লিখেছেন: অশোক চট্টোপাধ্যায়

kabir-suman-3শব্দগুলো আসলে বোমা কিম্বা বুলেট নয়, তারা বরং ছোট ছোট পুরস্কার, আর সেই পুরস্কারের একটা অর্থ ও তাৎপর্য থাকে। কথাগুলো ফিলিপ রথএর। শাসক যখন কাউকে কোনও পুরস্কার দেন, তখন তা নিছক সম্মান জানানোর জন্যে নয়, এর বাইরেও তার আর একটা নিগূঢ় অর্থ থেকে যায়। উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক বাংলায় যখন ব্রিটিশ সরকার কাউকে রায়বাহাদুর, সিআইই, কেসিআইই প্রভৃতি খেতাব দিতেন তখন তা কি নিছক সম্মানজ্ঞাপক ছিল? কোনওনাকোনোভাবে রাজস্বার্থের সেবাপরায়নতার পুরস্কার ছিল এগুলি। যার জন্যে দেখা যায় পুরস্কার বা সম্মাননা সকলেই পাননা, কেউ কেউ পান। অনেক লেখক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, অনেকে যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও পাননি। এই কেন পাননি প্রশ্নের উত্তর নিহিত থাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির মধ্যে।

শাসকশ্রেণী সবসময়ই চায় লেখকশিল্পীগায়কচিত্রকর এমনকি প্রতিবাদী চরিত্রের মানুষ এমন কিছু না করুন যা কিনা সরকারের কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বরং সরকার অনেকসময় প্রতিবাদী কণ্ঠকে পুরস্কারের মাধ্যমে কিনে নিতে চায়। জনসমক্ষে তাঁকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে জনগণের তারিফও পাওয়া যায় আবার পুরস্কারের মাধ্যমে তাঁর প্রতিবাদের মানসিকতাকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। অন্যদিকে, সরকার তার শ্রেণীমিত্রকেও পুরস্কারের মাধ্যমে তার সর্বাত্মক সহযোগিতার বিষয়টিকে নিশ্চিত করতে চায়। আদানি যেমন নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক মিত্র হয়ে তাঁর প্রায় সর্বক্ষণের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে উঠেছেন, কর্পোরেট স্বার্থপূরণে মোদিকে ব্যবহার করছেন, তেমনই ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গে পালন করছেন গোয়েঙ্কা হাউসের সঞ্জীব গোয়েঙ্কা। বিদেশ সফরে আদানি যেমন মোদির ছায়াসঙ্গী, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মমতার ছায়াসঙ্গী সঞ্জীব গোয়েঙ্কা। এহেন অকৃত্রিম বন্ধুকে মমতা ব্যানার্জী বঙ্গবিভূষণ সম্মানে সম্মানিত করবেন, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো দেখা যাবে আদানিও ভারতরত্ন হয়ে যাবেন! কিন্তু শিল্পী বা প্রতিবাদী ব্যক্তিকে পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে যেমন তাঁকে একটা বন্ধনের ফাঁসে আবদ্ধ করে থাকে সরকার, পুঁজিবাদী বা কর্পোরেট দৈত্যকে কিন্তু সরকার সেরকম কোনও শৃঙ্খলআবদ্ধ করার বিপরীতে তাঁকে তাঁর কাজ অবারিত প্রক্রিয়ায় চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়। গত ২০ মে সঞ্জীব গোয়েঙ্কাকে সম্মাননাজ্ঞাপনের পরেরদিনই অর্থাৎ ২১ তারিখেই গোয়েঙ্কার সিইএসসির বিদ্যুতের দাম বেড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ সম্মানিত হয়েই তিনি বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন! ন্যূনতম ২৫ থেকে ৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ওপর বিদ্যুতের বর্ধিত দাম হয়েছে যথাক্রমে ১৮.৭০ শতাংশ এবং ১৮.৪০ শতাংশ। এপ্রসঙ্গে স্মরণ থাকতে পারে যে, ২০১৪র মার্চ পর্যন্ত সিইএসসির লাভ হয়েছিল ২৪৩ কোটি টাকা, আর গত মার্চ পর্যন্ত এই লাভের পরিমাণ ২৪৪ কোটি টাকা। এই সম্মানপ্রাপ্তির ফলশ্রুতিতে আশা করা যায় আগামী মার্চে তার লাভের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে!

গত ২০ মে তারিখে বঙ্গবিভূষণ প্রাপকদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবীর সুমন। সিঙ্গুরনন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় থেকে সুমন তাঁর প্রতিবাদীসত্তাকে সর্বসমক্ষে হাজির করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সর্বাত্মক বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে এবং নিজের গান ও আন্দোলনকারীদের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে তিনি প্রতিবাদী মননের সামনে একটা প্রত্যাশার অবারিত আকাশকে উপস্থাপন করেছিলেন। জঙ্গলমহলে পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি গান বেঁধে, সেই গান গেয়ে প্রতিবাদী মানুষের কাছে তিনি প্রতিবাদের আইডল হয়ে উঠেছিলেন। অথচ এই মানুষটিই শেষপর্যন্ত তৃণমূলের সাংসদ হলেন! মূলগতভাবে বামপন্থী মননের মানুষ হয়েও সিপিএমএর কট্টর বিরোধিতার জায়গা থেকে তিনি তৃণমূলের সাংসদ হয়ে গেলেন! সাংসদ হওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দল তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সংঘাত বাঁধতে থাকে। তিনি দলীয় নীতির তোয়াক্কা নাকরেই পুলিশী সন্ত্রাসবিরোধী জনগণের কমিটির নেতা ছত্রধর মাহাতোকে নিয়ে গান বাঁধেন। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ছত্রধরকে অনৈতিক পদ্ধতিতে, সাংবাদিকের ছদ্মবেশে, গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। সুমনের ছত্রধরের গান, ছিতামণির চোখ, লালমোহনের লাশ প্রমুখ গানগুলি প্রতিবাদী সুমনের ভূমিকাকেই সামনে নিয়ে এসেছিলো। এইভাবে তিনি একদিকে জনগণের আন্দোলনের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করছিলেন, আবার একইসঙ্গে সমস্ত বিরোধ সত্ত্বেও তৃণমূলের সাংসদপদ বজায় রেখে এক অদ্ভুত রকমের সুবিধেবাদী দর্শনের প্রায়োগিক অনুশীলন করে যাচ্ছিলেন। স্বয়ং তৃণমূলেশ্বরীর সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে। তবু তিনি তাঁর সাংসদপদ বজায় রেখে তাঁর সুবিধেবাদকে অনাবৃত করতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের আনুকূল্য পাননি। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরোধিতার প্রশ্নে তিনি আবার ক্রমশ তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে যত্নশীল হন। স্বয়ং মমতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের উন্নতি হতে থাকে। এরপর তাঁর এই তৃণমূল তথা মমতাবিরোধিতার অবনমনের পুরস্কার তিনি পেতে থাকেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে গত ১২ মে তারিখে বিচারকের রায়ে ছত্রধর, সুখশান্তি বাস্কে, শম্ভু সোরেন, সাগর মুর্মু সহ মাওবাদী নেতা রাজা সরখেল ও প্রসূণ চ্যাটার্জীর যাবজ্জীবন সাজা ঘোষিত হওয়ার পর ১৪ মে কবীর সুমন আবার কবিতা/গান লিখে এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাঁর বিবেক যেন আবার জেগে ওঠে! তিনি লেখেন, সলমন খান জামিন পাবেই, পাবেই জয়ললিতা/এদিকে ওদিকে জ্বলছে জ্বলবে গণতন্ত্রের চিতা/ছত্রধরের জামিন হবে না, যাবজ্জীবন পাবে/আসুন আসুন, সবাইকে আজ মাওবাদী বলা যাবে।/জঙ্গলে একা টহল দিচ্ছে কোটেশ্বরের ভূত/ভদ্রলোকেরা এ গান শুনো না, এই সুর অচ্ছুৎ।/স্পার্টাকাসকে দেখিনি কখনও, ছত্রধরকে দেখেছি/আর কোনও কাজ জানি না বলেই তাকে গানে ধরে রেখেছি/দেশদ্রোহী যে কাকে বলে তা কি জানে অন্তর্যামীও/অমিত শা যদি ছাড়া পেতে পারে, দেশদ্রোহী তো আমিও।/যাবজ্জীবনে দণ্ডিত সব যে দিন মুক্তি পাবে/সেইদিনই এই দেশের মুখটা স্বদেশের বলা যাবে

kabir-mamta-1অথচ এই কবিতা/গান লেখার মাত্র ছয়দিনের মাথায় সুমন অবলীলায় মমতার হাত থেকে নতমস্তকে পুরস্কার গ্রহণ করলেন! আত্মসমর্পণকারী জাগরী বাস্কে আর আত্মসমর্পণনাকরা ছত্রধরের মধ্যে সুমন নির্দ্বিধায় জাগরীর পথ অনুসরণ করলেন। তিনি ছত্রধর সহ যাবজ্জীবন সাজাপাওয়া বন্দিদের মুক্তির মধ্যেই স্বদেশের প্রার্থীত মুখ খুঁজে পেতে চাইছেন আবার একইসঙ্গে আত্মসমর্পণকারী জাগরীর মতোই শাসকের কৃপাপ্রার্থী হচ্ছেন! রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা তাঁর প্রিয় ঘোড়াটিকে তাঁর আইনসভার সদস্য করে নিয়েছিলেন, কেননা এই ঘোড়া তাঁকে পিঠে নিয়ে ঘুরতো। কবীর সুমন কি সেরকম কোনও অঙ্ক কষে মমতার প্রিয় ঘোড়ার দলে নাম লেখাতে চাইছেন? যে সুমন একসময় লিখেছিলেন, আমাকে নয়, আমার আপস কিনছ তুমি” – সেই সুমন আজ নিজেই আপস করে বসলেন। নিজেই আপসের বোড়ে হয়ে নিজেকে বিক্রি করলেন। সুমনের জানা থাকা উচিত যে, গত কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটনে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সেরানায়ক ও খলনায়ক নির্বাচনের জন্যে সাঁইত্রিশটি দেশের ছহাজার দুশ নয়জন ছাত্রের গবেষণায় ফল হিসেবে সেরানায়ক ও খলনায়ক হিসেবে যথাক্রমে নির্বাচিত করা হয়েছে আইনস্টাইন এবং হিটলারকে। আর এই সেরা খলনায়ক যাঁদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে আছেন স্বয়ং স্তালিন এবং মাও জে দং! আর এই আইনস্টাইন স্বয়ং একসময় বলেছিলেন, বুদ্ধিমত্বার পরিমাপ হয় পরিবর্তনের সামর্থ্যের মধ্যে দিয়ে। নিজের অবস্থান পরিবর্তনের সামর্থ্যের মধ্যে দিয়ে সুমন প্রমাণ করলেন যে তিনি বুদ্ধিমান!

এধরনের বুদ্ধিমানদের ইতিহাস কোনোদিন রেয়াত করেনি।।

মে ২৬, ২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s