মে দিবস এবং শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব

Posted: এপ্রিল 30, 2015 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

may-day-1জনগণের সামনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে ১৯৭১ সালের জনগণের মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামীলীগ দখল করে নিতে পেরেছিল। জনস্বার্থবিরোধী একটি রাজনৈতিক দল যখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তখন তারা জনগণের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রগুলো দখল এবং নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে তাই ঘটে চেলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে জনগণের এবং শ্রমিককৃষক মেহনতি জনতার সংগ্রামের দিনগুলোকে আওয়ামীলীগ এবং পরবর্তীতে তার শেকড় থেকে তৈরী শাসকশ্রেণীর দলগুলো দখল এবং নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এইসব দিবসগুলোকে জনগণের লড়াই সংগ্রামের দিবস থেকে জনগণকেই জনস্বার্থের বিরূদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার দিবসে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে মে দিবসকে দখল এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে যে, গোটা বিশ্বের শ্রমজীবী জনগণের মুক্তির শপথ গ্রহণের এই দিনটিকে শ্রমজীবী মানুষদের দ্বারাই শ্রমজীবী জনগণের বিরূদ্ধে ব্যান্ড বাজিয়ে আনন্দ করার দিবসে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে মে দিবসের চিত্র দেখলে এখন তাই দেখা যায়।

এই কাজ আওয়ামীলীগ এবং তার শেকড় থেকে তৈরী শাসকশ্রেণীর দলগুলো করবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই তাদের রাজনীতি। এ নিয়ে তাদের কাছে কান্নাকাটি, অভিযোগঅনুযোগ করা এবং গোস্বায় ফেটে পড়া, এর জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করা এদেরকে এ কাজে আরো বেশি স্বার্থক করে তুলতেই সাহায্য করে। যারা এই নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তাদের যেন প্রত্যাশা আওয়ামীলীগসহ শাসকশ্রেণীর দলগুলোর শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের রাজনীতি করাই উচিত এবং যেন তাদের এ বিষয়ে কড়াল (প্রতিশ্রুতি) ছিল! আওয়ামীলীগ তার রাজনীতির জন্য যা করণীয়, তাই করবে এবং তাই তারা করছে।

আওয়ামীলীগের যেমন তার নিজ রাজনীতির জন্য করণীয় আছে, তেমনই শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য শ্রমজীবী জনগণের নিজ শ্রেণীর রাজনীতির জন্যও করণীয় আছে। আওয়ামীলীগসহ শাসকশ্রেণীর দলগুলো তাদের করণীয় করেছে এবং করে চলেছে। কিন্তু শ্রমজীবী জনগণের রাজনীতির করণীয় কাজ এখনও কিছুই হয়নি এবং হচ্ছে না। এই না হওয়ার কারণগুলো শ্রমজীবী জনগণের দিক থেকে বের করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি সংগঠিত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ।

may-day-committeeশ্রমজীবী জনগণের রাজনীতি সংগঠিত না হওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান যে কারণটির উল্লেখ দেখা যায় তা হলো শ্রমজীবী জনগণের সাথে ধোঁকা। এই ধোঁকার আবার ভিতরের এবং বাইরের বলে দুটি রূপেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে একটা বিষয় বলা দরকার তা হলো এই উল্লেখ শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে যতটা না প্রকট, তার চেয়ে বেশি প্রকট শাসকশ্রেণী এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গউপাঙ্গ দলগুলোর মধ্যে। এ যেন চুরি যাওয়ার পর চোর কর্তৃক যার চুরি গেছে তারই হাত পাকড়ানোর মতো অবস্থা! এ থেকে বুঝা যায় শ্রমজীবী জনগণের সাথে এটাও ধোঁকাবাজির এক নতুন মাত্রা। উল্লেখ করার বিষয় হলো এক সময় শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থের কথা বলা বহু সংখ্যক নেতা পরবর্তীতে শাসকশ্রেণীর দলে ভিড়ে গেছে। শ্রমিকজনতাকে হতাশ করার জন্য এ উল্লেখ খুবই কার্যকর এবং এটা চলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি তা হলো শাসকশ্রেণীর দলে ভিঁড়ে যাওয়া এইসব নেতারা পরবর্তীতে ঐ পক্ষের হয়েও শ্রমজীবীদের মধ্যে নেতা হয়ে থেকে যায়! এরাই শ্রমজীবীদের দিয়ে শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থের বিরূদ্ধে ব্যান্ড বাজানোর ব্যবস্থা করে।

শ্রমজীবী জনগণকে শোষণের জন্য শাসকশ্রেণী যে সব উপায় এবং কৌশল নির্ধারণ করে তার যে বিভিন্ন স্তর তার মধ্যে প্রাথমিক স্তরেই থাকে ধোঁকাবাজি। শোষণের জন্য শাসকশ্রেণী এসব কাজ করবে, কৌশলের এবং উপায়ের সবগুলো স্তর তারা ব্যবহার করবে। এর বিপরীতে শ্রমিকশ্রেণীর কাজ হলো এসব কৌশল এবং উপায়ের সবগুলোকে চূর্ণ করে নিজেদের বিজয়ের জন্য তৈরী হওয়া এবং সংগঠিত হওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে শাসকশ্রেণী এই ধারণা তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে যে, কেউ বা কোন নেতা শ্রমজীবী জনগণকে উদ্ধার করবে। শাসকশ্রেণী শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, নেতার ধারণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

শোষক শাসকশ্রেণী নেতা তৈরী করে। এই নেতা তৈরী তারা নিজেদের শ্রেণীর মধ্যে করে এবং শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যেও তৈরী করে। শাসকশ্রেণীর নেতা শাসকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার অধীন; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধীন নয়। সেখানে সে তার শ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় একাই একনায়ক। শোষণ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শোষণকে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় পরিণত করতে এই ধরণের নেতা তৈরী অনিবার্র্য। ব্যক্তিকেন্দ্রীক শোষণকে কেন্দ্রীভূত শক্তিতে রূপান্তর করতে এই ধরণের একক নের্তত্ব ছাড়া উপায় নেই। অপরদিকে, শ্রমিকশ্রেণীর শোষণ মুক্তি এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের বিষয়টি সামষ্টিক। তাই সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনিবার্য। তাই সেখানে সাংগঠনিক ধারণা নেতা তৈরীর ধারণা নয়। নেতা তৈরী সেখানকার লক্ষ্য এবং মূলনীতি পরিপন্থী। সেখানকার ধারণা হলো নেতৃত্ব তৈরী। নেতা এবং নেতৃত্ব এক কথা নয়। নেতা একক এবং নেতৃত্ব সামষ্টিক।

বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব তৈরীর কাজ এবং এ লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার কাজ এখনও পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করতে পারেনি। শ্রমিকশ্রেণীর একটি সামষ্টিক অংশগ্রহণে সংগঠিত সংগঠনের অভাবে এখনও পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব তৈরী সম্ভব হয়নি। অতীতে যেসব সংগঠন এবং নেতা শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাও আবার শ্রমজীবীদের সঙ্গে নিয়ে, সেটা সম্ভবই হতো না যদি শ্রমিকশ্রেণীর সক্রিয় অংশগ্রহণে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ একটি ন্যূনতম পর্যায়ে থাকতো। নেতৃত্ব হলো পরিমাণগত এবং গুণগত উভয়দিক থেকে একটি বর্ধমান বিকাশ ধারার চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি হলো সমষ্টি দ্বারা নির্ধারিত তাৎক্ষণিক কাজের নিমিত্ত মাত্র। এই তাৎক্ষণিক কাজও সমষ্টির কাছে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে নয়।

শ্রমিকশ্রেণীর বিরূদ্ধে ব্যান্ড বাজানোর বিপরীতে শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিকে সংগঠিত করে তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রমাকে জোরদার করাই হলো বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সবচেয়ে বড় কাজ এবং মে দিবসের শিক্ষা।।

৩০.০৪.২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s