লিখেছেন: দোলা আহমেদ

pain-art-2প্রাচীন এক মফস্বল শহর। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে উত্তাল পদ্মা। শহরের বুক চিরে চলে গেছে ইছামতি নদী। আজ অবশ্য কোন নদীই আর তেমন উত্তাল নয়। ইছামতিকে তো এখন আর খালও বলা যাবে না। বদ্ধ জলাশয় ছাড়া আর কিছু না। পোড়া বাড়ি যেমন শ্রীহীন হয়ে পড়ে ঠিক তেমনই। পদ্মা সারা বছর থাকে এক রাশ বালু বুকে নিয়ে শুধু আষাঢ়শ্রাবণ মাসে ফিরে পায় তার ফেলে আসা হারানো যৌবনের কিছুটা ছোঁয়া। প্রাচীন শহরের আর সেই প্রাচীন রূপ নাই। নাই কোন খেলার মাঠ। নাই কোন ফলের বাগান। কৃষি জমিও এখন আর তেমন নাই। এখন শুধু চারিদিকে বড় বড় বিল্ডিং আর শপিং মল, বড় বড় দোকানপাট। সব কিছু যেন অনেক দ্রুত পাল্টে গেছে। মানুষরাও তার সাথে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছে।

এক সময় যাদের অনেক কিছু ছিলো তারা আজ নিঃস্ব প্রায়। এমন অনেক পরিবার আছে এই শহরের মাঝে। তবে এখনো তাদের সেই প্রাচীন বংশমর্যাদা অক্ষুণ্ন আছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার যখন একেবারে নিঃস্ব হয়ে পরে, তবুও তারা কারো কাছে হাত পাততে পারে না। না খেয়েও থাকতে পারে, তবুও অন্যের দ্বারে যেতে পারে না।

এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে মামুনদের বাড়ী। আগে চারিপাশে অনেক খোলা জায়গা ছিলো কিন্তু এখন আর তেমন কিছু নাই, শুধু বাড়িঘর। এই বাড়ীতেই আজ সারা দিন নানা মানুষের আনাগোনা চলেছে। বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। নারীপুরুষবৃদ্ধাযুবাশিশু সবাই। মামুনের আব্বা মারা গেছেন। আজ ছিলো তার খয়রাত। মসুলমান ধর্ম মতে মারা যাওয়ার ৪০ দিন পরে সাধ্যমতো এলাকার পরিচিত মানুষদের, ফকিরকাঙ্গালদের এক বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হয়। তারা তাই বড় একটা গরু মেরেছিলো। অনেক মানুষ সেই দুপুর হতে আসছে এবং খেয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার খাবার সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সন্ধ্যা বেলা। মোটামুটি সব কাজ শেষ। মামুনের স্ত্রীসহ সব ভাইবোন তাদের পরিবার নিয়ে ঘরের মাঝে বসে নানা কথাবার্তা বলছে। সারা দিনের কাজটা কেমন হলো এই সব পারিবারিক আলাপআলোচনা। এরই মাঝে কেউ কেউ এখনো আসছে। কেউ খাচ্ছে আবার কেউ বা শুধু দেখা করবার জন্য আসছে। দুপুরের খাবার এখনো অনেকখানিই থেকে গেছে। মফস্বল শহরের এই একটা দিক সবাই সবার কাছের মানুষ। বিয়েশাদী বা এমন মৃত্যু অনুষ্ঠানে কাউকে না বললেও সে আসে। এতে সবাই খুশি হয়।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে ওদের বাড়ীতে এলো পাড়ার এক ভাবী। সাথে তার ছোট দুই ছেলেমেয়ে। ওদের বাড়িতেই মামুন এক সময় কর্মচারির কাজ করতো। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। প্রায় ১০/১২ বছর আগের কথা হবে। ঐ বাড়িটা ছিলো এক সময়ের মাঝে এই পাড়ার সবচেয়ে অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ী। শহরে সবাই এক নামে জানতো চিনতো এই বাড়ির কর্তাকে। কি ছিলো না সেই বাড়ীতে! গাড়ী, চাকরবাকর, কর্মচারি, লজিং মাষ্টার সবই ছিলো। সবেমাত্র যখন প্রথম ফ্রিজটিভি এলো এই শহরে, তখন এই বাড়িতে ছিলো। কিন্তু কি দিয়ে যে কি হয়ে গেলো আজ আর কোন কিছুই নাই ওই বাড়ীতে। বাড়ী বলতে এখন আর কিছুই নাই। শুধু কোনোমতে মানুষ থাকবার সামান্য ব্যবস্থা। বাড়ির গৃহকর্তা অসুস্থ। ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোভাবে টিকে আছে। তবে একটা জিনিস এখনো আছে সেটা হলো সম্মান। এলাকার সবাই এ বাড়ীর মানুষকে অনেক শ্রদ্ধাসম্মান করে। করবেই না কেন! আগে যখন তাদের সুদিন ছিলো, কারো বিপদে কখনো পিছু থাকে নাই। কাউকে কোনোদিন নিরাশ করে নাই। যেভাবে পেরেছে মানুষের পাশে থেকেছে। তাই তো এলাকার সবাই আজো সেই সম্মান দেয়ে স্বামীস্ত্রী দুজনাকেই। এই মামুনও তো বড় হয়েছে ওবাড়ীর অন্ন খেয়ে। আজ তার যে প্রতিষ্ঠা, তার পেছনে ওই বাড়ীর অবদান অনেক। সেজন্য শুধু মামুন নয়, ওই ঘরের মাঝে আর যারা ছিলো তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো তাদের এই ভাবীকে দেখে। মামুনের ভাইবোনেরা তাই সবাই বাইরে ছুটে এলেন। ভাবী একা আসেন নাই। সাথে তার ছোট ২ ছেলেমেয়ে। তার অবশ্য দুটো সন্তান নয়। ৩ ছেলে ২ মেয়ে। এই ছোট দুটোর বয়স হবে মেয়েটার ৯ আর ছেলেটার ৭বছর।

মামুনই প্রথম দেখেছিলো ভাবীকে। তাড়াতাড়ি উঠানে গিয়ে বড় যে বসবার ঘর, সেই ঘরের মাঝে নিয়ে এলো। তৎক্ষণে আর সবাই বারান্দায় এসে গেছে। মামুনের সবার বড় যে বোনটা, নাম মাকসুদা। তিনি অবশ্য এই ভাবীর চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তিনিই প্রথম বললেন

মাকসুদা: বৌমা এতো দেরী করলে কেন? দুপুরে এলে কত ভাল লাগতো। পরিচিত অনেক মানুষ এসেছিলেন

তাও যে এসেছো তুমি সহ বাচ্চারা। অনেক ভাল লাগছে। আব্বা তোমাকে অনেক ভালবাসতো।

ভাবী: বুবু সারা দিন কিভাবে আসবো? সংসারে কত কাজ। তার উপরে আপনার ভাইয়ের শরীরটা তেমন একটা ভাল না। না এলে আপনারা আবার মন খারাপ করবেন, তাই এলাম। তাও দেখেন কত রাত হয়ে গেছে। আপনাদের এখানে বলেই আসলাম, সব কিছু তো আর বাদ দেওয়া যায় না।

মাকসুদা: ছেলেমেয়ে দেখি কত বড় হয়ে গেছে! কত দিন দেখি না। ওদের নিয়ে এসে আরো ভাল করেছো বৌমা।

ভাই কেমন আছে এখন? আর ছেলেমেয়েরা?

ভাবী: আপনার ভাইয়ের শরীর তো আগের মতোই। ছেলেমেয়েরা আছে এক রকম।

এই সময়ের মাঝে মামুনের বৌ এলো ভাবীর কাছে। সাথে ছোট একটা মেয়ে। ভাবী এটা আমার মেয়ে মালতী।

ভাবী: বাহ! বেশ হয়েছে তো। একদম মামুনের মতই হয়েছে। স্কুলে দিয়েছো?

মামুনের বৌ: না ভাবী এখনো দেই নাই। এই বার দিবো।

এই সব নানা ছোটখাটো কথা বার্তা চলছিলো। ভাবীর ছেলেমেয়ে দুটো চুপচাপ তাদের মায়ের পাশে বসে ছিলো। একদম চুপচাপ। জড়োসড়ো হয়ে।

এক জন বলে উঠলো পাশ থেকে, বাহ! বাচ্চারা তো ভারী শান্ত। এমন দেখাই যায় না আজকাল। কিন্তু এত মনমরা কেন? মুখটা কেমন শুকনা শুকনা।

ভাবী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন: সারা দিন ঘুমায় নাই। সেই জন্য হয়তো এমন লাগছে। তা বলেই সন্তানের দিকে তাকালো। দুজনার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো।

মামুনের এক বোন তাদের নাম জিঙ্গাসা করলো

মেয়েটা আস্তে করে বললো, চাঁপা

ছেলেটাও বোনেরই মতো বললো, রাসেল।

ওদিকে পাশের ঘর হতে মামুন ডাকতে এলো, ভাবী আসেন। অল্প একটু খেয়ে নেন।

ভাবী তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, এই জন্যই আমি দিনের বেলা আসতে চাই নাই। তোমরা খাওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করবে। আজ তো আবার না বলাটাও ভাল না।

বুবু এগুলো খাবারের হক তো আসলে দুস্থকাঙ্গালদের। একদম গরিরদুখিদের। এগুলো আসলে তো ওদের হক। কি বলেন?

এই বলে তিনি মাকসুদা বুবুর দিকে তাকালেন তাদের অতিথি ভাবী।

মাকদুদা বুবু: ঠিক বলেছো বৌমা। তবে আমরা যারা ঘরের মানুষ তারা তো আব্বার অনেক কাছের। আর তাছাড়া মামুন তো বড়ই হয়েছে তোমাদের ওখানে। তোমরা আমাদের অনেক আপন। তাই কিছু মনে করবে না। নিজের পরিবার আমরা সবাই।

ভাবী: আমি শুধু এলাম আপনাদের দেখতে। আর তাছাড়া চাচা মিঞার সাথে প্রায়ই দেখা হতো রাস্তায়। খুব মনে পরে। আমি একাই আসতাম কিন্তু ওরা বললো আমরাও যাবো, তাই আর না বললাম না।

এই কথা গুলো বলতে বলতে ছেলেমেয়েকে সাথে করে পাশের ঘরে গেলেন ভাবী।

খাবার টেবিলের পাশেই ছিলো দাঁড়িয়ে মামুনের স্ত্রী আর ওর ছোট ভাই মাসুমের স্ত্রী। পাশের ঘর থেকে মাকসুদা বুবুও এলেন তাদের সাথে সাথেই। হাত ধুয়ে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে ভাবী বসলেন খাবার টেবিলে।

টেবিল ভরা খাবার। কতকিছু আজ ওরা রান্না করেছে। মাছ, মাংস, ডাল, সবজী আর সাদা ধবধবে চিকোন চালের ভাত।

সবকিছু দেখে কেমন জানি একটা মোচড় দিলো এই ভাবী নামক অসহায় মানুষটার মনের মাঝে। তার মনের কথা শুধুই তিনি জানেন, আর জানেন তার অন্তর্যামী।

রাসেল ছোট। তাই তাকে তার মা বললো, মাছ খাওয়ার দরকার নাই। তুমি মাংসই খাও। দেখো ভাতটা অনেক সুন্দর। সাদা ধবধবে চিকোন চাল। লজ্জা করো না এখানে। পেট ভরে খাও। সবাই এখানে তোমার চাচাফুপু। আমাদেরই বাড়ীর মতো।

মেয়ের দিকেও তাকিয়ে বলতে লাগলো, কোন লজ্জা নাই তোমাদের এখানে। যা লাগে, যেটা খুশি পেট ভরে খাও।

কোনোদিন আসা হয়নি তাতে কি? সবাই তোমার আপনজন এখানে।

মেয়েকে বললেন, মাংসটা বেশী করে নে। দেখ কি সুন্দর হয়েছে।

কে রান্না করেছে মামুন? বললেন ভাবী।

মামুন বললো, নওশের চাচা।

নওশের বাবুর্চি এই শহরের মাঝে সবচেয়ে নামকরা। এক নামে সবাই চেনে।

ও তাই এমন ভাল হয়েছে রান্নাটা। এমন সুন্দর ঘ্রাণ, বললেন ভাবী।

ওদিকে মামুনের স্ত্রী বললো, ভাবী আপনি তো কিছুই নেন নাই। মাংস না নিয়েই শুধু বলছেন। কখন থেকে দেখতে পাচ্ছি শুধু ডাল দিয়ে ভাত মাখছেন কিন্তু মুখে দিচ্ছে না।

মাসুমের বৌ তাড়াতাড়ি করে মাংসের বাটিটা নিয়ে এলো।

তাড়াতাড়ি বাঁধা দিলেন ভাবী, না রে বৌমা আমার ডাল দিয়েই ভাল লাগছে।

এইবার মাকসুদা বুবু মাছ নিয়ে এলেন ভাবীর পাতে তুলে দিবেন বলে।

তাড়াতাড়ি করে ভাবী বললেন, বুবু দেবেন না। আমার পেট ভরা। এখন কি খাওয়ার সময় না কি!! অবেলায় খেয়েছি তাই আর পারছি না। মাছমাংস আর খেতে পারবো না। এই ডালটাই অনেক ভালো লাগছে। তাই তো এটাই খেলাম। মনে হচ্ছে কত দিন পরে খেলাম। এই বলতে বলেতে তার কণ্ঠটা ধরে এলো। আর কোন কথা বলতে পারলেন না তাদের এই ভাবী। আস্তে করে উঠে চলে গেলেন হাত ধুতে।

কিভাবেই বা তিনি আর সবার সামনে শক্ত হয়ে কথা বলবেন। আর কতোক্ষণ করবেন এদের সামনে ভাল থাকবার অভিনয়? বাড়ীতে পেট ভরে মিথ্যা খাওয়ার গল্প আর কতোক্ষণ করবে এই অসহায় মানুষটা। আর কতোক্ষণ!!

ঘরে তার অভুক্ত অসুস্থ স্বামী। অন্য ছেলে ও মেয়ে। সেই গতকাল সারা দিন পরে রাতের বেলা একটা পাতিলের মাঝে সামান্য চাল আর ডাল দিয়ে কোনোরকমে সেদ্ধ করে মুঠো মুঠো খেয়েছে এই মানুষগুলো। তারপর থেকে আর কারো পেটে পানি ছাড়া কিছুই পরেনি দিনভর। সারাদিনে অনেক চেষ্টা করেছে বড় ছেলেটা, কিন্তু কোন কিছু জোগার করতে পারেনি। বড় ছেলেটা অবশ্য রাতে যেভাবেই হোক কিছু একটা ব্যবস্থা করবেই। এই ছোট দুটোকে কিভাবে আর না খাইয়ে রাখবে তাদের মা। এই মাসুমরা আর কতো কষ্ট সহ্য করবে?

সারাদিন বাচ্চা দুটো কিছুই খায়নি। তাই তো তাদের মা সারাদিন অপেক্ষায় ছিলো কখন রাতের আঁধার নামবে? কখন তাদের দুটো ভাতের জন্য এ বাড়ীতে আনতে পারবে? সারাটা দিন অনেক চিন্তা করেছে তাদের মা। এই বাড়ীতে আনবে, কি আনবে না? এই লজ্জা কিভাবে তিনি কাটাবেন। এই গ্লানি হতে তিনি কবে মুক্ত পাবেন? কিন্তু তিনি আজ বাধ্য। তাকে আজ এই সমাজ বাধ্য করেছে পেটের ক্ষুধার কাছে সব কিছুকে পরাজিত করেছে। নিজের জন্য না শুধুমাত্র এই সন্তানদের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আজ পরাস্ত। তাকে এই সমাজ আজ বাধ্য করেছে। এই গ্লানি, এই লজ্জা আসলে কার? এদের মায়ের না কি এই সমাজের??

ওদের জন্য আজ আসা এই খয়রাত বাড়িতে। মাছমাংস তারা কেউ খেতে পারে নাই। ছোট হলে কি হবে ওরা তো জানে শুধু ওদের পেট তো নয়, ওদের বাবাভাইবোন সবাই উপোস আছে। তাই তো তারা সবাই শুধু ডাল আর ভাত দিয়ে এ দিনের চরম ক্ষুধা নিবারণ করলো।

তাদের মনের কষ্টটা শুধু তারা নিজেরা জানে আর জানলো রাতের অন্ধকার। কারণ ও বাড়ি হতে আসবার সময় আর কেউ কোনো কথা বলে নাই। নীরবভাবেই সবাই চলে এসেছে তাদের কাছে বিদায় নিয়ে। সবারই চিন্তা শুধু রাতে আজ তাদের অপেক্ষার অবসান হবে কি??

১১/০৮/১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s