লিখেছেন: অশোক চট্টোপাধ্যায়

Modi_Hitlerএকবিংশ শতাব্দীর একটা দশক অতিক্রান্তির উত্তরপর্বে দাঁড়িয়েও বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকটিকে বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশকটি আমাদের দেশে উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের নগ্ন প্রকাশের দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের নবগঠিত হিন্দুসভা পরবর্তী আট বছরের মাথায় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সারা ভারত হিন্দুমহাসভা নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই ঘটনার ঠিক দশ বছরের মাথায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বহিন্দু পরিষদ। এখন আর জনসঙ্ঘ নেই, সেখানে হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। সঙ্ঘপরিবারের মূল নিয়ন্তা শক্তি হলো আরএসএস। এর সহযোগী হিসেবে শিবসেনা সহ অন্যেরা তো আছেই।

বিগত শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তার পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে তার ফ্যাসিস্ট চরিত্রের উন্মোচন ঘটিয়েই। ওই গোটা দশক জুড়েই তারা তাদের সঙ্ঘশক্তির উদ্যোগে এবং প্ররোচনায় অজস্র দাঙ্গা সংঘটিত করেছে, খুনলুণ্ঠনের বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ওই দশকের গোড়ায় ১৯৯২এর ৬ ডিসেম্বর তারা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটিয়েছিলো অবলীলায় এবং এই অপকর্মের জন্যে তারা রীতিমতো গর্ববোধ করেছে। এবং এরই সূত্রে সারা দেশে দাঙ্গা বাধিয়ে দেশকে রক্তাক্ত করেছিল। বিরানব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর শুধুমাত্র সুরাটেই তিনশ মানুষ খুন হন, এর মধ্যে ৯৫% মানুষই সংখ্যালঘু। ওই একই দিনে মুম্বাইয়ে দুদফা দাঙ্গায় নিহত হন প্রায় তিন হাজার মানুষ। এই দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুট এবং ধর্ষণের নির্মম ঘটনাবলী। মুম্বাইয়ের দাঙ্গার মূল পরিচালক শিবসেনা প্রধান বাল থ্যাকারে বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের রিপোর্টে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনও শাস্তি হয়নি। বরং মহারাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও রাষ্ট্রবাদী কংগ্রেসের যে জোট সরকার, তাকে বাল থ্যাকারে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, ক্ষমতা থাকলে তারা যেন তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরে দেন। অথচ সরকার নীরবে সেই হুমকি হজম করেছিলেন। সেই নতুন জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাসখানেকের মধ্যে শিবসেনার তরফে দাঙ্গার ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।() ১৯৮১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত সারাদেশ ৩২৩৩ টি দাঙ্গার ঘটনা ঘটে, যার ফলে মারা যান ১৮২২ জন মুসলিম ও ৭৫৩ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। অর্থাৎ মোট মৃতের সংখ্যা ২৫৭৫ জন।() শুধুমাত্র ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দেই সরকারি হিসেবে সারাদেশে ৬২৭ টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে; যার ফলে নিহত হন ২০৭ জন মানুষ।()

বিরানব্বইয়ের ঘটনার সাতবছর পর একটি ইংরেজি দৈনিকে গৌতম নাভালকার একটি পত্রপ্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে গৌতমবাবু লিখেছিলেন যে, বিরানব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পর সাত বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, সিবিআই তদন্তের কোনও ফলপ্রসূতা লক্ষ্য করা যায়নি। তিনি লিখেছিলেন

It is worth recalling that the demolition on December 6, 1992 and its aftermath not only resulted in the killings of hundreds of people and destruction of property worth several thousand crores…several of those implicated are members of Union Cabinet today and one of them heads the Union Home Ministry, in charge of internal security.”

গৌতমবাবু আরও জানিয়েছিলেন যে, ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে চল্লিশ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়, ১৯৯৬এর জানুআরিতে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৯ জন। শেষপর্যন্ত শুনানি শেষ হয় ১৯৯৭এর ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু তারপর থেকে দেখা গিয়েছে

Framing of charges by a special Magistrate has been stalled through stay orders issued by the Allahabad High Court. Each time a date is fixed, a stay order is issued over the last 30 months, nearly 10 such orders have been issued.”()

স্বভাবতই এই প্রক্রিয়ায় দাঙ্গার সংগঠক ও অপকীর্তির নায়করা পার পেয়ে গিয়েছিলেন। তখন কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাসীন। স্বাভাবিক কারণেই সঙ্ঘপরিবারের ফ্যাসিস্ট আত্মপ্রকাশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর অন্তিম সময় ভারতবর্ষ ফ্যাসিস্ট শক্তির শ্রীবৃদ্ধির পরিচয় বহন করেছিল। তখন বিজেপি ছিল জোটনির্ভর সরকার, তাই তার ওই রমরমা। আর বর্তমানে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লির ক্ষমতায় আসীন। স্বভাবতই বিপদ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

আরএসএসএর তাত্ত্বিক গোলওয়ালকর হিটলারের মতাদর্শকে তাঁর প্রেরণা হিসেবে স্বীকার করে বলেছিলেন যে, হিটলারের শিক্ষা হিন্দুস্তানে আমাদের জন্য অত্যন্ত ভালো শিক্ষা, এবং এ থেকে আমাদের লাভ হতে পারে।() ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর অর্গানাইজার পত্রিকায় আরএসএসএর তরফে স্পষ্টতই ঘোষণা করা হয় তাদের লড়াই তিন শত্রুর বিরুদ্ধে। এই তিন শত্রু হলো মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্টরা।() মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত করার পাশাপাশি খ্রিস্টানহত্যার বিষয়াবলী এই শত্রু চিহ্নিতকরণের পরিণতি। এছাড়া শত্রু হিসেবে কমিউনিস্টরা তো স্বাভাবিকভাবেই ছিল, আছে এবং থাকবে।

ফিরে দেখা

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১ মে হামবুর্গের রেডিও ঘোষণা করেছিলো অ্যাডলফ হিটলার নিহত হয়েছেন। ২ মে সোভিয়েতের লালফৌজ বার্লিন দখল করে । ফিল্ড মার্শাল কাইজেলরিংএর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে ইতালিতে সব শত্রুতার সরকারিভাবে অবসান ঘটে (‘and hostilities in Italy ended officially following the unconditional surrender of Field Marfshal Von Kesselring’)() শুধু তাই নয়, ৪ মে তারিখে

All German forces in Netherlands, Northwest Germany and Denmark surrendered to Field Marshal Montgomery’s 21st Army Group, and General Paten’s US seventh Army, having captured. Berchtesgaden, drove through the Brenner pass and joined up with General Clark’s Fifth Army.”()

বার্লিনের পতন ও হিটলারের নিহত হওয়ার খবর আমাদের দেশে এসে পৌঁছায় ৩ মে, ১৯৪৫ তারিখে। ৪ মে কলকাতার রাজপথে বেরোয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় মিছিল। ২৫০০০ মানুষের উদ্দীপিত এই মিছিলের সংবাদভাষ্যের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যেতে পারে

৪ মে শুক্রবার বার্লিনের পতন উপলক্ষে উৎসব করার জন্য কলকাতার রাস্তায় পঁচিশ হাজার মানুষের মিছিল বেরিয়েছিল। মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা কমিটি। বস্তুত প্রায় প্রত্যেকটি শিল্পের শ্রমিকরা এই বিরাট মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, সঙ্গে এনেছিলেন বিরাট বিরাট পোষ্টার যাতে দেখানো হয়েছিল লালফৌজের গৌরবমণ্ডিত অগ্রগতিদুমাইল লম্বা মিছিলটি রাস্তা দিয়ে যাবার সময় প্রচুর ভীড় হয়েছিল এবং বারান্দায় ও ছাদে প্রচুর মানুষ মিছিল দেখেছিলেন মিছিলের সর্বত্র সমান উদ্দীপনা ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়, যার দ্বারা সহজেই বোঝা যায় যে, বার্লিনের পতন শুধুমাত্র একটি সামরিক বিজয় নয়, মানব সমাজের স্বাধীনতালাভের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন।()

বাস্তবিক ফ্যাসিবাদের পরাজয় সারা বিশ্বজুড়ে এনেছিল স্বস্তির হাওয়া। কলকাতার এই উদ্দীপিত মিছিলও সেই স্বস্তির হাওয়াকেই অভিবাদন জানিয়েছিল।

জার্মান ফ্যাসিস্টরা স্ত্রীর সামনেই তাঁর স্বামীকে খুন করেছিল, মৃত পুত্রের চিতাভষ্ম তাঁর মায়ের কাছেই পাঠিয়েছিল পার্সেল করে। নির্যাতনশালায় ফ্যাসিস্ট বিরোধীদের ওপর বিষাক্ত ইঞ্জেকশান প্রয়োগ করেছিল তারা। তারপর তাদের হাত ভেঙে চোখ উপড়ে নিয়েছিল, সজীব দেহের ওপর ফ্যাসিস্ট স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল।(১০) নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর শুধুমাত্র জার্মানিতেই যে ফ্যাসিবিরোধী শ্রমিককৃষকবুদ্ধিজীবীকমিউনিস্টদের তারা খুন করেছিল তাঁর সংখ্যা ৪২০০; গ্রেপ্তার করেছিল ৩,১৭,৮০০ জন প্রতিবাদী মানুষকে।(১১) এতথ্য, বলাইবাহুল্য, অসম্পূর্ণ। স্বয়ং জর্জি দিমিত্রভ এই তথ্য পেশ করেছিলেন ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। নাৎসি এসএস বাহিনী নৃশংসভাবে খুন করেছিল ১,৪০,০০,০০০ জন মানুষকে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইহুদির সংখ্যা ৬০,০০,০০০, রুশ ৫০,০০,০০০, পোল ২০,০০,০০০, জিপসি ৫,০০,০০০ এবং অন্যান্য জাতির ৫,০০,০০০ মানুষ।(১২) আইউইৎস বন্দিশিবিরে চব্বিশ ঘণ্টায় কম করে ১০,০০০ বন্দীকে খুন করা হয়েছিল।(১৩)

এহেন ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের সত্তর বছর পূর্তি এবছর। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের পরাজয় সম্পূর্ণ হয়েছিল। আগামী ৯ মে আমরা কীভাবে পালন করবো এই দিনটিকে? বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সঙ্ঘপরিবারের যে দলটি দিল্লির মসনদে আসীন হয়ে ইতিমধ্যে সারাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের সমূহ বিপদকে সামনে নিয়ে এসেছে, এবছরের ৯ মে ফ্যাসিবাদবিরোধিতার ক্ষেত্রে তা নতুন মাত্রা পাবে, সন্দেহ নেই।

ফ্যাসিস্ট বর্বরতার স্বরূপ

প্রকৃতপ্রস্তাবে ফ্যাসিবাদ কী বলতে চায়, কী করতে চায়? সে চায় যুক্তিহীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে, যুদ্ধকে নির্বিকল্প হিসেবে হাজির করতে। সে চায় আপাতস্তাবকতার মধ্যে দিয়ে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করে একদিকে নিজের আখের গোছাতে এবং অন্যদিকে অন্যদের বিভ্রান্ত করে ফায়দা তুলতে। সে চায় তার জিঘাংসার পরিতৃপ্তি ঘটাতে, বিশ্বমানবতার সামনে নিজেকে মূর্তিমান ত্রাস হিসেবে হাজির করতে। সে চায় সারা বিশ্ব অবনতমস্তকে তাঁর পদপ্রান্তে নতজানু হোক, সে চায় সারা বিশ্বের প্রশ্নাতীত ভাগ্যবিধাতা হতে।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নেপলসে এক বক্তৃতায় মুসোলিনি বলেছিলেন

We have created our myth. The myth is faith; it is passion. It is not necessary that it shall be a reality. it is a reality by the fact that it is a good, a hope, a faith, that is courage. Our myth is the nation, our myth is the greatness of the nation!”(১৪)

অন্যত্র তিনি আবার বলেছেন

Three cheers for the war! May I be permitted to raise this cry. Three cheers for Italy’s war, noble and beautiful above all. Three cheers also for in general.”(১৫)

মুসোলিনির কাছে শান্তি শব্দটি বিবেচিত হতো একটি অবাস্তব শব্দ হিসেবে। শান্তি অর্থে তিনি যুদ্ধের সাময়িক ছেদকেই বুঝতেন, যা কখনই তাঁর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলনা। নাৎসি ইভার্সএর মতে, ‘The philosophy of Swastika defends the instincts of the heart against the insolence of reason.’(১৬)

হিটলার তো শিল্পীর অভিজ্ঞতাকে মানুষের কাছে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করেছিলেন। খোলা আকাশ ও ধানক্ষেতকে যথার্থ নীল ও সবুজ মনে হওয়াকে তিনি পাগলামি বলে মনে করতেন! আর এহেন পাগলদের জন্যে জেলখানাকেই তিনি উপযুক্ত স্থান বলে বিবেচনা করেছিলেন! আ হিস্টরি অব পোলিটিকাল থিয়োরির প্রণেতা অধ্যাপক জর্জ এইচ স্যাবাইন খুব যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, ফ্যাসিস্ট দর্শনের অন্তর্বস্তুতে রয়ে গিয়েছে অযুক্তি, যার পেছনে রয়ে গিয়েছে একটি অতিকথা (মিথ); আর সত্য হচ্ছে নিছক ইচ্ছা ও বিশ্বাসনির্ভর।

ফ্যাসিবাদ চিন্তার একনায়কত্বকে মান্যতা দেওয়ার কথা বলে। মহাকবি গ্যেটে চিন্তার একনায়কত্বকে মেনে নেননি। তাই যাতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে গ্যেটের নাম পৃথিবী ভুলে যেতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে তৎপর হয়েছিলেন নাৎসি পণ্ডিত রোজেনবার্গ। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের লনে উপস্থিত ৪০,০০০ মানুষের সামনে ২৫,০০০ বইয়ের বহ্নোৎসব করেছিল এই ফ্যাসিস্টরা। এইসব বইয়ের মধ্যে অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ও এরিখ মারিয়া রেমার্কের বইও ছিল।(১৭)

স্পেনে ফ্যাসিস্টদের দস্যুতা ও ফ্যাসিস্টবিরোধী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে লিগ এগেইন্সট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওঅরএর সভাপতি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের প্রথমেই একটি বিবৃতি দিতে গিয়ে বলেছিলেন

স্পেনে আজ বিশ্বসভ্যতা পদদলিত। স্পেনের জনগণের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রাঙ্কো বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়েছে। অর্থ ও জনবল দিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্য করছে আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ।শিল্পসংস্কৃতির গৌরব কেন্দ্র মাদ্রিদ জ্বলছে। বিদ্রোহীদের বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হচ্ছে তাঁর শিল্পের অমূল্য সম্পদ।লাখে লাখে এগিয়ে আসুন, গণতন্ত্রের সাহায্যে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির রক্ষায়।(১৮)

ফ্যাসিবাদ সংস্কৃতির ঘোষিত শত্রু। একথা সমসময়ে আমাদের বাংলার অনেক প্রথিতযশা লেখক চিন্তাচেতনায় যাঁরা মার্কসবাদকে গ্রহণ করেননি অন্তর থেকে উপলব্ধি করেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু এই ফ্যাসিস্ট বর্বরতার বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে বলেছিলেন

বর্বরতার বিরুদ্ধাচরণ মনুষ্যধর্ম মাত্র, কিন্তু লেখকদের পক্ষে এর একটু বিশেষ তাৎপর্য আছে। পশুত্বের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতেই হবে, নইলে আমাদের অস্তিত্বই যে থাকে না। আমরা যারা সংস্কৃতিতে, বিশ্বমানবের ঐতিহাসিক প্রগতিতে আস্থাবান,আমাদের এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।(১৯)

প্রখ্যাত কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন

এই ফ্যাসিজমের অধীনে যে সাহিত্য, যে শিল্প রচিত হবে তার কথা চিন্তা করতে গেলে আমার মনে পড়ে জেলখানার সতরঞ্চির কথা, ছোবড়া পাকানো দড়ির কথা; যার গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে পাকে পাকে নির্যাতিত মানবাত্মার অভিশাপ।(২০)

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝির পর রবীন্দ্রনাথ আবার ফ্যাসিবাদবিরোধী বিবৃতি দিয়েছিলেন। একসময় ধূর্ত মুসোলিনির কুশলী ফাঁদে তিনি পা দিয়েছিলেন এবং মুসোলিনির কিছু প্রশংসাও করেছিলেন। পড়ে রমাঁ রলাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিনি ফ্যাসিজমের প্রতি মোহমুক্ত হন এবং শেষপর্যন্ত বিবৃতি দিয়েছিলেন

যে মুহূর্তে আমি জেনেছি সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয়তাবাদের প্রতি অন্ধ আসক্তিই ফ্যাসিবাদের লক্ষ্যস্থল; সেই মুহূর্তেই তার প্রতি আমার সমস্ত সহানুভূতি আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছি।(২১)

এই বিবৃতিটি রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের অগাস্ট মাসে। আর এর ১৪ বছর পরে তিনি আবার বিবৃতি দিতে গিয়ে বলেছেন

জর্মানীর বর্তমান শাসকের উদ্ধত দুর্বৃত্ততার সর্বশেষ প্রকাশে বিশ্বের বিবেক প্রচণ্ড ঘা খেয়েছে। দীর্ঘকাল থরে চলে আসছে দুর্বলের ওপরে পর্যায়ক্রমিক ভীতিপ্রদর্শন রাইখরাষ্ট্রে ইহুদি নির্যাতন থেকে শুরু করে বীর ও প্রকৃত অর্থেই উদার চেকোস্লোভাকিয়ার বিনাশ পর্যন্ত তারই অনিবার্য পরিণতি এই ঘটনা।(২২)

ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান :: প্রেক্ষাপট ভারতবর্ষ

এক.

shiv_sena-2ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের পর সত্তর বছর অতিক্রান্ত হতে চললো। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘটেছে? ফ্যাসিবাদ কি মৃত? চেতনার অধিক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ বেঁচে রয়েছে বহাল তবিয়তে। সে লালিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল ঘটনাবলীর, মানবতাবিরোধী চিন্তাবিন্যাসের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে রয়েছে এই অশুভ প্রবণতা। সে জমি খুঁজছে, সংগ্রহ করছে গরল যা ঠিক সময়ে ঠিকভাবে উগ্রে দিয়ে বিষের ধোঁয়ায় আগুন জ্বালাবে।

ছয়ই ডিসেম্বর বিরানব্বইয়ের কথা, দেশব্যাপী করাল অগ্নিশিখার সামনে বিপন্ন মানবতার সেই দুঃস্বপ্নের মুহূর্তগুলি, তার ক্ষতগুলি এখনও জ্বলজ্বল করছে দীর্ঘ বাইশ বছর অতিক্রান্তির পরেও। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কৌশলে মানবতাবিরোধী এই ফ্যাসিস্ট প্রবণতাগুলি ক্রমাগত রসদ সংগ্রহ করছে। সত্তরবছর পরেও ফ্যাসিবাদের বিপদ রয়ে গিয়েছে শুধু নয়, তা এখন ক্রমশই উন্মত্ত হয়ে উঠছে এই আমাদের দেশেই। অযুক্তিই ফ্যাসিবাদের যুক্তির আহরণক্ষেত্র। অবিজ্ঞানই তার কাছে বিজ্ঞান বিরোধিতার জন্যে গ্রহণীয়। যুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মার্কসবাদ ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও সর্বাত্মক যুদ্ধই হলো ফ্যাসিবাদ।

আমাদের দেশে বিজেপি, ভিএইচপি, শিবসেনা, আরএসএস সহ নানাবিধ, নানাধরনের সংগঠন আছে সঙ্ঘপরিবারের। এই সংঘপরিবারের সমস্ত শাখাপ্রশাখাগুলি ফ্যাসিস্ট মননে ঋদ্ধ, ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়ায় লালিত ও বিকশিত। ১৯৯২এর ৬ ডিসেম্বর এরা ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে যেভাবে ধ্বংস করে উল্লাস প্রকাশ করেছিল, তাতে করে তাদের উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী চারিত্রই নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। এমন উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি তরুণদের মধ্যে প্রোথিত করেছে যে, অযুক্তি ও সম্প্রদায়গত সুতীব্র বিদ্বেষ তাদের মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে।বিরানব্বইয়ের ছয়ই ডিসেম্বরের প্রায় আড়াই বছর পর একজন সাংবাদিক ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে অযোধ্যায় গিয়ে এরকম তথ্যেরই সন্ধান পেয়েছিলেন। ষোলোবছর বয়স্ক, দশমশ্রেণীর ছাত্র, জনৈক সন্তোষ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রসঙ্গে রীতিমতো ক্রোধের সঙ্গেই বলেছিলো প্রতিটি মুসলমানই বিশ্বাসঘাতক, তাদের এদেশ থেকে খেদিয়ে দেওয়া উচিত, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে তাদের সব সম্পত্তি লুট করে নেওয়া উচিত!(২৩) বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবনযোগ্য।

পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়ার অনুশীলনেই এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি ক্রমাগত রসদ সংগ্রহ করে চলেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার ব্যাপারেও এরা সর্বাত্মকভাবে সামিল হয়েছিলো এবং বৃহৎপুঁজি ও কর্পোরেট দৈত্যদের হিসেব ও হিসেববহির্ভূত সাহায্যসহযোগিতায় পরিপুষ্ট হয়েছিলো। নির্বাচনের সময় সঙ্ঘপরিবার সারাদেশ জুড়ে যেভাবে একটা উন্মাদনা শুরু করেছিল এককনায়কের প্রচারে, তা একদিকে যেমন অতীতের সব রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছিল, তেমনই অভূতপূর্ব সাফল্যও অর্জন করেছিল। আচ্ছে দিন নামক এক আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক স্বপ্ন বিক্রি করে সংঘপরিবারের বিশ্বস্ত সেনাপতি নরেন্দ্র মোদি তো স্বপ্নের সওদাগরই হয়ে গেলেন! ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরের নির্বাচনে যে মুসোলিনির পার্টি (Fascist Di Combatti Mento) মিলানে ১,৮০,০০০ সমাজতান্ত্রিক ভোটের বিপরীতে মাত্র ৪,৭৯৫ টি ভোট পেয়েছিল, সেই পার্টিই পরবর্তীতে দেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল।(২৪) ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যে ফ্যাসিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ২০,০০০, তা পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২,৪৮,০০০এ।(২৫) ১৯২১এর নভেম্বরে ফ্যাসিস্ট ইউনিয়নগুলির সদস্য সংখ্যা যেখানে ছিল ৬৪,০০০, তা পরবর্তী দুমাসের মাথায় বেড়ে দাঁড়ায় ২,০০,০০০ এবং ১৯২২এর শেষে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮,০০,০০০এ।(২৬) আর এভাবেই মুসোলিনির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পথ সুগম হয়েছিল। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট পার্টির ক্ষমতায় আসার পথে যে প্রক্রিয়া তার বিকাশ কার্যকারিতায় থেকে গিয়েছিল, তার ছায়াপাত কিন্তু আমাদের দেশেও দুর্নিরীক্ষ্য নয়। যে হতাশা, অর্থনৈতিক নৈরাশ্য, জাতীয় রাজনীতির সংকট ফ্যাসিস্ট শক্তির মাথা তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল, সে ধরনের সমরূপতা আমাদের দেশেও বিদ্যমান। সোভিয়েতের পতনের ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যে সংগঠিত আক্রমণ শুরু হয়েছিল, তাও আমাদের দেশের এই হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলির হাতে আরও কার্যকরী অস্ত্র তুলে দিয়েছে। আমাদের দেশে বিজেপি সহ সঙ্ঘপারিবারিক দলসমূহ এবং তাদের সমস্ত শাখা সংগঠনগুলি মার্কসবাদ ও কমিউনিজমকে তাদের চরমতম শত্রু বলে মনে করে। বিজেপির ছাত্র সংগঠনের (অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ) তরফে প্রকাশিত একটি পুস্তিকায় প্রথমেই নির্দিষ্টভাবে নকশালপন্থা এবং সিপিআই (এম এল) এবং সাধারণভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে।(২৭) স্বভাবতই এদের উদ্দেশ্য পরিস্কার।

মহারাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে শিবসেনার শিবসৈনিকরা মহানগর পত্রিকার অফিস ভেঙে দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর বাল থ্যাকারের নেতৃত্বে সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। শিবসেনার রক্তচক্ষুর সামনে বহু খবরের কাগজ মাথা নত করেছিল। সেখানে এক মহিলা সাংবাদিককে তার ফ্লাট ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল! এর ফলে সেই সাংবাদিক ভদ্রমহিলা এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি থানায় ডায়েরি করার সাহস পর্যন্ত পাননি। এর পাশাপাশি একথাও মনে রাখা দরকার যে, যে কোনও ডায়েরি থানায় নেওয়া হতো না, কারণ সত্তর ভাগ বোম্বে পুলিশই তো সেনা সমর্থক। দাঙ্গার সময় এরা প্রকাশ্যে মুসলিম পেটানোয় মদত দিতো।(২৮) নির্ভীক সাংবাদিক নিখিল ওয়াগলে শিবসেনাধ্যক্ষ বাল থ্যাকারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাঁর রক্তচক্ষুর দিকে প্রতিস্পর্ধায় মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে নজির সৃষ্টি করেছিলেন।

উনিশশ পঁচানব্বই খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে গণেশপুজোর প্যান্ডেল সম্পূর্ণ রাস্তাজুড়ে করার বিরুদ্ধে প্রশাসনের তরফে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে সেখানে রাতারাতি গণেশসেনা গঠন করা হয় এবং সেই গণেশসৈনিকরা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার সমর্থক জনৈক আইনজীবীর ওপর চড়াও হয়েছিল।(২৯) স্মরণ থাকতে পারে যে, গণেশের দুধ খাওয়ার মতো একটি তথাকথিত, বহুল প্রচারিত অথচ স্বল্পস্থায়ী, ঘটনাকেও এই হিন্দুত্ববাদীরা বিজ্ঞানবিরোধী অবিজ্ঞানের আবেগময় যুদ্ধে সঞ্চালিত করেছিল। এখানেও যুক্তির বিরুদ্ধে তাদের হাতিয়ার ছিল অযুক্তিই। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফে হিন্দুধর্মীয় ভাবাবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে বলা হয়েছিল

…the phenomenon being called the milk miracle should be taken as a precursor of things to come and an indicator that the coming century would be a Hindu one.”(৩০)

দুই.

আগামী শতাব্দী অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীকে হিন্দু ভারত তথা ফ্যাসিস্ট ভারত বানাবার সঙ্ঘপারিবারিক পরিকল্পনা তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের সন্ধান করছে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায় আসীন হওয়ায়। আর এই স্বপ্নের হিন্দু তথা ফ্যাসিস্ট ভারতে কমিউনিস্টদের কোনও স্থান থাকবেনা, মুসলমানদের কোনও স্থান থাকবে না, খ্রিস্টান সহ অহিন্দু জনসাধারণের কোনও স্থান থাকবে না। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ অগাস্ট তৎকালীন বিজেপিসভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টিকে হিন্দু রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করা ভুল নয়। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর সঙ্ঘপরিবারের অবিসংবাদিত নেতা বালাসাহেব দেওরস খুব নির্দিষ্টভাবে হিন্দু এবং জাতীয়তা শব্দদুটিকে সমার্থক বলে ঘোষণা করেছিলেন। গোলওয়ালকরও ভারতীয় এবং হিন্দু শব্দদ্বয়কে সমার্থক বলে গণ্য করেছিলেন। তাঁর বাঞ্চ অব থট গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন ভারতীয়’ শব্দটিকে সাধারণত ইন্ডিয়ান নামক ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত ইন্ডিয়ান বললে এদেশে বসবাসকারী মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি প্রমুখ সবাইকেই বোঝায়। ফলে তা বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বরং হিন্দু শব্দটি হচ্ছে ঠিক সেই নির্ভুল শব্দ যা আমরা বোঝাতে চাই।(৩১)

গোলওয়ালকর বলেছিলেন আমরা নারীকে পবিত্র মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে গৌরবান্বিত করলে (একজন মুসলিম) চাইবে নারীর শ্লীলতাহানি করতে।(৩২) এর অর্থ কি এটাই নয় যে হিন্দুত্ববাদীরা যদি নারীজাতিকে ‘পবিত্র মাতৃত্বের’ প্রতীক হিসেবে গৌরবান্বিত করেন, তবে মুসলমানরা তাঁদের শ্লীলতাহানিকর কাজ করবে কেননা মুসলমানদের কাজই হলো হিন্দু নারীর শ্লীলতাহানি করা! আর সেই জন্যেই শ্লীলতাহানির হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করতেই হিন্দুত্ববাদীরা নারীকে মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য করতে চান না! মার্চ ১৬, ১৯৪৪ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তার এক সার্কুলারে বলেছিলো আরএসএস হলো একটা রাজনৈতিকবাণিজ্যিক সংগঠন; যা ফ্যাসিবাদী ধারায় একটা জঙ্গি সংস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।(৩৩) এই কথাটি যে কতখানি সত্য, তা তাঁর একাত্তর বছর পরে এসেও আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে গোলওয়ালকরের উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড প্রকাশিত হওয়ার বছর দুয়েক পর গঠিত হয় জামাতইসলামি। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের অগাস্ট মাসে মওলানা আবুল আলা মওদুদির নেতৃত্বে তার প্রতিষ্ঠা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পাঠানকোটে। আরএসএসএর গোলওয়ালকরএর প্রতিবর্ত ছিলেন জামাতইসলামির মওদুদি। দুই ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের এই দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানে অমিলের পাশাপাশি মিলও অনেক। হিটলার একইসঙ্গে গোলওয়ালকর ও মওদুদির গুরুস্থানীয়। সাতচল্লিশে দেশভাগের প্রেক্ষিতে মওদুদি এক বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছিলেন, তা বিস্ময়কর হলেও সত্য। তিনি অকপটে বলেছিলেন

যদি হিন্দুবিধানের ওপর ভর করে কোনো হিন্দু সরকার ভারতে আসে এবং মনুর বিধান আইনরূপে গৃহীত হয়, এবং যার ফলে মুসলিমরা অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হয়, সরকারে তাদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া হয় শুধু তাই নয়, তারা (যদি) নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত পর্যন্ত হয়, তবে আমার আপত্তি নেই। (অনুবাদে এমনই আছে অ চ)(৩৪)

১৯৪৮এর সেপ্টেম্বরে গোলওয়ালকর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে, যেভাবে কমিউনিজমের মতো একটা বিদেশি মতবাদ ক্রমাগত বেড়ে উঠছে, তাতে তাঁর উদ্বেগ বেড়ে গিয়েছে। তিনি প্যাটেলকে সরাসরি প্রস্তাব দেন, যদি সরকারি ক্ষমতা আর তাঁদের সংগঠিত ক্ষমতা জোটবদ্ধ করা সম্ভব হয়, তাহলে এদেশ থেকে কমিউনিজমের বিপদ দূর করা সম্ভব!(৩৫) এই সঙ্ঘপারিবারিক হিন্দুত্ববাদীদের কমিউনিস্টবিরোধী অ্যাজেন্ডা এখানে পরিস্কার। ফ্যাসিস্ট দর্শনের এই বিষয়টিকে তারা আন্তরিকভাবেই আত্মস্থ করেছিল। নাৎসি জার্মানির গোয়েরিং বলেছিলেন কেউ যখন সংস্কৃতি আর ইতিহাসের কথা বলে, তখন তাঁর হাত কখন যেন নিজের অজান্তেই রিভলভারের ট্রিগারের দিকে চলে যায়!(৩৫) আমাদের দেশের পশ্চিমবঙ্গে একটি দৈনিক বাংলা সংবাদপত্রে বিখ্যাত লেখক গৌতম রায় ধারাবাহিকভাবে আরএসএসএর তথ্যমূলক ইতিহাস লিখছিলেন, এবং যেহেতু সেই লেখায় আরএসএসএর প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটিত হচ্ছিল, সেহেতু গৌতম রায়কে রীতিমতো হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তাঁর মোটর বাইকটিকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।(৩৬) এ ঘটনা ২০০২ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধের শেষাশেষি নাগাদ। তখন এনডিএনেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার দিল্লির ক্ষমতায় আসীন। সংখ্যালঘু সরকার, অন্যের সহযোগিতানির্ভর। আর এখন তো এই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। স্বভাবতই তাদের আগ্রাসী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের প্রকাশ ঘটাই স্বাভাবিক।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দের অগাস্ট মাসের প্রথম দিকে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামি মৌলবাদ প্রসঙ্গে দুদিন ব্যাপী এক সেমিনার। এই সেমিনারের উদ্যোক্তা ছিলো আরএসএস স্বয়ং। এই সেমিনারের পরবর্তীতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আরএসএসএর তৎকালীন সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বলেছিলেন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে, তবে আগামী পঁচিশ বছর আর তাদের ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবেনা। আর যদি বিজেপি তা না পারে, তবে আগামী একশ বছরের মধ্যে তারা আর তা পারবে না।(৩৭) এই বক্তব্যের মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে আরএসএস যে কতটা মরীয়া হয়ে উঠেছিলো, তা পরিস্কার। বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ায় সঙ্ঘপরিবারের কাছে তা এখন আচ্ছে দিনএর বার্তাবাহক হয়ে উঠেছে। সারাদেশ জুড়ে সঙ্ঘপরিবারের ১,৫০,০০০ প্রকল্প কার্যকরী রয়েছে, তারা এখন এই আচ্ছে দিনের প্রসাদ ভোগ করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। ভাগবত নির্দিষ্ট করেই বলেছেন যে, এদেশের হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশংকার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সুতরাং এখন এদেশের হিন্দুদের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদী অবস্থান নেওয়া দরকার।(৩৮) ইঙ্গিতটি পরিষ্কার। অথচ বাস্তব তথ্য হলো ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা যেখানে ছিলো মোট জনসংখ্যার ১৩.৪০%, তা ২০১১ খ্রিস্টাব্দে দাঁড়িয়েছে ১৪.২০%। অর্থাৎ এই দশবছরে এই হার বৃদ্ধি হয়েছে ০.৮০% মাত্র। আর নির্দিষ্টভাবে পশ্চিমবাংলায় ২০০১এ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ছিলো ২৫.২০%, তা পরবর্তী দশবছরে বেড়ে হয়েছে ২৭%। অর্থাৎ এই বৃদ্ধির হার ১.৮০% মাত্র।(৩৯) স্বভাবতই সঙ্ঘপারিবারিক নেতৃত্ব কেন এবং কী উদ্দেশ্যে আসল তথ্য চেপে গিয়ে ভুল এবং মিথ্যে তথ্য পরিবেশন করে হিন্দুদের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের পক্ষে সওয়াল করছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয়না।

ডোনাল্ড স্মিথ ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর ইন্ডিয়া অ্যাজ আ সেকিউলার স্টেট শীর্ষক গ্রন্থে বলেছিলেন

The leader principle, the stress on mililtarism, the docrine of racial-cultural superiority, ultra-nationalism infused with religious idealism, the use of symbols of past greatness, the emphasis on national solidarity, the exclusion of religious or ethnic minorities from the nation concept—all these features of the RSS are highly reminiscent of fascist movement in Europe.”(৪০)

আরএসএসএর যে যে বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে উল্লেখ করে তার মধ্যে ইউরোপের ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের প্রতিরূপের সন্ধান পেয়েছেন ডোনাল্ড স্মিথ, তার মধ্যে যে অতিশয়োক্তি কিছু নেই, তা বোধকরি বিতর্কের অতীত। সত্তরের দশকে ভিওয়ান্ডি দাঙ্গার প্রেক্ষিতে ম্যাডন কমিশন তার রিপোর্টে বলেছিল যে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা রাতারাতি ছড়ায় না, সাম্প্রদায়িক প্রচার, সাম্প্রদায়িক ঘটনায় ক্রমাগত ইন্ধন, পরিকল্পিত গুজব ছড়ানো প্রভৃতি কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় মানুষের মনের ভেতর ঘৃণা জাগানো ও হিংস্র আচরণের বীজ বপন করার মধ্যে দিয়ে এর প্রকাশ ও বিস্তার ঘটে।(৪১) এবং ঠিক এই কাজগুলিই সঙ্ঘপরিবার রীতিমতো পরিকল্পনামাফিক আমাদের দেশে করে থাকে। বিরানব্বইয়ে বাবরি ধ্বংসের ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাবলীই এর প্রমাণ। তেলিচেরির দাঙ্গা প্রসঙ্গে তদন্ত কমিশনের তরফে তো সরাসরি সঙ্ঘপরিবারের দিকে আঙুল তোলা হয়েছিলো, তদন্ত কমিশনের ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি কোনোরকম দ্বিধা ব্যতিরেকেই বলেছিলেন যে, তেলিচেরির দাঙ্গার পেছনে যে জনসঙ্ঘের হাত ছিল, এবিষয়ে তিনি নিঃসন্দিগ্ধ; এমনকি এই দাঙ্গা সঙ্ঘটিত করার পেছনে যে আরএসএস তেলিচেরির হিন্দুদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়েছিল, সে ব্যাপারেও তিনি সুনিশ্চিত।(৪২)

এন ডি এর আমলে (১৯৯৯২০০৪) সঙ্ঘপরিবারের কট্টর সঙ্ঘী কৃষ্ণ গোপাল রাস্তোগি তৎকালীন কেন্দ্র সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের দুটি কমিটির কাজের দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনী প্রচারক জীবনএ গর্বের সঙ্গে লিখেছেন যে, একটি মুসলিম অধ্যুসিত এলাকায় ২৫০ জনের মতো কুখ্যাত সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি হামলা চালান, হত্যালীলা সংঘটিত করেন, লুটতরাজ করেন এবং একটি অসাধারণ সুন্দরী অসহায় বাচ্চা মেয়েকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেন। এবং তাঁর গর্বোদ্ধত উক্তি সম্বলিত এই আত্মজীবনী গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেছিলেন আরএসএসএর তৎকালীন প্রধান সুদর্শন স্বয়ং!(৪৩) অসীমানন্দের সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার পেছনে যে আরএসএসএর উচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিলো, তা এক সাক্ষাৎকারে অসীমানন্দ নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি একথাও বলেছেন মোহন ভাগবত তাঁকে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন এধরনের কাজ করতেই হবে, তবে দেখো এব্যাপারে যেন সঙ্ঘপরিবারের নাম জড়িয়ে না যায়(৪৪) এই হচ্ছে সঙ্ঘপরিবারের স্বরূপ। এই স্বরূপকে আড়াল করে তারা অনেক জনমোহিনী কথাবার্তা বলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তরুণসমাজকে উদ্দীপিত করে এবং যথাসময়ে নিজেদের অ্যাজেন্ডার অনুশীলন করে। জার্মান ফ্যাসিবাদের অনুসরণে সঙ্ঘপরিবার দেশের তরুণ সম্প্রদায়কেই বেশি বেশি করে তাদের কাজে লাগাতে চায়। বিশেষত মুসলিম এবং খ্রিস্টানবিরোধী প্রচার এবং ধ্বংসাত্মক প্রচারণা তরুণসমাজকে সহজেই আকৃষ্ট করে। মনে রাখা দরকার, নাৎসি জার্মানিতে হিটলার চ্যান্সেলর হওয়ার মাত্র সাড়ে চার মাস পর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বার্লিনে যা ঘটেছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। মধ্যরাত্রে হাজার হাজার ছাত্র মশাল মিছিল করে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়। সেখানে অজস্র বই স্তূপীকৃত করা ছিল। ছাত্ররা সেই বইয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। বই পোড়াতে পোড়াতে আগুন যখন তার লেলিহান শিখা বিস্তার করতে থাকে, তখন সেই আগুনে আরও অসংখ্য বই ছুঁড়ে দেওয়া হয়। সেদিন সেখানে কম করে ২০,০০০ বই ভস্মীভূত হয়েছিলো। এরকমভাবে জার্মানির অন্যান্য শহরেও বই পোড়ানো হয়। আর এভাবেই নাৎসি জার্মানিতে বইয়ের বহ্ন্যুৎসবের সূত্রপাত হয়েছিলো। বই যখন পুড়ছিলো তখন সেইসব ছাত্ররা হর্ষধ্বনি করছিলো। আর স্বয়ং গোয়েবলস এই ঘটনার তারিফ করছিলেন!(৪৫) ২০১৪র নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সরকারিবেসরকারি সমস্ত ক্ষেত্রেই সঙ্ঘপারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিখ্যাত বামপন্থী ব্যক্তিত্বদের সরিয়ে সঙ্ঘের মতাদর্শের অনুবর্তী ব্যক্তিদের বসিয়ে নিজেদের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করার প্রয়াসী স্বাক্ষর রেখে চলেছে। জার্মানিতেও একইরকম অনুশীলন হয়েছিলো। সেপ্টেম্বর ২২, ১৯৩৩ তারিখে জার্মান রাইখের সাংস্কৃতিক দপ্তরে গোয়েবলসএর নির্দেশক্রমে এক সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানানো হয়

In order to pursue a policy of German culture, it is necessary to gather together the creative artists in all spheres into a united organization under the leadership of the Reikh.The Reikh must not only determine the lines of progress, mental and spiritual, but also lead and organise the professions.”(৪৬)

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই হিটলার স্বয়ং জানিয়েছিলেন যে, জার্মানিতে সাংস্কৃতিক পাগলামির অবসান ঘটতে চলেছে এবং জার্মান জনসাধারণের মনমনস্কতাকে দূষিত করার সাংস্কৃতিক অপপ্রয়াসের পথ রুদ্ধ করা হলো।(৪৭) অনুরূপ ঘটনাই যে এদেশে সঙ্ঘপরিবার ঘটাতে উৎসাহী হতে চলেছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে সারাদেশে দাঙ্গার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘর ওয়াপ্সির নামে ধর্মান্তরকরণের প্রক্রিয়ায় গরিব মানুষজনকে প্ররোচিত করা চলছে। খোদ দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চার্চের ওপর হামলা চলছে। স্কুলে সঙ্ঘমতাদর্শের অনুগামী হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। স্কুলে গীতা পড়ানো আবশ্যিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঈশ্বরের উপস্থিতি একমাত্র হিন্দু মন্দির ছাড়া আর কোথাও নেই বলে প্রচার করা হচ্ছে। গান্ধিহত্যার কুখ্যাত খুনী নাথুরামকে বীরের সম্মান দিয়ে তাকে দেবতা বানিয়ে মন্দিরস্থ করার অপপ্রয়াসও চলেছে। গোহত্যা নিষিদ্ধ করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী অনুশীলনকে জাতীয়স্তরে চারিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। অন্যদিকে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিসদৃশ পদলেহন করে সাধারণ জনস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ করে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি সরকার।

ফ্যাসিস্ট প্রবণতার ক্রমোত্থান :: প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গ

বিজেপি সহ সঙ্ঘপরিবারের অন্যান্য সংগঠনগুলিও পশ্চিমবঙ্গে ডালপালা বিস্তারের অবিরাম প্রয়াস পেয়ে চলেছে। কেন্দ্রে বিজেপি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গেও তারা তাদের কার্যক্রমের ফলিত অনুশীলনে রীতিমতো উদ্যোগী হয়েছে। এখানে সরকারি বামপন্থার অস্তিত্বের সংকট, কংগ্রেসের অবসৃয়মানতা এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের জনবিরোধী চরিত্র এবং স্বৈরাচারী ভূমিকায় বিরক্ত মানুষের সামনে তারা নতুন আশার আলোর দিশা দেখাতে গিয়ে কমিউনিস্ট বিরোধিতা এবং সরকারের মুসলিম তোষণ, অনুপ্রবেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোরুপাচারের মতো সংবেদেনশীল বিষয়গুলিকে সামনে এনে জনমনে, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মনে, প্রভাব ফেলে নির্বাচনে রাজনৈতিক ফয়দা তোলার আপ্রাণ প্রয়াস পেয়ে চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারদা কেলেঙ্কারির মতো বিষয়ও। যদিও এসব সত্ত্বেও তারা এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনে সমর্থ হয়নি দুটি এমপি ও একটি এমএলএর পদ অধিকারিত্ব ছাড়া। তবে তারা চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখছে না। লক্ষাধিক সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করলেও, সেক্ষেত্রেও তাদের সাফল্য অর্জন এখনও সম্ভব হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, একথা বলতেই হবে। নির্বাচনে তাদের প্রাপ্তভোটের পরিমাণও বেড়েছে, সন্দেহ নেই। সরকারি বামপন্থার অবক্ষয় এবং কংগ্রেসের অবসৃয়মানতা ও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বও বিজেপি তথা সঙ্ঘপরিবারকে কিছুটা হলেও পা রাখার জমি সরবরাহ করেছে।

bajrang_dal_activists-2বিজেপি তথা সঙ্ঘপরিবারের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ধরনের সংগঠনগুলি আমাদের দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিপদকে ক্রমশই স্পষ্ট করে তুলছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের স্বপ্নের হিন্দু ভারত গঠন করার প্রক্রিয়ায় হিন্দুত্ববাদীরা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের চরম স্বৈরতান্ত্রিক কার্যকলাপ, সরকারের জনবিরোধী ভূমিকার প্রতিবাদে আন্দোলনরত মানুষের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিহীনতা, এমনকি প্রতিবাদকে সরকারের বিরুদ্ধে সিপিএম ও মাওবাদীদের চক্রান্ত হিসেবে নির্বিশেষ আখ্যাদান, ন্যূনতম সহনশীলতার অভাব জনমানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অপরিমেয় ক্ষোভবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি তথা সঙ্ঘপারিবারিক শক্তিগুলি এসবের সুযোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষের বন্ধু সেজে তাদের রাজনৈতিক ফয়দা তোলার চেষ্টা করে চলেছে। সরকারবিরোধী শক্তিগুলির দুর্বলতা তাদের আরও উৎসাহিত করেছে। সস্তা বুকনি আর চমক এবং এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের একটা মোহগন্ধী চাটনি দিয়ে এরা মানুষকে আকৃষ্ট করছে। মানুষ যে একেবারে আকৃষ্ট হচ্ছেনা, এমন তো নয়। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বামপন্থী শাসনেই বিজেপি সহ হিন্দুত্ববাদীদের পা রাখার জায়গা তৈরি হয়েছিলো। এটা অস্বীকার করা যাবেনা। বিরানব্বইয়ে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা তো আর ভোলবার নয়। দীর্ঘ বামজমানায় কীভাবে বিজেপি সহ হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গে পা রাখার জায়গা তৈরি করে? কীভাবে তারা বিকাশলাভ করে? কে বা কারা তাদের রসদ যুগিয়েছিল? এসব প্রশ্ন তো আর এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কাছে মার্কসবাদ এবং কমিউনিজম ঘোরতর শত্রু বলে চিহ্নিত। তৃণমূলের জনবিরোধী ভূমিকা ছাড়াও এই প্রপঞ্চটি ধরেও তারা এখানে এগোতে চাইছে। মনে রাখতে হবে যে খোদ বাম আমলেই বিজেপির ছাত্র সংগঠন কলকাতার বুক থেকে লেনিনের মূর্তি অপসারণের দাবি তুলেছিল। এই দাবি ছিল প্রকৃত অর্থে মার্কসবাদ তথা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার সামিল। এই দাবির যৌক্তিকতা হাজির করতে গিয়ে ওই ছাত্র সংগঠনের তরফে প্রকাশিত এক পুস্তিকায় (৪৮) দেখাবার চেষ্টা হয়েছিলো লেনিন কতো নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং হৃদয়হীন ছিলেন! মনে রাখা দরকার যে পশ্চিমবঙ্গে আশির দশকেই আরএসএস বেশ কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করেছিল। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসএর উপশাখা ছিলো প্রায় ১,০০০, যা ১৯৮৯৯০এ বেড়ে দাঁড়ায় ২,৫০০র মতো। ১৯৯২তে এই উপশাখার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪,২৩৮ টি এবং শাখার সংখ্যা ৪,১৫১ টি। অর্থাৎ শাখাউপশাখা মিলে মোট ৮,৩৮৯। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে আরএসএসএর পূর্ণ স্বয়ংসেবকের সংখ্যা ছিলো ৩১,৪২৩ জন। সাধারণ স্বয়ংসেবকের সংখ্যা ছিলো ১,৩০,৮৫৮ জন এবং সমর্থক স্বয়ংসেবকের সংখ্যা ছিলো ১,৩৭,২০৫ জন।(৪৯) এরপর কুড়ি বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। শক্তি তাদের বৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে অনুকূল পরিস্থিতিতে তারা তাদের আরও শক্তিবৃদ্ধির বিষয়ে তৎপর। এহেন শক্তির বাড়বাড়ন্ত পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাইছে তা বিস্তৃত ব্যাখ্যার অবকাশ রাখেনা। ভারতের মাটিতে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রবক্তারা অর্থাৎ এই ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট সংগঠনের নেতৃত্বরা জার্মানির ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বকে সমর্থন জানাতে দ্বিধা করেনি। এঁরা পরিস্কার ভাষায় বলেছিলেন

অনুকূল পরিবেশ থাকলে আরএসএস হবে, যা হয়েছিল জার্মানিতে হিটলারইয়ুথ বা ইটালিতে ফ্যাসিস্ট যুব সঙ্ঘ। শৃঙ্খলা, সংগঠিত কেন্দ্রিকতা ও সংঘবদ্ধ চেতনার নাম যদি হয় ফ্যাসিবাদ, তবে আরএসএস নিজেকে ফ্যাসিস্ট বলতে লজ্জিত নয়।(৫০)

অথচ এর বিরুদ্ধে, বিগত বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে, কোনও কার্যকরী পদক্ষেপের কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। বরং বহু বামপন্থী বুদ্ধিজীবীও তাঁদের আত্মসন্তুষ্টি ও ঔদাসীন্যের কারণেই এই অশুভ শক্তির শক্তিবৃদ্ধিতে রসদ যুগিয়েছিলেন। আজ থেকে সত্তর বছরেরও আগে কবি সমর সেন লিখেছিলেন বুদ্ধিভ্রংশ তারই ঘটে, সর্বনাশ ভবিতব্য যার। এই বুদ্ধিভ্রংশতাই শেষপর্যন্ত ডেকে আনে সর্বনাশের দিনগুলি। সমকালের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী সেইসময় লিখেছিলেন

দার্শনিক ভিত্তি থাকুক আর নাই থাকুক, আমাদের দেশের পণ্ডিতদের ঝোঁক তবু ফ্যাসিজমের দিকেই শেষপর্যন্ত যেয়ে দাঁড়ায়। অযৌক্তিক ফ্যাসিজমই আমাদের যুক্তিঅভিমানী বুদ্ধিজীবীদের বেশি আকৃষ্ট করে।এটা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির দৈন্য ছাড়া আআর কিছুই সূচিত করেনা।(৫১)

সাত দশকেরও বেশি সময়ের আগের এই কথাগুলো কি আজও আমাদের দেশের ফ্যাসিস্ট প্রবণতার আগুনে হাওয়াদেওয়া বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশের ভূমিকা থেকে স্পষ্ট হয়না? বুদ্ধিজীবীদের একটা বড়ো অংশের দায়িত্বহীনতায়, বিবেকবুদ্ধি বিক্রয়ের ঘটনায় স্বয়ং রমাঁ রলাঁ পর্যন্ত একটা সময় আত্মগ্লানিতে আর্তনাদ করেছেন।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ অগাস্ট কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসের গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছিল

ফ্যাসিজম জয়যুক্ত হইলে সাধারণের ভাগ্যে কি ঘটে ফ্যাসিসত জার্মানি সারা দুনিয়াকে তাহা স্পষ্ট দেখাইতেছে। উন্মত্ত ফ্যাসিস্ট সরকার শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, তাঁহাদের নেতা ও সংগঠকদের কারাগারে বন্দিনিবাসে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিতেছে।আন্তর্জাতিক প্রতিবিপ্লবের ঝটিকা বাহিনী হিসাবে তাহারা অগ্রণী।(৫২)

এর প্রায় দুবছর আগে (১৯৩৩এর অক্টোবরে) রোথারমিয়ার (Rothermere) প্রেসের তরফে সরাসরি কমিউনিস্ট বিরোধিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফ্যাসিস্ট হুঙ্কার উচ্চারিত হয়েছিলো এইভাবে

The sturdy young Nazis of Germany are Europe’s guardians against the communist danger.”(৫৩)

সাত দশকেরও বেশি আগে উপরিউক্ত উচ্চারিত বক্তব্যগুলি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার গুরুত্ব দিয়েছিলেন, এমন তথ্য অপ্রতুল। অথচ ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে তাঁরা ঘটা করে অনুষ্ঠান করেছিলেন। আর এখন তো পশ্চিমবাংলায় সেই সরকারি বামপন্থীরা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে আরও একটা জনস্বার্থবিরোধী তুমুল দক্ষিণপন্থী এবং ফ্যাসিস্টপ্রবণ দল। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারি বামপন্থীদের অনুশীলিত জনবিরোধী ভূমিকার নিপুণ অনুকৃতিতে বর্তমান সরকার হয়ে উঠেছে জনগণের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের আন্দোলনদমনের এক কালাপাহাড়ী সরকার। এর বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভবিক্ষোভকে পুঁজি করে বিজেপি ও সঙ্ঘপরিবার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে মসগুল হয়েছে।

পরিশেষে

ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের সত্তর বছর অতিক্রান্তির পথে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ কি সত্যিই পরাজিত? ফ্যাসিবাদ কি সত্যিই মৃত? সে যে নতুন শক্তিতে জেগে উঠতে চাইছে আমাদের দেশের মাটিতেই—কিন্তু এর বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখর কর্মসূচিগত চিন্তাভাবনা এখনও যথেষ্ট দুর্বল বলেই মনে হয়। জোসেফ স্তালিনের একটা বক্তব্যাংশ উদ্ধৃত করছি

কেউ কেউ মনে করেন যে একটা সঠিক নীতি নির্ধারণ করে সর্বসমক্ষে সজোরে তা ঘোষ করা, সাধারণ নিবন্ধ ও সিদ্ধান্ত হিসেবে সে নীতির ব্যাখ্যা করা এবং সর্বসম্মতিক্রমে তা গ্রহণ করাই বুঝি যথেষ্ট। আর তা হলেই একেবারে আপনা থেকেই, যাকে বলে কল টিপলেই যেন, জয়মাল্য এসে যাবে। এধারণা অবশ্যই ভুল। (৫৪)

আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। তাদের ক্রমোত্থানের সম্ভাবনা এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন জনবিরোধী সরকারটি পরিস্থিতি বুঝে আশু সুবিধালাভের স্বার্থে যে কোনও সময় এই ফ্যাসিবাদের সঙ্গী হয়ে উঠতেই পারে। স্বভাবতই এই ফ্যাসিবাদ রুখতে চাই নীতিনিষ্ঠ কর্মসূচি, সংগ্রামী যুক্তফ্রন্ট। ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের সত্তর বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আমাদের দেশে ক্রমোত্থানরত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, তার সমস্ত ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে, নতুন করে শপথ গ্রহণ করার ঐতিহাসিক কর্তব্য আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই কর্তব্যে অবহেলার পরিণাম হবে মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস, দেশজুড়ে সুদীর্ঘ সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী বিভিন্ন মুসলিম স্থাপত্যকলা ও মসজিদের ওপর ধ্বংসের পরোয়ানা জারি করে সঙ্ঘপরিবার তো সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। সে যুদ্ধ তো জারি আছে, থাকবেও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন শিল্পীর ওপর হামলা চালিয়েছে তারা। কারগিল যুদ্ধের সময় দিলীপকুমারের ওপর পাকিস্তানি খেতাব ত্যাগ করার জন্যে চাপ সৃষ্টি করে একদিকে যেমন সংস্কৃতির গোয়েবলসীয় কায়দায় বন্দুকের আধিপত্য কায়েম করার প্রয়াস পেয়েছিল, তেমনি কারগিল যুদ্ধকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের খাতে বহিয়ে দিয়ে হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষের প্রেরণায় মুসলিমবিরোধিতাকে সর্বাত্মক রূপ দিতে চেয়েছিল। মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টানদের ওপর পাশবিক হামলার ক্রমাগত নজির সৃষ্টি করেছিলো। অস্ট্রেলীয় মিশনারি গ্রাহাম স্টুয়ার্ড স্টেইনস ও তাঁর দুই শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে মেরে তারা এদেশে নাজি জার্মানির প্রেতাত্মাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টাও করেছিলো। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শেষ দুই বছরে সারা দেশে খ্রিস্টানদের ওপর ১৫০ টির মতো আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিলো। আর কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে এদের বিজাতীয় ঘৃণা তো এদের স্যাসিস্ত মতাদর্শের সঙ্গেই পূর্ণ সঙ্গতি রক্ষা করে। আর এখন যেহেতু তারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নিয়েছে, ফলে তাদের এখন আরও আক্রমণশীল হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি তামিল লেখক পেরুমলের ওপর পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট পদ্ধতিতেই চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে নতুন করে আর লেখা থেকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছে তারা, তাঁকে বদলি করেও মনের ওপর ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছে। একবার বিরোধী দলের জনৈক নেতা হিটলারকে বলেছিলেন যে, তিনি আর যাই হোক হিটলারকে সমর্থন করবেন না। হিটলার তার উত্তরে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন

…I calmly say, ‘your child belongs to us already…What are you? You will pass on. Your descendants, however now stand in the new camp. In a short time they will know nothing else but this new community.’…”(৫৫)

এই হলো ফ্যাসিবাদের ভয়ঙ্কর রূপ। তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ফ্যাসিস্ট বানাবার প্রকল্প নিয়ে গোটা মানবসভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলো। তারপর বহুবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সোভিয়েত সহ পূর্ব য়ুরোপের পতন হয়েছে। তবু বিপ্লবী মতবাদ এবং সমাজ পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসসেবে মার্কসবাদলেনিনবাদ বিকল্পহীন থেকে গিয়েছে। মার্কসবাদ বিদেশি ভাবধারায় গঠিত, এদেশে এর কোনও প্রাসঙ্গিকতা ও ভবিষ্যৎ নেই ইত্যাকার কথামালা ও প্রচারপ্রচারণা রাখলেও মার্কসবাদ ও কমিউনিজমের ঘোরতর শত্রু ফ্যাসিবাদের প্রবক্তা এই সঙ্ঘপরিবার ভালোই জানে যে এদেশে তাদের ঈপ্সিত ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথে মূল বাধা এই মার্কসবাদী তথা কমিউনিস্টরাই। সংসদসর্বস্ব বামপন্থার বাইরে এব্যাপারে তারা সবচাইতে ভয় পায় নকশালপন্থীদের। লালকৃষ্ণ আদবানি তো ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে কোনোরকম রাখঢাক না করেই প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, নকশালপন্থাই হচ্ছে ভারতীয় স্বপ্নের অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায়। সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়েই এদের উৎখাত করতে হবে!(৫৬)

ফ্যাসিস্ট শক্তি নতুনভাবে, নবোদ্যমে জেগে উঠছে আমাদের এই দেশে, ভারতবর্ষে। নতুন শতাব্দীর চোদ্দটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দিল্লির নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় বসে বিজেপি এখন সঙ্ঘপরিবারের স্বপ্নপূরণের খোয়াব দেখছে। পরিস্থিতি ক্রমশই হয়ে উঠছে ভয়াবহ। কর্পোরেট শক্তি এবং বৃহৎ পুঁজির সহযোগিতায় অমিত শক্তির অধিকারী হয়ে এক হিন্দু ভারতের নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদ তাদের বাড়তি শক্তি যুগিয়েছে। আমরা এই বিকাশমান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কোন পথপদ্ধতি গ্রহণ করছি তার ওপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনমাসবছরগুলি কেমন যাবে। নিপীড়িত মানবাত্মার আর্ত কান্নায় সময় কলঙ্কিত হবে, না উত্তোলিত লালঝাণ্ডার নিচে সমবেত মানুষের গর্বিত সমাবেশে লেখা হবে মানবমুক্তির নতুন ইতিহাস?

————————————

তথ্যপঞ্জি

১। হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় বেচারা বিলাসরাও বাইরে ঠাকরে, ঘরে পওয়ার। আনন্দবাজার পত্রিকা নভেম্বর ২৫, ১৯৯৯

২। শ্যামল চক্রবর্তী মৌলবাদের সর্বগ্রাসী আক্রমণ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। কলকাতা। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ পৃ ২৩

৩। দেবাশিস চক্রবর্তীঃ সঙ্ঘপরিবার কেন জনগণের শত্রু। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। কলকাতা। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ ১৩

৪। The Asian Age, November 21, 1999

৫। দেবাশিস চক্রবর্তী। প্রাগুক্ত। পৃ ২

৬। শ্যামল চক্রবর্তী প্রাগুক্ত। পৃ ১৫

৭। Robert E. Sherwood: Roosevelt and Hopkins. Vol. 2. Bantham Books. Newyork. September 1950 edn. P 553

৮। Ibid.

৯। সুস্নাত দাশ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে অবিভক্ত বাংলা। প্রাইমা পাবলিকেশনস। কলকাতা। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ ২৫২৫৩

১০। জর্জি দিমিত্রভ শ্রমিক ঐক্য ফ্যাসিবাদবিরোধী দুর্গ। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। কলকাতা। ১৯৭৪ সংস্করণ। পৃ ৬

১১। প্রাগুক্ত। পৃ ৭

১২। দেবাশিস দত্তগুপ্ত চল্লিশলক্ষ মানুষের স্মৃতিসৌধ। নবান্ন, শারদ ১৪০২ বঙ্গাব্দ। পৃ২৯

১৩। প্রাগুক্ত। পৃ ৩১

১৪। উদ্ধৃত, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ফ্যাসিজম ও বুদ্ধিদ্রোহ। অগ্রণী, প্রথমবর্ষ, প্রথমসংখ্যা জানুয়ারি ১৯৩৯ উদ্ধৃত, বাংলার ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐতিহ্য। মনীষা। কলকাতা। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ ১৩৬

১৫। প্রাগুক্ত। পৃ ১৩৭

১৬। প্রাগুক্ত

১৭। অনিশ্চয় চক্রবর্তী আমিত্বের যুক্তিহীন বন্দনা। রবিবাসর আজকাল। জুন ১৮, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ

১৮। Statesman, March 3, 1937 উদ্ধৃত, বাংলার ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐতিহ্য। প্রাগুক্ত। পৃ ১৫

১৯। বুদ্ধদেব বসু সভ্যতা ও ফ্যাসিজম। উদ্ধৃত, প্রাগুক্ত। পৃ ১০৭, ১০৯

২০। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ সংগ্রাম ও শিল্পী। প্রাগুক্ত। পৃ ১১৫

২১। উদ্ধৃত, বাংলার ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐতিহ্য। প্রাগুক্ত। পৃ ৯

২২। Modern Review, October 1939 উদ্ধৃত, প্রগুক্ত।পৃ ৩৯

২৩। The Sunday Statesman. June 18, 1995 (Impressions, page-3)

২৪। রবিবাসর আজকাল। প্রাগুক্ত।

২৫। Quoted in ‘On Fascism’. SUCI publication. Calcutta. 1976 edn. P 9

২৬। Ibid. p 12

২৭। শান্তনু সিংহ ওরা শুধু ভুল করে যায়। অখিল ভারতীয় বিদ্যাথী পরিষদ। কলকাতা। ডিসেম্বর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

২৮। আনন্দবাজার পত্রিকা/ পত্রিকা, জুন ১৭, ১৯৯৫। পৃ ২

২৯। The Sunday Statesman. September 10, 1995 (Impression p-7)

৩০। The Asian Age. September 22, 1995

৩১। এ জি নূরানি আরএসএস ও বিজেপি শ্রম বিভাজন। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। কলকাতা। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ। পৃ ২৯

৩২। প্রাগুক্ত।

৩৩। প্রাগুক্ত। পৃ ৩০

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেরুআরি সর্দার প্যাটেল বলেছিলেন ‘…Rashtriya Swayamsevak Sahgh have indulged in acts of Violence involving arson, robbery, decoity and murder and have collected illicit arms Ammunitions. They have been found circulating leaflets, exhorting people to sort to Terrorist methods….’ আর ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মতে the Sangh hopes to be in future India what the Fascists are in Italy and the Nazis in Germany.’ See Frontline, January 22, 2015. Page-9

৩৪। সিতারাম ইয়েচুরি এই হিন্দুরাষ্ট্রের শ্লোগান আসলে কী? ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। কলকাতা। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

৩৫। () দেবাশিস চক্রবর্তী প্রাগুক্ত। পৃ ১৪

৩৫। () জনচেতনা পুস্তিকা প্রসঙ্গঃ গুজরাট একটি পুনর্ভাবনা। জুন ২০০২ খ্রিস্টাব্দ। পৃ ৬

অনুরূপ কথা বলেছিলেন স্বয়ং গোয়েবলসও। সংস্কৃতির কথা শুনলে তাঁরও হাত বন্দুকের দিকে চলে যেতো। (Quoted by Akhilesh Mithal: The Statues of Culture in the Subcontinent. The Asian Age. November 21, 1999) এমনকি জার্মানির রাইখের থিয়েটার চেম্বারের সভাপতি জনৈক হ্যান্স জোনস্ট, যিনি একজন ব্যর্থ নাট্যকার, তিনিও সর্বসমক্ষে গর্বের সঙ্গেই বলতেনঃ যখনই কেউ সংস্কৃতি নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করে তখনই তিনি তাঁর রিভলভার খুঁজতে থাকেন! (William L. Shirer: The Rise and Fall of The Third Reich. Crest Book. Newyork. 1962 edn Page 335)। আসলে সংস্কৃতি সম্পর্কে নাৎসিদের এটাই হচ্ছে সাধারণ মনোভাব।

৩৬। প্রাগুক্ত।

৩৭। Caravan. May 1, 2014

৩৮। Ibid.

৩৯। The Times of India. January 22, 2015

৪০। S. Ghatade: Under the Saffron Flag. Fountain Ink. Noverber 2014, Page 016

৪১। Ibid. Page 017

৪২। Secular Democracy. January 1974. Page 24-25. Quoted in Ibid. page 018

৪৩। Fountain Ink. Ibid. page 021-022

৪৪। The Caravan. February 2014

৪৫। William L Shirer: The Rise and Fall of the Third Reich. Crest Books. Newyork. 1962 edn. Page 333

৪৬। Ibid. Page 334

৪৭। Ibid. Page 337

৪৮। শান্তনু সিংহ সহকর্মীদের চোখে লেনিন। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ। কলকাতা। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

৪৯। নন্দগোপাল ভট্টাচার্য বিষাক্ত চক্রান্ত রুখতেই হবে। মনীষা। কলকাতা। ডিসেম্বর ১৯৯২ সংস্করণ। পৃ ১১১২

৫০। প্রাগুক্ত। পৃ ২

৫১। সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীঃ প্রাগুক্ত। পৃ ১৩৬

৫২। জর্জি দিমিত্রভঃ প্রাগুক্ত। পৃ ৯০

৫৩। Daily Mail. November 28, 1933 Quoted in R.P.Dutt: World Politics 1918-1936. Adhar Prakashan. Patna. 1961 edn. Page 312

৫৪। জর্জি দিমিত্রভঃ প্রাগুক্ত। পৃ ৭৫

৫৫। William L Shirer: Ibid. Page 343

৫৬। Editorial: A Spectre haunting Advani. Liberation Cental Organ of CPI(ML). July 1998. Page 3

RW/March 20-23/2015

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s