শিক্ষার্থীদের ভ্যাট-বিরোধী আন্দোলন এবং সরকারের শিক্ষা-বিরোধী চক্রান্ত

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2015 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

()

anti-vat-protest-2আওয়ামী মন্ত্রিসভা শিক্ষাব্যয়ের ওপর ৭.% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এই বিজয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের, যারা সরকারের গুণ্ডাবাহিনীর হুমকি, পুলিশের চোখরাঙানি, মিডিয়ার অপপ্রচার উপেক্ষা করে এই আন্দোলনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন এবং নগণ্য কিছু ঘটনা ছাড়া মোটামুটি সুশৃঙ্খলভাবেই আন্দোলনকে পরিচালিত করেছেন। অভিনন্দন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্মীবৃন্দকে, যারা শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে তাদের সাহস ও প্রেরণা যুগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এই আন্দোলনে এক অর্থে বিজয় হলেও একে পরিপূর্ণ বিজয় মনে করার কারণ নেই। সরকার ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাধ্য হয়ে। ভ্যাট আরোপে সরকারের পূর্ব সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশে শিক্ষা সঙ্কোচনের অপরাজনীতি, শিক্ষাক্ষেত্রে নয়াউদারতাবাদী নীতি বাস্তবায়ন এবং মধ্যবিত্ত জনগণের ঘাড় ভেঙে নিজেদের দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টার অংশ। সেই অর্থে ভ্যাটের বিষয়টি হিমবাহের দৃশ্যমান শৃঙ্গ মাত্র। আরো অনেকভাবে ও বিচিত্র পথে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের চক্রান্ত করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

একটা বিষয় দেখলাম, শিক্ষার্থীরা ভ্যাট আরোপের সাথে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছে। এমনই নয় যে ভ্যাট আরোপের ফলেই শিক্ষা হঠাৎ করে পণ্যহয়ে গেছে। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী শিক্ষাকে পণ্য বানিয়েছে আরো আগেই। ইউজিসি কর্তৃক গলির মোড়ে মোড়ে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন প্রদান এবং সেগুলোর মানের নিশ্চয়তা বিধানে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিরত থাকা, শিক্ষাখাতে বাজেটব্যয়ের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা, শিক্ষার হাত থেকে ভর্তুকি হ্রাস, অধিকাংশ স্কুলকলেজে শিক্ষা প্রদানে নিম্নমুখি মানের কারণে কোচিং সেন্টারের রমরমা ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ কর্তৃক শিক্ষকতার পরিবর্তে কনসালটেন্সি সহ বিভিন্ন লাভজনক প্রকল্পে নিযুক্ত থাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মননশীল ও বিজ্ঞানবিষয়ক শৃঙ্খলাসমূহের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে ‘বাজারচাহিদা’ অনুযায়ী নিত্যনতুন বিভাগ খোলা এবং সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করাএসবই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ। এছাড়া আরো অনেক কিছু আছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে বলতে গেলে এসবই সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন।

বনানীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের গুণ্ডাবাহিনী হামলা চালিয়ে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আহত করেছে। এই গুণ্ডাদের বিচারের জন্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি তুলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই দাবি থেকে সরে আসা কিংবা দাবির সাথে আপোষ করা যাবে না। কার্যকর পদক্ষেপের আগে সরকারের কোনো মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতেই দাবিভিত্তিক উক্ত কর্মসূচি স্থগিত করা ঠিক হবে না।

()

একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি সংক্রান্ত একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রটোকলের আওতায় বিগত আওয়ামী সরকার কর্তৃক ভারতকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একতরফা ট্রানজিট দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বস্ব দেশের পক্ষে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির আওতায় ত্রিপুরায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারি যন্ত্রপাতি আনানেয়া শুরু হয়। ভারি যন্ত্রপাতি নেয়ার জন্য তিতাস নদীর গতিপথ বন্ধ করে দিয়ে এর ওপর দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করতে হয়েছিল। এতে পরিবেশ আইন ও নদী আইন লঙ্ঘন এবং শত শত স্থানীয় মৎসজীবী পরিবারের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ভারত যাতে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একতরফা ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করতে পারে সেই জন্য প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান সম্ভাব্য সব কিছুই করেন। এই ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশ যে সম্ভাব্য পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় সে বিষয়ে এবং আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী আবগারি শুল্ক ও ফি নির্ধারণ বিষয়ে কথা উঠলে ড. রহমান বলেন, “বর্তমান বিশ্বে কোনো সভ্য দেশ অপর দেশকে ট্রানজিট দেয়ার বিনিময়ে কোনো ধরনের ফি বা অর্থ চাইতে পারে না। ভারতের কাছ থেকে ফি বা চার্জ চেয়ে আমরা অসভ্য হতে চাই না।” তার এই বক্তব্য তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় স্থান পেয়েছিল।

এবার বর্তমান প্রসঙ্গ। শিক্ষার্থীদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন চলাকালে সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত সদম্ভে বলেছিলেন: ভ্যাট দিতেই হবে। কোনোভাবে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে না। এই বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট পরিশোধ করলেও (যেটা আসলে একটা প্রতারণামূলক বক্তব্য ছাড়া কিছুই নয়) সামনের বছর থেকে শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাটের অর্থ পরিশোধ করতে হবে (এটাই আসল কথা)। আজ শিক্ষার্থীদের চাপে ভ্যাট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেও এটাই ছিল সরকারের মনের আসল কথা: ছাত্রদের ভ্যাট দিতে হবে। ভ্যাট না দিয়ে কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না। ভারতকে একতরফা ট্রানজিট দেয়ার সময় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি উপেক্ষা করে এবং ট্রানজিট ফি ধার্য করার প্রশ্নে যে সরকার অতিশয় ‘সুসভ্য’ হয়ে উঠতে পারে তারাই দেশের মধ্যবিত্তের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপ করার মতো ‘সুসভ্যতা’র অপর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বলাই বাহুল্য, এই উভয় প্রকার ‘সুসভ্য’ কাণ্ডকারখানাই বিশ্বের বুকে নজিরবিহীন। দয়া করে কেউ বলার চেষ্টা করবেন না, মশিউর রহমান এবং আবুল মাল মুহিত দুজন আলাদা মানুষ। এই দুটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’র মধ্যে সংযোগ খুঁজতে না যাওয়ার উপদেশও দেবেন না কেউ। তাহলে জনতার আদালতে তিনি আহাম্মক অথবা সরকারের মহাধান্দাবাজ দালাল হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s