ছোটকাগজ মঙ্গলধ্বনি :: কয়েকজন তরুণের প্রাণ-ছোঁয়া আনন্দ

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2015 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: মতিন বৈরাগী

mongoldhonyমঙ্গলধ্বনি ছোট কাগজ মানবজীবনের কল্যাণের পক্ষের কথা বলবার জন্য এবং শোনানোর জন্য কয়েক তরুণ চেষ্টার এই ছোট কাগজ। সে কল্যাণ সার্বিক সামাজিক রাজনৈতিক প্রাণপ্রকৃতিপরিবেশের পক্ষের। নিয়মিত নয় এই ছোটকাগজ, তবে তাদের চেষ্টা দেখে বুঝে নেয়া যায় যে একটুখানি সহযোগিতা পেলে তারা নিয়মিত হয়ে উঠতে পারে এবং নিরন্তর নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাদের শ্রমমেধাযোগ্যতাকে ব্যবহার করতে পারে। জগজীবনে কোনো কাজই যা বৃহক্ষ্য অর্জনে নিবদ্ধ, তা একক চেষ্টায় পূর্ণতা পায় না সাহসী, উদ্যমী, সমাজ সচেতন মানুষের অংশগ্রহণ তাই জরুরী। তবু এই গীত তারা গাইতে চাইছে এবং এর জন্য অসুখ চিহ্নিত করে ইস্যুভিত্তিক লেখা তারা ছাপছে তাদের এই ছোট কাগজে।

আমাদের চারপাশে এখন এক অনীহা, বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু নয়, সাধারণ লেখাপড়ায়। বলা যায় এক ভয়ানক আতঙ্কজনক অবস্থা চলছে এখন। বিপুল মানুষ চেতনাহীন, আধিপত্যবাদী রাজনীতির দ্বারা পঙ্গু। তাদের সামাজিক ভাবনা কেবল নিজেকে নিয়ে, কেবল ধনসম্পদ অর্জনের দিকে, আর তার জন্য এখন আর কোনো লেখাপড়ার প্রয়োজন হয় না। জ্ঞান অর্জনের ক্লেশও করতে হয়না। শুধুমাত্র একটা যোগ্যতা আমরা আছি তোমার পিছে ধ্বনি উচ্চকিত হলে অনেক কিছুর লাইসেন্স মেলে আর সেটা আরো ভালোভাবে করতে পারলে রাতারাতি গণনা করবার মতো ধনসম্পদ অর্জনের পথ খুলে যায়। সকলে এখন সেই প্রতিযোগিতায় মগ্ন। সেখানে ছোটকাগজ বড়কাগজ পড়ে দেখে বুঝে নিলেতো কাজ চলে না, তার দরকারটাই বা কি? তাই আমাদের সমাজজীবন যে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে সেখানেও মুক্ত চেতনার দরকার পড়ে না। চালিয়ে গেলেই হলো, মুখের ভাষা, রাষ্ট্রের বাহিনী নিজেদের পোষ্যরা থাকলেই তো যথেষ্ট। সমাজ কোথায় যাচ্ছে, কোথায় যাবে, আগামীর জন্য কে কি রাখতে পারলেন [বৃহৎ অর্থে ক্ষুদ্রার্থে তো বেশ রাখতেই পারছে] তার ভাবনা কেবল কতক তরুণ হয়তো করে; কিন্তু তাদের শক্তি, সামর্থ এমন নয় যে, এইসব ক্ষুদ্র প্রয়াস দ্বারা এমন বিশাল বিপুল আগত অন্ধকারকে রুখে আলো আসার পথকে প্রশস্ত করবে। তবু চেষ্টা তাদের নিরন্তর। আর এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চেষ্টা, যা বক্ষ্যমান সমস্যার মধ্যেই তলিয়ে থাকে, তা হয়তো বিন্দু পরিমা জেগে থাকে, সেইটুকুই আশা, সেইটুকুই আশ্বাস।

বড়কাগজের সুবিধা অনেক, তাদের জন্য পুঁজিপতিদের আদর আছে, পরিচালিত হয় তাদের অর্থে, বলে তাদের কথা, রহিমুদ্দি কলিমুদ্দি হচ্ছে তাদের তামাশার বাহন। তারা তাদেরকে উপাত্ত করে, লোক খাটায় বেতনভাতা দেয়, নিজদের জীবনআচারকে ঢেকে রাখে, প্রয়োজনে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা তাদের বাজার বোঝে, নানা স্বার্থকে একত্রিত করে আর বিপুল মানুষকে একটা তামাশার মধ্যে রেখে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে পারে। রাষ্ট্রশক্তি তাদের পক্ষের, আন্তর্জাতিক শক্তি তাদের জন্য, জাতিসংঘ তাদের সমস্যার শালি কেন্দ্র আইন আদালত সুবিধা মুক্ত রেখেছে দরোজা তাদের দিকের। সেখানে কেবল এইসব চেষ্টা যত ক্ষুদ্রই হোক কিছুতো আছে, এরকম এক শান্তনার মধ্যে কেউ কেউ এসে উঁকি দিতে পারেন, এবং আস্তে আস্তে বড়মাছের গ্রাসে ছোটমাছের ধারালো কাঁটা বিঁধে তার কেবল গলধকরণ রীতির কিছুটা শ্লথ করে একটা পরিমাণ হতে পারে এই হলো আশা।

মঙ্গলধ্বনি এবারের ৩৩৬ পৃষ্ঠার চমৎকার প্রচ্ছদেও [আলো আঁধারের রঙ মিশ্রণে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংখ্যা নামে প্রকাশ করেছেন সম্পাদক শাহেরীন আরাফাত, হেলাল সম্রাটএর প্রচ্ছদে। সহযোগিতা করেছেন আবিদুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, অনুপ কুণ্ডু, আব্দুল্ল আলশাছ বিল্লাহ, তৌফিক খান, সুস্মিতা তাশফিন, কৌস্তভ অপু। দাম রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা। এবারের সংখ্যায় বেশকিছু ভালো লেখা তারা ছেপেছেন। এসব লেখা সংগ্রহ এবং ছাপার আনুষঙ্গাদি শেষ করে তা আলোকের মুখ দেখা তো বাস্তবিকই দুরূহ। বড়কাগজে দেশের প্রথিত যশারা [!] লেখেন, তারা লেখেন এবং কিছু সেলামী পান, এসব কাগজে লেখা সংগ্রহ করতে হয়, একেকজনের কাছে কতোবার দৌড়াতে হয়, কখনো কখনো কিনতেও হয়, সময় দিতে হয় এবং তারপরে পাওয়া গেলে তবেই সন্নিবেশ করা যায়। তবুও এই তরুণদের তারুণ্য হয়তো রাখছে আলস্যহীন কর্মপ্রপঞ্চ। তাই তারা বের করতে পারলেন এমন মনোলোভা একটা কাগজ যার থেকে আমরা পাঠকরা এবং আগ্রহীরা জানতে পারছি অনেক, অনেক বিস্ময় নিয়ে আবিস্কার করতে পারছি আমাদের কালের অসুখ। বিধান নয় আর নয়ই বা কেন, অবগত হতে পারলে তো চেতনা জগতে যে আন্দোলন হয় তা একটা সামাজিক ক্রিয়া হিসেবে দাঁড়াতে পারে, তখন সমাজ নির্ধারণ করে এর প্রতিষেধক রাজনীতি। লিখেছেন রিয়াজুর রহমান, কেনো আমরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী; সাম্রাজ্যবাদে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায়ন লিখেছেন স্টেফানি ম্যাকমিলান; জাহেদ সরোয়ার লিখেছেন কর্পোরেটোক্রেসি, সাম্রাজ্যবাদেনয়া চেহারা; বিশ্বায়ন ও সাম্রাজ্যবাদ, শরীফ শমশির; হাসানাত কায়ূম লিখেছেন জাতিসংঘ পানি প্রবাহ কনভেনশন প্রসঙ্গে; নেসার আহমেদ লিখেছেন বাঁধবিদ্যুতপানি ও কৃষির রাজনীতিতে ভারত বাংলাদশের ভবিষ্য; প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে কলোল মোস্তফা; ফুলবাড়ি : একটিচেতনা, শাহরিয়ার সানি; পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার মহামারী, বাধন অধিকারী; বিরুদ্ধে যুদ্ধ, রক্তিম ঘোষ; মার্কিন সাম্রাজ্যবাদে বিশ্ব আধিপত্য রক্ষায় ডলারেরর মাহাত্ম্য, আবিদুল ইসলাম; গণহত্যা টি তুলনামূলক আলোচনা, আব্দুল্লাহ আলশামছ বিল্লাহ; সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নকরণী, বাসদ; জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সাম্রাজ্যবাদ, শাহেরীন আরাফাত এরকম ২০/২১ প্রবন্ধ পর্যালোচনার সাথে রয়েছে গল্প, কবিতা তাও মূল ইস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণ। কোনো তামাশা ভরামি কারণহীন কোন কর্মবিদ্যা এখানে বর্তমান নেই।

প্রতিটি প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য নির্ধারিত বিষয় যতদূর সহজ করে প্রয়োজনীয় করে বলা এবং তথ্য তত্ত্বএর সন্নিবেশ করে যুক্তি যৌক্তিকতাকে বিন্যস্ত করে বলা, যাতে পাঠক অন্তত যে প্রবন্ধটি পড়বেন, তা থেকে কিছু পেতে পারেন, তারা কাজে লাগতে পারেন। কাগজটি আমার ভালো লেগেছে, আমি পড়েছি সাধ্যমত বুঝতে চেষ্টা করছি, চিনতে চেষ্টা করছি আমাকে, আমার চারপাশ। হয়ত সব বিষয়ের সঙ্গে আমি নই, কিন্তু সহমত হবার অনেক বিষয় রয়েছে। অবশ্য সেরকম যদি আবশিষ্ট আমরা কিছু এখনো থেকে থাকি। ভবিষ্যতের ঈশ্বর তো জনগণ তারা যদি কোনো কিছু নেয় এবং কখনো কাজে লাগায় সেই চেষ্টাটা তো করা হলো এই কজন তরুণ তেমনটা করছেন। অন্তত এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার পিছেএর বিপরীত ভাবনায়। সেটাই বা কম কিসে?

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s