লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

sindabader-galicha-1বন্ধুবর আহমদ জসিমের ‘সিন্দাবাদের গালিচা’ নামক গল্পগ্রন্থটি বেরিয়েছে এ বছরের একুশে বইমেলায়, অগ্রদূত পাবলিকেশন্স লিমিটেড থেকে। আমার জানামতে এটি তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ, এর আগে ‘যেভাবে তৈরি হল একটি মিথ’ নামে প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১০ সালে তেপান্তর থেকে। বইয়ের প্রচ্ছদ সুদৃশ্য, ভেতরের ফ্ল্যাপে বইটি সম্পর্কে অকালপ্রয়াত সাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের দুয়েকটি কথা লেখা দেখে মনে বেদনাবোধ জাগ্রত হয়। জাহাঙ্গীর হঠাৎই গত ৭ মার্চ আমাদের ছেড়ে গেছেন না ফেরার দেশে।

বাংলা কথাসাহিত্যের আধুনিক ধারায় শিল্পীরা যা রপ্ত করেছেন তাহলো নৈর্ব্যক্তিকতার কৌশল। এখানে বলে নেয়া ভালো যে সাহিত্য সম্পর্কে আমার নিজের জ্ঞান অতি অল্প, আর সাম্প্রতিক লেখকদের গল্পকবিতাও আমি পড়েছি খুবই কম। আধুনিক লেখক বলতে এখানে যেটা বোঝাচ্ছি তার শুরু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর হাত ধরে। ওয়ালীউল্লাহ থেকে শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, মঈনুল আহসান সাবের, শাহাদুজ্জামান এদের কথাই বোঝাতে চাইছি কেননা তাদের সাহিত্যকৃতির সাথেই আমি কমবেশি পরিচিত। সাহিত্যের বিভিন্ন শৃঙ্খলার মধ্যে ছোট গল্প নির্মাণ আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ বলে মনে হয়। কেননা একটি সীমিত পরিসরে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখা, মূল বক্তব্য সরাসরি প্রকাশ না করেও পাঠকের মধ্যে তার অন্তর্বস্তুটুকুকে চারিয়ে দেয়া এটা কোনো সহজ কথা নয়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গল্পের সারকথা বক্তব্য আকারে সামনে আনতে গেলে শুধু যে তা শিল্পগুণ হারায় তাই নয়, পাঠকের বোধজ্ঞানের ওপরও বলতে গেলে অবিচার করা হয়।

সিন্দাবাদের গালিচা’ গল্পগ্রন্থে নৈর্ব্যক্তিকতা অভাব রয়েছে সেটা মোটামুটি আমার কাছে মনে হয়েছে। তবে বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তার সততা নিঃসন্দেহে লক্ষণীয়। অন্য অনেক তথাকথিত আধুনিক সাহিত্যিকের ন্যায় তিনি বক্তব্য প্রকাশে কূটচাল কিংবা বাকচাতুর্যের আশ্রয় নেন নি। বইটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলে যে জিনিসটি সহজে চোখে পড়ে তাহলো ডিটেইলিংয়ের অনুপস্থিতি। ছোটগল্পে উপন্যাসের মতো ডিটেইলসের স্বাধীন ব্যবহার যে সম্ভব নয় এটা সহজেই বোঝা সম্ভব। গল্পে ডিটেইলিংয়ের কাজ হতে হয় ছোট ছোট বাক্যে। প্রথম গল্প ‘ত্রিচক্রযান’ শুরু হয়েছে এভাবে:

অস্থিরতার ষোলকলা পূর্ণ করে জামশেদ চৌধুরী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সেই কাকডাকা ভোরে, অথচ ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়বে সকাল সাড়ে সাতটায়। ভোর পাঁচটা থেকেই ব্রাশ কই, পেস্ট কই, টাওয়েল কই করতেকরতে পুরো ঘরটাই মাথায় তুলেছে অথচ ঘর থেকে স্টেশন বড়জোর আধঘণ্টার পথ। গাড়ির ত্রুটি সারাতে গ্যারেজে দেওয়া হয়েছে। পাঁচছয় দিনের আগে পাওয়া যাবে না; রিকশা করেই তাকে স্টেশনে যেতে হবে এটাই অস্থিরতার কারণ। ব্যাপারটা মোটেই এইরকম নয়, বরং অস্থিরতা তার স্বভাবেরই অংশ। জামশেদ চৌধুরী ঘর থেকে বেরুবার পর স্ত্রীকন্যা মোটামুটি স্বস্তিতে! একই সাথে তারা নিশ্চিত, অস্থিরতা চলবে অনবরত। ‘রিকশা পাচ্ছি না কেন? [রিকশা পেলে] আস্তে চলছে কেন? [স্টেশনে পৌঁছলে] ট্রেন আসছে না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি।” (পৃষ্ঠা:১১)

এই অনুচ্ছেদ থেকে আমরা জামশেদ চৌধুরীর স্বভাবের একটি দিকের পরিচয় পাই তার অস্থিরচিত্ততা। কিন্তু লক্ষণীয়, এখানে কোথাও তার ঢাকায় যাওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয় নি। গল্পের পরবর্তী অংশ যে চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে তার ঢাকা গমণের উদ্দেশ্যের সাথে তার চরিত্রের যে পরিণতি আমরা দেখতে পাই সেটিকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা যেতো যদি এর মধ্য দিয়ে তার বর্তমান অর্থনৈতিক/রাজনৈতিক অবস্থান এবং কর্মকাণ্ডের আভাস কিছুটা হলেও মিলত। বেশি নয়, দুয়েক বাক্যেই লেখক কাজটি সেরে ফেলতে পারতেন। অথচ তার সাথে রিকশাচালকের কথোপকথনে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রভৃতি ইস্যু নিয়ে আলোচনায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে উঠে এসেছে সেটি অত্যন্ত বাস্তব চিত্র, এখানে পাঠকের হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। অন্যদিকে আবার মূল চরিত্রের পরিণতিতে নাটকীয়তা আনয়ন করতে গিয়ে গল্পের সাফল্যমণ্ডিত পরিসমাপ্তির নিরিখে শিল্পবোধ কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে হয়।

কসিমউদ্দি’র বাবা’ গল্পে একজন দরিদ্র কিশোরের মাতৃপিতৃস্নেহের কাতরতা পাঠকের কাছে আবেদন তৈরি করতে পারে। একই সাথে নিম্নবিত্ত মানুষের দিনানুদৈনিকতায় আচরিত পুরুষতান্ত্রিকতার বিষয়টিও লেখকের কলম এড়িয়ে যায় না। কিন্তু প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের পরিবর্তে তাতে ব্যাখ্যার পরিসর রাখলে গল্পটির শিল্পগুণ বাড়ত বৈ কমত বলে মনে হয় না।

সম্পাদক সমীপেষু’ গল্পটি উপভোগ্য এই অর্থে যে পত্রিকা সম্পাদকের অসাধুতা, অধঃপতিত নৈতিকতা এবং সাহিত্যের প্রতি অঙ্গীকারহীনতা প্রকৃত সাহিত্যচর্চা এবং বিকাশের পথে যে এক কার্যকর অন্তরায় এই বিষয়টি তুলে ধরার সাথে সাথে এ ধরনের সম্পাদককে শিক্ষা দেয়ার একটি বিষয়ও উঠে এসেছে। কিন্তু সাহিত্যে বিদ্যমান এই সঙ্কটের কারণকে ভেতর থেকে দেখা কিংবা এর সন্তোষজনক নিষ্পত্তির কোনো ইঙ্গিত এখানে পাই না। অসাধু সাহিত্য ব্যবসায়ীকে শিক্ষা দেয়ার যে পন্থা আমরা গল্পের মধ্যে দেখি তা কি বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কোনো কার্যকর সমাধানের পথ দেখায়?

লিলি ও লুলু’ গল্পে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণের আপাত প্রগতিশীলতার আড়ালে পুরুষতান্ত্রিক কূপমণ্ডুকতার প্রতিচ্ছবি জ্বলে উঠেছে তীব্রভাবে। কিন্তু এর শরীরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘প্রেমের গপ্পো’র ছাপ বিদ্যমান। তবে আলোচ্য গল্পে মূল বক্তব্য অনেক বেশি সরাসরি সামনে আসায় তার অন্তর্নিহিত শক্তি কিছুটা খর্ব হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

লিফলেট’ গল্পের থিমটি চমৎকার। সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠার মধ্যে বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থায় ‘পণ্যে’র উপযোগিতা তৈরি, ক্রয়বিক্রয়, লেনদেন ইত্যাদির চরিত্র এবং বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত একটি দেশে জনগণের চেতনায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদ উপাদানের উপস্থিতিতে অলৌকিকতার বাণিজ্য বিস্তারের রূপ বেশ সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। এ যেন ওয়ালীউল্লাহরই কালজয়ী ‘লালসালু’র প্রতিপাদ্যের ভিন্ন সংস্করণ, তবে মূল বক্তব্যটুকু উঠে এসেছে আপন শক্তিমত্তায়, নিজস্ব মুন্সিয়ানায়।

নকল বাঘ’ শিক্ষিত বেকার যুবকের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত আখ্যান। গল্পের পরিণতিতে উপস্থাপিত বিদ্রুপাত্মক সমাপ্তি সমকালীন বাস্তবতার রূপটিকে তুলে ধরে প্রতীকি ব্যঞ্জনায়। কিন্তু সমস্যা হলো সমস্ত গল্পটিকে সমাজবাস্তবতার চিত্রটির প্রতীকি ব্যাঙ্গাত্মক রূপ হিসেবে যদি আমরা ধরে নিই এরপর গল্পের মূল চরিত্র মাহাতাবের চাকরি পাওয়ার জন্য যে প্রাণপণ প্রচেষ্টা এবং সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রের (যদিও নকল) ব্যবহারের মতো একটি মূর্ত বাস্তব বিষয়কে বিবেচনায় নিলে গল্পের শরীরে সামঞ্জস্যহীনতার অবকাশ তৈরি হয়।

রোদন পর্ব’ গল্পটিকে মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ন রেখে তার শরীরে আরো উপাদেয় এবং বিশ্বাসযোগ্য রসদের সরবরাহ করা যেতো বলে মনে হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট বাড়ির চৌহদ্দিতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে অজ্ঞাতকারণজাত কান্নার সংক্রমণের বিষয়টি বাস্তবসম্মতির মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় কিনা সেটি ভাবনার বিষয়। একে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায় লেখকের প্রচেষ্টাকেও কিছুটা অপরিণত মনে হয়েছে। নামগল্প ‘সিন্দাবাদের গালিচা’ বিদ্যমান বাস্তবতার অসঙ্গতিকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে রচিত। কিন্তু রূপকের ব্যবহারে স্থূলতার আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে মনে হয়।

আমি কোনো সাহিত্যবিশ্লেষক কিংবা পণ্ডিত সমালোচক নই। সাহিত্যে আমার পদচারণার পরিধিও অত্যন্ত সীমিত। আমার বক্তব্যকে তাই সাহিত্য সমালোচনা হিসেবে না ধরে পাঠপ্রতিক্রিয়া মনে করলেই ভালো হবে। এ কারণে গল্পগুলোর শরীরে বিদ্যমান অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে, আবার কিছু জিনিস লক্ষ করলেও সংশ্লিষ্ট সাহিত্যিক পরিভাষার জ্ঞান না থাকায় বিষয়গুলো উত্থাপিত হয় নি। অন্য অনেকে, বিশেষত যারা সাহিত্যবিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখেন তারা সবাই বইটি পড়ে আমার সাথে সর্বতোভাবে একমত হবেন বলেও আশা করি না। তবে সামগ্রিক পাঠে একটি বিষয় বলতে পারি, লেখকের গল্পরচনায় সাহিত্যিক সততার বিষয়টি প্রশ্নাতীত উজ্জ্বলতার সাথে প্রতিভাস্বর হয়েছে। আমাদের চারিপাশে বহু শিল্পীযশোপ্রার্থী লেখকদের মধ্যে এই বিষয়টির অনুপস্থিতি পীড়াদায়কভাবে লক্ষ করি। আগ্রহী পাঠকগণ বইটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে পারেন।।

——————–

সিন্দাবাদের গালিচা

আহমদ জসিম

প্রকাশক: অগ্রদূত পাবলিকেশন্স লিমিটেড

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬২

মূল্য: ১৬০.০০ টাকা।

———————

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s