ডে তার অংশগ্রহণের কথা সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, উদ্ধতভাবে বলেছিলেন মুসলিমদের কোনো মোকাম তিনি অক্ষত রাখেননি, যাকেই হাতের কাছে পেয়েছেন কুপিয়ে অথবা পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। তার ভাষায়, ঐ ‘বেজন্মা’গুলো যেহেতু মৃত্যুর পর দগ্ধ হতে চায় না, এ জন্য জীবন্তদগ্ধ করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা তিনি করেছেন। তার এই কাজের জন্য তাকে যদি ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তাতেও তার আফসোস নেই, বরং ফাঁসির আগে হাতে দুইদিন সময় পেলেও ২৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ মুসলমানকে তিনি হত্যা করবেন। উল্লেখ্য, ঐ ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় তার নামে অভিযোগ দায়ের করা এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন। গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী (ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) নরেন্দ্র মোদী তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন।

পরবর্তীতে গোপন ভিডিওতে ধারণকৃত বাবু বজরঙ্গির স্বীকারোক্তির প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয় তাতে ২০১২ সালে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এই হলো বজরঙ্গ দলের প্রধান নেতার অবস্থা। তবে এ কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে, বাবু বজরঙ্গির উপর্যুক্ত অবস্থানকে একান্ত ব্যক্তিগত মনে করলে বড় ভুল করা হবে। এটা তাদের সমগ্র সংগঠন, সেই হিসেবে আরএসএসএরও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থান। এই আরএসএসএর মুখপাত্র হিসেবেই নরেন্দ্র মোদী ভারতের শীর্ষপদে আসীন হয়ে ইতিহাস, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুর মধ্যে হিন্দু ধর্মের ‘মাহাত্ম্য’ আবিষ্কার করে সেই মাহাত্ম্য প্রচারের নামে পক্ষান্তরে উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন সমগ্র জনগণের ওপর।

ওপরে যে বজরঙ্গ দলের কথা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো সেই দলের পরম পূজনীয় দেবতা বজরঙ্গ তথা হনুমানের একান্ত অনুগত সেবক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সিনেমার প্রধান চরিত্র পবন কুমারকে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রামায়ণের অন্যতম চরিত্র হিসেবে হনুমানকে দেবতা হিসেবে মান্য করার সাথে উগ্র সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কোনো আত্যন্তিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিচারে এটা বোঝা কঠিন নয় যে, একজন হনুমানভক্ত হিসেবে পবন কুমারকে সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, পরোপকারী ও মহানুভব যুবক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে একাধিকবারএর আসল লক্ষ্য হলো বজরঙ্গ দল তথা আরএসএসএর মতাদর্শকেই মহিমান্বিতরূপ ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। এহেন হনুমানভক্ত পবন যখন তার মহানুভবতার গুণ দিয়ে ভারতপাকিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের হৃদয় জয় করে পরম নিশ্চিন্তে ও অক্ষত অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন তখন আমাদের মনে না পড়েই পারে না বাংলাদেশভারত সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গত এক দশকে বিএসএফএর হাতে সহস্রাধিক বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা। মনে না পড়েই পারে না, সীমান্তে ২০১১ সালে নিরীহ বাঙালি কিশোরী ফেলানীকে হত্যা করে তার লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার কথা। আমরা ভুলে যেতে পারি না, ভারতের মাটিতে এক প্রহসনমূলক বিচারে ফেলানীহত্যাকারী বিএসএফসদস্য অমিয়কে আদালত কর্তৃক নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বলিউডি চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী আর অভিনয়ের শিল্পগুণে পাসপোর্টভিসাবিহীন পবনের ভারতপাকিস্তান সীমান্ত পাড়ি দেয়া দেখে দর্শক হাততালি দিয়ে ওঠেন, তাদের চোখে জল আসে শেষ দৃশ্যে শাহিদার মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ বোল ফোটা শুনে।

বজরঙ্গি ভাইজান’ চলচ্চিত্রের কাহিনী যতোই মর্মস্পর্শী হোক না কেন, যতোই অভিনন্দিত হোক সালমান খান, হর্ষালি মালহোত্রা, কিংবা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর অনবদ্য অভিনয়, এর অন্তরালের রাজনীতিটুকু উন্মোচন না করে কেবল আবেগে ভেসে গেলে আমাদের চলছে না। চলচ্চিত্রের রস সবটুকু আস্বাদন করেও আমাদেরকে বলতেই হচ্ছে, এই কাহিনী আসলে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যকামী শক্তি হয়ে ওঠার আখ্যান, এই চলচ্চিত্র বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কপালে মাহাত্ম্যতিলক অঙ্কনের এক শিল্পমণ্ডিত প্রয়াস।

(সংস্কৃতির সেপ্টেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত)

২৩.০৮.২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s