লিখেছেন: অজয় রায়

narendra-modi-one-year-1কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এর মধ্যেই তারা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থবাহী অবস্থান নিয়েছে। আর দেশ বিক্রির বাজারমুখী সংস্কার নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্থ করেছে। মোদীর নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ঢেলেছিল কর্পোরেট মহল। যাদের প্রতিদানে ব্যাপক সুযোগসুবিধা পাইয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে বিজেপি সরকার। বিগত ইউপিএ সরকারের থেকেও বেশি জোর কদমে বিশ্বায়নের নয়াউদারবাদী নীতি গ্রহণ করছে এরা। আর সেই সঙ্গে লুম্পেন উন্নয়নের পথে হাঁটছে। যাতে মুষ্টিমেয় ধনীদের স্বার্থ সিদ্ধি হচ্ছে। আর মেহনতি মানুষের রুটিরুজি ও অর্জিত অধিকারের উপর আঘাত নেমে আসছে।

দেশীবিদেশী বৃহৎ পুঁজিপতিদের জন্য ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করার রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে মোদী সরকার। শ্রম আইন শিথিল করছে। খনি ও কয়লার মতো ক্ষেত্রের বেসরকারীকরণ এবং বিমা সংস্থাগুলির বিলগ্নীকরণ করছে। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা উৎপাদক সংস্থা কোল ইন্ডিয়া লিমিটেডের যেমন আরও বিলগ্নীকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) উর্ধ্বসীমা ২৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।[] আর কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ব্যাপক কর ছাড় দিচ্ছে। সাধারণ কর্পোরেট করের হার ইতিমধ্যেই ৩০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়েছে।[] সেই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতি চলছে। এদিকে, দেশে দারিদ্র ও অসাম্য বাড়ছে। যখন জনসাধারণের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপছে। জিনিসপত্রের দামও আকাশ ছোঁয়া।

স্পষ্টতই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারি করে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সঙ্গে এমএনরেগা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয় ছাঁটাই করছে। জমি অধিগ্রহণ অর্ডিন্যান্স জারি করেছে বড় ব্যবসায়ীদের জন্য জমি দখল সহজ করে দিতে। আদিবাসীদেরকেও উচ্ছেদ করছে। আর যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে। যার পরিণতিতে বিপন্ন হচ্ছেন বহু মানুষ। পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। ফলে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভবিক্ষোভও। যা দমন করতে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমে মরিয়া প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণী। যারা খেটে খাওয়া মানুষের নজর ঘোরাতে বিভাজনের রাজনীতি করছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে। যখন সমসাময়িক ধনবাদের সঙ্কটের কারণেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঘটছে। দিল্লিতে যেমন ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। যে চরম দক্ষিণপন্থী দল প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ফ্যাসিবাদী আধাসামরিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) একটি ফ্রন্ট।

বিজেপিআরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবারের অবস্থান গণতন্ত্রের পরিপন্থী। আর তারা দীর্ঘকাল ধরেই উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালাচ্ছে। ১৯৯২ সালে যেমন বাবরি মসজিত ধ্বংস করে। আর ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক গণহত্যা সংঘটিত হয়। সঙ্ঘ পরিবারের গৈরিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলি মালেগাঁও, সমঝোতা এক্সপ্রেস, হায়দ্রাবাদের মক্কা মসজিদ ও আজমির শরিফ দর্গার মতো নানা জায়গায় বিস্ফোরণও ঘটিয়েছে।

বিজেপিসরকারের মদতেই গৈরিক বাহিনী সংখ্যালঘুদের নিশানা করে চলেছে এখনও। এবছরের জানুয়ারিতেই যেমন ভারতে মোট ৭২টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে; যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন ও আহত হয়েছেন ২১৮ জন। আর ২০১৪ সালে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৪৪টি।[] যার মধ্যে শুধু উত্তরপ্রদেশেই মুজফ্ফরনগরের মতো বিভিন্ন জায়গায় ঘটেছে ১৩৩টি ঘটনা। এর পাশাপাশি ‘ঘর বাপসি’ কর্মসূচীর নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের জোর করে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরকরণও করছে গৈরিক বাহিনী। সংখ্যালঘু ছেলের হিন্দু মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার বিরুদ্ধে ‘লাভ জেহাদ’এর প্রচার চালাচ্ছে। কিছু নেতামন্ত্রীর বিরুদ্ধে উত্তেজক ভাষণ দিয়ে সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে শিক্ষাসংস্কৃতিতে গৈরিকীকরণের প্রক্রিয়া তো চলছেই। ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা হচ্ছে।

এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত জাতপাতবর্ণভেদ ও লিঙ্গবৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি। সেই সঙ্গে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পক্ষেও প্রচার চালানো হচ্ছে। আর এর মধ্যেই যেটা লক্ষণীয়, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু মৌলবাদ উভয়ই একে অপরকে উৎসাহ যোগাচ্ছে। মোদী সরকারের এই জনবিরোধী কার্যকলাপের মোকাবিলায় সমস্ত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির ঐক্যবদ্ধ হওয়া বর্তমানে জরুরি। যা প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্রীকরণ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথ প্রশস্থ করতে পারে।।

তথ্যসূত্র

[] “Govt approves Ordinance to hike FDI in insurance to 49%”, Dec 24, 2014

[] Sumeet Chatterjee, “India Inc cheers corporate tax cut, simpler rules”, Feb 28, 2015

[] “72 Incidents of Communal Violence Reported in Jan 2015”, Mar 10, 2015

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s