pyching-mong-11

লিখেছেন: পাইচিংমং মারমা

()

দোস্ত,

তোরা কেমন আছিস?

কেমন আছে চেঙেমেইনীহাজলংক’তাউ খ্যং? বনপাহাড় আর উপত্যকার মানুষেরা কেমন আছে?

দেশ ছেড়ে আসার আগের দিনটা ছিলো আওয়ামীলীগের জন্য ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ আর বিএনপির ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু দিবস’। শেষ দিনের মত কেনাকাটা করতে বের হয়েছি। ঢাকা শহরের যেসব রাস্তা আওয়ামী লীগের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর দখলে ছিলো সেখানে তারা মুজিবের ভাষণ আর দেশাত্মবোধক গান বাজিয়েছে লাঠিসোটা নিয়ে।

কি অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার! লোকজন নেই, জনমনিষ্যি নেইমাইকে বেজে চলেছে “সোনা সোনা সোনা, লোকে বলে সোনা…” সব দেখে শুনে আমি বলেছি, “আবার তোরা মানুষ হ!”

যে দ্রোহের গানদেশের গান মানুষকে জাগিয়েছে আত্মবিসর্জনের জন্য, সেই গান ব্যবহৃত হচ্ছে দখলবাজি করতে!

বিএনপিরা সেদিন ভালো করে ‘মুনির’ পোড়াতে পারেনি। প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় আমাকে নিউ মার্কেট, নীল ক্ষেত, এলিফেন্ট রোড ঘুরতে হয়েছে

কখন কোনদিক দিয়ে মাথায় ককটেল পড়ে!

সেদিন তেমন হইহট্টগোল না হলেও এই কয়েকদিনে বাংলাদেশটা মানুষ পোড়ার দেশ হয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষ পুড়েছে বাংলাদেশের অপরাজনীতির আগুনে।

আমি কেমন আছি বলি

আমি যে হাউজে উঠেছি সেখানে আমার সাথে থাকে ইন্দোনেশিয়ার বুদি (Budi), জাম্বিয়া থেকে আসা Steve আর Chris এবং দক্ষিণ আফ্রিকার Harry

ও হ্যাঁ, আরেকজন থাকে আমার পাশের রুমেইসুবর্ণদা। রাঙ্গামাটি বাড়ি। আমরা দুই উপজাত এখানে একসাথে মিলেছি।

আমি যথারীতি সবার সাথেই মজা করে মিশছি। এদের মধ্যে বুদি সবার শেষে এসেছে। কোন এক ঘটনায় একদিন সন্ধ্যায় বুদির আক্কেলজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠলো।

আমি মশকরা করে বাংলায় বললাম, “বাবা বুদি, তোমার নাম বুদি হোক বা বুদ্ধি, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি কবে হবে বাপু?” সে কিছু না বুঝে হে হে হে হে করে বোকার মতন একটা হাসি দিয়ে বিনাবাক্যে জবাব দিয়েছিলো।

নাম নিয়ে মজা করতে হলে ক্রিস এর নামটা হচ্ছে সব চাইতে অনবদ্য! ক্রিসকে কৃশ ডাকা যায়, কৃষ ডাকা যায় এমনকি কিরিচও ডাকা যায়। আমি অবশ্য ইচ্ছে করেই কিরিচ ডাকি কিন্তু সে ভাবে যে আমাদের উচ্চারণ ভঙ্গিটাই বুঝি এমন।

সেদিন সন্ধ্যায় সবাই মিলে বিয়ার খাচ্ছিলাম। আমি কিরিচকে বললাম, ডোন্ট ড্রিংক এনিমোর, ইউ লুক ব্লার ! প্রথমটাই কেউ বুঝলো না আমি আসলে কি বলতে চাইছি। আমি আবার বললাম, দোস্ত আর খাইস না, তোরে ঝাপসা লাগাতাছে! (ইংরেজীতে)। এবার স্টিভ হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। বললো, দ্যাট ওয়ান ইজ হট!! আমি বুঝলাম আমার মশকরাটা গরম হয়েছে।

ব্যাটারা স্কলারশিপের টাকা পাওয়ার দিন থেকে দিনে রাতে সমানে হানিকেন বিয়ার কোপাচ্ছে! দিন কি রাতএমনকি সকাল বেলা থেকেই। আজ সকালে হরিকে (হ্যারি) দেখলাম সকালে ঘুম থেকে উঠেই চোখ মুছতে মুছতে বিয়ারের বোতল খুলছে।

সুবর্ণদা তাদের কান্ডকিত্তি দেখে বলেছিলো, “শালা কাইল্যার দলদুর্ভিক্ষের দেশ থিকা আসছে সব কয়টাকোনদিন মনে হয় এমন পয়সা উড়ায় নাই…”

আমি এফারমেটিভ সাই দিলাম।

কালো নিগারের দল এমন আয়েসিবিলাসী খরচ হয়তো কোনদিন করেনি। সুবর্ণদা কালোদের কি ডাকলে যেন খুব ক্ষেপে যায় জানতে চায়ছিলো। আমি উত্তর দিলাম নিগার। সাদারা কালোদের নিগার, স্যাভেজ, স্লেভ ইত্যাদি সব বদনামী নাম দিয়েছিলো। আজও নামগুলো কালোদের কপালের কলংক তিলক হয়ে রয়েছে ।

কালোরা নিগার বা বন্য বা দাস বা আদিম বর্বরকিন্তু

তারা কি এমন দীনহীনকাইল্যা হতে চেয়েছিলো?

যারা কালোদের দাস বানালো, গনহত্যায় মেরে কেটে সাফ করে দিলো, রোগের সংক্রমন ছড়িয়ে দিয়ে মহামারীতে হাজারে হাজারে মারলো, তাদের মাটিবন উজার করে দিলো, তাদের পিতৃভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করলোতারা কারা?

তারা আর কেউ নয় আজকের দুনিয়ার সভ্য সাদারা। সারা দুনিয়া সাদাদের আবাসস্থল হিসাবে পশ্চিম দিগন্তকে চিহ্নিত করে।

.

দোস্ত,

তোকে একদিন এথনোসেন্ট্রিজম নিয়ে বলেছিলাম মনে আছে? এথনোসেন্ট্রিজম সবখানেই আছে, কমবেশি সবার আচরণেই আছে। এথনোসেন্ট্রিজম থেকেই রেসিজম (Racism) এর উৎপত্তি।

জানিস, এখানে সাদারা বাংলাদেশের মুসলমানদের সহজে ঘর ভাড়া দিতে চায় না। অনেক বদনাম!

যখন একটা রেসের (Race) বা বিশেষ কোন নৃগোষ্ঠীর মানুষ ভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করে, তার চাইতে নিজেরটাকেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে এবং তা প্রচার করে বা সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত করে তখন তা এথনোসেন্ট্রিক আচরন হয়ে যায়।

Ethnocentrism is judging another culture solely by the values and standards of one’s own culture.Ethnocentric individuals judge other groups relative to their own ethnic group or culture, especially with concern for language, behavior, customs, and religion. These ethnic distinctions and subdivisions serve to define each ethnicity’s unique cultural identity” (Wikipedia)

নিজেকে কেন্দ্রে রেখে একটা বৃত্তবন্দি দৃষ্টি থেকে অপরকে দেখলেই সেটা এথনোসেন্ট্রিজম হয়ে যায়। আমরা সালার এমন দেশে জন্মেছি যে অষ্টপ্রহর চারপাশের সবকিছু মনে করিয়ে দেয়, “তুই উপজাতিতুই উপমানুষ!” সাইকোলজিকেলি আমরা যে এমন কোনঠাসা মানসিকতায় গড়ে উঠি বা হীনমন্যতায় গড়ে উঠি,

সেটা ক্যামন অস্বাভাবিকতায় মানবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয় তা বিশ্লেষণ করা দরকার।

অস্ত্বিত্বের প্রান্তদেশে প্রান্তিক মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে অনেকদিন ধরে ভাবছি। আহা! আমার সাবজেক্টটা বিজনেস স্টাডিজ না হয়ে যদি সামাজিক মনোবিজ্ঞান হতো!

আমাদের দেশে বাঙালিরা এবং বাঙ্গালীরা যখন আমাদের চাইনিজ, উপজাতি, জংলী জ্ঞান করে এবং নিজের হাগামুতা থেকে শুরু করে সব কিছুতে মহান জাতিত্বের ন্যায্যতায় আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেসেখানেই এথনোসেন্ট্রিজম কাজ করে। যখন আমরা কালোদের নিগার বলি, দুর্ভিক্ষের দেশের কাইল্যা আদমি বলি, সেখানেও প্রচ্ছন্নভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এথনোসেন্ট্রিজম থাকে। ব্যাপারটা কি সারকাস্টিক তাই নাআমরা নিজের দেশে পরবাসী অথচ মিডলক্লাস ইকোনমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের জোরে আমরা কিনা নিগ্রোদের দুর্ভিক্ষপীড়িত কাইল্যা বলছি! বোধ করি চেতনার গোঁজামিল এবং মিডলক্লাস ভন্ডামি আমাদের মজ্জায় আছে বলেই এমন ভাবতে পারি আমরা।

একটা মজার ব্যাপার বলি,

এখানকার পোষ্টমাষ্টারকে অনেকে রেসিস্ট বলেছে। কেন জানিস? কারন এখানকার পোষ্টমাষ্টার নাকি এশিয়ানদের সাথে মাতে না! হাহাহাএখানে এসে এমন কিছু রেসিস্ট মানুষের রেসিস্ট আচরণ শুনে হেসেই মরি! অথচ আমাদের পাশের গুচ্ছগ্রামের সেটলাররা যারা কিনা আমাদের অস্ত্বিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে,

যেন এক পাল নেকড়ে ঘাড়ের কাছে নিঃশাস ফেলছেলালা পড়ছে গায়ে তবু কিচ্ছুটি করা যাবে না, বলা যাবে না।

তাদেরকে রেসিস্টরেপিস্টও বলা যায় না, বললেই মুসকিল! শান্তিসম্প্রীতিউন্নয়ন ব্যাহত হয়! যে রাষ্ট্র সেটলারদের ঢুকিয়ে দিয়ে আমাদের মেয়েদের রেপ করাচ্ছে, আমাদের জানমালভিটে কেড়ে নিচ্ছে তাকেও রেসিস্ট রাষ্ট্র বলা যাবে না। যে রাষ্ট্র এসব পঙ্গপালকে রেশন দিয়ে পুষে রেখেছে শুধুমাত্র আমাদের নিপীড়নের জন্য তাদের নিয়ে কিচ্ছুটি বলা যাবে নাকরা যাবে না। যখন খোদ রাষ্ট্রই নিপীড়কের ভূমিকায় নেমেছে তখন তার প্রতিবাদ করাটা স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। সুতরাং “চুপ থাকো, বেয়াদপ কোথাকার”

কি সিষ্টিছাড়া কান্ড! যেন নিজের মৃত্যু দেখছি হাত পা বাধা অবস্থায়।

আচ্ছা আমি শুধু তোকেই আমার মনের কথা বলে যাচ্ছিকিন্তু এটাতো খোলা চিঠি! পাঠকের জন্য কিছু বলতে হবে! নেক্সট চ্যাপ্টারটা সব পাঠকের জন্য।

.

()

গেলো সহস্রাব্দের শেষ কয়েক শতকের কথা

পৃথিবীতে কয়েকদল মানুষ নিজেদের উন্নত ঘোষণা করলো।

তারপর তারা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়লো।

তারা নিজেদের উন্নত আর অন্যদের বন্য, আদিম ইত্যাদি নাম দিয়ে দাস বানাতে চায়লো। ভূগোলকের কোনায় কোনায় তারা জাহাজে করে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তারা যেখানেই পৌঁছেছিলো সেখানকার মাটি তারা দখল করতে উদ্যত হয়েছিলো। সেখানকার মাটিজলখনিপাহাড়সম্পদ দখল করতে তারা সেখানকার আদি বাসিন্দাদের বশ করে ফেলেছিলো

নতুবা তাদেরকে তারা ধ্বংস করে ফেলেছিলো।

তারা যাদের দাস বানাতে পারেনি তাদেরকে অন্যভাবে বশ্যতার অধীন করেছিল। তারা ছলে, বলে, কৌশলে শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলো। তারা শোষণ করতে শাসন করেছিলো।

তারা এই শোষণের নাম দিয়েছিলো উপনিবেশিকরন। তারপর

তারপরের ইতিহাস সবাই জানেতারপর পৃথিবীর মানচিত্রে একেকটা রাষ্ট্রকে একেকটা রঙের সীমারেখায় ঢোকানো হলো। সেই রঙের সীমা অর্থাৎ রাষ্ট্রের মানচিত্র বার বার বদলেছে।

রাষ্ট্রের মানচিত্র বার বার বদলে যায়।

তারপর গেলো শতকে পশ্চিম দুনিয়ার মালিকানায় থাকা একেকটা উপনিবেশ ভেঙে যায়।

উপনিবেশের ডিম থেকে উপমহাদেশ বের হয়ে গিয়ে কয়েকটা দেশের জন্ম নেয়,

পূর্ব পাকিস্তান তার অন্যতম।

১৯৪৭ এ রেডক্লিফ নামের এক ব্রিটিশ কমিশনার আমাদের বনপাহাড়কে ঢুকিয়ে দেয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যদিও সেসময় অমুসলিমপাহাড়িদের জনসংখ্যাই বেশি ছিলো সেখানে। সেসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯২ শতাংশ জনসংখ্যা ছিলো পাহাড়ি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যারা আচানক পাকিস্তানী হয়েগিয়েছিলো, তারা তাদের অরণ্যের মাটি যে পাকসারজমিনসাদবাদ হয়ে গেছে

তা জানতেই পারেনি।

এভাবেসেভাবে নানান ভাবে পৃথিবীটা বার বার বদলেছে।

পৃথিবী নামের গোল্লাটা ঘুরতে ঘুরতে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় কালান্তর পেরিয়েছে । পৃথিবীটা ভাগ হয়েছে নানান ভাগে, নানান মতে, নানান পথে। যারা একসময় দুনিয়ার অনেক দেশে, অনেক দিশায় উপনিবেশ বানিয়ে শোষণ করেছে, যারা নিজেদের উন্নত হবার যুক্তিতে অনুন্নতদের সম্পদ লুট করেছে তারা এই গোল্লার বাবুপাড়া মানে ‘প্রথম দুনিয়ায়’ থাকে। ‘ দ্বিতীয় দুনিয়াটা’ গেলো শতকের মাঝামাঝিতে সামনে এসেছিলো, এখন মৃয়মান হয়ে গেছে। তিন নাম্বার দুনিয়াটা সেই দুনিয়া যেখানে একসময় সেইসব অসভ্য সভ্যরা উপনিবেশ গড়েছিলো

মানে বাংলাদেশভারতের মতো সেইসব দেশ যেখানে পাশ্চাত্য সাদারা অপনিবেশ গড়েছিলো।

আরেকটা দুনিয়া আছেনা, খোদাভগবানের দুনিয়া অবশ্যই নয়।

এই অসভ্য সভ্যতার, এই পাপ পঙ্কিল, রক্তাক্ত ইতিহাসের শেষ দিগন্তে আরেকটা দুনিয়া আছে।

আরেকটা দুনিয়া ছিলোযার হদিস ইতিহাসের পাঠ্যসূচিতে কখনোই ছিলোনা, কখনো থাকবে না।

সেই ইতিহাসের কথা খুব সাধারনত মানুষ ‘ইতিহাসে’ পাঠ করে না। হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে সেই ইতিহাস নেই। আমরা এখন পর্যন্ত যে ইতিহাসের কথা বলেছি তার বাইরেও আরেকটা ইতিহাস আছে। আরেকটা দুনিয়া আছে যাকে আজকের দুনিয়ায় ‘চতুর্থ বিশ্ব’ বলা হয়। চতুর্থ বিশ্বটা হচ্ছে আদিবাসীর দুনিয়া।

আজকের হলিউড ‘ট্রয়’ সিনেমা বানায় কিন্তু গ্রিক ইতিহাস ছাড়াও সেই মার্কিন মুলুকের আরেকটা ইতিহাস আছে যা হাওয়ার্ড জিনের A People’s History of the United States” এ পাওয়া যায়, পাওয়া যায় ডি ব্রাউনের “আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙার বাঁকে”।

এমন সব অচ্ছুৎ ইতিহাস আছে সব অচ্ছুৎ মানুষের

চতুর্থ বিশ্বের ইতিহাস।

অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, ভারত, বাংলাদেশ সহ দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশেই সেই চতুর্থ বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আছে।

ইতিহাসের নিজস্ব একটা গতিপথ আছে। ইতিহাসের এই পথে কেউ সিধা রথ চালিয়েছে আর কেউ উল্টোরথে চলেছে। কিন্তু এক দল মানুষ সোজা বা উলটো কোন রথেই চড়তে চায়নি।

তারা এই রথের পথেই যেতে চায়নি।

হাতের কড়েয় গুনলে দুনিয়ার মূল জনগোষ্ঠীর বা জাতির নাম পাওয়া যায়, তাদের ইতিহাস পাওয়া যায়। তাদের জাতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।যেমন ভারতীয় জাতি, চীনা জাতি, মার্কিনী জাতি, বাঙালি জাতি, জাপানী জাতি ইত্যাদি।

সব জাতির ইতিহাসের একটা গতিপথ আছে। সারা দুনিয়ার মূলধারার জনগোষ্ঠী বা এইসব জাতির ইতিহাসের একটা ট্র্যাক আছে।

আমি বলতে চাইছি তাদের কথা যারা এই ট্র্যাকের নয়। বস্তুত তারা কোন ট্র্যাকেরই নয়।

যে পথে উপনিবেশের রেলপথ গেছে,

চলে গেছে জীবাস্মপোড়া জ্বালানীর গন্ধ, তারা সেইসব উন্নত পথের উন্নয়ন কখনোই চাইনি। তারা চিরকাল শুধু বাঁচতে চেয়েছে নিজের ভিটেয়, নিজের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার পরম্পরায়।

তারা আজও শুধু বাঁচতেই চায়। ওয়াল স্ট্রিট স্টক মার্কেট ফুলে উঠলে ফাটকা পুঁজির কিছু ছিটেফোটা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে চলে যায়। সেই ফান্ড দিয়েই বিশ্বনেতারা হাজারটা তত্ত্বএপ্রোচ হাজির করেন।

আমি যাদের কথা বলছি তারা ধ্বংসের শেষ প্রান্তে বাস করছে। তারা শুধু সাসটেইন করতে চায়তারা সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট চায় না। তারা এসব বোঝেনা।

তারা স্টক মার্কেটের ফাটকাবাজি বোঝে না, তারা রাজনীতি বোঝে না, তারা রাষ্ট্র বোঝে না, তারা পেরেস্ট্রোইকা বোঝে না, গ্লোবালাইজেশন বোঝে না।

আমি আজ তাদের কথা লিখছি।

.

()

আজ মহান অস্ট্রেলিয়া ডে। অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ঘরে আনন্দ। পথে পথে শিশুদের কলরব। আজ সব সেটলার মিলেছে সেটলমেন্টের বর্ষফুর্তিতে। ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারী, আজকের দিনে ইউনিয়ন জ্যাক (ব্রিটিশ পতাকা)উড়িয়ে প্রথম রনতরী ভেড়ে অস্ট্রেলিয়ায়।

তারপর

তারপরের ইতিহাস তথাকথিত সভ্যতার অসভ্য ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার সাদা মানুষের ইতিহাস।

সবাই শুধু বিজয়ীর ইতিহাসটাই পড়ে। যারা কখনো কোন ইতিহাসে ছিলো না, তারা বিস্মৃত ইতিহাসে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় কালের গর্ভে।

আজকের ঝাঁ চকচকে অস্ট্রেলিয়া জুড়ে শুধু আদিবাসিদের আদি নিবাস ছিলো। এখন তাদের কোথাও কেউ নেইকিসসু নেই! সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৩০ সালে সাদারা আদিবাসীদেরএমনভাবে মেরে কেটে সাফ করেছিলো যে তাদের ৯০% শতাংশই মরে গিয়েছিলো।

The Aborigine population then was around 750,000, although it was rapidly reduced to just over70,000 by the 1930s.”

আজকের অস্ট্রেলিয়ায় সাদারা অনেক ভালো মানুষ। আসলে তাদের আর খারাপ হবার কোন দরকার নেই, তাদের ভালো ফলানোতেই আমার মতন উপমানুষেরা এখানে ডিগ্রি নিতে আসতে পারে।

অজি (Aussie) সাদা চামড়ার ইউরোপীয়রা আদিবাসী বাচ্চাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ইউরোপীয় কেতা, আচরণ, ধর্ম,বিশ্বাস, সংস্কৃতিতে আত্মীকরণ (Assimilation) করতে চেয়েছিলো। গোটা কয়েক প্রজন্মের আদিবাসী বাচ্চাদের ধরে নিয়ে গিয়ে তারা স্টোলেন জেনারেশন বানিয়েছে যাতে সাদা বশংবদ পয়দা হয়। তার অনেক অনেক পরে অবশ্য তাদের প্রধানমন্ত্রী ২০০৮ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী পারলামেন্টে স্টোলেন জেনারেশনের কাছে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছেন কিন্তু তাতেকিযাহা হইবার তাহা তো হইয়া গিয়াছে!

মার্কিন মুল্লুক, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার কাহিনী প্রায় একইরকম।

সাদারা এসে দেশটাকে ‘আবিস্কার’ করেছে তারপর সেটলমেন্ট করেছে তারপর নেটিভ/এবওরিজিন/আদিবাসীদের মেরেকেটে সাফ করে তাদের কাছ থেকে দেশ কেড়ে নিয়েছে।

অবশ্য সাদারা কখনোইএমনটা ভাবে না। তারা বলে যে তারা এই দেশটাকে ‘আবিস্কার’ করেছে। তারা উন্নত তাই তারা আবিস্কার করেছে।

এই দেশে যা অস্ট্রেলিয়া ডে, মার্কিন মুলুকে তার নাম ‘কলম্বাসডে’। ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১৬ই অক্টোবর মার্কিন দেশে পা রেখেছিলেন এবং তারপর থেকে আদিবাসীর মার্কিন দেশে নেমে এসেছিলো সাদা চামড়ার অন্ধকার।

এই সাদা মহাদেশকে নিয়ে একটা পুরানো গল্প এখানে বলে যাই

ক্লাসে ইতিহাসের শিক্ষক আমেরিকা আবিস্কারের পাঠ শেখাচ্ছিলেন। আমেরিকার ইতিহাস শেখানোর শেষদিন শিক্ষক হঠাৎ একটা ছাত্রের বুক পকেট থেকে ছোঁ মেরে কলমটা উঠিয়ে নিলেন। তারপর কিচ্ছু হয়নি এমন স্বাভাবিকভাবে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। ছাত্রটা হতবম্ব হয়ে গেলো। তারপর আমতা আমতা করে শিক্ষককে মৃদু প্রতিবাদ জানালো,

আপনি আমার কলমটা এভাবে ছিনতাই করতে পারেন না!”

শিক্ষক তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর দিলেন, “কে বলেছে আমি ছিনতাই করেছি? আমি তো আবিস্কার করেছি!”

এমন সব চেনা গল্প যারা বাংলাদেশে থেকেও পড়েননি তাদের একটু পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে তাকাতে অনুরোধ করবো আমি। বাঙালির ঈমানদার বাঙালি চেতনা প্যালেস্টাইনে মুসলমান মরলে চিৎকার করে কিন্তু পাহাড়ে আদিবাসী মরলে উলটা শীৎকার করে। বাঙালি নিজের আগ্রাসী চরিত্রটা বুঝেও বুঝে না। ঘুরে ফিরে সবাই একসব ইতিহাস একই রকম! ইতিহাস সর্বদায় বিজয়ীর। মেরে কেটে সাফ করে, রণরক্তসফলতায় যে জাতি টিকে থাকে সেই সভ্যতা সৃষ্টি করে। এটাই অসভ্য সভ্যতা।

বাই দা ওয়ে, অজি সাদারা কিন্তু নিজেদের সেটলার বলতে কার্পন্য করে না কিন্তু বাঙালির নিজেকে সেটলার বলাতে প্রবল আপত্তি আছে

আজকের অস্ট্রেলিয়ায় অস্ট্রেলিয়া ওপেনটেনিস খেলা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় শিল্পসাহিত্যজ্ঞান চর্চা হয়। অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালগুলো ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংএ জায়গা করে নিয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ এখানে বিদ্যা চর্চা করতে আসে। একসময় অস্ট্রেলিয়া ছিলো ব্রিটিশ পেনাল কলোনী অর্থাৎ আসামীদের নির্বাসনের জায়গা। যেমন পাহাড়ে প্রথমদিককার সেটলাররা ছিলো সব মামলা খাওয়া আসামী।

একদিন হয়তো আমার পাহাড়ে আমি বা আমাদের উত্তর প্রজন্ম থাকবে না। আমরা সবাই লাখে লাখে রিফিউজি হয়ে যাবো বা এসিমিলিটেড হয়ে যাবোঅর্থাৎ বাঙ্গালী হয়ে যাবো।

যেমন করে আদিবাসীদের কংকালের উপর আজকের অস্ট্রেলিয়া দাঁড়িয়ে আছে, শিল্পসংস্কৃতিশিক্ষার উৎকর্ষ দেখাচ্ছে

তেমন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে হয়তো অনেক উন্নত এস্টাবলিশমেন্ট হবে।

আজকের অষ্ট্রেলিয়া অনেক সভ্য। তারা আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে তাদের পূর্বপুরুষের অপকর্মের জন্য।

হয়তো পাহাড়ের আজকের যে সেটলার কাউখালীতে আদিবাসীদের হত্যা করে তার মাটি কেড়েছে, একদিন তার নাতি আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চায়বে।

হয়তো সেটলারদের উত্তর প্রজন্ম চারুকলার আদলে একটা আর্ট ইন্সটিটিউট বানাবে পাহাড়ে। তখন পাহাড়ে আর কোন মারমাচাকমাম্রোবম থাকবে না। তাই তাদের স্মরনে সেই আর্ট ইন্সটিটিউটে

ট্রাইবাল আর্ট এক্সপ্লোরিং করা হবে।

আমি কি পাঠককে দুঃস্বপ্ন দেখাচ্ছিআই এম সরি! আমি নিজেও এই দুঃস্বপ্নে ভয়ে কুঁকড়ে যাই।

You may say I am Paranoid, but I must say you are uninformed.

কিন্তু তারপরেই আবার যখন সামনের দিকে তাকাইকোন গান বা কবিতা বা নিসর্গ বা কোন শিশুর হাসিসুন্দর যেকোন কিছুর কথা ভাবি তখন মনে হয়

পৃথিবীটা একদিন মানুষের হবেই হবেসব মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে।

ইতিহাস তার গতিতে চলে বটে কিন্তু ইতিহাস সর্বদাই বিজয়ীর। পৃথিবীর রুঢ় নিয়ম মেনে হয় লড়ো নয়তো ইতিহাসের ভাগাড়ে চলে যাও!

আমরাও একটা কালবেলা পেরোচ্ছি। অন্ধকার যেন চোখ গেলে দিচ্ছে

কিন্তু রাত গভীর না হলে সকাল আসবে কিভাবে?

এই দুঃস্বপ্ন তাদের জন্য যারা অচেতন আছে আফিমখোরের মতন। আর নতুন জীবনের স্বপ্ন তাদের জন্য যারা ইতিহাসকে নিজের পথে আনতে চায়।।

(চলবে…)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s