লিখেছেন: সৌম্য মণ্ডল

indian-media-and-army[মূল্যায়ন পত্রিকার তরফে ত্রয়ন দা আমাকে নেপালের ভূমিকম্প :: একটি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে বলেছে। দীর্ঘ দিন ঝুলিয়ে অবশেষে লিখতেই হল। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে গেলে সেটা অবধারিতভাবেই রাজনৈতিক মতামত হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু মুশকিল হল এই যে নেপাল সম্বন্ধে আমার যানা বোঝা হল কিছু বই পড়া ভাসা ভাসা জ্ঞ্যান আর গত ভূমি কম্পের সময় ইউএসডিএফ United Students’ Democratic Front (USDF)-এর তরফে নেপালে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে গিয়ে যেটুকু নেপাল দেখা। মাও সেতুঙএর ভাষায় যাকে বলে ঘোড়ায় চড়ে ফুল দেখা। মাওএর মতে, কোন বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান না করে সেই বিষয়ে মতামত দেওয়ার কোন অধিকার থাকে না। আর এই বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ স্টাডি আমার নেই। ফলে লেখাটি একটি অহেতুক অকারণ অগভীর প্রবন্ধে পর্যবসিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আজ কাল কথিত মূল ধারার অধিকাংশ রাজনৈতিক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে যা হয় আরকিতবুও এইটুকু সময়ের মধ্যে যা দেখাজানাবোঝা (ভুল বা সঠিক) সেটা পাঠককে জানাবার সুযোগ পেলে মন্দ কি? বাকি বিচার পাঠকের উপরই ন্যস্ত থাকলো।।]

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপালে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে গিয়ে আমরা যে সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক আবেদন রেখেছিলাম সেটা উল্লেখ করা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। কারণ নেপালে যাওয়ার আগের এই সংক্ষিপ্ত আবেদনপত্রের বক্তব্যই এই প্রবন্ধের ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে। আমাদের আবেদনপত্রটি ছিল ভূমিকম্পের কারণের সাথে মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্রাজ্যবা্‌দ, সামন্তবাদ, শ্রেণীবিভক্ত সমাজ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনকিছুর সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আচ্ছে কিছু মহাদেশীয় প্লেটের, যে প্লেট ২ খানার চাপে টেথিস সাগর থেকে হিমালয় এর সেই কোন কালে জন্ম, আর এখনও সেই প্লেটের চাপেই বাড়ন্ত বাচ্চার মতো বেড়ে চলেছে বৃদ্ধ হিমালায়, আর এটাই এই অঞ্চলের ভূমিকম্প প্রবণতার কারণ। এই ব্যাপারটা একজন স্কুল ছাত্রও জানে। কিন্তু ভূমিকম্প পরবর্তী ব্যাপারগুলোর সাথে অবশ্যই একদল স্বার্থান্বেষী মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের সম্পর্ক আছে। তাইতো কেউ নেপালে ধর্মগ্রন্থ পাঠায়, কেউ বা ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে গরুর মাংস খাওয়া, মেয়েদের ছোট পোশাককে দায়ী বলে প্রচার করে। আর প্রত্যেকবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বড় বড় দেশগুলো মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নামে কি করে সেটাও গোটা দুনিয়া জানে। এই দুনিয়া নাকি গিভ এন্ড টেকএর অমোঘ নিয়মে চলে। কিন্তু আমরা দেখলাম ভূরাজনৈতিক, বিদেশনৈতিক, ধারের (ঋণ) ফাঁদ ইত্যাদি উদ্দেশ্য ছাড়াই; এবারো ঐতিহাসিক ধারা মেনেই সারা দেশ থেকে মূলত ছাত্রছাত্রীরা ত্রাণ সংগ্রহ করেছে, অনেকে বারবার ছুটে যাচ্ছে নেপালে। অন্যদিকে, সরকারি এবং বিদেশী উদ্ধার কাজ, ত্রাণবণ্টন শুধুমাত্র রাজধানী কাঠমন্ডুকেন্দ্রিক। গ্রামাঞ্চলে ত্রাণ বা উদ্ধার কাজ শুরুই হয়নি এমনটাই খবর স্থানীয়সূত্রে। আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের সংগ্রহ করা ত্রাণ নিয়ে নেপাল যাচ্ছি। যাচ্ছি গ্রামাঞ্চলে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে। যদিও এই দলটি উদ্ধার কাজে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নয়; তবুও নেপালি কৃষকমজুরের ডাকে তাদের সাথে কিছুদিন পুনর্গঠন ও উদ্ধার কাজে হাত লাগাতে যাওয়াটা আমরা কর্তব্য মনে করছি। তারা জানিয়েছে যে, স্বেচ্ছাসেবক দরকার। আমারা আহ্বান জানাচ্ছি স্বেচ্ছাশ্রম দিতে নেপাল চলো। দাবি জানাই, অবিলম্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারি দলগুলোকে গ্রামের দিকে পাঠানো হোক। যারা যেতে ইচ্ছুক তারা যোগাযোগ করতে পারো আমাদের সাথে। আর যাদের পক্ষে কোনো কারণে এখন যাওয়া সম্ভব নয়, তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও, ব্যাটারি, ত্রিপল, ফ্লেক্স, কম্বল, টাকা পাঠাও।

usdf-nepalনেপালে যাওয়ার আগে দুধরনের সূত্র থেকে আমরা খবর পাচ্ছিলাম। ১) নেপালের বন্ধুদের কাছ থেকে টুকরো টুকরো খবর; ) মূলত সংবাদ মাধ্যম থেকে। খবরের কাগজে পড়েছিলাম, এখন নেপালে পানীয় জলের দাম ৪০০ টাকা প্রতি লিটার। আমরা পিছিয়ে পড়তে চাইনি; তাই নিজেদের জন্য জলের পেটি নিয়ে গিয়েছিলাম, আর কেউ কেউ চিন্তায় পড়ে গেছিল স্থানীয় পিপাশার্থ মানুষ জল খেতে চাইলে এই সীমিত জল নিয়ে কিভাবে সামাল দেওয়া যাবে! আরও চিন্তা বেড়ে গেলো যখন কিনা আমরা দেখলাম যে, নেপাল পৌছবার আগেই আমরা ১৪ জন সব জল খেয়ে ফেলেছি। সুতরাং নেপালে ঢুকে যখনি সুযোগ পাচ্ছিলাম আমরা জল ভরে নিতে শুরু করাম। এইভাবে জল খেতে খেতে আর ভরতে ভরতে আমরা কাঠমন্ডু পৌঁছে গেলাম। কাঠমন্ডুর দেওয়ালে দেওয়ালে তখন পোস্টার সাঁটা indian media go back”। খবরে আরও পড়েছিলাম যে, নেপাল সরকার নাকি যাবতীয় বিদেশীদের বের করে দিচ্ছে। মনে শঙ্কা ঘনীভূত হলো। কমরেডদের সাথে যোগাযোগ করে চলে তো এসেছি, কিন্তু আমাদেরও বের করে দেবেনাতো! দেখলাম কিছু দোকান খোলা। ফ্রিজে জলের বোতলও রাখা আছে। ভয় ও কৌতূহল নিয়ে ১ লিটার জলের দাম জিজ্ঞাসা করলাম। দোকানদার ১ টি ঠাণ্ডা জলের বোতল এগিয়ে দিলো, এবং চেয়ে নিল নেপালি ২০ টাকা (স্মৃতি যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকে)। ভারতীয় ১ টাকা = .৬ নেপালি টাকা। অর্থাৎ ১২.50 ভারতীয় টাকা মাত্র!

কাঠমন্ডুতে Radical Students’ Union-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড সন্তোষকে প্রথমে জলের ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করলাম। ও আমাকে পাল্টা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলো যে, নেপালে কোথায় ৪০০ টাকা জলের লিটার? আমি বললাম যে, ভারতে প্রথম সারির সংবাদপত্রে পড়েছি। ছাত্রনেতা উদ্ধত ভঙ্গিতে হেঁসে উত্তর দিলো, আমরা পুরো ভারতকে খাওয়ার জল সাপ্লাই করতে পারি। নেপাল হলো জলের রিসোর্স। বাস্তবিকই আমরা স্যলং নামে যে প্রত্যন্ত গ্রামে স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়ার জন্য ছিলাম, বা যেকটা গ্রামের উপর দিয়ে গিয়েছি বা থেকেছি সব জায়গাতেই জল সরবরাহ ছিল। গ্রামগুলোয় কয়েকটা পাইপ আছে যেখান থেকে গ্রামবাসীরা ২৪ ঘণ্টা জল পায়।

সন্তোষ বললো, এখানে জাতীয়তাবাদী ও বাম ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভারতীয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। আমি বললাম, হুম দেখলাম। কিন্তু ব্যাপারটা কি? সন্তোষ ভারতীয় মিডিয়া দেখাচ্ছে যে, নেপাল সরকার বা নেপালের মানুষ কিছুই করছে না, সব উদ্ধার কাজ নাকি ভারত করে দিচ্ছে। আমি করছে না? সন্তোষ জবাব দিলো, ভারতের উদ্ধারকারী দল শুধুমাত্র ভারতীয়দের উদ্ধার করেছে, একজন নেপালিকেও উদ্ধার করেনি। আর ভাঙ্গা বাড়ির পাথর হাতে নিয়ে সেলফি তুলে বাড়ি চলে গেছে।

usdf-nepal-2সাথে অনেকখানি ত্রাণ সামগ্রী থাকার কারণে রক্সলে বর্ডার পার করার সময় ভারতীয় সীমানায় আমরা একদিনের হয়রানির সম্মুখীন হই। সরকারী দপ্তরগুলো টাঙ্গায় মালপত্র সহ আমাদের সাথে ফুটবল প্র্যাকটিসএর মতো পাসপাস খেলছিল মনে হচ্ছিল। অবশেষে মাননীয়া এসডিওএর সহায়তায় আমরা ত্রাণ সমেত নেপালে ঢুকতে পারি। আমরা হাওড়া থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে নেপালে ত্রাণ কার্যের জন্য ৭টা সংরক্ষিত বগি দেখেছিলাম, ফলে বেশ আরামেই রক্সল পৌঁছেছিলাম। কিন্তু তারপর এই অভিজ্ঞতা হবে ভাবা যায়নি। যাই হোক, আমরা যখন এসডিও অফিসের বাইরে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন সাংবাদিক (অথবা পুলিশের গুপ্তচর!) পরিচয় দিয়ে কয়েকজন এসে কিছু প্রশ্ন করে, আর কিছু কথা বলে চলে গেলেন। ওরা বলছিল নেপালে এখন এন্টিইন্ডিয়া মুভমেন্ট চলছে। ওরা এখন আমাদের সাহায্য নিতে চাইছে না, এতোদিন আমাদের খেয়ে এখন চীনের দিকে ঢলেছে। এর পিছনে চীনের হাত আছে। দেখো তোমাদের ঢুকতে দেয় কিনা। best of luck”। টের পেলাম যে, নেপালে ভূমিকম্প আর ত্রাণকে কেন্দ্র করে বৃহৎশক্তি, মূলত ভারতচীনএর আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। আর চীনভারত দ্বন্দ্বের অর্থ শুধুমাত্র চীনভারত দ্বন্দ্ব নয়। অতীতে এটা ছিল সমাজতান্ত্রিক শিবির বনাম আমেরিকা নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শিবিরের দ্বন্দ্ব। আর আজ সেটা আদতে লাল ব্যানারে উঠতি পুঁজিবাদী শক্তি চীনের সাথে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব।

তিব্বত নেপাল হয়ে চীনভারত ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেক পুরনো। ভারতের সাথে চীনের যোগসূত্র হিসবে কাঠমন্ডুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আর স্বাবাভিকভাবেই যুযুধান দুই দেশের দড়ি টানাটানিতে বারবার নাজেহাল হতে হয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় গরিব দেশ নেপালের জনতাকে। নেপাল ও চীন বর্ডার দুরলঙ্ঘ হিমালয় দিয়ে ঘেরা। অন্যদিকে উত্তবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, উত্তারাঞ্চলে কমবেশি ১৮০০ কিলোমিটারের বর্ডার। যার মধ্যে আছে মাধেসীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমভূমি। ঐতিহাসিকদের মতে ১৭৬৯ সালে পৃথ্বী নারায়ণ শাহের আমলে নেপালে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়ার সময় থেকে আধুনিক নেপালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৭৭৭ থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত পরপর ২ জন এমন রাজা হন; যারা নাকি সিংহাসনে বসার সময় ছিলেন নাবালক। নাবালক রাজাদের পুতুলের মতো ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে দলাদলি, দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। অবশেষে থাপা পরিবারকে পরাজিত করে সামন্ততান্ত্রিক রানা পরিবার একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজাকে ঠুঁটো বানিয়ে তারাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, এমনকি রাজা বাধ্য ছিলেন রানা পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে। এই বৈবাহিক সম্পর্ক ও ব্রিটিশদের সাথে বন্ধুত্বকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর পদটি বংশানুক্রমিক করে নেয়। রানা পরিবার ১৮৬০ সালে ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করে যে, ব্রিটিশরা রানাশাহীকে সুরক্ষিত করবে, তার বিনিময়ে ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোর্খা ইউনিটে নেপালি সেনা নিয়োগের অনুমতি কাঠমন্ডুকে দিতে হবে। ভারত থেকে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর নেপালের জনগণের সংগ্রাম শাসকশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তোলে। বিপন্ন হয়ে পড়ে রানাশাহী। ১৯৫০ সালে ভারতের শাসক দলের আশীর্বাদধন্য নেপালের সামন্ত ও বুর্জোয়াদের দল নেপালি কংগ্রেস রাজপরিবারের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বিদ্রোহের সূচনা করলো। এই বিদ্রোহের ফল হিসেবে ১৯৫১ সালে রাজা, রানা পরিবার ও ভারত সরকারের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে বংশ পরম্পরায় প্রধানমন্ত্রীত্ব বাতিল হলো, পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হলো এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া, ডিক্রি জারী করে শাসন করার ক্ষমতাসহ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হন রাজা এবং তত্বাবধায়ক হিসেবে ভারতের ভূমিকা কে নিশ্চিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় নেপালি কংগ্রেস রাজার মন্ত্রীসভায় মন্ত্রিত্ব করেছে, কখনো ক্ষমতা ভাগ করে নিয়েছে সিপিএন (এউএমএল) সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে। আবার প্রয়োজন মতো রাজা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নিজের হাতে সমস্ত স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে। ১৯৫৯ সালে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেস। নেপালি কংগ্রেসএর আমলে ভারতের প্রাধান্য আরও জোরদার হয়। অনেকগুলো অসম চুক্তির মাধ্যমে নেপালের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিশাল জলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার তুলে দেওয়া হয় ভারতের শাসকশ্রেণীর হাতে। ভারতের জোর এমনই ছিলো যে, নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র সংঘে নেপালের সদস্যপদ দেওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার বিরোধিতা করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে বড় ভাই ভারতের সদস্যপদ তো আছেই।

বড় ভাই ভারত তার প্রতিদানও দিয়েছে। ১৯৫২৫৩ সালে কমিউনিস্ট নেতা ভিমদত্ত পন্থএর নেতৃত্বে সামন্ততান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃষকজনতা সশস্ত্র বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। এই উত্তাল কৃষক বিদ্রোহ দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিল রাজার বাহিনী। এরপর ভারতীয় সেনা নেপালে ঢুকে কৃষক বিদ্রোহ দমন করে বর্বরতার সাথে কমিউনিস্ট নেতা ভিমদত্ত পন্থকে হত্যা করে নেপালের শোষক শ্রেণীকে সুরক্ষিত করে। স্বাবাভিকভাবে নেপালের মূল ধারা রাজনিতির বিপরীতে যে শ্রমিক কৃষকের যে বিকল্প রাজনীতি (যা কথিত মূল ধারা থেকে শক্তিশালী) আছে; তা অবশ্যই সামন্ততন্ত্রভারতের সম্প্রসারণবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। ২০০৬ সালে প্রকাশিত নেপাল কোন পথেনামে নাতিদৈর্ঘ্য পুস্তিকায় দিলিপ গুহ সেই সময় মাওবাদী পরিচালিত রাজতন্ত্রবিরোধী জনযুদ্ধ বা গণসংগ্রামের পটভূমিকায় একটি অনবদ্য ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। উৎসাহী পাঠক মতাদর্শে অগ্রণী প্রকাশিত এই পুস্তিকাটি পড়ে দেখতে পারেন। এটি সস্তা ও পুষ্টিকর।

সন্তোষ বলছিল ভারত এই ভূমিকম্পের সুযোগে কাঠমন্ডুতে বায়ুসেনার স্থায়ী শিবির বানাতে চাইছে, এর আগে কাঠমন্ডু থেকে বিমান হাইজ্যাকের সময়েও এরকম চেষ্টা করেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে, সেটা কেন করতে চাইছে বলে মনেহয়? কি সমস্যা হতে পারে? সন্তোষ কেন মানে? আমরা একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, আমাদের দেশে বিদেশী সেনা ছাউনি কেন হবে? নেপাল যদি দাবি করে দিল্লিতে সেনা ছাউনি বানাবে, ভারত সরকার কি বানাতে দেবে? আমি বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন কি ভারতের মিডিয়ার বাড়িয়ে রঙ চরিয়ে খবর পরিবেশনের বিরোধী নাকি ভারত বিরোধী? সন্তোষ প্রথমত আমরা কোনোভাবেই ভারত বিরোধী নই, ভারতের জনগণের সাথে নেপালের জনগণের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক, ভারত থেকে নেপালে, নেপাল থেকে ভারতে অনেকে কাজ করতে যায়, দুই দেশে দুই দেশের মানুষের আত্মীয়রা থাকে, তেলেঙ্গানা, নক্সালবাড়ি, ছত্তিসগড়, লাল গড়আমরা ভারতের জনগণের বিপ্লবী লড়াইয়ের খোঁজ রাখি, সেটাকে সমর্থন করি। আমাদের সমস্যা ভারতের শাসকশ্রেণীর সাথে, আর ভারতীয় মিডিয়ার এই প্রচার নেপালের উপর ভারতের সম্প্রসারণবাদী শোষণনীতির অংশ। সন্তোষ মাওবাদী পার্টির প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে একজন মাতৃকা যাদবএর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। রাজার পতনের পর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রচণ্ডএর নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিলো, সেই সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মাতৃকা যাদব, পড়ে অন্যান্য আরও বহু মাওবাদী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের মতো তিনিও প্রচণ্ডএর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনেন ও অনাস্থা প্রকাশ করে জনগণের সাথে থাকতে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন, সম্ভবত মাতৃকাজীই প্রথম পদত্যাগ করেন, নেপালের মাওবাদী পার্টি এখন ৫/৬ ভাগে বিভক্ত। তার একটির নেতা মাতৃকাজী। কিন্তু সন্তোষ তো বর্তমান নেপালের কংগ্রেস সরকারের চরম বিরোধী, তবেকি ও ভারত সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে নেপালি সরকারের পক্ষ নিয়ে নিচ্ছে না? আমার মনে হলো, ওর ভাবখানা এরকম আমাদের দেশের সরকার, তার সাথে আমরা বুঝে নেব, ভারত সরকার নাক গলাবার কে? আর আমার মনে হয়েছে এটা শুধু সন্তোষের বক্তব্য নয়, এটা নেপালের জনতার বক্তব্য, যারা সামন্ততন্ত্র ও ভারতের সম্প্রসারণবাদবিরোধী ৬০ বছরের কমিউনিস্ট আন্দোলন বিশেষত ১৯৯৬২০০৬ অব্দি দীর্ঘ ১০ বছরের জনযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর দ্বিতীয় গরিব দেশের মেহনতি জনতা, যুব সমাজ তার আত্ম মর্যাদা নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে।

মাতৃকা, বিপ্লব, চাঁদ প্রমুখ নেতারা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে শ্রেণীশোষণ উচ্ছেদ করে সমাজতান্ত্রিক নেপাল গড়ার রাজনীতিতে আস্থা রাখেন, আবার জনযুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতিতে আছেন, তারা সেটা খোলাখুলি বলেও থাকেন। অন্যদিকে প্রচণ্ডবাবুরামরা এখানকার সিপিআই, সিপিআইএমএর মতো বুর্জোয়া কাঠামোয় জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার রাজনীতি করছেন বলে অভিযোগ তাদের, এমনকি মাত্র কয়েকবছর আগে প্রবল প্রচণ্ডবিরোধী কিরণের উপরেও আস্থা রাখছেন না। গত নির্বাচনে প্রচণ্ডবাবুরাম গ্রুপ বাদে বাকি সমস্ত মাওবাদী গ্রুপ নির্বাচন বয়কট করে, প্রচণ্ড এবং তার দলের লজ্জাজনক হার হয়, এবং দেখা যায় যে, ৭০% ভোট পড়েছে। বর্গিও ক্রান্তি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এস.বি.থাপার ব্যাখ্যা সেই সময় পার্টি ভেঙে গেছে এবং প্রচণ্ড ও তার পার্টি ইউসিএনএম মাওবাদীদের মধ্যে সংখ্যালঘু। তাছাড়া বয়কটপন্থীরা হিসাব করে দেখিয়েছিলেন যে, আদতে ভোট দিয়েছে ৩০% মানুষ।

মাতৃকা যাদব বললেন, ত্রাণ আর উদ্ধার কাজ সবই কাঠমন্ডুকেন্দ্রিক, তার উপরে দুর্নীতি, ত্রাণ নিয়ে কালোবাজারি চলছে, গ্রামের দিকে যারা প্রভাবশালী, যাদের যোগাযোগ আছে তারাই সুযোগসুবিধা যোগাড় করে নিতে পারছে। নিপীড়িত মানুষের অবস্থা খুবই খারাপ, আমাদের ৫ পার্টি (৫ মাওবাদী পার্টি, যারা অন্য সময়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা বা হঠকারিতার অভিযোগে খর্গহস্ত) এই সময়ে যৌথভাবে কিছু কর্মসূচি নিচ্ছে, কমরেডরা গ্রামাঞ্চলে উদ্ধার কাজ করছে, আর রাতে থাকার জন্য কিছু ঘর বানানো ইত্যাদি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

ভারতে বসে কাঠমন্ডুর যে চিত্র কল্পনা করেছিলাম ব্যাপারটা আদতে সেরকম নয়, অবস্থা খারাপ তবে যতটা খারাপ মিডিয়া, মূলত হিন্দি মিডিয়া দেখাচ্ছে, ততটা অবশ্যই নয়। কাঠমন্ডুতে মূলত ভেঙ্গেছে প্রাচীন স্থাপত্যগুলো। বহু বাড়িতে ফাটল দেখেছি আমরা। ফেরার পথে ১১ তারিখ কাঠমন্ডু ছিল একবারে স্বাভাবিক, কর্মচঞ্চল, যেন কিছুই হয়নি (যদিও পরের দিনই আরেকটা বড় ভূমিকম্প হয়, তখন আমরা ছিলাম সমতলে)

আমরা গিয়েছিলাম সিন্ধুপাল চক। মাতৃকাজী আমাদের বলেছিলেন যে, ভূমিকম্পে নেপালে যত মানুষ মারা গেছে, তার অর্ধেক মারা গেছে এই জেলায়। এটি হলো ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র। তবে সিন্ধুপাল চক জেলার অবস্থা ভয়াবহ, প্রায় সমস্ত বাড়ি ভেঙে গেছে, যেখানে সোজাভাবে দাড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোই মনে হচ্ছিল অস্বাবাভিক! অথচ মিডিয়া বা সরকারি বা বিদেশী সাহায্য এদিকে তেমন পা মারায়নি। যদিও সিন্ধুপাল চক জেলার প্রধান শহর (আমাদের কাছে সেটা মফস্বলের কোন পাড়া মনে হতে পারে) চৌতারাতে ইউএনএর ক্যাম্প দেখেছি, এই ক্যাম্প একটা নতুন জিনিস দেখলাম, আমরা রেডক্রসের কথা জানি, যার চিহ্ন হল ক্রস বা +” চিহ্নের মতো, কিন্তু এবার দেখলাম ক্রসএর পাশাপাশি কিছু পতাকায় লাল চাঁদ এর মতো চিহ্ন, তার তলায় লেখা রেড ক্রিসেন্ট। ডাক্তারি শিক্ষার ছাত্র অর্ক আমাকে বুঝিয়ে দিলো ব্যাপারটা। খ্রিস্টানরা যেহেতু ক্রস ব্যবহার করে তাই মুসলমানরা রেড ক্রস এর বদলে চাঁদের মত চিহ্ন দিয়ে রেড ক্রিসেন্ট বানিয়ে নিয়েছে। ভাবছিলাম যে সাহেবের ধর্ম হিসেবে খ্রিস্টান ধর্ম পরিচিত যদি না হত এবং তথাকথিত হিন্দু জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটা ব্রিটিশের কল্যাণে জন্ম না নিত, তাহলে হয়তো আমাদের দেশে রেড ক্রসএর যায়গায় রেড ওম বা রেড ত্রিশূল প্রচলিত হত। এই চৌতারার ক্যাম্পে দেখলাম ভারতের মাড়োয়ারি ব্যবসাদারদের সাহায্যে গণহারে তরকারি আর সুগন্ধি চালের ভাত খাওয়ানো হচ্ছে, নেপালি সেনা সেই ভাত পরিবেশন করছে। কাঠমন্ডুতে দেখেছিলাম নেপালি সেনা দক্ষতার সাথে পুরোদমে উদ্ধার কাজ করছে, তারপর এই চৌতারাতে দেখলাম সেনা খাবার পরিবেশন করছে, এরপর সেনা দেখেছিলাম স্যলং গ্রামে, (যে গ্রামে আর আশেপাশের গ্রামে আমরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছিলাম) এখানে মানুষ সেনাদের নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে, সেনা নাকি কিছুই করেনা। সেনা ছাউনিটি ছিল একটি ভূমিকম্প বিদ্ধস্ত স্কুলে, আমরা এই স্কুলটাকে পরিস্কার করে বই সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধার করছিলাম, দেওয়াল চাপা পড়া বইয়ের আলমারি থেকে আরও অনেক নেপালি পাঠ্যপুস্তকের সাথে কয়েক খণ্ড মার্ক্সএঙ্গেলস রচনাবলী, বিশেষত ১ কপি গীতাঞ্জলী দেখে বিশ্বভারতীর ছাত্র কমরেড শুভদীপ, টিপু রীতিমতো পুলকিত হয়ে উঠেছিল। গ্রামের মানুষের সাথে ছাত্রছাত্রীরা যখন কাজ করছিলো, তখন দেখা গেল যথারীতি সেনারা হাতে পাথর ধরে গ্রুপ সেলফি তুলে আবার আড্ডা দিতে চলে গেলো।

বাস্তবিকই কাঠমন্ডুর বাইরে রাজার শাসন ছিল না। ২০০৪ সালে নেপালের ৮০% অঞ্চল ছিল মাওবাদী প্রভাবিত। এই অঞ্চলগুলোতে চলতো সমান্তরাল সরকার, কমিউনও চলতো বহু। এখনো দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নেপাল সরকারের প্রভাব বা নিপীড়িত জনতাকে সেবার আগ্রহ কোনটাই নেই, বেশীরভাগ অঞ্চলই মাওবাদীদের কোনো না কোনো গ্রুপ প্রভাবিত, অন্যদিকে রাজাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার সময় সমান্তরাল সরকার এমনকি কমিউনগুলো পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়। গ্রামগুলোতে পার্টির উদ্যোগে কাঠ আর টিন দিয়ে কিছু অস্থায়ী ঘর বানানো হয়েছে। এক মধ্যবয়স্ক গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আগের থেকে এখন তো শান্ত, কি মণে হয় জনযুদ্ধের থেকে এখন ভালো সময়? উনি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, রাজার সেনা এদিকে ঢোকার সাহস করতো না। ওরা ঐ কাঠমন্ডুর আশেপাশে ঘুরপাক খেতো। এদিকগুলো মোটামুটি শান্তই ছিল। তবে বিপ্লবী গণকমিটি (মাওবাদী ও অঞ্চলের অন্যান্য দল বা প্রগতিশীল ব্যাক্তিদের নিয়ে গঠিত সমান্তরাল প্রশাসন)-র সময় জনগণ সিদ্ধান্ত নিতো, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনতাকে জানানো হতো, মতামত নেওয়া হতো। এখন প্রশাসনের সাথে জনতার কোনো সম্পর্ক নেই, নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেরাই লাগু করে বা করেনা, জনগণকে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। দেখছেন না, ত্রাণ নিয়ে কী হচ্ছে। আমরা পেপারে পড়েছিলাম যে, মানুষ নাকি ত্রাণের জন্য হামলা করে জিনিসপত্র লুট করে নিচ্ছে। এরকম ঘটনার কথা নেপালেও শুনলাম, তবে এরকম কোথায় ঘটেছে কেউ সেটা বলতে পারলো না।

দোকানে খেতে গিয়ে আমরা ভারত থেকে এসেছি শুনে একজন জিজ্ঞাসা করলেন, মোদীজীর লোক? আমি বললাম, আমরা ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা এসেছি, সরকার থেকে আসিনি। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন কমবয়সী যুবক আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, জ্যোতি বসুর নাম শুনেছেন? আর চারু মজুমদার? এবং তিনি প্রাণপণে আমাকে বুঝিয়েই ছাড়বে কেন জ্যোতি বসু ভূল আর চারু মজুমদার ঠিক, আমি বুঝলাম যে, ছেলেটি ভারতের এই দুই বাঙালিরই নাম জানে। আমাদের সাথে দেখা হয়েছিল জনগণতান্ত্রিক রেডিও(বর্তমানে লুপ্ত) এক সাংবাদিকের সাথে, ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেড়িয়ে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন ইনি। শুধু সাংবাদিক নন, এক সময়ে বন্দুক কাঁধে যুদ্ধ, সংগঠন সবই করেছিলেন। জনগণতান্ত্রিক রেডিও এক সময় মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল থেকে প্রচারিত হতো প্রতিদিন ১৫ মিনিটের জন্য, বিষয় হিসেবে থাকতো রাজার সরকারের নীতির সমালোচনা, বিতর্ক, যুদ্ধ, কৃষি ও সমান্তরাল সরকারের অগ্রগতি সম্পর্কে খবর ইত্যাদি। প্রাক্তন সাংবাদিক বলছিলেন, নেপালে এখন প্রত্যেক গলিতে (পাকিস্থানের আইএসআই বা আমেরিকার সিআইএএর মতো ভারতের গুপ্তচর সংস্থা) তাছাড়া অন্যান্য দেশগুলোর গুপ্তচর সংস্থাগুলোও আছে, ওরাই ঠিক করে নেপাল কিভাবে চলবে, ভূমিকম্পের সুযোগে এদের এক্টিভিটি অনেক বেড়ে গেছে। সাংবাদিক আরও বলছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট বলছে ৫ নেতার বিরুদ্ধে পুরনো কেসগুলো পুনরায় শুরু করবে আমি – “কিন্তু সবনেতাই যে কাঠমন্ডুতে দপ্তর খুলে বসে আছে! ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়? ওনারা তো যখন তখন গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারেন সাংবাদিক হেসে উত্তর দিলো – “ক্ষমতা থাকলে করে দেখাক। জনসমর্থনের জোয়ার এদের আত্মবিশ্বাসের উৎস, কিন্তু আমার মনে হলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস হয়তো এদের ডোবাবে, প্রত্যেক প্রথম সারির নেতা (যারা পুনরায় আত্মগোপন করে জনযুদ্ধ শুরু করবেন বলছেন তারাও) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষের মিছিল, মিটিংয়ে ভাষণ দিচ্ছেন, বিক্ষোভ সংগঠিত করছেন তাই শুধু নয় উপরন্তু কাঠমন্ডুতে পার্টি অফিস খুলে বসে আছেন! মাওবাদী পার্টি পরিচালিত গণমুক্তি ফৌজএর একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা বলছিলেন, প্রচণ্ড সব শেষ করে দিল, আগে যেখানে সেনা ঢুকতে পারতো না, এখন সেখানে সেনাবাহিনী শিবির খুলে বসে আছেতবে আমরা আবার যেদিন জনযুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেব ঠিক সেইদিনই ৪০% সেনা শিবির দখল নিয়ে নিতে পারবো, মানুষ এখানে রাজনীতি বলতে রাশিয়া বা চীনে লেনিনমাও যেভাবে বিপ্লব করেছিলেন সেটাই বোঝে, কিন্তু সমান্তরাল সরকার, কমিউন এগুলো একদিনে ফিরে আসবেনা, যা আমরা হারিয়েছি, এগুলো তৈরি হতে সময় লাগবে আমি – “কিন্তু পিএলএ (গণমুক্তি ফৌজ) এর কি হলো? তারা কোথাথায়? উনি উত্তর দিলেন, পার্টি ভাগ হওয়ার সময় যাবতীয় গণসংগঠনগুলোর মতো পিএলএও ভাগ হয়ে গেছে। কেউ সরকারি সেনাবাহিনীতে চাকরী করছে, কেউ দেশ বা দেশের বাইরে বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করতে চলে গেছে, কেউ চাষবাস করছে গ্রামে ফিরে। তবে অনেকেই বলেছে দাজু/দাদা (নেতা)-রা লড়াই শুরু করলে আবার ফিরে আসবে।

এতক্ষন শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র মাওবাদীদের কথা বললাম, একটা কারণ অবশ্যই বর্তমান লেখকের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। ২০০৪ সালে মাওবাদীরা যখন ১ সপ্তাহের জন্য কাঠমন্ডু অবরোধ করে পুরো দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিল, মনে হচ্ছিল এই বিপ্লব হল বলেকমিউনিস্টরা যদি এই সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারে, তবে আপসকামী ভণ্ড কমিউনিস্ট এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বা বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, যারা মনে করে সমাজতন্ত্র ইতিহাস হয়ে গেছে তাদের মুখে চুন কালি পড়ে যাবে, সেই সময় আমি সম্ভবত ক্লাস ৯এর ছাত্র, আরও অনেক কিশোরের মতো আমিও সাইবার ক্যাফেতে বসে লুকিয়ে নেপালের বিপ্লবের খবর সংগ্রহ করতাম, পড়তাম বিবৃতিগুলো, মনে হতো কমরেড প্রচণ্ড হয়তো এই যুগের লেনিন বা মাও। বিপ্লবের দোর গোঁড়া থেকে ফিরে আসায় আশাহত হয়েছিলাম, তবে নেপালের বিপ্লবী সংগ্রাম নিয়ে আবেগ তো ছিলই। তবে নেপালে গিয়ে ব্যাপারস্যাপার দেখে মনে হলো এখানে মাওবাদীরাই একমাত্র প্রধান শক্তি, বাকিরা সব দুধভাত। দেওয়ালে তার স্পষ্ট প্রতিফলন, খোঁজাখুঁজির দরকার নেই, বর্ডার ক্রস করে নেপালে ঢুকলেই চোখে পড়বে বড় বড় দেওয়াল লেখা নও জনবাদী ক্রান্তি জিন্দাবাদ নকপা (মাওবাদী) (নয়াগণতান্ত্রিক বিপব জিন্দাবাদ)। কাস্তে হাতুরির ছবি আর দেওয়াল লেখা সারা নেপাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। যদি ১০০টা দেওয়াল লেখা দেখে থাকি, তবে ৯০টাই মাওবাদী পার্টির প্রচণ্ডবিরোধী গ্রুপগুলোর, এছাড়া নকপা (এউ এম এল) বা নেপালি কংগ্রেসএর প্রাক্তন নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালার ছবি দেওয়া কিছু পোস্টার দেখেছি। বীরগঞ্জে ও কাঠমন্ডুতে ছাত্রছাত্রী দের আঁকা সামাজিক সথমান্দ এবং লড়াকু মেজাজের কিছু অসাধারণ গ্রাফিত্তি দেখেছি। আরও একটা বিষয় দেখলাম, আমাদের এখানকার লরি, ম্যাটাডোর ইত্যাদিতে যেমন কালি, দুর্গা, শারুখ, সালমান, মাধুরী দীক্ষিতের ছবি আঁকা বা লাগান থাকে, সেরকম ৪৫টা গাড়িতে ওখানে দেখলাম চে গুয়াভারা, বব মার্লে এবং রেড স্টারএর ছবি, কিছু ছাত্রকে দেখেছি রেড স্টার, কাস্তে হাতুরি আঁকা টি শার্ট পড়ে ঘুরে বেড়াতে। ২০০৬ সালে সংসদীয় গাড্ডায় না পড়ে বিপ্লব সফল হলে হয়তো আমরা সমাজতান্ত্রিক নেপাল দেখতাম, অন্য রকম অভিজ্ঞতা হতো। স্যলং থেকে ২ ঘণ্টা ক্লাইম্ব ডাউন করে বাস ধরে কাঠমন্ডু ফেরার সময় একটা ব্রিজ ক্রস করেছিলাম, ব্রিজের উপর যে গেট বা তোড়ন, তার মাথায় ছিল কাস্তে হাতুরি এবং ২টো রাইফেল ক্রস করে রাখা, তোড়নটা ১০ বছর আগের সমান্তরাল কমিউনিস্ট সরকারের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলা যেতে পারে। জানি ভূমিকম্পের আঘাত খুব জলদি নেপালের মানুষ জয় করে নেবেন, কারণ জীবন থেমে থাকেনা, জানি সংগ্রামের ধাক্কা কাটিয়ে আবার জেগে উঠবে নেপালের মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের যুদ্ধ। হ্যাঁ আমি নেপালের বিপ্লব নিয়ে আশাবাদী।।

পূর্বপ্রকাশ: মূল্যায়ণ পত্রিকা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s