ছত্রধর মাহাতোর প্রতি কমরেড সব্যসাচী গোস্বামীর খোলা চিঠি

লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

chotrodhar-mahatoআপনার সঙ্গে আমার কোনদিন আলাপ হয়নি ছত্রধর। লালগড় আন্দোলনের উত্তঙ্গ সময়ে আমি রাজদ্রোহিতার অভিযোগে কারান্তরালে। মুক্ত আকাশের নীচে ফিরে আসার আগেই পুলিশ আপনাকে গ্রেপ্তার করেছে ইউএপিএ আইনে। আমরা দুজনে ছিলাম তখন দুই জেলে। আলাপের আর সুযোগ হলো কোথায়? তবু আজ যখন আপনার এবং আপনার বন্ধু, সহযোদ্ধাদের যাবজ্জীবন সাজার রায় শুনলাম, মনটা কেমন বিষন্ন হয়ে পড়ল। হৃদয়টা বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। একেই কি বলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষদের মধ্যেকার সৌভ্রাতৃত্ববোধ??

সময়ের এ এক অদ্ভূত সমাপতন! একদিকে যখন পাঁচ জন অসহায় পথবাসী মানুষকে গাড়ি চাপা দেওয়ার পরও, এমনকি টানা তেরো বছর জামিনে থেকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও, সলমান খানকে আবারো জেলে ঢুকতে হলো না; জয়া আম্মা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন; ঠিক একই সময় আপনি ও আপনার অন্য সাথীরা যাবজ্জীবন দণ্ডের সাজা মাথায় নিয়ে গারদের অন্ধকারে প্রহর গোনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। বাম আমলের সাজানো মামলার পাপের বৃত্তটি সম্পূর্ণ করলো পরিবর্তনএর সরকার। ঘটনা হলো এটাই যে, ব্রিটিশ আমলের পুরানো পেনাল কোডের উপর ভিত্তি করেই আপনাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ সাক্ষী বিরূপ ঘোষনা হওয়া; মামলায় বার বার বিচারক বদল হওয়া; বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পরও এমনকি সাতচল্লিশে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তিতে সুপ্রীম কোর্টের নানা সময়ের সংশোধনী ও ব্যাখ্যাগুলোকেও আপনাদের বিচারের ক্ষেত্রে তোয়াক্কাও করা হয় নি!

সিধু কানহু, বিরসা মুণ্ডার উত্তরসূরি আপনি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এমনিতেই সত্যি কথা বলা; স্পষ্ট কথা বলা; প্রতিবাদ করা; এদেশের শাসকদের চোখে অন্যায়, বেআইনী, তার ওপর আবার আদিবাসী জনতা মুখ তুলে প্রতিবাদ করলে এদেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রের অহংবোধে লাগে। তারা কখনোই তা মেনে নেয় না। এমন দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তি দেওয়া হয়, যা আদিবাসী মূলবাসী মানুষদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এক হাড়হিম করা বার্তা নিয়ে যায়। সেই রামায়নে মহাভারতে শম্বুকের বা একলব্যের সময় থেকে ব্রিটিশ আমল হয়ে আজকের বিশ্বায়িত দুনিয়ার ভারত এই ট্র্যাডিশন চলছেই ফলত এমন এক শাস্তি যে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তা নিশ্চয়ই আপনারা আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন। ব্রিটিশ আমলে সিধু কানহু, বিরসা মুণ্ডাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ফাঁসির কাঠ। পরিবর্তিত সময়ে আপনাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার যাবজ্জীবন কয়েদের ব্যবস্থা।

এ রাজ্যের জেলগুলোতে নাগরিক অধিকার পদদলিত হয় প্রতিমুহূর্তে। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলেন গৌর নারায়ন চক্রবর্তী। সুবক্তা গৌরদা এখন স্মৃতিশক্তি রহিত, বাকশক্তিও তার ক্রমশ ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। যে গৌরদাকে কলকাতায় রাজপথে ঘন্টার পর ঘন্টা মাইক হাতে বক্তৃতা রাখতে দেখা যেত, তিনি আজ এক নাগারে দুতিন মিনিট কথা পর্যন্ত বলতে পারেন না। বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও রাজবন্দিনী পারো প্যাটেলের চিকিৎসা হচ্ছে না। স্বপন দাশগুপ্ত, তরুণ সাহা, রঞ্জিত মুর্মুর মতো রাজবন্দীরা জেলের চার দেয়ালের ভিতরই মারা গেছেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে, সংশোধনাগারের সাইনবোর্ডের আড়ালে জেলখানা আজো একটা বধ্যভূমিই রয়ে গেছে। নতুন সরকার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় এলে বাম আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যারা শিকার হয়েছেন, তাদের মুক্তির জন্য একটা রিভিউ কমিটি গঠন করে, সেই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করে, মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যতদূর জানি, তাদের নামের তালিকায় পতিত পাবন হালদার, হিমাদ্রী সেন রায়, গৌর চক্রবর্তী, সুদীপ চোংদার, রাজা সরখেল, প্রসূন চ্যাটার্জী থেকে শুরু করে আপনার যাবতীয় সাথীদের মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছিল। এ এমন সরকার, যে নাকি নিজেদের ঘোষিত রিভিউ কমিটির সুপারিশ নিজেরা তো মানেই নি, উল্টো রাজবন্দীদের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পথেই হাঁটল! ব্যস্‌! না রইল বাঁশ, না বাজল বাঁশী। রাজবন্দীই রইল না, ফলত রাজবন্দীদের মুক্তির প্রশ্নও রইল না!! আসলে সরকারি কমিটিটা গঠন করে রাজ্য সরকার জল মেপে নিতে চাইছিল। রাজবন্দীদের নামের তালিকা পাওয়ার পরই এক কলমের খোঁচায় সব রাজনৈতিক বন্দীদের রাজবন্দীর মর্যাদা কেড়ে নিতে তাই এতো তার দ্বিধাহীনতা! শুধু তাই নয়, অসংবেদনশীলতার চরম নিদর্শণ হলো আজ তারা সার্কুলার পাঠিয়েছেন, যাতে রাজবন্দীদের সাথে পরিবারের লোকজনের বাইরে অন্য কোন বন্ধু দেখা পর্যন্ত না করতে পারে!! স্বাভাবিকভাবেই এর উদ্দেশ্য হলো একদিকে যেমন রাজবন্দীদের সাথে অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সংযোগকে বিছিন্ন করা, পাশাপাশি জেলের ভিতর ঘটে চলা অনাচারকে ঢাকা দেওয়া। কিন্তু শাক দিয়ে কি আর মাছ ঢাকা যায়? গারদের অন্ধকার ভেদ করে প্রকৃত চিত্রগুলো সামনে একদিন আসবেই!

এমনিতেই অল্পবিস্তর অভিজ্ঞতার কারণে জানি, পশ্চিমবঙ্গের জেলগুলিতে চলে এক তীব্র অনাচার। বন্দীদের বরাদ্দ খাবার, তেল, সাবান, থালা, বাটি, কম্বল, ফিনাইল থেকে ওষুধ অবধি সবই চুরি করে জেল প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা; জেলকোডকে পদদলিত করে বন্দীদের উপর চলে শারীরিক পীড়ণ; ইন্টারভিউ ব্যবস্থা দেখলে মনে হবে চিড়িয়াখানার জন্তু দেখা হচ্ছে; তুইতোকারি করে কথা বলা (এমনকি বয়স্ক বন্দীদের ক্ষেত্রেও!) এখানকার নিত্য অভ্যাস। জেলের পরিভাষায় নতুন আসা বন্দীদের আমদানি করা হয় অথবা বেরিয়ে যাওয়া খরচা দেওয়া হয় এর থেকেই বোঝা যাবে কেমন মানুষের মর্যাদা পান জেলের গারদের আড়ালে থাকা বন্দী ভাই, বোনেরা! চিকিৎসা ব্যবস্থা এমনই যে সুস্থ লোকেরা এখানে অসুস্থবোধ করেন আর অসুস্থ হলে বাঁচার আসা কম; উৎকোচ সংস্কৃতির এতটাই রমরমা যে, পয়সা না দিলে এখানে কোন কাজই হয় না; সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এতোই খারাপ যে, চোর এখানে এসে ডাকাত হয়, আর ডাকাত হয় সুপারি কিলার; মদগাঁজাহেরোইনের রীতিমতো ব্যবসা চলে জেলের ভিতর এমতাবস্থায় আপনাদের মতো সেইসব বন্দীরা যারা সংবেদনশীল, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন; ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার কারণে আন্দোলন করতে গিয়ে জেলবন্দী; তারা কেমন থাকতে পারে তা বোঝার জন্য খুব একটা কষ্ট কল্পনার আশ্রয় নিতে হয় না!

আজ আপনার ও আপনার সাথীদের সাজা ঘোষণার পর রাজ্যের শাসকদলের কৌশলী নীরবতা; বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আত্মশ্লাঘার চোঁয়া ঢেকুর; মিডিয়ার পাশ কাটানো; পরিবর্তনপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মৌনি বাবা সাজা; পাশাপাশি অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের দৃপ্ত মিছিল হৃদয়কে তোলপার করছে। মনের ভিতর থেকে উঠে আসছে হাজারো প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক অতীতে সিঙ্গুরনন্দীগ্রামলালগড়ের আন্দোলনের অভিঘাতে বাম জমানার পতন ঘটেছিল। অনেকটা অনুজ পাণ্ডের প্রাসাদপোম অট্টালিকা ভাঙার মতো করেই জনতা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের লৌহ শাসনের ইমারত। আর এই গণআন্দোলনের ঘারে চেপেই ক্ষমতায় বসেছিল আরেক শাসকদল। তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও ক্ষমতায় বসার শুরুর দিন থেকেই বিজয় মিছিলের সময় থেকেই একটা ধারণাকে নির্মাণের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। তা হলো নেত্রীর একক প্রচেষ্টায়ই নাকি এই পরিবর্তন। ইতিহাসের পাতা থেকে জনতার ভূমিকাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির ভূমিকাকে প্রাধান্য দেওয়ার সেই শুরু। সেদিন থেকেই কি আপনাদের জেলে পঁচিয়ে মারার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল ছত্রধর?

আপনাকে গ্রেপ্তারের পর, তদানীন্তন পুলিশ প্রধান জানিয়েছিলেন আপনার কোটি টাকার বিমা, বিপুল সম্পত্তি এবং বিলাসবহুল অট্টালিকার কথা। আপনার সিজার লিস্টের কোথাও কিন্তু তার উল্লেখ নেই! এমনকি পরবর্তীতে আর তারা তুললেনও না সেসব কথা! ঘটনা এটাই যে, আপনার এবং আপনার সহযোদ্ধা বন্দীদের মা, স্ত্রী, সন্তানদের আজ নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। কিন্তু কজন তার খবর রাখে? কই, পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক বিবেক তো একবারও দাবী তোলেন না যে পুলিশ প্রধানের সেদিনের বয়ানের সত্যতা যাচাই করা হোক। প্রকৃত সত্যকে সামনে আনা হোক!! যখন একজন রাজবন্দীর বন্ধুদের সাথে দেখা করার অধিকারের উপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা; তখন পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক বিবেক নীরব থাকেন কি করে? যেসব স্বজনসুজনবুদ্ধিজীবী লালগড় আন্দোলনের সময় আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন; যারা বলেছিলেন পরিবর্তন চাই আজ তাঁরা কেন হিরন্ময় নীরবতা পালন করছেন?

যে তীব্র গণআন্দোলনগুলির কারণে বাংলায় সরকারের পরিবর্তন, লালগড় আন্দোলন তাদের মধ্যে শুধু অন্যতমই নয়, হয়ত অনন্যও। সেই আন্দোলনের মুখ ছিলেন আপনি ও আপনার সহযোদ্ধা বন্দীরা। অথচ সেই আপনাদেরকেই পরিবর্তনের সরকার আজ জেলে পঁচিয়ে মারতে চাইছে! তাহলে কি আপনাদের আন্দোলনের পিছনে অন্যকোন ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছিল শাসকশ্রেণী? এটা তো ঠিক, গণআন্দোলনের ইতিহাসে লালগড় আন্দোলন ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা! প্রায় আট মাস ধরে পুলিশ বয়কট হয়েছিল, অথচ ততদিন অবধি আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ! অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলকে অপাঙতেয় করে দিয়েছিল এই আন্দোলন। কবির ভাষায় বললে এ তো দেখছি চন্দ্রবিন্দুর এর আগে উঠে আসতে চাওয়া। সমস্ত তথাকথিত মূলস্রোতের রাজনীতিকে ব্রাত্য করে দিয়েছিল প্রান্তজনদের রাজনীতি! সাময়িকভাবে হলেও রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে চলে এসেছিল প্রান্তিক মানুষজন!

টা গণআন্দোলন এতোদিন ধরে টানা ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছিল এ দেশের ইতিহাসে? আন্দোলনে এত ব্যাপক মাত্রায় নারীদের যোগদানই বা এদেশের আন্দোলনের ইতিহাসে কতবার দেখা গেছে?? সবচেয়ে বড় কথা হ আপনারা কোন সরকারি দলের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেরাই নিজেদের উন্নয়নের বিকল্প পথে হেঁটেছিলেন! বাঁচতে চেয়েছিলেন অন্যভাবে। খুঁজতে চেয়েছিলেন জীবনের অন্য মানে। এই কী আপনাদের অপরাধ? তাই কি আপনারা রাষ্ট্রদ্রোহী??

আপনারা জলসেচের জন্য ক্যানাল কেটেছিলেন; বাঁধ বানিয়েছিলেন; হাসপাতাল গড়েছিলেন; শস্য খামার তৈরি করেছিলেন; স্কুল তৈরি করেছিলেন। স্বনির্ভর এই উন্নয়নের বিকল্প চিন্তাকে ভালভাবে নিতে পারেন নি এদেশের শাসকশ্রেণী তাই, যৌথ অভিযানের শুরু শুরুতেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল স্বহস্তে পরিচালিত এইসব স্কুল, হাসপাতাল। উন্নয়নের এই নতুন ধারাকে উন্নয়ন বিরোধী তকমা দেওয়া হয়েছিল। বিতর্ক, আলাপ, আলোচনার কোনো অবকাশই দেওয়া হয়নি। প্রকাশ্যে ঘুরে বেরিয়েছিল সিপিএমএর সশস্ত্র হার্মাদ বাহিনী, তাদের একবারের জন্যও গ্রেপ্তার করা হয় নি। হ্যা! তৃণমূল জমানায়ও!

বস্তুতপক্ষে বিশ্বায়নের উন্নয়নের তাত্ত্বিকদের কাছে এই বিকল্প উন্নয়নই ছিল সম্ভবত সবচেয়ে অস্বস্তিকর। তাই আপনাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল জেলের ডাব্বু মাপা ভাত আর সুউচ্চ প্রাচীরের ভিতর পায়রার খুপরির মতো সলিটারি সেল। জেলকোড অনুযায়ী যে সলিটারি সেলে একটানা চোদ্দদিনের বেশি রাখার নিয়মই নেই, সেই সব সলিটারি সেলে আপনাদের বছরের পর বছর আটক রেখেছে রাজ্য সরকার। বাম সরকার থেকে মামাটিমানুষএর সরকার সবাই এ ব্যাপারে একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে!

বস্তুতপক্ষে বিশ্বায়নের উন্নয়নের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে কেউ যদি আজ উন্নয়নের অন্য পথে হাঁটেন, যা নাকি প্রত্যক্ষ বিদেশী পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে স্বনির্ভরতার পথ তাহলে আজ তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী ছাপ্পা মেরে দেওয়াটাই এ দেশের প্রশাসনের রেওয়াজ! যদি কেউ প্রতিবাদ করেন; তবে তাকে তাঁর জন্য বরাদ্দ সিডিশান এক্ট অথবা টাডা, পোটা, মোকা, ইউএপিএ ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনারা একে প্রতিবাদী, তাও আবার উন্নয়নের বিকল্প রাস্তায় হেঁটেছেন তাও আবার জঙ্গল মহলের আদিবাসী মূলবাসী জনতা তাই এদেশের রঙবেরঙের সমস্ত শাসকশ্রেণীর চোখে আপনারা রাষ্ট্রদ্রোহী হবেন এতে আবার অবাক হবার কি আছে! কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহী হলেও আপনারা দেশদ্রোহী নন। কারণ দেশ আর রাষ্ট্র এক নয়। দেশ মানে, রাষ্ট্ররাষ্ট্রনেতাপ্রশাসন নয়। দেশ মানে আইনআদালতপ্রশাসনজেলখানাথানাযৌথ বাহিনীপঞ্চায়েত থেকে সংসদ ভবন নয়। দেশ মানে নিছক একটা মানচিত্রও নয়। দেশ মানে, দেশের মানুষ। সেই অজেয় মানুষ যাদের রক্তে, ঘামে গড়ে উঠছে সভ্যতা। সেই মানুষ; যারা সভ্যতার চালিকাশক্তি হলেও ঘরে যাদের আলো জ্বলে না। দুবেলা পেট ভরে যাদের খাবার জোটে না। উন্নয়নের হাঁড়িকাঠে যাদের প্রথমে বলি চরতে হয়। বড় বাঁধ বা বিদ্যুত কেন্দ্র বা কেমিক্যাল হাব গড়তে হলে যারা হন প্রথম উদ্বাস্তু তারাই হচ্ছেন এদেশের বুনিয়াদি জনতা। তাদের নিয়েই দেশ। তাদের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। তাদের প্রতি ভালবাসাই হলো দেশকে ভালবাসা। এ পোড়া দেশের তাই দেশদ্রোহিতা আর রাষ্ট্রদ্রোহিতা অনেক সময়ই দুই বিপরীত শব্দ। আপনারাও কোন ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, এইসব বুনিয়াদি জনতার ইজ্জত আর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই আজ জেল খাটছেন। তাই আপনাদেরও কোন মতেই দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া যায় না! রাষ্ট্রের আদালতের বিচারে আপনারা যতই দোষী সাব্যস্ত হোন, জনতার হৃদয়ে বিশেষত লালগড়সহ জঙ্গলমহলের জনতার হৃদয়ে আপনাদের আসন কেউ টলাতে পারবে কী?

কখনো কখনো এমন সময়ও আসে, যখন আন্দোলনে কিছুটা ভাটা আসে। উদ্ধত শাসকের তখন মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে প্রকৃত স্বরূপ। আজো বোধহয় এমনই এক সময়। যখন প্রতিবাদী মুখগুলোকে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চারিদিকে এক অদ্ভূত আঁধার। শিল্পীসাহিত্যিককবিরা ব্যস্ত পুরস্কার গ্রহণে। বিদ্বজনেরা নীরব। নাগরিক সমাজ প্রকাশ্যে এসে কিছু বলার হিম্মত দেখাচ্ছেন না। হয়ত কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তও। পাড়ায় পাড়ায় শাসক দলের গুণ্ডা বাহিনীর দাপাদাপি। আলু চাষী আত্মহত্যা করছে। জুট মিলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোজই কোথাও না কোথাও নারী লাঞ্ছনার খবর আসছে। চিটফান্ড কাণ্ডে সর্বস্ব খুইয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন অনেক সাধারণ মানুষ।

কিন্তু তবুও জানি এমন রাত্রি নেই যা প্রভাত হয় না। আপনাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের দৃপ্ত মিছিল কি সেই প্রভাতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে…??

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s