বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ কেন?

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2015 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

anti-vat-protestসরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয়ের ওপর ৭.% ভ্যাট বসিয়েছে। সঙ্গত কারণেই শিক্ষার্থীরা এই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের ন্যায্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ কারণেই এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতারণামূলকভাবে বলতে বাধ্য হয়েছে যে, এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে না, এ ভ্যাট দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন এ ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয়কেই দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথার সুরে মনে হয়েছে, তিনি জোরালোভাবে শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন! অপরদিকে অর্থমন্ত্রী বলে চলেছেন, ভ্যাট প্রত্যাহারের কোন কারণ নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের অপাত অমিল থাকলেও লক্ষ্যের দিক থেকে তাদের বক্তব্যের মধ্যে মিল আছে।

ভ্যাট সব সময় ক্রেতাকেই গুনতে হয়। অর্থাৎ ভ্যাট তার ওপরই থাকবে যা’ বিক্রয়যোগ্য পণ্য। সেদিক থেকে শিক্ষার উপরকণই শুধু নয়, খোদ শিক্ষার ওপরই ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে সরকার শিক্ষাকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে সামনে আনতে চাচ্ছে। সরকার যেমন বলেছে, রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য এই ভ্যাট আরোপ, ভিতরের দিকে একটু দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে আসল লক্ষ্য সেটা নয়।

যে পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয় অবশ্যই তার একটি নির্ধারিত দাম থাকা চাই। ঐ পণ্য বিক্রেতা যেই হোক তাকে সেই নির্ধারিত দামেই তা বিক্রয় করতে হবে। বিক্রেতার হাতেই যদি সেই ক্ষমতা থাকে যে, সে ইচ্ছামত দাম নির্দারণ করতে পারবে, তাহলে সেখানে ভ্যাটও হবে ‘ইচ্ছামত’। অর্থাৎ এক এক ভোক্তাকে এবং একই ভোক্তাকে এক এক জায়গা থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য এক এক রকমের ভ্যাট দিতে হবে! বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ব্যয় এক রকম নয়। একটির সাথে অপরটির আকাশপাতাল ব্যবধান লক্ষ্যনীয়। শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ৪ মাসের একটি সেমিস্টারে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয় ১৮,০০০ টাকা আবার কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয় ৮০,০০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ৪ মাস অন্তর একজন শিক্ষার্থীকে ভ্যাট বাবদ গুনতে হবে ১,৩৫০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো এই বিশাল ব্যায়ের বাড়তি ভার ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই যে বিপুল অংকের সেমিস্টার ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে, তা কে নির্ধারণ করে দিচ্ছে? এটা নির্ধারণ হচ্ছেই বা কিসের ভিত্তিতে? অনিয়ন্ত্রিত বাজার দরের ভিত্তিতে? যদি তাই হয় তাহলেতো এন.বি. আর এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আর কোন অমিল থাকে না। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন ইচ্ছামত টিউশন ফি, ক্রেডিড আওয়ার ফি সহ অন্যান্য সকল ফি বাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে এই ভ্যাটের নাটক করার প্রয়োজন কি? রাজস্ব বৃদ্ধি একমাত্র লক্ষ্য হলে সরকার বিশ্ববিদ্যায়ের ওপরই আয়কর নির্ধারণ করে দিত। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারের ওপর নাখোশ হওয়ার কোন কারণ থাকতো না। কারণ বাংলাদেশে কর ব্যবস্থার এক বড় বৈশিষ্ট্য হলো যার ওপর সরকার কর ধার্য্য করে তার প্রাপ্তি অনেক। সে ভিআইপি, সিআইপি অভিধায় অভিসিক্ততো হয়ই তার আর্থিক প্রাপ্তিও বেড়ে যায়। যেমন বাড়ির মালিকদের বাড়ীর আয়কর বাড়ালে তারা তার দ্বিগুন ভাড়াটেদের কাছ থেকে তুলে নেয়। এভাবে সবাই তার ওপর সরকারী ধার্য্য কর জনগণের ওপর থেকেই তুলে নেয়। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সব ধরণের করের বোঝাই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধের ওপর বর্তায়। তাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কর ধার্য্য করলে তা যে তারা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা ‘বৈধ’ পথ পেয়ে যেত এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কর ধার্য্য করলে তা অনিবার্যভাবে শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই পড়বে, তা জেনেও এই নাটকের আলাদা তাৎপর্য আছে। এনবিআর এবং অর্থমন্ত্রীর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের মিলন বিন্দু এই আলাদা তাৎপর্যের মধ্যেই নিহিত আছে। এই আলাদা তাৎপর্যের একটি মাত্রায় পৌঁছানোর পর তাদের বক্তব্য ভিন্ন পথে অভিষ্ট অভিন্ন মিলন বিন্দু খুঁজে পাবে।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ওপর নিজেদের ইচ্ছামত শিক্ষা ব্যয় নির্ধরণ করে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী কৌশল পত্র অনুযায়ী সরকার শিক্ষাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যাতে পাবলিক শিক্ষা ক্রমাগতবাবে সংকুচিত হয় এবং প্রাইভেট শিক্ষা ক্রমাগতভাবে কলেবরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই লক্ষ্য এখন একটি পর্যায়ে এসে পৌঁছে গেছে। এখন পাবলিক শিক্ষা এবং প্রাইভেট শিক্ষা কেবল সমান্তরালেই এসে দাঁড়ায়নি, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাইভেট শিক্ষা পাবলিক শিক্ষাকে ছাড়িয়ে গেছে। এক সময় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বুঝাত, সেখানে শুধুমাত্র ধনী লোকের সন্তানেরাই পড়ালেখা করে। সাম্রাজ্যবাদী কৌশল পত্রে শিক্ষা নিয়ে সরকারের কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে পাবলিক শিক্ষাকে সংকুচিত করে প্রাইভেট শিক্ষাকেই শিক্ষার প্রধান ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ এমন মাত্রায় পোঁছেছে যে, এখন শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরিত করণের বিরূদ্ধে জনপ্রিয় শ্লোগানও আর নেই। সাম্রাজ্যবাদ এবং তার নির্দেশিত পথে সরকারারের কৌশলে এখন সমাজের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সাথে জড়িত। তাই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ওপর তাদের ইচ্ছামত যে শিক্ষা ব্যয় ধার্য্য করে দিয়েছে তার একটি প্রকাশ্য সরকারী বৈধতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনিবার্য্য হয়ে পড়েছে। এই অনিবাযর্তা এ কারণেও যে, বৈধতার একটি সরকারী ভিত্তি থাকলেই কেবল ভবিষ্যতেও ‘বৈধ’ পথেই তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা চলে। তার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছামত যা ধার্য্য করা হয়েছে আগে তাকে বৈধ করে নেওয়া।

সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এখন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্দিষ্ট মাত্রায় পোঁছেছে। এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনিবার্য্য ফল। যদিও এ অনিবার্যতার পরিণতি প্রাপ্তি স্বত:স্ফুর্তভাবে হয়নি। এর জন্য সাম্রাজ্যবাদী কৌশল পত্র আনুসারে সারকারের শিক্ষানীতিকেও সেই লক্ষ্যপূরণের দিকে কাজ করতে হয়েছে। পুঁজিবাদী অনিবার্যতা জনগণের জন্যতো বটেই, খোদ পুঁজিবাদের জন্যও নিরীহ কোন বিষয় নয়। শুধু জনগণের দুর্ভোগই নয়, দ্বান্দ্বিকভাবেই তা পুঁজিবাদেরও সংকট সৃষ্টি করে। তাই পুঁজিবাদী অনিবার্যতাকে জনগণের মধ্যে খাপ খাইয়ে নিতে সাম্রাজ্যবাদকে সর্বদাই কৌশল খাটাতে হয়। সে কারণে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার হিসেবে সরকার সাম্রাজ্যবাদী কৌশল পত্রেই কাজ করে থাকে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের এটিও একটি কারণ যে, প্রাইভেট শিক্ষার অপরিহার্য্যতাকে সমাজের মধ্যে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং সমাজ স্বীকৃত করে নেওয়া।

শিক্ষার সংষ্কৃতি এমন করা হয়েছে যে, শিক্ষা ব্যয়কে এখন সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে দখতে বাধ্য করা হচ্ছে। শিক্ষা ব্যয়কে সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে যত প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছে শিক্ষাকে ততই বেসরকারী করণের দিকে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছে। এখন প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্রই শিক্ষাকে প্রাইভেটাইজেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সে প্রক্রিয়াই সরকারের শিক্ষানীতির বর্তমানের মূল কাজ। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন পাবলিক শিক্ষার ওপর প্রাইভেট শিক্ষাই প্রাধান্য বিস্তার করেছে।

ভ্যাট আরোপের বিরূদ্ধে এখন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। এই আন্দোলন যদি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে সরকার যে লক্ষ্যে এই ভ্যাট বৃদ্ধি করেছে তাই সফল হবে। শুধুমাত্র ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি সরকার মেনে নিলেও শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে যেমন শিক্ষার ব্যয়ভার কমবে না, তেমনই সরকারের লক্ষ্যও অপূর্ণ থাকবে না। তাই শুধু শিক্ষা ব্যয়ের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবির মধ্যে এবং আপাত দৃষ্টিতে তা পূরণ হওয়ার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তি বলে কিছু থাকবে না। যে শিক্ষা ব্যায়ের ওপর এই ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে সেই শিক্ষা ব্যায় কমানোর আন্দোলন করতে হবে। এই ব্যায় কিভাবে নির্ধারিত হবে তার সুষ্পষ্ট নীতিমালার জন্য আন্দোলন করতে হবে। আর সেই আন্দোলনের ভিত্তি হলো শিক্ষার প্রাইভেটাইজেশন এবং বিণিজ্যিকীকরণের বিরূদ্ধে অবস্থান গ্রহন। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং প্রাইভেটাইজেশন যেমন অনিবার্য্য, তেমনই দ্বান্দ্বিকভাবেই এর অনিবার্য্য পরিণতিও হলো এর মধ্য থেকেই এর বিরূদ্ধে প্রতিরোধ। কাজেই আজকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এটা ভাবলে চলবে না যে, তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বলে তাদের পক্ষে প্রাইভেটাইজেশনের বিরূদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। বরং দ্বান্দ্বিকভাবে এই অবস্থাই অনিবার্য্য যে পাবলিকপ্রাইভেট সকল শিক্ষার্থীকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের বিরূদ্ধে এবং প্রাইভেটাইজেশনের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

১২/০৯/১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s