দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক অনিশ্চয়তা ও বিচারহীনতা মানব পাচারের মূল কারণ

Posted: মে 20, 2015 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অনুপ কুণ্ডু

human-trafficking-2015-1মানব পাচার সাম্প্রতিক সময়ের এক জটিল সমস্যা। ১২ মে ২০১৫ পর্যন্ত থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে ২০০০ বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। থাইল্যান্ডে আবিষ্কৃত হয়েছে ৩০টির মতো গণকবর। পাচার হওয়া শত শত অভিবাসীর শেষ ঠাঁই হয়েছে এই কবরে। মানব পাচার রোধে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি।

জাতীয়, আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র এবং সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন মতে, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কয়েক হাজার বন্দীশিবির গড়ে তুলেছে মানব পাচারকারীরা। শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার মালাক্কা প্রণালীতে ৭ থেকে ৮ হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী আটকে রয়েছে। তবে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, থাইল্যান্ড উপকূলের কাছে সাগরে কয়েকটি নৌযানে কমপক্ষে ৮ হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা ভাসছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের চাপে থাই সরকার তৎপর হলে তাদের পুলিশের কড়া নজরদারিতে ভিড়তে পারছে না উপকূলে। ফলে দালালরা তাদের বহন করা নৌযানগুলো উত্তাল সাগরে ভাসিয়ে রেখেছে। থাই পুলিশী তৎপরতায় পাচারকারী নৌযানগুলো তীরে ভেড়াতে চাইছেনা। হতভাগ্য অভিবাসীদের গভীর জঙ্গলের গোপন বন্দী শিবিরে না এলে সাগরে ভাসিয়ে রাখছে। যেখানে মজুত খাদ্য, পানি শেষ হয়ে গেছে। অনাহার, আতঙ্কে অনেকেই মারা গেছে। তাদেরকে ফেলে দেয়া হচ্ছে সাগরেই। ভাগ্য ফেরানোর নেশায় জীবনবাজী রাখা মানুষগুলোর সাথে চলছে নিষ্ঠুর পরিহাস।

মানবপাচার যদিও একটি বিশ্বজনীন সমস্যা। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় এ সমস্যা প্রকট। কেন হয় এই মানব পাচার? উত্তর খুজতে গেলে প্রথমে বলতে হয়, এর অন্যতম কারণ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব।

মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোলে (এমডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার নেশায় থাকা সরকারের উন্নয়নের বুলিতে, কাগজে কলমে দেশের দারিদ্র নিরসনে বেশ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারী হিসেবেই বর্তমানে প্রায় ২ কোটি লোক হতদরিদ্র এবং ৩১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যদিও আসল তথ্য এর বেশী হতে বাধ্য। শিক্ষিত অশিক্ষিত মিলে দেশের বেকারত্বের পরিমাণ সাড়ে ৩ কোটি। এই দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের নিষ্পেষণে অতীষ্ট হয়ে পরিবারের শেষ সম্বল সামান্য পুঁজি কিংবা বসতবাটি বিক্রি অথবা বন্ধক রেখে নতুবা ধার কর্জ করে লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে পাড়ি দেয় থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ায় যাবার জন্য। সেখানে গিয়ে হাড়ভাঙ্গাঁ খাটুনি খেটে আয় রোগজার করে দেশে পাঠাবে ধার শোধ করবে। বন্ধকী বসতবাটী উদ্ধার করবে। দেশে ভাল থাকার উপায় করতে না পেরে একটু ভাল থাকার জন্য তাদের পরিবার পরিজন ছেড়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা। অকূল পাথারে ঝাপ দেয়া আরকি।

আরেকটি কারণ দেশে সব ক্ষেত্রেই চরম অনিশ্চয়তা। চাকুরী নিশ্চয়তা নেই, কাজের নিশ্চয়তা নেই, কিছু টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসাবাণিজ্য করারও নিশ্চয়তা নেই, অন্যায়ের শিকার হলে ন্যায়বিচার নেই এই গরীব নিম্নবিত্তদের জন্য। সংগতকারণেই কর্মক্ষম যুবকটি দেশকে, পরিবারকে ভাল রাখার জন্য নিজেকে সমর্পণ করছে চরম অনিশ্চয়তার কাছে। আর এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। একদল পাচারকারী দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভারতের পাচার করছে অসংখ্য নারী পুরুষদের। এই হতভাগারা ভারতে গিয়ে দেহ ব্যবসা করছে, বাসাবাড়ীতে কাজ করছে, বিভিন্ন ধরনের নির্মান কাজ করছে, কেউ জেল খাটছে। মাঝে মাঝে এরা ভারতে বিপদাপন্ন হয়ে খবরের শিরোনাম হয়। আরেকদল মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী শিশুদের উটের জকি হিসেবে পাচার করছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া মানব পাচার কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অথচ মানব পাচার প্রতিরোধে ২০১২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের আইন অত্যন্ত কঠোর। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে মানব পাচারের তুলনায় অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তিপ্রদানের দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।

আর থাকবেই বা কিভাবে! ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তাদের স্বজনরা জড়িত থাকার কারণেই আদম ব্যবসার ছদ্মাবরণে মানব পাচারকারী দাস ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। পুলিশের অনুসন্ধান কমিটি বলছে, মানবপাচারের ক্ষেত্রে টাকা লেনদেন হয় হুন্ডির মাধ্যমে। ২৬ জন হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ১ নম্বরে আছেন টেকনাফউখিয়া আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠজন মং মং সেন (৪২)। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। পাচারকারীদের বেশীরভাগই ঐ এলাকার স্থানীয়ভাবে সরকার দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। এই কারণে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজে এদের গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনার সাহস পাচ্ছে না।

যদি মানবপাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট রাঘববোয়ালদের বাঁচাতে অথবা ভাগ বাটোয়ারায় বনিবনা না হওয়ায় গত এক সপ্তাহের মধ্যে সন্দেহজন ৫ জন পাচারকারীকে “বন্দুকযুদ্ধ” এ মেরে ফেলেছে কক্সবাজার পুলিশ। মানব পাচার হয় প্রাধানত কক্সবাজার এবং চট্রগ্রাম জেলাকে কেন্দ্র করে সমুদ্র পথে। পাচারকারী ও হুন্ডিব্যবসায়ীদের বেশীরভাগের বাড়ি কক্সবাজার জেলায়। তাদের কেউ কেউ অতীতে গ্রেফতার হলেও আদালত থেকে জামিন পেয়ে তারা আবার আগের পেশায় ফিরে আসেন। অনেকে গ্রেফতার না হয়েই এলাকায় অবস্থান করছে।

দরিদ্র ও জনসংখ্যার চাপের কথা বলে সরকার অদূরদর্শী নীতি অনুসরণ করে, রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলেও এ ঘটনা এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। আশ্রয়প্রদানে আমাদের সরকারের অপরাগতার ফলে রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে মানব পাচারে দালালদের শরণাপন্ন হয়। মালয়েশিয়া থাকে অসংখ্য রোহিঙ্গা পরিয়াছে। রোহিঙ্গাদের একটা অংশ পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য দালালদের আশ্রয় নেয়। ২০১২১৩ সারে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা বাড়াতে থাকলে কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফের দালালেরা তাদের প্রলোভন দেখায়। এই অসাধু চক্র মূল্য গন্তব্য মালয়েশিয়া হলেও তাদেরকে নেয় থাইল্যান্ডে। এভাবে তাদের মাধ্যমে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন হয়ে থাই উপকূল পৌঁছানোর নৌরুটটি চালু করে। পাচারকারী চক্র তাদের ব্যবসা বাড়ানো জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়। এমনকি কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনে কাজের খোঁজে বা বেড়াতে যাওয়া লোকজনকে সরাসরি অপহরণ করে পাচারকারীরা। প্রতি মাসে মাত্র ৮০০ রিয়েল বা ১৬ হাজার ৮০০ টাকা বেতনে ওদিকে সৌদি আরবে ১০ হাজার নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি করেছে সরকার গত ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এইভাবে চুক্তি করাও এক ধরনের মানব পাচার। এটা সরকারী মানব পাচার। কারণ আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বা আইওএম) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন বাংলাদেশী প্রবাসী নারী শ্রমিকের মধ্যে দুই জন নানারকম শারিরীক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হন। মাঠ গবেষণার ভিত্তিতে ২০০৮ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচও অনুরূপ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

নিরাপত্তাহীনতা ও নিম্ন মজুরীরর কারণে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া সৌদি আরবে নারী শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। শ্রীলঙ্কা ও ভারত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সাথে বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০১৪ সালে ভারতের সাথে চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেক নারী শ্রমিকের জন্য সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট গৃহকর্তাকে ভারতীয় দুতাবাসের একাউন্টে এককালীন ২ হাজার ৫০০ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ২ লাখ টাকা) জামানত দিতে হয়। প্রতি মাসে এক হাজার পাঁচশত রিয়েল হারে মজুরি গৃহকর্মীর নামে খোলা ব্যাংক একাউন্টে জমা দিতে হয়। বছরে ১৫ দিন সবেতনে ছুটি। আর শ্রীলঙ্কায় সার্বক্ষণিক যোগাযোগ সুবিধার জন্য ২৪ ঘন্টার হটলাইন চালু, সপ্তাহে ১ দিন ছুটিসহ ভারতের অনুরূপ বেতন ভাতা। অথচ বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তাই এটাকে নির্দ্বিধায় মানব পাচার বলাই সংগত।

আমরা মনে করি, সরকার যেভাবে রেমিটেন্স বৃদ্ধি পাওয়ায় আশাবাদ ব্যক্ত করে তেমনি বৈধঅবৈধ পথে মানুষকে বিদেশে চাকুরীর জন্য যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে হবে। দেশেই অনেক বেশী কর্মক্ষেত্র তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আইন শৃঙ্খলার উন্নতি ঘটিয়ে নিশ্চিত জীবন যাপনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে। শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার মানবিক ও যৌক্তিক সমাধানে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করলে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। নিজদেশের মানুষকে পুরোনো বর্বর দাসদের আধুনিক সংস্করণ না বানিয়ে তাদের নিরাপদ রাখতে মানব পাচারের মতো জঘন্য ও ঘৃণ্য কাজ বন্ধ করার কার্যকরী পথ খুঁজতে হবে।

নগরমুখী অভিবাসন বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুতগতিতে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩২ শতাংশ অথচ নগরমুখী জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ৫ শতাংশ হারে। জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ মানুষ হচ্ছে বস্তিবাসী।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্ষুধা ও অপুষ্টির শীর্ষে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির ২৪ শতাংশ মান ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার।

পাকিস্তানে এ হার ১৯.%

নেপাল ——– ১৮%

ভারত ———- ১৭.%

মালদ্বীপ ——— .%

বাংলাদেশ —— ১৬.% বা ২ কোটি ৬২ লাখ মানুষ (২০১২১৪)

২০০৯১১ সালে ছিল ২ কোটি ৬০ লাখ

২০০৫০৭ সালে ছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ

বর্তমান বিশ্বের ৮০ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পায় না। তার মধ্যে ৩৩ কোটি ৯০ লাখ বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়।

[জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s