ভ্রান্ত কৌশলেই বার বার পরাস্ত হচ্ছে বিএনপি!

Posted: অগাষ্ট 7, 2015 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: আহমদ জসিম

Flag_of_Bangladesh_Nationalist_Partyকার্যত বিএনপি এখন কোথাও নেই! নেই ক্ষমতায়, নেই বিরোধী দলে, নেই আন্দোলনের মাঠে, নেই সংলাপের টেবিলে। নেই মানে দলটার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। বরং আজও সরকারের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের নাম বিএনপি। আজও কোটি কোটি কর্মী, সমর্থক নিয়ে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক শক্তির নাম বিএনপি। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই প্রশ্ন আসে যে দলের এত জনসম্পৃক্ততা, এত বিশাল কর্মীবাহিনী; তার এমন করুণ হাল কেন হল? এই কেন এর উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের দলটার রণকৌশলের দিকে একটু নজর দিতে হবে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর থেকেই আমরা দেখে আসছি বিএনপিআওয়ামীলীগ এই দুই দলের পাল্টাপাল্টি ক্ষমতার পালাবদল। দেখেছি যে দল ক্ষমতা যায় তাদের সীমাহীন দুর্নীতি আর ভয়ানক গণবিচ্ছিন্নতা, দেখেছি ৮ম সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ী দল বিএনপি নবম সংসদ নির্বাচনে ভয়াবহ পরাজয়। আবার দশম সংসদ নির্বাচনও যদি অবা, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষভাবে হতো, তবে সেই নির্বাচনে যে আওয়ামীলীগের ভয়ানক ভরাডুবি হতো সেই ধারণা আমরা নানা জনমত জরিপ আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে ধারণ করতে পারি।

কিন্তু ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অংশ। দশম সংসদ নির্বাচনে সেই সংস্কৃতির জয় হয়েছে। তবে এই অসুষ্ঠুসংস্কৃতির জন্ম তো বিএনপিই দিয়েছে। জনগণ এত দ্রুত ইতিহাস ভুলে যাবে, এটা মনে করার কোন কারণ নেই কারণ নেই বেগম জিয়ার সেই ঐতিহাসিক উক্তি ভুলে যাবার, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয় সেই সাথে একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতাই যাবার ইতিহাসও। এই ইতিহাস যদি দূর অতীত বলেও মনে হয়, তবে নবম সংসদ নির্বাচনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। যেখানে তিনি ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে রাখার জন্য সমস্ত রকম ষড়যন্ত্রের ষোলো কলাই পূর্ণ করেছিলেন! যখন বিএনপি ক্ষমতায় যাবার পালা আসলো, তখন দলটা সেই সংকটের মুখোমুখিই হলো, যে সংকটে তিনি সরকারে থাকার সময় বিরোধী দলকে ফেলেছিলেন। ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেল। একটি সুষ্ঠু, অবা, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলার যে নৈতিক শক্তি দরকার, দলটা সে শক্তি হারিয়ে ফেলল। সত্যি কথা বলতে কি, যে কোন আন্দোলন সংগ্রাম রাজনৈতিক কর্মীরাই করে এটা যেমন সত্য, ঠিক একইভাবে সত্য হচ্ছে, নানা মত পথের সাধারণ মানুষের সমর্থন ছাড়া কোন আন্দোলনই সফল হতে পারে না। যে কারণে ব্যর্থ হলো বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক দাবি। তা ছাড়া জনগণ তার পূর্বের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝে গেছে: বিএনপির এই আন্দোলন ক্ষমতার মসনদে বসার আন্দোলন, এর মধ্যে জনগণের কোন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার, নেই। পাঁচ বছর বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তারা কোন জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে কর্মসূচি দিতে পারেনি

আমার স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তবে বলতে পারি, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির প্রথম আন্দোলনের ইস্যু ছিল সংসদের সামনের সারিতে আসন পাওয়া নিয়ে, এরপর বেগম জিয়ার বাড়ি রক্ষা, তারেক জিয়ার মামলা প্রত্যাহারের মতো কর্মসূচিগুলো পেরিয়ে শেষে আসলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্ন। অথচ আওয়ামীলীগের তার প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছরসহ সাত বছরের শাসনকালে যা যা ঘটেছে এবং ঘটছে তার প্রত্যেকটা ইস্যু নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলা যেত। অপরদিকে, জামায়াত আন্দোলনের নামে দেশে যত রকম নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, তার সমস্ত দায় ভার বিএনপি তার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। জামায়াতের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থা ছিল অনেকটা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের মতো। কিন্তু সেই কৌশলেও তারা ভয়াবহ রকমের ধরা খেয়েছে, নিজের নাক কেটেছে ঠিকই, কিন্তু অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে পারেনি। বরং উল্টা নিজের যাত্রাটাই ভঙ্গ হয়ে গেছে। যে আমেরিকা জামায়াতের মতো একটা ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক দলকে মডেরেট ইসলামি দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেই আমেরিকা ও তাদের মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নই আজ প্রশ্ন তুলছে বিএনপি সাথে জামায়াতের গাঁটছড়া বাঁধা নিয়ে। ক্ষমতার মোহে তারা ভুলে গিয়েছিল আমেরিকা যার বন্ধু, তার কোন শত্রুর প্রয়োজন নেই! তারপরও বিএনপি বিশ্বাস ছিল তার দীর্ঘদিনের মিত্র আমেরিকা বোধ করি একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতাই আসা সরকারকে স্বীকৃতি দেবে না। এরবাইরেও আমেরিকাকে বসে রাখার জন্য উপঢৌকন হিসেবে বিএনপি হাতে তখনও ছিল, টিফফা চুক্তির মতো একটা লোভনীয় প্রস্তাব। কিন্তু সব হিসেবনিকেশ পাল্টে গেল, বিএনপি ক্ষমতার জন্য যেমন দেশের সমস্ত স্বার্থ বিক্রয় করে দিতে পারে বিদেশি প্রভুর কাছে, একই ব্যাপারে আওয়ামীলীগই বা কম কীসে! তাই তারা ক্ষমতা ছেড়ে পুনঃনির্বাচিত হবার আগেই আমেরিকার সাথে সেরে ফেলল টিফফা চুক্তিটা। আর আমেরিকার অবস্থার ক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটা প্রবাদ বিড়াল কালো হোক আর সাদা হোক, ইঁদুর ধরতে পারলেই হলো। বিএনপির রণকৌশল জনগণের উপর আস্থা না রেখে বিদেশি প্রভুকে তুষ্টি রাখার কৌশল; এভাবেই ভয়ানক মার খেল। শুধু তাই নয়, কথা জো দিয়ে বলা যেতে পারে বিএনপি জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ভারত বিরোধিতা। সাম্রাজ্যবাদী ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রবল জনমত শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং ভারতের সমস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রর মধ্যেই আছে। আমরা যদি একবার নেপালের দিকে লক্ষ্য করি তা হলে দেখব, সেখানে মাওবাদী রাজনীতির ব্যাপক উত্থানের অন্যতম কারণ নেপালের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী ভারতের প্রভুত্ব মেনে নেওয়ার ফল। ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী জনগণের সেন্টিমেন্টটা জেনারেল জিয়া ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি ক্ষমতাই বসে প্রথম নির্বাচনি সভাতে স্লোগান তুললেন: ভুটান নয়, সিকিম নয়, এদেশ আমার বাংলাদেশ! স্লোগানটা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে পড়ল। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল একেবারে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত। অথচ বিএনপির বহুদিনের বহু মূল্যবান সেই অস্ত্র বেগম জিয়া ছুঁড়ে ফেলল এক দিনেই! মোদি সফরের সময় বেগম জিয়া জো গলায় বলে বসলেন বিএনপি ভারতবিরোধী রাজনীতি করে না! তাঁর কথা শুনে চমকে উঠল বিএনপির সমস্ত সাধারণ কর্মী সমর্থক।

এ কথা সত্য যে আজকের যুগে কোন বুর্জোয়া দলের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা নেওয়া সম্ভব না, তবুও রাজনৈতিক কৌশল বলে কিছু কথা থাকে, সেই কৌশলেই বার বার মার খাচ্ছে বিএনপি। বেগম জিয়া হয়তো ধারণা করে ছিলেন তার এই কথার মধ্যদিয়ে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কিছুটা অনুগ্রহ আদায় করে নিতে পারবেন। ভাবনা হিসেবে এটা কতটা দুর্বল ছিল, বিএনপি এখন নিশ্চিতভাবেই টের পাচ্ছে। বিএনপি আরেকটা বড় কৌশলগত পরাজয় হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এমন ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামীলীগের ক্ষমতা আসা এবং উপজেলা নির্বাচনে নিশ্চিত ভরাডুবি দেখার পর কেন্দ্র দখল, সন্ত্রাস আর ভোট জালিয়াতি করে ফলাফল নিজের অনুকূলে নিয়ে যাওয়া! এত কিছু উদাহরণ হিসেবে সামনে থাকার পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে জোরালো অবস্থান না নিয়ে কোন যুক্তিতে বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিল? এটা তাদের সাধারণ নেতাকর্মীদের বোধগম্যতার মধ্যে পড়ে না। তারপরও সিটি নির্বাচনে জালিয়াতি নয় রীতিমত ভোট ডাকাতি হবার পরও বিএনপি কার্যকর কোন আন্দোলনই গড়ে তুলতে পারল না। এই না পরার সবচেয়ে বড় কারণ নিহিত আছে তার রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে আমরা সাম্প্রতিক উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া গোপন নথি থেকে দেখছি, বিএনপি তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য, একবার ধরনা দিচ্ছে সৌদি আরবের কাছে, একবার মার্কিনিদের কাছে তো আরেকবার ভারতের কাছে। অথচ বাস্তবতা হলো সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে কে ক্ষমতা আছে এটা বড় কথা নয়, বরং তাদের স্বার্থগুলো ঠিকঠাক মতো উদ্ধার হচ্ছে কি না এটাই বড় কথা। আর কে না জানে একটা অনির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে যত সহজে সবকিছু আদায় করে নেওয়া যায়, নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সে সবকিছু আদায় করা একটু হলেও কঠিন হয়। বিএনপি যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করে, কিংবা যে ভূখণ্ডে ক্ষমতার মসনদে বসতে চান, সেই ভূখণ্ডের মানুষের দিকে না তাকিয়ে তাকিয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকে। তাই আজ হাসানুল হক ইনুর মতো খুদ খাওয়া নেতাও জো গলায় বলতে পারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে বেগম জিয়াকে অংশ নিতে দেব না! শুধু তাই নয়, আজ রাজনৈতিক সচেতন মহল থেকেও প্রশ্ন উঠছে বিএনপি কি তবে বিলীন হয়ে যাবে? প্রশ্নটা আরো জোরালো হয়, যখন দেখা যায় বিএনপি মাঠ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীদের নানা মামলার জালে জড়িয়ে আওয়ামীলীগ হয়তো আত্মকীয়করণ করে নিচ্ছে, নয়তো নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে। অথচ একটা দলের মূল শক্তির উৎস কিন্তু এই মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই। বিএনপি সত্যি বিলীন হবে কি হবে না, এটা গভীর রাজনৈতিক ভাবনার বিষয়। সেই বিষয় নিয়ে না হয়, আরেকদিন কথা বলা যাবে।

————————

লেখক :: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

ahmodjasim@yahoo.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s