লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

world-to-win[নির্বাচন সম্পর্কে বামপন্থী মহলে একটা বিতর্ক রয়েছে বহুপূর্ব হতেই। কেউ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে সাফাই দেন; কেউ বা জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান; আবার কেউ বা শাসকশ্রেণীর কোনো একটি অংশকে মন্দের ভালো জ্ঞান করে তাতেই নিজের আখের গোছাতে মত্ত হন। আবার কেউ কেউ নির্বাচন মানেই সংশোধনবাদএমন তত্ত্ব ফেরি করেন। কোনো কোনো বামপন্থী সংগঠন ভারতের রাজধানী দিল্লীতে আত্মপ্রকাশ করা আম আদমি পার্টির সাথে নিজেদের মেলাচ্ছে; আবার কেউ বা এই নির্বাচনে শ্রেণীসংগ্রামের স্বপ্নও দেখেন! এমন বিবিধ চিন্তাচেতনায় কেউ কেউ বিভ্রান্তও হতে পারেন। তাই এ নিয়ে কিছু লেখা, তথা নির্বাচন সম্পর্কে নিজের অবস্থান তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। এই লেখাটি যেহেতু নির্বাচন সম্পর্কিত অবস্থান; তাই এখানে সংক্ষিপ্তাকারে হলেও এভূখণ্ডে পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরাটা জরুরী। আর এর মাধ্যমে ইতিহাস ও মতাদর্শের আলোয় বাঙলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর সাথে নির্বাচনের বিষয়টি মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে বলেই আমার ধারণা।]

বাঙলাদেশ কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছে পুঁজিবাদের ভিত্তি। আর পুঁজিবাদের বিজয়সূচক অগ্রগতি এবং সামন্ততান্ত্রিক অনৈক্যের ওপর পুঁজিবাদের বিজয় অর্জনের সময়কালে পুঁজিবাদ তার নিজস্বার্থেই সংসদীয় গণতন্ত্র বা সর্বজনীন ভোটাধিকারের বিষয়টিকে সামনে তুলে ধরে। আবার বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিকাশ যেহেতু অসমভাবে হয়েছে; তাই বিশ্ব পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের শোষণটাও বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান থেকেছে। পুঁজিবাদ নিজস্ব স্বাভাবিক নিয়ম অবাধ প্রতিযোগিতার হাত ধরে বেশিদিন চলতে পারেনি। পুঁজিবাদ দ্রুতই একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদে রূপ নিলো। দেশে দেশে তৈরি হলো উপনিবেশ। সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপে উপনিবেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হলো। সেইসব স্থানে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মিলিত শক্তির ফলে গড়ে ওঠে এক ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ।

এখানে উল্লেখ্য যে, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ এক কথা নয়। উপনিবেশ সাম্রাজ্যবাদের পূর্বেও ছিল; তবে সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ হলো সাম্রাজ্যবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আবার সরাসরি উপনিবেশ কায়েম না করেও সাম্রাজ্যবাদ কোনো ভূখণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক, আইনী, বা সামরিক দখলদারিত্বের মাধ্যমেও সাম্রাজ্যবাদ এই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে। অর্থাৎ, উপনিবেশ স্থাপন ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। উপনিবেশ বা নয়াউপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ তার টিকে থাকার রসদ যোগাতে সক্ষম হয়। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। তা এমন একটি মতাদর্শ, যা পুঁজিপতি বুর্জোয়াদের পুরো বিশ্বে রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকমনস্তাত্ত্বিকসামাজিকসাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য তৈরির বৈধতা প্রদান করে।

দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত জাতিসত্তাসমূহের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম দানা বাঁধতে থাকে। কিন্তু দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় সেবাদাসদের সাহায্যে পূর্বতন উপনিবেশ, আধাউপনিবেশগুলোতে পরোক্ষ নয়াঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে ঔপনিবেশিক শাসন বজায় থাকা; সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সাম্রাজ্যবাদের স্থায়ী সমর অর্থনীতি ও ব্যাপক সামরিকীকরণের মতো নতুন পদ্ধতি গ্রহণ; সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী দেশে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপান্তর; একের পর এক স্থানীয় যুদ্ধ আর সাম্রাজ্যবাদের সংযুক্ত শক্তি কর্তৃক আগ্রাসী যুদ্ধ; ঋণ নির্ভরতা বৃদ্ধি এবং কিছু কেইনসীয় নীতি বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

বর্তমান কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদকেও দেশে দেশে গড়ে তুলতে হয়েছে তাদের পুষ্ট নয়াঔপনিবেশিক রাজনীতির দোসর আমলামুৎসুদ্দি ও স্থানীয় দালালবুর্জোয়াশ্রেণী। এখানে উল্লেখ্য যে, নয়াউপনিবেশবাদের সাথে সামন্ততন্ত্রের রয়েছে দ্বৈতনীতি। একদিকে, নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উচ্ছেদ করে। আবার তা ততোটুকুই যতোটুকু সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে আংশিক সংরক্ষণও করে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থানুযায়ী। অর্থাৎ, নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পূর্ণমাত্রায় সামন্তবাদ উপস্থিত না থাকলেও সামন্তঅবশেষ বিদ্যমান থাকে। আর তা খুব স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

নয়াউপনিবেশবাদের মূল কথা হলো উপনিবেশিত দেশের জনগণের একাংশকে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতিশিক্ষায় গড়ে তোলা এবং এই সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট দালালবুর্জোয়া শ্রেণীকে সেই কথিত স্বাধীন দেশের শাসক হিসেবে ক্ষমতাসীন করা। অর্থাৎ, শাসকশ্রেণীর দাসত্ব নিশ্চিত করে দালালবুর্জোয়াদের দ্বারা পরোক্ষ ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখা যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবই সাম্রাজ্যবাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে। আর এই ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পড়ে বিপ্লবী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তিগুলোকে ধ্বংস করার। আর এক্ষেত্রে প্রতিবিপ্লব হলো নয়াউপনিবেশবাদের এক অপরিহার্য উপাদান। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দেবার আগে, সাম্রাজ্যবাদীরা এটা নিশ্চিত করে নেয় যেন সবচেয়ে রক্ষণশীল এবং দক্ষিণপন্থী শক্তি সেইসব দেশে ক্ষমতায় আসে। সেই সাথে সেই সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট দালালবুর্জোয়াদের এক জাতীয়তাবাদী লেবাস ধারণ করতে দেখা যায়; যা সর্বোতই রাষ্ট্রীয়তার অনুরূপ। কোনো রাষ্ট্র যখন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমন সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন) প্রায় অপরিবর্তিত রেখে নিজেকে স্বাধীনসার্বভৌম বলে ঘোষণা করে, অখণ্ডতার বুলিতে জাতীয়তাবাদের গান শোনায়, তখন সেটি গণতন্ত্রের লেবাস ধরলেও, তা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে না। বাঙলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান বা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো তেমনি নির্বাচন সর্বস্ব পোষাকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাতে জনগণের নাম ভাঙিয়ে শাসকশ্রেণীর গণনিপীড়ন বলবৎ থাকলেও জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন থাকে সুদূর পরাহত।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে ভারতীয় উপমহাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করে জন্ম নেয় পাকিস্তান আর ১৫ আগস্ট ভারত। ভারত ও পাকিস্তানের মসনদে আসীন হয় যথাক্রমে দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী ভারতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ।

ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিসমস্যার বিষয়টিও বেশ জটিল। আর এই সমস্যার জট এতো সহজে ছাড়ানো সম্ভব নয়। তবে এই পাকানো জটটির নানাদিক যথাযথভাবে অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। ভারতীয় জাতি নামক ভারতের দালালবুর্জোয়াশ্রেণী প্রসূত তত্ত্বটিকে বোঝাটা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে ভারতীয়তাভারতীয় জাতির মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবন করা দরকার। ভারতীয়তার সংজ্ঞায় এই উপমহাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও জনগণের প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে যে কিছু সাধারণ ঐতিহ্য রয়েছে তাকে আবদ্ধ করা যায়। কিন্তু তা কোনো নির্দিষ্ট জাতিসত্তাকে নির্দেশ করে না। রাষ্ট্রীয়তার ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞার মাধ্যমে কেবলমাত্র বোঝানো যায় ভারত রাষ্ট্র ও তার সংবিধানের আওতাভুক্ত নাগরিকত্ব। ভারতীয় জাতি নামক একটি মেকি, অনৈতিহাসিক ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তাকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপাচ্ছে দালালবুর্জোয়াশ্রেণী এবং তাদের চালিত কর্পোরেট প্রচারযন্ত্র। অথচ রাষ্ট্রীয়তা বা নাগরিকত্বকে জাতিগত ক্ষেত্রে কোনোভাবেই টানানো সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৪৭ সালের আগে বাঙলাদেশ ও পাকিস্তান ছিল ভারতের সঙ্গে একীভূত, কিংবা কয়েক বছর আগেও সিক্কিম ছিল ভারতের বাইরে। প্রতিবারই রাষ্ট্রীয় সীমানা পরিবর্তনের সাথে সাথে কী ভারতীয় জাতির রূপ পালটে গেছে? আমরা জানি, তা কখনোই ঘটে না। তেমন হলে, বাঙলাদেশের অধিবাসীদের জাতীয়তা তিনবার পালটে যেতো ভারতীয় থেকে পাকিস্তানি হয়ে বাঙলাদেশি। অথচ তা হলো রাষ্ট্রীয়তা বা নাগরিকত্বের বিষয়। রাজনৈতিক পরিভাষা শ্রেণী স্বার্থের কারণে যা খুশি দাঁড় করালেও বাস্তব সত্য হলো বাঙলাদেশে বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল সহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের আবাস রয়েছে; যাদের রাষ্ট্রীয়তা, নাগরিকত্ব বাঙলাদেশি। একইভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয়তাকে জাতীয়তা বলা প্রচার করা হয়ে থাকে।

পাকিস্তানে ধর্ম ও রাষ্ট্রীয়তাকে জাতীয়তা বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। অথচ পাকিস্তান একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র; যেখানে বহু জাতিসত্তা ও জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হয় সামরিক শাসন। উল্লেখ্য, এই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হলো কর্পোরেট সেনাবাহিনী; যার সুযোগ্য উত্তরসূরি বাঙলাদেশ সেনাবাহিনী। এই সামরিক শাসনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামরিকবেসামরিক আমলা, দালালবুর্জোয়াশ্রেণী ও ভূস্বামীদের হাতে কুক্ষিগত হতে থাকে। ফলে পাকিস্তানে বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের মনোভাব সঞ্চারিত হয়। যেহেতু ধর্ম ছাড়া জাতিসত্তাসমূহের মধ্যে ঐক্যের কোনো সাধারণ সূত্র ছিল না, রাষ্ট্রের অর্থনীতিরাজনীতি ছিল বৈষম্যমূলক; সেই কারণে জাতিসত্তাসমূহের মধ্যকার বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ দমনে প্রায় প্রথম থেকেই পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেনাধিপত্য হলো পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য। আর এই প্রক্রিয়ার সহযোগী শক্তি হিসেবে বরাবরই সক্রিয় সমর্থন যোগায় ইসলামী ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দল। আর এর বিপরীতে জনগণের গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা থেকে অসংখ্য রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আসে ৭১, যা মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ এই ভূখণ্ডের জনগণের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী এবং তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্র শিবির) তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিকআমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য পাকিস্তানি সেনা কমান্ডের অধীনে রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে ফ্যাসিস্ট বাহিনী গঠন করে। এই বিশেষ বাহিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কর্মীসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে সাধারণ নিরীহ জনগণকে হত্যা, নারী নির্যাতন ও লুণ্ঠনে মেতে উঠে এবং তারা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি থেকে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগণকে নির্মূলের চেষ্টা করে।

লাখো মুক্তিকামী জনগণের আত্মবলিদানে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়, যাতে এখানকার জনগণ পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষভাবে আত্মনিয়োগ করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করে জনগণের আইন, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে অসমাপ্ত রেখে ঘোষণা করা হয় মুক্তিযুদ্ধ শেষ, আমরা স্বাধীন জন্ম নেয় বাঙলাদেশ রাষ্ট্র। কিন্তু জনগণের মুক্তি আজও অধরা।

বাঙলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের সময়কালেও দেখা যায় যে, বাঙালি জাতীয়তার নামে বাঙলাদেশি জাতীয়তা গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা। পরবর্তীতে, শাসকশ্রেণীর একাংশকে সরাসরি বাঙলাদেশি জাতীয়তাবাদের তত্ত্বটিকে স্বনামে সামনে এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় মত্ত হতে দেখা গেছে। কিন্তু আদতে এই দুই জাতীয়তার চেতনাধারীদের মাঝে কোনো মৌলিক পার্থক্য দেখা যায় না। এই জাতীয়তার উপাদান হিসেবে ইসলাম ধর্মকে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যার ধরন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাঙলা ভাষাভাষীদের একাধিপত্য।

একই নামে দুইটি জাতিসত্তা থাকতে পারে না, যেখানে দুটি জাতিসত্তাই একই ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ, ঔপনিবেশিক বিভাজনে বিভাজিত বাঙালি জাতিসত্তা বাঙলার দুই প্রান্তে দুইভাবে বিকশিত হয়েছে। এখন বাঙালি জাতিসত্তা বলে যদি কোনো এক অংশের রাষ্ট্রীয়তাকে তুলে ধরা হয়, তবে তা কেবল আধিপত্যবাদী রাজনীতিরই পরিচায়ক হবে। আদতে তা কখনোই জাতিসত্তার পরিচয় পেতে পারে না। আর এজন্যই এখানকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধীদের ঔপনিবেশিক বিভাজন বা কলোনিয়াল বাউন্ডারির বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান থাকা দরকার।

যে উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতে তৎকালীন মুক্তিকামীদের বৃহৎ অংশের নেতৃত্ব ছিল, তারা কোনোভাবেই জাতীয় চেতনার অধিকারী ছিল না তারা সাম্রাজ্যবাদীসম্প্রসারণবাদী শক্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত দালালবুর্জোয়াশ্রেণী। যার ফলে পরবর্তীতে বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ক্ষমতা, তথা রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়াটি যখন এদের হাতে উঠে আসে, তখন তারা আত্মনির্ভরশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে না গিয়ে পূর্ববর্তী পাকিস্তানি কাঠামোয় একটি নয়াঔপনিবেশিক ধাঁচের রাষ্ট্র কাঠামোই বিনির্মাণ করে। রাষ্ট্রের সংবিধান গঠনে রাষ্ট্রের জনগণের সকল অংশের মত ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে, জনগণের তথা মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পছন্দানুযায়ী একটা কমিটি গঠন করে সংবিধান রচনা করা হয়। আর সেই সংবিধান ইংল্যান্ড ও ভারতের সম্মতি পাওয়ার পরেই কেবল গৃহীত হয়। সংবিধানের সর্বত্র ঔপনিবেশিক আইন বলবৎ রেখে এবং গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূলা ঝুলিয়ে সেখানে একব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। উল্লেখ্য, বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের ক্ষমতা যেকোনো রাষ্ট্রের সরকার প্রধান থেকেই কেবল বেশি নয়, এর তুলনা হতে পারে কেবল রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা কর্তৃক ভোগ্য ক্ষমতার সঙ্গে। এই ঔপনিবেশিক গণতন্ত্রে প্রকৃতার্থে জনগণ সার্বভৌম নয় সার্বভৌম কেবল সরকার প্রধান। এই অগাধঅপ্রতিরোধ্য ব্যক্তিক্ষমতা আবার গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়ানো সংবিধানসিদ্ধ।

যে সংবিধানে মৌলিক অধিকারের কথা বলছে, সেই সংবিধানই বলছে রাষ্ট্র তার জনগণকে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করলে জনগণের এ নিয়ে মামলা করারও অধিকার নাই, সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, আবার সংবিধানেরই অপর বক্তব্যে তা রহিত করা হয়। একই রূপ স্ববিরোধী অবস্থান রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও। অথচ রাষ্ট্র কর্তৃক গোপন চুক্তি, তথা সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের বৈধতা স্বয়ং এই সংবিধান প্রদান করছে! ঠিক তেমনি ক্রসফায়ারের বৈধতাও দিচ্ছে এই সংবিধান। বৈধতা দিচ্ছে সংসদ কর্তৃক যে কোনো গণবিরোধী আইন পাসের, আর তাতে জনগণ কোনো হস্তক্ষেপও করতে পারবে না!

নির্বাচনপন্থী বাম সংগঠনগুলোর অবস্থান

নির্বাচনপন্থী বাম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সাথে নির্বাচন সম্পর্কিত কোনো আলোচনা হলেই তারা টেনে আনেন কমরেড লেনিনকে। তাদের অনেকেই নির্বাচনকে কৌশল হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেন। কিন্তু এ সম্পর্কে লেনিনবাদএর শিক্ষাটা কি, সেটা দেখা যাক।

রাশিয়ার ডুমার প্রথম দুটি নির্বাচনে বলশেভিকরা অংশ নেয়নি, মেনশেভিকরা দুটিতেই অংশ নিয়েছিল। তৃতীয় নির্বাচনের আগে বলশেভিকরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বিতীয় নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি (এস আর) অংশগ্রহণ করলেও তৃতীয় নির্বাচন তারা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রসংগেই লেনিন এগেইনস্ট বয়কট লেখেন। ১৯১২ সালের ডুমা নির্বাচনে বলশেভিক পার্টির ছয়জন সদস্য শ্রমজীবী নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে জয়লাভ করেন। ডুমার অভ্যন্তরে এই সদস্যদের কাজ ছিল জার সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের বিরোধিতা করা এবং তাদের গণবিরোধী চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের স্বরূপ উন্মোচন করা। নির্বাচনকে লেনিন কখনোই বিপ্লবী লক্ষ্যে পৌঁছাবার সিড়ি বলে মনে করেননি। যে কারণে বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতির সাথে সাথে ডুমা ত্যাগ করতেও তিনি এক মুহূর্ত চিন্তা করেননি। অর্থাৎ, সংসদের গণতান্ত্রিক চর্চাই কেবল নয়; নিজেদের আন্দোলনসংগ্রামের তীব্রতার তারতম্যের ক্ষেত্রেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, না করার বিষয়টি জড়িত; আর তা অবশ্যই কৌশলগতভাবে সংসদকে ব্যবহার করার জন্য, নির্বাচনকে বিপ্লবী পথ জ্ঞান করে নয়। কারণ বিপ্লবী লক্ষ্য কেবল সহিংস বল প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে এটাই মার্ক্সবাদলেনিনবাদের শিক্ষা। এখানে উল্লেখ্য যে, জারশাসিত রাশিয়া ছিল স্বয়ং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র; ঔপনিবেশিক, আধাঔপনিবেশিক, বা নয়াঔপনিবেশিক নয়।

প্রশ্ন হলো এই সংগঠনগুলো কোন অজুহাতে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে?

saki-telescopeগণসংহতি আন্দোলনএর রাজনৈতিক প্রস্তাবএর [৩১ জানুয়ারি, , ২ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২য় জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে গৃহীত] শিরোনাম

মার্কিনভারত দখলদারিত্ব থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করুন

মুক্তিযুদ্ধে জনগণের আকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র ও সংবিধান কায়েমে ঐক্যবদ্ধ হোন

এই দলিলে দখলদারিত্বের বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। সাধারণত দখলদারিত্ব বলতে আমরা বুঝি কোনো ভূখণ্ডে অন্য কোনো রাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন। যেমন ইরাক বা আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে দখলদারি কায়েম রয়েছে। সেই সাথে নয়াউপনিবেশবাদী ধাঁচেও রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকসাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব বা নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখা যায়। তবে উক্ত দলিলের বক্তব্যে তা পরিষ্কার হয়নি। এটি পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিল; কারণ এর মাধ্যমে তাদের অবস্থান বোঝা সম্ভব হতো তারা সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদকে কিভাবে দেখছেন। যেহেতু মৌলিক বা প্রধান দ্বন্দ্ব সম্পর্কেও তাদের দলিলে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নাই।

দলিলে বলা হয়েছে

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নবগঠিত শাসকশ্রেণী তার জন্মের সাথে সাথেই সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে আপোস করে। ফলে একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে না উঠে কার্যত পুরোনো রাষ্ট্রটিই নতুন নামে সংগ্রামী জনগণের ঘাড়ে চেপে বসে তার ওপর ছড়ি ঘোরাতে থাকে। বহাল থেকে যায় পুরোনো রাষ্ট্রের সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, আইনকানুন। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল গণতান্ত্রিক শক্তির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, জনগণের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম একটি সংবিধান তৈরির বদলে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা বিধানে অক্ষম, নারী বিদ্বেষী এবং জাতিগত নিপীড়ন ও সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের উপযোগী একটি সংবিধান। আর এসবের সহযোগে সামরিক কিংবা বেসামরিক প্রত্যেকটি সরকার ধারাবাহিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং দেশের সম্পদ, উৎপাদনী খাত, জনগণের শ্রম ও সাংস্কৃতিক জীবনকে সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে তৎপর হয়েছে।…”

শাসকশ্রেণীর আদর্শিক দেউলিয়াত্ব, সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব এবং মেরুদণ্ডহীনতার ফলে আজ আমাদের জাতীয় পরিচয় একটি আত্মমর্যাদাহীন, দুর্বল, নতজানু চরিত্রে দুনিয়ার সামনে উপস্থিত। জনগোষ্ঠী হিসেবে সংগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাস সত্ত্বেও আমাদের এ পরিচয় লজ্জার, বেদনার। ক্ষমতা লাভের আশায় বাংলাদেশের শাসকরা আজ সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্র রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাসে ধরনা দেয়ার প্রতিযোগিতা করে। প্রতিযোগিতা করে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রেসক্রিপশনকে কে কত ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তার জন্য। জনগণের সম্পদ বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয় দেশের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে জলাঞ্জলি দিয়ে। আমাদের পূর্বসূরিদের সংগ্রামের সাথে, তাদের আকাঙ্ক্ষার সাথে এটা এক সর্বাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা মনে করি, এ দেশের জনগণ হাজার বছর ধরে যে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সংগ্রাম করেছেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায় আমরা যার আজ বেঁচে আছি তাদের সকলের। ইতিহাসের দায় শোধ না করলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সেই দায় শোধ হতে পারে ইতিহাস নির্ধারিত পথেই।…”

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশে দেশে জনগণের চলমান সংগ্রামের প্রেরণা এবং ফুলবাড়ী, কানসাট, গার্মেন্টস, শনির আখড়া, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিল ইত্যাদি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের বিষয়বস্তু এরকম একটি বাংলাদেশের দাবিকেই সামনে নিয়ে আসছে। গণসংহতি আন্দোলন এই সংগ্রাম গড়ে তুলতে সকল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য কামনা করে। মেহনতি জনগণের রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে সকল দেশপ্রেমিক জনসাধারণ, শ্রমিককৃষকসহ মেহনতি জনতা, দেশীয় উদ্যোক্তা ও ছাত্রমধ্যবিত্ত জনগণের সম্মিলিত সক্রিয়তা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই এই সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে এবং জনগণের এই সংগ্রামের ব্যাপক উত্থান, বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধে জনগণের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ও সংবিধান কায়েম হতে পারে।…”

উক্ত দলিলমতে, গণসংহতি আন্দোলন বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানকে একটি স্বৈরতান্ত্রিক, গণনিপীড়ক সংবিধান বলে মনে করে। সেই সাথে সাম্রাজ্যবাদের সাথে শাসকশ্রেণীর সম্পর্কের বিষয়টিও তারা উল্লেখ করেছেন। তারা বিপ্লবী অভ্যুত্থানএর মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ও সংবিধান কায়েম হতে পারে বলে মনে করেন।

কিন্তু তারা বিপ্লবী অভ্যুত্থানএর প্রতিশব্দ যে নির্বাচন হতে পারে, সেটি উল্লেখ করেননি। আবার সেই বিপ্লবী অভ্যুত্থান কিভাবে এমন সংবিধানের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সম্ভব করে তোলেন, যাকে তারাই স্বৈরতান্ত্রিক বলে মনে করেন তা কিন্তু আমাদের বোধগম্য হয়নি। এ বিষয়ে তারা কোনো ব্যাখ্যাও প্রদান করেননি। উপরন্তু বিপ্লবী অভ্যুত্থানএর ধারণাটি একেবারেই ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ। বলপ্রয়োগ, অথবা অহিংসসহিংস; বিষয়টি মীমাংসা করা হয়নি।

আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোনো শাসক দেখা যায়নি, যারা সহিংস বলপ্রয়োগ ছাড়া ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে। শাসকশ্রেণী নিজেই সশস্ত্র হামলা চালায় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এখানে সহিংস বলপ্রয়োগ; তথা সশস্ত্র অভ্যুত্থান, বা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ব্যতিরেকে কিভাবে ক্ষমতা দখলের মার্ক্সবাদী, বা বিপ্লবী গণতান্ত্রিক তত্ত্বায়ন হতে পারে; তা আমার বোধের এন্টেনায় ধরা পড়েনি।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের বেশকিছু টকশোতে গণসংহতি আন্দোলনএর নেতা জোনায়েদ সাকি (মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মেয়র পদপ্রার্থী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন) বারংবার দাবি করেছেন সংবিধান সংশোধনের; শক্তিশালী, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু সামান্যতম রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই বোঝার কথা বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংবিধান, নির্বাচন কমিশন; এসবকিছুই শাসকশ্রেণীর সেবাদাস। তার পরিবর্তনও কেবল তাদের স্বার্থেই হবে; জনগণের স্বার্থে নয়। যা উপরোক্ত রাজনৈতিক বক্তব্যে জোনায়েদ সাকির সংগঠন গণসংহতি আন্দোলনও তুলে ধরেছে।

গণসংহতি আন্দোলনএর পরিবর্তনের ধারণাকে অনেকেই স্বাগত জানাতে পারেন; কিন্তু পরিবর্তনের কথা কিন্তু ওবামাও বলেছে, একইভাবে তাবিথ আওয়ালের এক ভিডিওতে দেখা যায়, সেও পরিবর্তনের কথা বলছে। দিনবদলের কথা বলেই কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছিল। দিনের কোন মাপের বদল হয়েছে, তা আশা করি আমাদের অজানা নয়!

গণসংহতি আন্দোলনএর অপর এক দলিলে বলা হয়

বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতাই যেহেতেু ধনসম্পদ আহরণের এখন পর্যন্ত সবচেযে বড় হাতিয়ার এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের শাসনব্যবস্থা যেহেতু উৎপাদনশীল অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক, সে কারণে পুঁজির বিপুল পুঞ্জিভবন সত্ত্বেও তা বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরের কোনো সম্ভাবনা ধারণ করে না। এর জন্য প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার এমন গণতান্ত্রিকীকরণ যা উৎপাদনশীল অর্থনীতির বাস্তব ভিত্তি তৈরির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কিন্তু শাসকশ্রেণীর কোনো অংশই যে এ কাজের উপযোগী নয় সেটা বলাই বাহুল্য। কাজেই এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির উত্থান।…”

শাসনব্যবস্থার সংকট ঘনীভূত হচ্ছে: জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিই একমাত্র বিকল্প

[গণসংহতি পত্রিকার জানুয়ারিফেব্রুয়ারি ২০১২ সংখ্যায় সম্পাদকীয় হিসাবে প্রকাশিত]

এই দলিলে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে শাসনব্যবস্থার সাথে সাম্রাজ্যবাদী সংযোগের কারণে বাঙলাদেশের অর্থনীতি উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর হতে পারে না। তবে কি শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের রাজনীতিকে শিকেয় তুলে গণসংহতি আন্দোলন আগামীর ঢাকা শ্লোগানে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মত্ত হয়ে সেই ধনসম্পদ আহরণের ভাগীদার হতে চাইছে??

————————-

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম মোর্চার বক্তব্য: গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাবনা ও আন্দোলনের আশু দাবিনামা নামে একটি বুকলেট প্রকাশ করে। সেই বুকলেটে বলা হয়

আওয়ামী লীগবিএনপিসহ শাসকশ্রেণীর দলগুলোর দেশবিরোধী অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদীআধিপত্যবাদীদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।…”

কৃষিক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক সংস্থা ও এনজিওদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা কৃষির বিকাশকে যেমন রুদ্ধ করছে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও বিপন্ন করে তুলছে।…”

দেশের জনগণের পরিবর্তে এখানকার লুটেরা শাসকশ্রেণী এবং আওয়ামী লীগবিএনপিসহ শাসকশ্রেণীর দলগুলো সাম্রাজ্যবাদীআধিপত্যবাদীদের অনুগত থাকার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজি ও তার স্বার্থের সাথে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও তাদের দলগুলো এক জোয়ালে বাঁধা।…”

বুকলেটের প্রথমদিককার লেখায় বিতর্কের অবকাশ খুব সামান্যই। কিন্তু বুকলেটের ৮ম ও ৯ম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক ও শোষণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না ঘটিয়ে এই ব্যবস্থা বদলানো যাবে না; জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীল কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা যাবে না।…”

রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বস্তরে এদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতেই অবৈধ অর্থ, পেশীশক্তি, ধর্মের ব্যবহার, প্রশাসনিক ম্যানিপুলেশান ও দুর্বৃত্তায়নের বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাহীন করে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করার যে অপতৎপরতা তাও এই লক্ষ্যে পরিচালিত। তাই শোষক শ্রেণীর বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সংবিধান, সংসদীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্তমান অগণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন জরুরি।

পরিবর্তনের এই লড়াইকে বিকশিত ও জোরদার করতে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারিত করতে জনগণের ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে; গড়ে তুলতে হবে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা, বদলাতে হবে প্রধানমন্ত্রীর নিরংকুশ ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা, ক্ষমতাসীনদের অনুগত ও অকার্যকরী নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে স্বাধীন, দক্ষ, কার্যকরী ও পক্ষপাতহীন নির্বাচন কমিশনও গঠন করা প্রয়োজন।…”

এখানে এক জায়গায় বলা হচ্ছে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে; আবার বলা হচ্ছে “স্বাধীন, দক্ষ, কার্যকরী ও পক্ষপাতহীন” নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারিত হবে!

১৪ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার এই নীতির ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।…”

রাষ্ট্র সবার বলার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানটুকুও কিন্তু পরিষ্কার করেছেন; যা এর আগে পর্যন্ত ছিল ধোঁয়াশা। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার এই শ্লোগান হলো অন্তর্বস্তুর দিক দিয়ে পরিপূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রসম্পন্ন। একই শ্লোগান আমরা শুনতে পাই সিপিবি বা আওয়ামী লীগের প্রচারপ্রপাগান্ডায়। শ্রেণীবৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্র সবার হতে পারে না, তা কোনো না কোনো শ্রেণীর স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে, সেভাবেই তার সকল বিধিব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলে। কেননা রাষ্ট্রব্যবস্থা হলো সমাজে বিবদমান শ্রেণীগুলোর মধ্যেকার বৈরী দ্বন্দ্বসমূহের অমীমাংসেয়তারই ফল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে রাষ্ট্র কখনোই শ্রেণীহীন হতে পারে না, তার শ্রেণীগত অবস্থান থাকবেই। শ্রেণীবৈষম্যহীন, তথা শ্রেণীহীন সমাজে তাই স্বয়ং রাষ্ট্রব্যবস্থারই বিলুপ্তি ঘটবে। বামপন্থীদের মধ্যে রাষ্ট্র সবার জাতীয় শ্লোগান দেয়ার রীতিটি এসেছে কোনো মার্ক্সবাদীলেনিনবাদী লাইন থেকে নয়, ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের অভ্যন্তরেই এর জন্ম। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালের অক্টোবরে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২২তম কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব হিসেবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণাকে পরিত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সব জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন; যাকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সংশোধনবাদী লাইন গণ্য করে থাকেন।

বুকলেটের ১২তম পৃষ্ঠায় বলা হয়

শাসকশ্রেণীর দলগুলোর মধ্যে যে বিরোধবৈরিতা, অনাস্থাঅবিশ্বাস তাতে দলীয় সরকারের অধীনে সমস্ত দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোন অবকাশ নেই…”; আবার একই পৃষ্ঠায় তারা আবার উল্লেখ করেছেন প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও এই সংকটের সমাধান নয়…”

বুকলেটের ১৪তম পৃষ্ঠায় বলা হয়

পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নির্বাচনী সংগ্রামকেও আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে [বাম মোর্চা] নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, জনগণের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও গ্রহণ করবে।…”

উক্ত ব্যবস্থার যে বিবরণ গণতান্ত্রিক বাম প্রদান করেছে, তাতেও নির্বাচনের পক্ষে এই সাফাই দেওয়াটা ভীষণভাবে অগ্রহণযোগ্য। সেই সাথে তাদের নিজেদের বক্তব্যের মাঝেই অসামঞ্জস্য আর স্ববিরোধিতা সুস্পষ্ট। আর তা যে কোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণের পক্ষেই বোঝা সম্ভব।

————————-

DLA-1সম্প্রতি ৪ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। বাম মোর্চার অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মোর্চার সমন্বয়কারী ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-র কেন্দ্রীয় কার্য পরিচালনা কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এড. আব্দুস সালাম, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির বহ্নিশিখা জামালী, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের হামিদুল হক, বাসদ (মাহাবুব)-এর মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়

গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেশে নেই। ৫ জানুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি ও ভোট ছাড়াই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে দেশ চালাচ্ছে মহাজোট সরকার। জনগণের আকাঙ্খা অনুযায়ী দ্রুত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে তারা গায়ের জোরে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায়। আর তা করতে গিয়ে মহাজোট সরকার নিপীড়নমূলক, স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসন চালাচ্ছে। দেশে আজ জানমালের নিরাপত্তা নেই, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা ও যে কাউকে গুম করে ফেলার লাইসেন্স তুলে দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। মত প্রকাশের অধিকার, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অধিকার ও প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে। জনগণের প্রতিনিধিত্ববিহীন সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা তুলে দিয়ে বিচারবিভাগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার পাঁয়তারা চলছে। এই অগণতান্ত্রিক শাসনকে গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার লক্ষ্যে এবং বিরোধীদের কোণঠাসা করে নিজেদের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার উদ্দেশ্যে মহাজোট সরকার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে স্বেচ্ছাচারী কায়দায় তড়িঘড়ি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশে বিরাজমান সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমননিপীড়ন অব্যাহত রেখে যেভাবে এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য যে সরকার দলীয় প্রার্থীদের জিতিয়ে আনা তা স্পষ্ট। এধরণের কূটকৌশল গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কোনটাকেই শক্তিশালী করবে না, বরং রাজনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের বিপক্ষে যাওয়ায় পরের প্রতি দফায় ওই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রশক্তির জোরে প্রভাবিত করেছে, নিজেদের ইচ্ছেমতো ফলাফল নির্ধারণ করেছে। এমনকি জামাতের সাথে বিভিন্ন মাত্রায় আঁতাত ও সমঝোতা পর্যন্ত করেছে। উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দূরে থাক, এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনও আপাত নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শুধু জবরদস্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি ক্ষমতাসীন সরকার, স্থানীয় সরকারের সমস্ত স্তরের সকল পদও দখল করার জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পৌরসভাউপজেলাইউনিয়ন পরিষদের বিরোধী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত বা সরিয়ে দিয়ে স্থানীয় সরকারও তার দখলে নিয়ে এসেছে।

এই বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা সম্পূর্ণভাবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে ঘোষণা করছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনের কোন সুষ্ঠু পরিবেশ উপস্থিত নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় বামমোর্চাভুক্ত বেশিরভাগ দল অনির্বাচিত সরকারের বৈধতা সৃষ্টির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারের মুখোশ উন্মোচন ও ঢাকা নগরীর পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যেতে আগ্রহী।…”

গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা দলীয় প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।…”

এই বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে কার্যত ধোঁকাই দেওয়া হয়েছে। কারণ একদিকে এই ব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদ বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী সরকারকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সবক দেওয়া হচ্ছে! বলা হচ্ছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা সম্পূর্ণভাবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে ঘোষণা করছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনের কোন সুষ্ঠু পরিবেশ উপস্থিত নেই…” আবার নির্বাচনে তাদের একাংশ যাবে; এমন জগাখিচুরী মার্কা বক্তব্য তাদের কাছ থেকে আশা করিনি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করাটাই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য; সেটি অন্তত পরিষ্কার হলো উল্লিখিত বক্তব্যসমূহে; বিপ্লবী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করাটা সম্ভবত তাদের রাজনৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না; অথবা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের লিস্টে তা অনেক নিচের সারিতে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে উপরোক্ত লিফলেটে এই ব্যবস্থার ব্যাখ্যা সম্পর্কিত যে বক্তব্য তারা দিয়েছিলেন, তার সাথে এবারের বক্তব্যের কি কোনো বিস্তর ফারাক রয়েছে? এর মাঝে কোনো মৌলিক পরিবর্তন কি ঘটেছে? যদি না ঘটে থাকে; তাহলে তখনকার নির্বাচনী পরিবেশ আর এখনকার নির্বাচনী পরিবেশের মাঝে এমন কি পার্থক্য দেখা গেল, যার বদৌলতে এবার গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা মনে করছে যে, পূর্বেকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখন আর নাই; তা ফিরিয়ে আনতে হবে?? প্রশ্নগুলো আমাদের নিকট কেবল গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার সুবিধাবাদী চরিত্রটিরই জানান দিচ্ছে।

———————————

CPB-Basadঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বাসদ (বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল) নির্বাচনপন্থী দল। তাদের জন্মলগ্নের ইতিহাসেও নির্বাচন সম্পর্কে প্রায় একই বক্তব্য পাওয়া যাবে; তবে তা না হাতড়ে আমরা বরং এই দুটো দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করব এই লেখায়। ২০১২ সালে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেন দলদুটির নীতিনির্ধারণী নেতারা, সেখানে তারা ১৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ১৫ দফা কর্মসূচী বলা হলেও, এটি মূলত ১৫ দফা দাবীনামা; যা সিপিবিবাসদ শাসকশ্রেণীর ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহবান জানিয়ে অনুরোধ করেছে।

উল্লিখিত ১৫ দফার ১ম দফায় উল্লেখ করা হয়

. মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের সকল বিকৃতি ও অসম্পূর্ণতা দূর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সংবিধানকে আরো গণতান্ত্রিক ও গণমুখী করা।

* বিগত ৪০ বছরে ১৫ টি সংশোধনীর মাধ্যমে সাধিত সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্র ক্ষুণ্নকারী সকল বিকৃতি দূরী করা।…”

* সংখ্যানুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র এই ছয় স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে স্বশাসিত স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

* নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে কমপক্ষে আরও দুটি নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে সম্পন্ন করা। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনে টাকার খেলা, পেশী শক্তি, সাম্প্রদায়িক প্রচার–প্রচারণা ও প্রশাসনিক কারসাজিমুক্ত করতে স্বাধীন ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা।…”

সংবিধান এবং এখানকার শাসকশ্রেণী সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে; তাই এখানে আলাদাভাবে খুব বেশি বলার অবকাশ নাই। ১৯৭২–এর সংবিধান জনগণের মৌলিক অধিকার প্রশ্নে বলে

২৬। () এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসমঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান–প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

() রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।…”

আবার সংবিধানের ১৪২ ধারায় বলা হয়

এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও সংসদের আইন–দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে।…”

যা মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। এমনি আরো অনেক অনেক স্ববিরোধী মন্তব্যে ঠাঁসা; এক স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধানকে কেমন করে আদর্শ মনে করতে পারে কমিউনিস্ট নামধারী কোন পার্টি, তা বোধগম্য হয় না। উপরন্তু, ওই সংবিধানে ফিরে যাওয়াটাই যেখানে তাদের প্রথম দাবী, সেখানে সর্বহারার একনায়কত্ব বা বিপ্লব যে সুদূর পরাহত, কেবলই বুলিতে সীমাবদ্ধ; তা বলাই বাহুল্য!

যেন বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাবৃদ্ধি আর ১৯৭২এর সংবিধান কায়েমই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অপরিহার্য! আর তা করার দাবি জানানো হচ্ছে ওই শাসকশ্রেণীকে, যাদের বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণী, বা সাম্রাজ্যবাদবিরোধীদের ক্ষুরধার সংগ্রাম পরিচালনা করার কথা।

সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হলেও রাষ্ট্র কাঠামোর কোন অংশে এর কোন অনুশীলন হয়নি। কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি সম্পর্কে সংবিধানে বলা হয়

১৪৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।…”

এই রাষ্ট্রযন্ত্রে কৃষক–শ্রমিকের শোষণ মুক্তির কথা বলা হলেও তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে; যেহেতু এই সংবিধান প্রনয়ণ ও গ্রহণকারীরা তৎকালীন উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণীর ধারক–বাহক ছিলেন; আর এই কাগুজে সমাজতন্ত্র ছিল মুক্তিকামী জনতার হাত থেকে তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা আর তৎকালীন মধ্যশ্রেণীর বাম দল সিপিবি গং’দের আওয়ামী লীগের বিটিমে পরিণত করার সুদূর প্রসারী অপতৎপরতা। যার ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৫ সালে সিপিবিকে গিলে খাওয়ার পরও আজ অবধি সেই বামদের কাগুজে সমাজতন্ত্রের প্রতি মোহ ভঙ্গ হয়নি। সিপিবির অনেক নেতা মন্দের ভালো খুঁজতে গিয়ে এখনো আওয়ামী লীগ, বা বর্তমান সরকারকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সমর্থনের পক্ষে সাফাই গান। কেউ কেউ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাঝে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাও খুঁজে ফেরেন! তারা সমাজব্যবস্থার অনেক বিশ্লেষণ, শাসকশ্রেণীর বহু সমালোচনা হাজির করলেও; এখনো শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এজেন্ডাকেই আপন করে নেন পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে।

উক্ত দাবিনামায় বলা হয়

মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা।…”

মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়নি, সেখানে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন কোনো বৃহৎ জোটও গঠিত হয়নি, বরং এই যুদ্ধে অনেক পার্টি তাদের নিজেদের লাইন অনুযায়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল; আবার কোন কোন বিপ্লবীদের একাধারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, নক্সাল নিধনে জড়িত থাকা ভারতীয় বাহিনী এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের এখানকার এজেন্ট মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল। এই যুদ্ধে অনেক পেটিবুর্জোয়া এবং গণতান্ত্রিক শক্তিও লড়াই করেছিল। যার মূলে ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক মুক্তির লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম। আর সেই গণতান্ত্রিক মুক্তি অর্জিত হওয়ার পূর্বেই সুকৌশলে বিজয় অর্জনের রব তোলা হয়, ক্ষমতা হস্তান্তর হয় পাকিস্তানি স্বৈরাচারীদের থেকে সাম্রাজ্যবাদের এদেশীয় দালালদের হাতে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক মুক্তি থেকে যায় অধরা। অথচ সিপিবিবাসদ তাদের কর্মসূচীতে সে ঐতিহাসিক ঘটনাকে নাকচ করে বলছে মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্র। যা ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বামদের মোটা দাগের বিচ্যুতি ভিন্ন কিছু নয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে আনু মুহাম্মদ সিপিবির রাজনীতি ও লেজুড়বাদ শীর্ষক এক নিবন্ধ রচনা করে সিপিবির সংশোধনবাদী রাজনীতির গোড়া বেশ ভালোভাবেই উন্মোচন করেছিলেন।

২০১৪ সালের আগস্টে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সিপিবি সভাপতি লিখিত জনতার মৃত্যু নেই, তাই মৃত্যু নেই বঙ্গবন্ধুরও এবং দেশ–কাল–জনতা ও বঙ্গবন্ধু শীর্ষক দুটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখা দুটির শিরোনাম দেখেই বোঝা সম্ভব, তাতে কাকে কোন মাপের স্তুতি গাওয়া হয়েছে! একজন বামপন্থী নেতা কিভাবে জাতির জনক অভিধা গ্রহণ করতে পারেন, কিভাবে বঙ্গবন্ধু অভিধাটি ব্যবহার করে তিনি অকপটে রাজনৈতিক স্তুতি গাইতে পারেন; তা আসলেই অবাক হওয়ার মতো বিষয়ই বটে। কিন্তু যদি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিই; তবে দেখব, এটা সিপিবির রাজনৈতিক লাইনেরই অংশ। তিনি লিখছেন,

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের যে সব ঐতিহাসিক অর্জন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার প্রতীক ও কেন্দ্রবিন্দু। এ বিষয়ে বিতর্ক করাটা একটি অনৈতিহাসিক পণ্ডশ্রম মাত্র।…”

এখানে রাজনৈতিক কারণেই খানিক পণ্ডশ্রম করার প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পাচ্ছি। জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ খুবই সংবেদনশীল একটি অধ্যায়। এখানে বামপন্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা জাতীয় সংগ্রামে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালনের পরেও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব অন্যদিকে কেন গেল, সেই বিশ্লেষণ কোনো সংক্ষিপ্ত লেখায় দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিষদ পর্যালোচনা; যা আজ পর্যন্ত হয়নি। আর যেটুকু হয়েছে, তা দলগত অবস্থান থেকে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তিকে একক কৃতিত্ব দেওয়া হয়, তখন এ নিয়ে দুয়েকটি কথা বলাটা জরুরী হয়ে পড়ে।

শেখ মুজিবুর রহমান বা আওয়ামী লীগের অন্য কোনো নেতা মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা; অর্থাৎ স্বাধীন দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্টার ধারণাটুকু ধারণ করেননি; এমনকি কোথাও এ সম্পর্কিত কোনো বিবৃতিও প্রদান করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীসমর্থকদের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাদের নেতৃত্ব অখণ্ড পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসীন হতেই চেয়েছিল; যে কারণে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত চলছিল দেনদরবার। দ্বিধাবিভক্তি সহকারেই মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করতেন তৎকালীন কমিউনিস্টবামপন্থী নেতাকর্মীরা। কমিউনিস্টরাই দিয়েছিল স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা কায়েমের ডাক। ৬২–এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯–এর গণঅভুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনসংগ্রামে সক্রিয় থেকে জীবন দিয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টি সমূহের নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। আর ঐসব আন্দোলনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা গড়ে ওঠে। আর এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কমিউনিস্টবামপন্থী নেতৃবৃন্দ। মনি সিংহ, খোকা রায়, সুখেন্দু দস্তিদার, আব্দুল হক, তোয়াহা প্রমুখ এবং অবশ্যই মাওলানা ভাসানী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক বা কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় রাজনীতি বা মুক্তিযুদ্ধে অবশ্যই শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা রয়েছে। তবে তা প্রশ্নহীন, বিতর্কহীন নয়। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যে প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখিয়েছেন, তা তার রাজনৈতিকতারই প্রতিফলন মাত্র। একে ব্যক্তিগত লেখা হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নাই। ঐতিহাসিক বিতর্ক কোনো একক লেখায় মীমাংসা হতে পারে না, তা চলতেই থাকবে। আবার একে পণ্ডশ্রম বলার মানেই হলো যান্ত্রিক চিন্তাচেতনাকে ধারণের নামান্তর। জনগণের মাঝে সর্বহারাশ্রেণীর রাজনীতি, তথা শ্রেণীসংগ্রামের বিকাশকে তরান্বিত করতেও এই বিতর্ক জরুরী।

২০১৩ সালের নভেম্বরে এক সমাবেশে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “…যদি নির্বাচন কমিশনের টাকায় পোস্টার ক্যাম্পেইন করে দেয়া হতো, যদি এর বাইরে প্রার্থীদের কোনো খরচ করতে দেয়া না হতো, তাহলে আগামী নির্বাচনে সিপিবিবাসদনাগরিক ঐক্যগণফোরামসহ অন্যান্য দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তি ৩০০ আসনে ৩০০ আসন পেত।…”

চলমান ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় এমন আকাশকুসুম চিন্তা করাটা কোনো বামপন্থী নেতার রাজনৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

kafi-firozআরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিপিবিবাসদএরলেফট অ্যান্ড লিবারেল তত্ত্ব। বাসদ তাদের বর্তমান অবস্থানে উপনীত হওয়ার প্রস্তুতি যে আগেই সম্পন্ন করেছিল তার একটা বহিঃপ্রকাশ ছিল ২০১২ সালের নভেম্বরে ভ্যানগার্ডে প্রকাশিত বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট কাটাতে ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রামে এগিয়ে আসুন শীর্ষক একটি লেখা। ঐ লেখাতেই তারালেফট অ্যান্ড লিবারেলতত্ত্ব হাজির করেন। এর মাধ্যমে মূলত এ দেশে সাম্রাজ্যবাদের চিহ্নিত এজেন্টদের উদারপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সাথে ঐক্য গড়ার এক অজুহাত দাঁড় করানো হয়। বর্তমানে তাদের কর্মকাণ্ডও সেই পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছে। মাহমুদুর রহমান মান্না, কামাল হোসেন মতো চিহ্নিত দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর প্রতিনিধিদের সাথে নির্বাচনী রাজনৈতিক ঐক্য গঠন করাটা নিশ্চিতভাবেই কোনো বামপন্থী সংগঠনের জন্য মর্যাদা হানিকর। তাদের নিজেদেরই ঘোষিত বামবিকল্প গড়ার কর্মসূচি শিকেয় উঠিয়ে তারা লেফট অ্যান্ড লিবারেল তত্ত্ব দিয়ে মাঠে নেমেছেন। বামপন্থীদের মধ্যে ঐক্যের বিষয়টি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ; তা যতো সময়ই লাগুক, যতো ক্ষুদ্র ইস্যুতেই সেই ঐক্য হোক না কেন; তা তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ সিপিবিবাসদ সম্ভবত মিডিয়া পাবলিসিটিকেই অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে!

উল্লেখ্য, আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল ক্বাফী (কাফি রতন) এবং ঢাকা দক্ষিণে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলবাসদএর কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ সিপিবিবাসদ জোটের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন।

নির্বাচন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়

এখানে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি আসে কেবল মাত্র কৌশল হিসেবে। অর্থাৎ, সহিংস বলপ্রয়োগের লাইনকে সহায়তার জন্য প্রপাগান্ডামূলক কাজের অংশ হিসেবে আসে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়টি। নির্বাচন মানেই সংশোধনবাদ এমন ধারণাটাও কিন্তু গোড়ামীবাদী চিন্তারই বহির্প্রকাশ। বরং বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের সুচিন্তিত মূল্যায়নের মাধ্যমেই ফয়সালা করা সম্ভব নির্বাচন গ্রহণবর্জনের বিষয়টি। বাঙলাদেশে যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা জারি রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম অধিকারটুকুও তিরোহিত; যেখানে পুরো শাসনকাঠামো একব্যক্তিকেন্দ্রিক; যেখানে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সরকার, প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থা সর্বত্র চলে শাসকশ্রেণীর ক্ষমতাসীন অংশের দলীয়করণ আর লুটপাট; সেখানে নির্বাচনে যাওয়ার মানেই হলোসেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানো; ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দেওয়ারই নামান্তর। তা জাতীয় নির্বাচনই হোক; আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হোক। বরং বামপন্থীদের রাজনৈতিক কর্তব্য হওয়া দরকার ছিল, নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ও নির্বাচনকে বয়কট করা এবং এই আহবান নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া। অথচ তারা এখন নির্বাচনী হাওয়ায় উড়ছেন, শাসকশ্রেণীর উচ্ছিষ্ট্য ভোগ করার লালসা তারা ত্যাগ করতে পারেননি!

কেউ বা গ্রীসের সিরিজা পার্টির কথা বলতে পারেন। কিন্তু গ্রীস আর বাঙলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোকে এক করে দেখার কি কোনো সুযোগ আছে? সিরিজা পার্টির ইতিহাস থেকে জানা যায়, এটি কোনো এককেন্দ্রিক পার্টি নয়। বিভিন্ন পার্টি ও পার্টির গণসংগঠনের সমন্বয়ে তৈরী হয় একটি জোট; যা বিভিন্ন আন্দোলনসংগ্রামে নেতৃত্ব দান করে। এটি পরবর্তীতে পার্টি গঠনের দিকে এগিয়ে যায়। যেখানে বিভিন্ন মতাদর্শের সমন্বয় ঘটলেও সাধারণ একটি বিষয় ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। গ্রীসের আন্দোলন সংগ্রামের তীব্রতা এবং তার আর্থসামাজিক কাঠামো, তথা জনগণের মানসিক গঠনের কারণেই সেখানে নির্বাচনে যাওয়া আর বাঙলাদেশে নির্বাচনে যাওয়া এক কথা নয়। এ কারণেই এ দুটি ভূখণ্ডের বিপ্লবের স্তরও এক হবে না। গ্রীসে যেখানে বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক; সেখানে ঔপনিবেশিক, আধাঔপনিবেশিক বা বাঙলাদেশের মতো নয়াঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে এই বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্ত নয়াগণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক। প্রথম পর্ব হলো নয়াঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী শোষণ থেকে মুক্ত স্বাধীন ও নয়াগণতান্ত্রিক সমাজ গঠন; আর দ্বিতীয় পর্ব হলো এই বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর। বিপ্লবী কাজে নিযুক্ত রাজনৈতিক পার্টি, গ্রুপ বা ব্যক্তি, এই ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে তারা ক্রমেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

সংস্কার আর পরিবর্তনের মাঝে কিন্তু মোটা দাগের পার্থক্য রয়েছে। সংস্কার মানে সেই ব্যবস্থাকেই নতুন রূপে পুনঃনবায়ন করা, আর পরিবর্তন মানে নতুন ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা। যদিও চেঞ্জ বা পরিবর্তনের কথা বলেই শাসকশ্রেণীর তোষক দলগুলো জনগণকে নির্বাচনের নামে ধোঁকা দিয়ে থাকে দিনের পর দিন, কিন্তু আদতে এই ব্যবস্থার পুনঃনবায়নই তাদের আরাধ্য কর্ম! আর এজন্য কিছু গৎবাঁধা বুলি দেওয়া হয় সার্বভৌমত্বের নামে, অখণ্ডতার নামে, ধর্মের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে। যেই ব্যবস্থা স্বয়ং নিপীড়ক, স্বৈরাচারী, গণবিরোধী; তার গায়ে হাজারো তেল মালিশ করলে, হাজার রঙে রাঙালেও তার কোন গুণগত পরিবর্তন সম্ভব হ না। আর এ কারণেই কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের কথা বলার মানেই হলো শাসকশ্রেণীর দালালীর অন্যনাম। সাধারণ জনগণের এর মাধ্যমে কোনো ফায়দা হবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নাই।

বাঙলাদেশে কোনো কোনো বামপন্থী ভারতের আম আদমি পার্টির বিষয়টি সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু এই পার্টি একটা বিষয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, শাসকশ্রেণীর নিপীড়নে ত্যক্তবিরক্ত জনগণ বিকল্প খুঁজছে এটাই এদের নির্বাচনী সমর্থনের মূল উপজীব্য। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক যে, জনগণের সামনে সমাজ পরিবর্তনের, জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি সামনে তুলে ধরার এখন সময়; যা এই কথিত আম আদমিদের কাজ নয়। সাম্রাজ্যবাদপীড়িত নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান ব্যতিত গণতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী অবস্থানও অসম্ভব। আর এ কারণেই কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীদের অনুদানপ্রাপ্ত এনজিওবাদীদের পক্ষে গণতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী থাকাটাও সম্ভব নয়। তবে সাম্রাজ্যবাদ প্রদর্শিত শুয়োরের খামার সর্বস্ব গণতন্ত্রের লেবাসে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সেবাদাস বানানোটাই যদি হয়ে থাকে গণতন্ত্রের মানে, তবে তো ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে! আর ওই এনজিওবাদীরাও বিশাল বড় বিপ্লবী” – ঠিক যেমনটা আরেক কর্পোরেট সৈনিক নরেন্দ্র মোদি!

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্রও সবার জন্য সমান হয় না। যেমন, বাঙলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে শাসকশ্রেণীর অন্যান্য অংশ এই রাষ্ট্রের মালিকানা ভোগ করে, বা ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে শোষণ করে থাকে। এর বিপরীতে আমাদের কাছে জনগণের মানে হলো ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকশ্রেণী ও তার সহযোগীদের বাইরে যাদের অবস্থান। আর আমাদের নিকট গণতন্ত্রের মানেই হলো শ্রমিককৃষকমেহনতি জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব। সেই গণতন্ত্রের ক্ষমতা চর্চায় দালালদের কোন স্থান নেই এটাই নয়াগণতন্ত্র

ওই দালালবুর্জোয়া বা তাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের জীবনজীবিকার যে কোন উন্নয়ন সম্ভব নয়, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। তার পরেও যারা ওই দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর মাঝেই মন্দের ভালো খুঁজতে যান, আর সেই মন্দের ভালোতে নিজের মুক্তি খুঁজে বেড়ান, তারা সর্বোতভাবেই বিভ্রান্ত। তারা গড্ডালিকা প্রবাহে চলে ধাক্কা খেয়েই শিখবে বলে আশা রাখি। তবে কোন কোন রাজনৈতিকভাবে সচেতন বন্ধুপরিচিতজন তাদের বক্তব্যে কি করে এনজিওবাদীদের রাজনীতিকে বামপন্থীদের রাজনীতির সাথে মেলাচ্ছেন; কি করে দালালদের সাথে কোন বিপ্লবীকে তুলনা করতে পারেন; তা আদতেই মেলাতে পারিনি। এহেন কর্মকাণ্ড হয় উনার/উনাদের নির্বুদ্ধিতা, অথবা তার/তাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচায়ক। আশা করি, তারা অচিরেই নিজেদের বোধবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সঠিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পালনে ব্রতী হবেন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে অবদান রাখবেন।

বাঙলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো ও বিপ্লবী করণীয় সম্পর্কে কিছু কথা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্রগত বিশ্লেষণের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, সর্বোতভাবে এটি একটি নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। যেখানে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় অখণ্ডতার মতো শব্দসমূহ কেবল ব্যবহৃত হয় গণনিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে, মার্কিনের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ, তথা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যে, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বরে কর্পোরেটদের সৌজন্যে হরেক রঙের বাহারি অনুষ্ঠান আর তাদের দরদ উথলে ওঠা দেশপ্রেম। কর্পোরেটদের এ সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে তাদের পণ্যায়ন আর কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রচারপ্রসার।

উল্লেখ্য, এভূখণ্ডের উঠতি পুঁজিপতি; যারা মূলত দালাল বুর্জোয়া চরিত্রের পুঁজিপতি, তাদের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস একইসাথে এখানকার সর্বহারাশ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশেরও ইতিহাস। ব্যবসায়ী, জমিদার ও আমলাদের একাংশ যেমন বুর্জোয়াশ্রেণীর পূর্বগামী; তেমনি ভূমিহীন কৃষক, ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পীদের একাংশ ছিল সর্বহারাশ্রেণীর পূর্বগামী। নবজাত দুই সামাজিক শ্রেণী বুর্জোয়া ও সর্বহারা, তারা একই সঙ্গে পরস্পর সংযুক্ত এবং পরস্পরবিরোধী।

সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে এখানে যে দালাল বুর্জোয়াশ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে, তারা কর্পোরেট স্বার্থে প্রতিনিয়ত নানাকৌশলে ভূমি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে কৃষক জনগণকে দেউলিয়াতে পরিণত করছে। এতে তাদের আরেকটা ফায়দা হলো সহজ ও অধিকহারে নিম্ন মজুরির শ্রমিক উৎপাদন। উল্লেখ্য যে, এই বিপুলহারে শ্রমিক সৃষ্টি হলেও তা কিন্তু শক্তিশালী শ্রেণীরূপে গড়ে ওঠেনি। তবে তা শক্তিশালী শ্রমিকশ্রেণীতে কখনো পরিণত হবে না, এমনটিও নয়। আর এভাবে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ, এদেশে দুই ধরনের লোকজনের সৃষ্টি করছে সাম্রাজ্যবাদের অনুসরণকারী ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু একটা অংশ, দালাল বুর্জোয়াশ্রেণী; এবং এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, যার অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক জনগণ, শহুরে মধ্যশ্রেণী, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং এইসব শ্রেণীসমূহ থেকে আগত বুদ্ধিজীবীশ্রেণী। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যকার সকলেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের মিত্রশক্তি, তাদের মধ্য থেকেই সূত্রপাত হবে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের।

মোটা দাগে এখানকার শ্রেণীসমূহকে দুইভাবে ভাগ করা সম্ভব। একদিকে, গণনিপীড়ক শ্রেণী হলো এখানকার দালালবুর্জোয়া শাসকশ্রেণী, যারা সামরিকবেসামরিক আমলামুৎসুদ্দি পুঁজির ধারক, সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় সহযোগী এবং তাদের দোসরেরা যারা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ছলে, বলে, কৌশলে কাজ করে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস হিসেবে; সাথে রয়েছে তাদের শ্রেণীগত লুণ্ঠনতন্ত্র। অপরদিকে, ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের অন্তর্গত শ্রেণীসমূহ শ্রমিক, কৃষক, বিভিন্ন পেশাজীবী, মধ্যশ্রেণী ইত্যাদি; যারা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

বাঙলাদেশে যেহেতু জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটেনি, তাই এখানকার পুঁজিপতিশ্রেণী জাতীয় চরিত্রের নয়। বরং এই শ্রেণীটি ঐতিহাসিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস হিসেবে কাজ করেছে এবং করছে দালালবুর্জোয়াশ্রেণী। এখানে ভারী শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেনি। যে কল কারখানা গড়ে উঠেছে সেখানকার শ্রমিকদের মূলত ক্ষুদে কৃষক ও ভূমিহীন কৃষক অবস্থা থেকে শিল্পীয় শ্রমিকে রূপান্তর ঘটেছে। তাদের সংখ্যা ব্যাপক নয়, তারা বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালীও নয়। যে শ্রমিকদের আমরা ব্যাপকহারে অবলোকন করি, মূলত তারা গার্মেন্টস শ্রমিক; তাদের চরিত্র শিল্পীয় শ্রমিকের চরিত্র নয়। এদের অনেকের মাঝে ক্ষুদেবুর্জোয়া মানসিকতা ভীষণভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। শ্রমঘন এই গার্মেন্ট শিল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখানকার শ্রমিকদের চরিত্র শিল্পীয় শ্রমিকদের থেকে ভিন্ন। এমন ছোট ছোট শিল্পক্ষেত্র গড়ে তোলাটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, তথা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে এদের রূপান্তরও সম্ভব। তবে শক্তিশালী সর্বহারাশ্রেণী সংগঠনের পক্ষেই কেবল এই রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। এছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। এর বাইরে রয়েছে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর। ক্রমাগত উৎপাদকশ্রেণীর কাছ থেকে ফসলী জমি অনুৎপাদকশ্রেণী কাছে হাতে কুক্ষিগত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরশ্রেণী সর্বহারা হিসেবে বর্ধিষ্ণু। এই একই কারণে গার্মেন্ট শ্রমিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের সংখ্যাও বর্ধিষ্ণু। ভূমিহীন ক্ষেতমজুর সহ অন্যান্য ক্ষেত্র হতে আগত শ্রমিকশ্রেণীই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী শক্তি। এই বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীর প্রধান মিত্র হবে ভূমিহীন কৃষক। এছাড়াও এই বিপ্লবের অন্যতম মিত্রশক্তি হলো ক্ষুদে ও মাঝারি কৃষক, নিপীড়িত মধ্যশ্রেণী এবং ক্ষুদে বুর্জোয়া ও বৃহৎ কৃষকদের একাংশ। সেই সাথে এই বিপ্লবে মিত্র হিসেবে থাকবে সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদবিরোধী বিভিন্ন দল, গ্রুপ, সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। উল্লেখ্য, নয়াঔপনিবেশিক বাঙলাদেশে বিপ্লবের স্তর হলো নয়াগণতান্ত্রিক যা সমাজতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পরেই আসবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধাপ যার লক্ষ্য সাম্যবাদের দিকে।

নয়াগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কমরেড মাও সেতুঙ বলেন, জনগণের রাষ্ট্র জনগণকে রক্ষা করে। শুধু জনগণের রাষ্ট্র থাকলেই জনগণ সারা দেশব্যাপী ও সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দ্বারা নিজেদেরকে শিক্ষিত ও পুনর্গঠিত করতে পারবেন, স্বদেশি ও বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রভাব (যা এখনো খুবই জোরদার, যা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান থাকবে এবং যাকে দ্রুত বিনাশ করা যায় না) থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবেন, পুরোনো সমাজ থেকে প্রাপ্ত বদভ্যাস ও খারাপ মতাদর্শ দূর করতে পারবেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা নিজেদেরকে বিপথে চালিত হতে দেবেন না এবং অব্যাহতভাবে অগ্রসর হতে থাকবেন অগ্রসর হতে থাকবেন সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সমাজের দিকে।

শাসকশ্রেণীর রমরমা শোষণের ব্যবসা সঙ্গী আছে রক্তচোষা সুদখোর দালালেরা; যারা এদেশে সাম্রাজ্যবাদের পরীক্ষিত এজেন্ট। আরো রয়েছে সুশীল এজেন্ট, কর্পোরেট মিডিয়া, এনজিও; যারা শাসকশ্রেণীর নিপীড়নে পিষ্ট জনগণের বিদ্রোহী হয়ে ওঠাকে রুখতে সদাপ্রস্তুত। এদের সম্মিলিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মাঝেও শ্রমিক আন্দোলন, কানসাট, রূপগঞ্জ, ফুলবাড়ি, আড়িয়ল বিল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান ছাত্রআন্দোলন আমাদের জানান দেয় যে, জনগণকে এই সুশীলতার দোহাই দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আবার জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা সম্ভব যে, শক্তিশালী সর্বহারাশ্রেণীর সংগঠন, তথা কমিউনিস্ট পার্টির অবর্তমানে কোনো বুলিসর্বস্ব, নামধারী শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বে এসব আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না এবং পারেনিও। বরং এদের কেউ কেউ মুখে এসব আন্দোলনের পক্ষাবলম্বন করেও পরোক্ষভাবে এর বিরোধিতা করেছে, কখনো কালক্ষেপণ, কখনো বা ভ্রান্ত দিকনির্দেশনা, আবার কখনো ভণ্ড সুশীলতার ছলে। সর্বহারা নেতৃত্বই পারে দেশব্যাপী এই আন্দোলনগুলোতে একসূত্রে গ্রন্থিত করে তাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের আন্দোলনের অংশে পরিণত করতে। আর এখানে শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি না থাকায় এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, এখানকার প্রায় সব বাম দলই বিভিন্ন আন্দোলনে এসেছে নিজেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচিয়ে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আন্দোলনে তারা বরাবরই অনাগ্রহী।

কর্পোরেশন এবং তার পরিচালিত ও প্রভাবান্বিত রাষ্ট্রসমূহের ফ্যাসিবাদী নিপীড়ন বর্তমানে এতো তীব্রতর হয়েছে যে, পুরোনো ধাঁচের ট্রেড ইউনিয়ন বা নির্বাচনপন্থী শ্রমিকশ্রেণীর নামধারী দলগুলো কার্যকর সংগ্রাম পরিচালনা করতে ব্যর্থ। বরং এসময়ে কমিউনিস্ট নামধারী পার্লামেন্টারী দলগুলো নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ দালালে পরিণত হতে দেখা যায়। নিপীড়নের তীব্রতা ও দ্বন্দ্বসমূহের তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামীদের বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। আর এই বিপ্লবে কোনো সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য কোনো সংগঠন নেতৃত্ব দিতে সক্ষম নয়। বাঙলাদেশের মতো নয়াঔপনিবশিক দেশগুলিতে কমিউনিস্টদের কর্তব্য হলো সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তির জন্য বিপ্লবী লড়াই গড়ে তুলতে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর বিরুদ্ধে, বিপ্লবী পার্টি, সংগঠন, ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সর্বহারাশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা। সেই সাথে নতুন করে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য, যা এখন সময়ের দাবি।

এমতাবস্থায় বাঙলাদেশের বিপ্লবী মার্ক্সবাদী গ্রুপ ও ব্যক্তিবর্গের জন্য মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদএর মতাদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নাই। সেই সাথে মিত্র শ্রেণীসমূহের সাথে সমাজের বিভিন্ন স্তরে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে; যার লক্ষ্য হবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এভূখণ্ডের সমাজ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বিভিন্ন রকম দ্বন্দ্ব এখানে নিয়ত জন্ম নিচ্ছে। তবে কিছু মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে; যা অবশ্যই বাস্তবিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। নিম্নে তার উল্লেখ করা হলো

১। সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ফ্যাসিবাদী শাসকশ্রেণীর সাথে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব;

২। কৃষকের সাথে জোতদারঅনুৎপাদক ভূমি মালিকের দ্বন্দ্ব;

৩। সামরিকবেসামরিক দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর সাথে শ্রমিকশ্রেণীর দ্বন্দ্ব;

৪। ব্যাপক জনগণের সাথে

) কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব;

) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব;

) ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দ্বন্দ্ব;

৫। ফ্যাসিবাদী শাসকশ্রেণীর সাথে নিপীড়িত জাতিসত্তাসমূহের দ্বন্দ্ব।

আমরা জানি যে, সমাজে বহু দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকলেও কিছু দ্বন্দ্ব যেমন হয় মৌলিক চরিত্রের, যার মাঝে অন্যান্য দ্বন্দ্বসমূহের সমাধান নিহিত থাকে। তেমনি মৌলিক দ্বন্দ্বসমূহের মাঝে প্রধান দ্বন্দ্ব হলো এমন এক দ্বন্দ্ব যার মাঝে অন্যান্য মৌলিক দ্বন্দ্বসমূহের সমাধানের পথ নিহিত থাকে। উপরোল্লিখিত মৌলিক দ্বন্দ্বসমূহের মধ্যে প্রধান দ্বন্দ্ব হলো সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ফ্যাসিবাদী শাসকশ্রেণীর সাথে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব। উক্ত দ্বন্দ্বের মীমাংসা কেবল সম্ভব সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আর এর মধ্য দিয়ে অন্যান্য মৌলিক দ্বন্দ্বসমূহও মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হবে।

দুই.

কোনো সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তার শিক্ষাব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তা সমাজের মেরুদণ্ড স্বরূপ। সমাজ বিকাশের সাথে সাথে সেই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থাও বিকশিত হয়। উৎপাদন ব্যবস্থা যদি গণমুখী হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে গণমুখী। অপরদিকে, যদি এই উৎপাদনব্যবস্থা গণমুখী না হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে তার অনুরূপ। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ পীড়িত বাঙলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা নয়াঔপনিবেশিক হওয়ায়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাও ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করেছে ও করছে। যার মূল উদ্দেশ্য কেবলই মুনাফা অর্জন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর কর্পোরেট দাস উৎপাদন। এই ব্যবস্থা ক্রমেই মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে, যা শাসকশ্রেণী এবং কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। এর সঙ্গে মিশেছে কর্পোরেট সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিকৃতি। এই শিক্ষাব্যবস্থার ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাশ করতেই শেখাচ্ছে, নৈতিক গুণাবলী বৃদ্ধিতে যার ভূমিকা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে দিনদিন আত্মকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাদের মামাটিমানুষ নিয়ে ভাবনার চেতনাটুকুও অবশিষ্ট থাকে খুব সামান্যই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নয়া কর্পোরেট মোড়কে গ্রাস করেছে, করছে আমাদের সংস্কৃতিকে।

নয়াঔপনিবেশিক বাঙলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় শোষকরা জনগণের ওপর যে নিপীড়ন চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে করে এখানকার সংস্কৃতি ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়েছে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এবং সংস্কৃতিকর্মীবৃন্দ ও বিভিন্ন পেশাজীবীরাই বিশেষ করে দুর্ভোগে ভুগছেন। সাম্রাজ্যবাদী ও শোষকশ্রেণীর নিপীড়ন থেকে মুক্ত নয়াগণতান্ত্রিক বাঙলাদেশ গঠনের জন্য দরকার বিরাট সংখ্যক শিক্ষক, নিবেদিতপ্রাণ বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও অজস্র সংস্কৃতিকর্মী। তাদের জনগণের সেবায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বুদ্ধিজীবীদের সমস্যাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘকাল যাবৎ ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে থাকা ও এখানকার উঠতি বুর্জোয়ারা ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদীদের দালালে পরিণত হয়ে দালাল বুর্জোয়াশ্রেণী গড়ে ওঠার কারণে এখানকার বুদ্ধিজীবীদের প্রধানাংশ ব্রিটিশ আমল থেকেই সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গেয়ে যাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী নয়াঔপনিবেশিক শাসনশোষণে নিষ্পেষিত হতে হতে জনগণের বৃহদাংশের চিন্তাচেতনায় আপোষকামিতা, আত্মসমর্পণবাদিতা, আত্মসর্বস্ব ভোগবাদী ভাবধারা প্রবলভাবে আধিপত্য করছে। ফলে শাসনশোষণ নির্যাতনের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আমাদের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত কর্পোরেট সংস্কৃতির চর্চা করা হচ্ছে। গণঅধিকার সচেতনতাকে আচ্ছন্ন করে আত্মকেন্দ্রিকতাকে উসকে দেয়া হচ্ছে। শ্রেণী চেতনাকে ভোঁতা করতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। রাষ্ট্র ধর্ম আর উগ্রবাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে শাসকশ্রেণীর মনগড়া ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি।

এতদসত্ত্বেও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সর্বদাই জনগণের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। এদের উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিশ্চিত করাটা জরুরি। সকল দাসত্বমূলক মনোভাবসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট ও ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ও দৃঢ় বিকল্প শিক্ষাদানের সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। যে সংগঠন সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে শিক্ষিত করে তুলবে।

বাঙলাদেশের জনগণের সংস্কৃতি ও শিক্ষা হবে নয়াগণতান্ত্রিক। বিদেশি সংস্কৃতিকে দূরে সরিয়ে রাখাটাও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ না করে, তার প্রগতিশীল অংশটুকু অবশ্যই গ্রহণ করে নতুন সংস্কৃতির বিকাশে ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে দেশীয় সংস্কৃতিকেও ঢালাওভাবে খারিজ বা অনুকরণ না করে বিচারসাপেক্ষে পশ্চাদপদ অংশকে নতুন সংস্কৃতি থেকে ছেঁটে ফেলে বাকিটুকু গ্রহণ করে নতুন সংস্কৃতির বিকাশে কাজে লাগাতে হবে। এখানকার দেশীয় সংস্কৃতিতে শত শত বছর ধরে চলমান রয়েছে নারীর জন্য অবমাননাকর পুরুষতান্ত্রিক উপাদান, যা নতুন সংস্কৃতিতে স্থান পেতে পারে না। নয়াসংস্কৃতিতে নারীর ক্ষমতায়ন, তার সক্ষমতা অর্জনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ বা তার স্থানীয় দোসররা নারীর ক্ষমতায়নের নামে নারীর যে পণ্যায়ন পরিচালিত করে, তা হবে এর থেকে ভিন্ন। নারীর সমান সুযোগ সৃষ্টি ও সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিক চেতনা দূর করাটাই মূল কাজ। সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা বজায় রেখে নারীর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। নয়াসংস্কৃতির অবস্থান হবে সকল প্রকার পুরুষতান্ত্রিক উপাদানের বিরুদ্ধে।

এ দেশে চলমান কর্পোরেট সংস্কৃতি রোধের জন্য প্রয়োজন নয়াসাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা মুক্তচিন্তার বিকাশে, চেতনাগত মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কর্পোরেট সংস্কৃতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, পুরুষতন্ত্র, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা, পশ্চাদপদ চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনগণের সংস্কৃতিকে লালন করে তাকে বিস্তৃত করতে হবে। আমাদের বিস্মৃতপ্রায় লোকজ শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি, যা জনগণের লড়াই সংগ্রামের স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শাসকশ্রেণীর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির বিপরীতে জনগণের সাংস্কৃতিক আন্দোলনই আমাদের সাহসী ভূমিকা নিতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের মানস গঠনে সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নাই। আমাদের অতীত ইতিহাস সেই শিক্ষাই দিয়ে থাকে।

শাসকশ্রেণীর বর্তমান ক্ষমতাসীন অংশ চাইছে, যে কোনো প্রকারে হোক, ক্ষমতায় টিকে থাকতে। আর এতে তাদের মূলত কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। টিকফা চুক্তি, গ্যাজপ্রমএর পেট্রোবাঙলা দখল, অস্ত্রচুক্তি, করিডোরটেলিকরিডোর, বন্দীবিনিময়, খনিজ সম্পদের উপঢৌকন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ; এসবই এখানকার ক্ষমতাসীন সেবাদাসদের আনুগত্যের নিদর্শন; যার ফলে তারা কথিত গণতন্ত্রের নির্বাচনের খোলসটি ছুঁড়ে ফেলেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছে। শাসকশ্রেণীর ক্ষমতাবঞ্চিত অংশও একইভাবে নিজেদের আনুগত্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কায়দায় প্রকাশ করেছে ও করছে। বর্তমান চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও তাদের উভয় অংশই সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। অপরদিকে, এখানে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে চক্রান্ত আখ্যা দেওয়া হয়, নিত্যনতুন আইন করে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অবরুদ্ধ করা হয়; এমনকি একে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের অন্তর্গতও প্রমাণ করা হতে পারে! উল্লেখ্য, বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণীর সাম্রাজ্যবাদী প্রভু মার্কিন প্রশাসন গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ সমাবেশকেও সরকারিভাবে নিম্নমানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছে।

যেখানে নিপীড়িতের বিরুদ্ধে সকল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জায়েজ, সে বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, যে জাতিসত্তারই হোক না কেন। সেই সাথে রয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। অন্যান্য জাতিসত্তাকে বাঙালিত্বের নামে কর্পোরেট সংস্কৃতির অংশীদার করে নেওয়াটাই যার লক্ষ্য। উল্লেখ্য, ভাষার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে যুক্ত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম। আর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার ছাড়া আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বুলিটুকুও এক আধিপত্যবাদী মানসিকতাকেই ধারণ করে মাত্র। আর এই অধিকার আদায়ের জন্য দরকার নিপীড়িত শ্রেণী ও জাতিসত্তাসমূহের ঐক্যবদ্ধ তীব্র লড়াইসংগ্রাম। যার অনুপস্থিতিই এই শোষণকে তীব্রতর করছে।

বিবিধ কৌশলে কর্পোরেশনগুলো প্রতিনিয়ত বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন চালাচ্ছে। তারা এখন কেবল অস্ত্র হাতেই আক্রমণ করছে না। বরং এর থেকে বড় আঘাতটা তারা হানছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে। যার আঘাতে সামাজিক মানুষের চিন্তাধারাটুকুও তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হচ্ছে। মানুষ বাঁচে তার চিন্তার মাঝে। আর যখন সেই চিন্তাটাকেই মেরে ফেলা যায়, অথবা দিকভ্রান্ত করে দেওয়া সম্ভব হয়, তখন আর যাই হোক, তা আর সেই একই মানুষ থাকে না। অর্থাৎ, বস্তুর গুণগত পরিবর্তন সাধনের পর তা আর পূর্ববর্তী বস্তু থাকে না, সৃষ্টি হয় এক নতুন বস্তুর। এমন আমূল পরিবর্তন যখন কর্পোরেশনের স্বার্থে সংঘটিত হয়, তখন তা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী নয়াউপনিবেশবাদের জন্ম দিয়ে থাকে। আবার যখন তা মানব মুক্তির উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক চেতনায় সংঘটিত হয়, তখন তা সর্বহারা বিপ্লবের সূচনা করে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s