নৈরাষ্ট্রিকতা :: মানবমুক্তির নার্সিসাস

Posted: জুলাই 19, 2015 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: অশোকবিজয়

eliminate-the-state-2লেখার জন্য ভাবনার প্রয়োজন পড়ে, আবার ভাবনা ব্যক্তিক বোধ দ্বারা তাড়িত হয়, যে কারণে সকল তাড়না লেখা হয়ে ওঠে না এবং সিংহক্ষেত্রে, বেপর্দা তাড়নায় হওয়া লিখাগুলো সুঠাম শক্তিমান না থেকে হয়ে পড়ে অক্ষর স‍‍র্বস্ব এই অক্ষরসর্বস্বতা সকল দশকেই কালের শরীরে রঙিন জরির মতো, ভীষণ চমকানো সত্য কিছু তাড়না অনেক ক্ষেত্রেই বোধের সুকুমার অবস্থা তথা শিল্পের বলয় ভেদ করতে না পারায় ভাবনাকে প্রভাবিত করে না ভাবনাহীন লিখায় তাড়নার যে স্বরূপ, তাকে বলে আবেগ। আবেগ হচ্ছে এমন একটি গুণ, যা মানুষকে মানবিক, অমানবিক এবং অতিমানবিক এই ত্রিবিধকল্পে পৃথক করে রেখেছে যেকোনো যন্ত্রসত্তা, জন্তুসত্তা এবং অদৃশ্য কল্পনাতুর নালৌকিক সত্তা থেকে ব্যক্তিক ভাব হচ্ছে সেই গূঢ় আদিগুরু, যা থেকে সমস্ত ভাবনার প্রকাশ ও বিকাশ এবং আবেগ হচ্ছে সেই ভাবসঞ্জাত দূরাতিক্রম্য গুণ। আবেগের স্বরূপ একই নয়; পাত্রভেদে এর বিভিন্নতায় স্থানিক প্রভাব থাকে, সময়সঞ্জাত কালিক অভিজ্ঞতার পরিমিতিবোধ থাকে এবং নি‍‍র্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে আবেগের প্রকাশ সময়ের তারতম্যে বিভিন্ন হয়ে থাকে। ভাবনার ক্ষেত্রে ভাবসঞ্জাত তাড়িত আবেগকে ডিমাউন্ট করতেই প্রাথমিক কথাগুচ্ছের অবতারণা।

আমাদের বসবাস পৃথিবী নামক যে গ্রহে সেটি দেখতে যতখানি সাধারণ (ধারকপ্রকৃতি) বলে বোধ হয়, তা ততধিক মাত্রায় জটিল অসীম মহাশূন্যে সংখ্যাতীত সৌর পরিবারের মধ্যে এটিও একটি পরিবারের সদস্য। এক একটি সৌর পরিবার সূ‍র্য, গ্রহ, গ্রহাণু, উপগ্রহ ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত হয়। সূ‍র্যকেন্দ্রিক এক একটি পরিবারকে বলা হয় সৌরজগৎ। এই মহাশূন্য এবং এর সৌরজগৎ আকস্মিক সং‍‍ঘর্ষের দরুণ সৃষ্ট এক মহাবিষ্ফোরণের ফসল। মহাবিষ্ফোরণের প্রায় দশ হাজার মিলিয়ন বৎসর পর আমাদের সূ‍র্য গঠিত হয়, তখন সূ‍র্যকে আবর্তন করতে থাকে ঘূ‍র্ণায়মান প্রকাণ্ড ধূমায়িত মেঘ; যা থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন গ্রহ এবং উপগ্রহ গঠিত হয়। সুতরাং বলা যায়, সমস্ত সৃষ্টি প্রক্রিয়া এক অনাবশ্যক দুর্ঘটনার ফল ভিন্ন আর কিছুই নয়।

নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণময়তার (Inorganic to Organic) উদ্ভব এবং তারপর জটিল থেকে জটিলতর বিবর্তন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আসে পিথেক্যানথ্রোপাস (Pithecanthropus) মানে, বানর সদৃশ্য মানুষ; এরও আগে, হোমো ইরেক্টাস (Homo Erectus) অর্থাৎ খাড়া মেরুদণ্ডধারী মানুষ। তারপর বহু সময়ের বহু জটিল ক্রমবিকাশ প্রক্রিয়ায় আসে বর্তমান আধুনিক মানুষের আকৃতি। বিবর্তন এমন একটি জটিল ধারা; যেখানে প্রত্যেক পূ‍র্ববর্তী পর্যায় তার পরবর্তী পর্যায় দৃষ্টে অপরিণত দশা (Premature Stage) হিসেবে বিবেচিত হয়। বিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং অনুমান ব্যতীত আমরা কেউ জানি না আমাদের বিবর্তিত পরবর্তী দশা কী হতে যাচ্ছে।

তবে মানুষ পৃথিবীতে আছে, এটি একটি প্রাকৃতিক সত্য। অন্যদিকে, যে প্রতিষ্ঠানটির মৌল উপাদান হিসেবে মানুষ অবিসংবাদিতভাবে বিবেচ্য অর্থাৎ রাষ্ট্র, এর কোনো প্রাকৃতিক ভিত্তি বা সত্যতা নেই। একটি সময়ে যূথবদ্ধভাবে মানুষ ঘুরে বেড়াতো, বসবাস করতো, খাদ্যসংস্থানের উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে বন্যপশু শিকার করতো। কেউ এক দল থেকে বেরিয়ে অন্য দলে অথবা দলছুট হয়ে আরেক দলে নিজেদের অবস্থান করে নিতো। প্রাচীন যুগে মানুষের দলবদ্ধভাবে বসবাস অবশ্যম্ভাবী ছিলো; কারণ একক প্রচেষ্টায় খাদ্যসংস্থান বা আত্মরক্ষা সম্ভবপর ছিলো না। সেইসময়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে হিংস্র এবং বন্যপ্রাণীদের মোকাবেলা করতো, দশ বা পনেরো জনের একটি দল যূথবদ্ধ হয়ে শিকার করতো এবং দলের প্রতিটি সদস্য তার নিজ নিজ খাদ্য চাহিদা মিটাতে সক্ষম হতো। মানুষের এই শ্রেণীহীন সম্মিলন এবং যূথবদ্ধ সংগ্রামী প্রচেষ্টা তাদেরকে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মানসিক এবং শারীরিক সাম‍‍‍র্থ্য জুগিয়েছে।

তাহলে মানুষের জন্য রাষ্ট্রের কেন প্রয়োজন পড়লো? রাষ্ট্র কি মানুষের সা‍র্বিক মঙ্গল বিধান করতে পেরেছে? রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশ কতোটুকু প্রগতিবান্ধব? রাষ্ট্রের উদ্ভব হচ্ছে কতিপয় স্বা‍র্থান্বেষী ব্যক্তিগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন এবং আধিপত্য বিস্তারের কূটকৌশলগত বাস্তবায়ন। রাষ্ট্র হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যেখানে মুষ্টিমেয় মানুষ দ্বারা একটি বিশাল জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে। কায়িক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র হচ্ছে শোষণনিপীড়নের হাতিয়ার। যখন রাষ্ট্র ছিলো না, মানুষ যূথবদ্ধভাবে বসবাস করতো, সেসময় প্রত্যেকে তার নিজ নিজ শ্রম দক্ষতার জন্য নিজ নিজ দলে মূল্যায়ন পেতো রাষ্ট্রিক প্রক্রিয়া মানুষকে তার শ্রমের মালিকানা থেকে রূপান্তরিত করেছে শ্রমদাসে এ এক দুর্লঙ্ঘ্য অদৃশ্য শৃঙ্খল যা মানব মুক্তির পথে এক সুবিশাল অন্তরায় হয়ে আছে। রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল মানুষই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শৃঙ্খলিত, তার চেতনা, বোধ সমস্তকিছুই অদৃশ্য স্থির বলয়ে আবদ্ধ। সুতরাং রাষ্ট্র প্রগতিবিরুদ্ধ এবং রাষ্ট্রস্থিত মানুষ কখনোই প্রগতির ধারক হতে পারে না; বা স্বাভাবিক প্রকৃতিগত সত্যকে তার চর্চায় নিয়ে আসতে পারে না। আধিপত্যবাদী চিন্তাধারায় এক পৃথিবীর বুক চিরে অসংখ্য ভারসাম্যহীন কৃত্রিম পৃথিবীর জন্ম দিয়েছে কতিপয় স্বা‍র্থান্ধরা।

আমাদের বাস এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষের জন্য রাষ্ট্রের নয়, রাষ্ট্রের জন্যই মানুষের প্রয়োজন। অত্যধিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমরা দেখি বিভৎস শ্রেণীবিভাজন, আরো ভয়ঙ্কররূপে, শ্রেণীর ভিতরে জন্ম নেওয়া উপশ্রেণীগত বিকৃত মানসিক বিভাজন অসংখ্য স্তরবিন্যাসের অপরিকল্পিত সমাজব্যবস্থায় প্রায় সকল ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয় রাষ্ট্র স্বীকৃত শোষকশোষিতের শ্রেণীচরিত্র। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণী সর্বদাই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে অপেক্ষাকৃত সবল শ্রেণীর দ্বারা। আবার শ্রেণীর স্তরবিন্যাসে অধস্তন শ্রেণীচরিত্র ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণবঞ্চনার ধারাবাহিকতায় অধস্তন এই প্রলেতারিয়েত শ্রেণীগোষ্ঠী হয়ে ওঠে মূল্যবোধহীন ও সুযোগসন্ধানী। তারা যেকোনো উপায়ে হতে চায় বৈভবের মালিক; অনৈতিক পারিপা‍র্শ্বিকতার চাপে হয়ে ওঠে নীতিহীন অর্থধ্যানী। এই অর্থলিপ্সান্ধ সুযোগসন্ধানী মানসিকতায় নিজেরাই তৈরী করে উপশ্রেণীর; অতঃপর চলে মূল্যবোধহীন নিগ্রহ। এই শোষিতের শোষণ প্রক্রিয়াই মূলত প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর ঐক্য বিনষ্টকরণের জন্য দায়ী।

সম্প্রতি এই ভূখণ্ডে ঘটে গেছে যে নি‍র্মম হত্যাকাণ্ড, সেটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। নিগ্রহে নিহত কিশোর রাজন এক শ্রমিক পরিবারের সন্তান; যে নিজেও একজন শ্রমজীবী ছিলো। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হোতা, সে যুক্ত ছিলো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এবং তার এদেশীয় সহযোগী যারা, তাদের সবাই একই শ্রেণীভুক্ত। এই সুযোগসন্ধানী মূল্যবোধহীন শ্রেণীর কাছে অপেক্ষাকৃত দু‍র্বল এবং অধস্তন শ্রমিক কিশোরটি নিগ্রহের শিকার হয়ে মারা যায়। এই মৃত্যু এরকম অসংখ্য মৃত্যু এবং শ্রেণীদ্বন্দ্বের জড় প্রোথিত আছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে।

কমিউনিস্ট ইশতেহারের কথা আজ পর্যন্ত বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। এখানে শ্রেণী হচ্ছে নিপীড়ক শ্রেণী ও নিপীড়িত শ্রেণী। এই নিপীড়ক ও নিপীড়িতরা নিরন্তর পরষ্পরবিরোধী থেকেছে, লড়াইসংগ্রামে, গুপ্ত বা প্রকাশ্যে। কিন্তু নিপীড়িতের শ্রেণীবিভাজন এবং উপশ্রেণীর আবি‍র্ভাব এবং একই শ্রেণীভুক্ত প্রলেতারিয়েতের নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সমশ্রেণীভুক্ত অপেক্ষাকৃত দুর্বলের প্রতি নিগ্রহমূলক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি শৃঙ্খলিত মানবমুক্তির পথ অবরুদ্ধ করে দিতে পারে এবং এই অবস্থায় তা অবশ্যম্ভাবী। যেহেতু রাষ্ট্রব্যবস্থায় থেকে কখনোই শ্রেণীহীন সমাজ চিন্তা করা বাস্তবিকভাবে সম্ভবপর নয় তাই মানবমুক্তির একটিই পথ এক শ্রেণীহীন নৈরাষ্ট্রিক সমাজ।

রাষ্ট্রের প্রতি আমার শেষ উচ্চারণ

Every unjustified killing we evident, would remind the formation of the State for the sake of predominance, considered the artistic and tactical weapon of a few to skim benefits against a huge ordinary group.

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s