পহেলা বৈশাখ :: সর্বজনীনতাহীন উৎসবে বিকৃতি এবং লুণ্ঠকদের নতুন সংষ্কৃতি নির্মাণ

Posted: এপ্রিল 14, 2015 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

Pohale_Boishakh-2প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৪ বছরে বাঙালি সংষ্কৃতি কি স্বাধীন হয়েছে? বাঙালি সংষ্কৃতি কি মুক্ত হয়েছে নাকি বিলুপ্ত হয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান এই জন্য জরুরী যে, সমাজের গতিপ্রকৃতির রূপটি সংষ্কৃতির মধ্যদিয়েই প্রতিফলিত হয়প্রচারিত এবং মধ্যবিত্তের মধ্য থেকে প্রতিফলিত সংষ্কৃতি শাসকশ্রেণীর চরিত্রের প্রকৃতিটিকেও প্রতিফলিত করে

সংষ্কৃতি কোন স্থির বা বদ্ধ বিষয় নয়সময়ের সাথে সাথে সংষ্কৃতির বদল ঘটেসমাজে বিরাজমান শ্রেণীসমূহের আর্থসামাজিক রূপটি বদলের পিছনে পিছনে সংষ্কৃতির রূপটিও বদলাতে থাকেএর মধ্যে শাসকশ্রেণীর সংষ্কৃতিটাই সমাজের উপরের স্তরে বিরাজমান থাকে এবং প্রচারিত হয়অপরদিকে ব্যাপক অধিকাংশ হলেও শোষিতবঞ্চিতদের সংষ্কৃতি তাদেরই মত উপেক্ষিত হয়

বাংলাদেশে শাসকশ্রেণী বলে যে শ্রেণীটি আবির্ভূত, তার কোন ধারাবাহিক গঠন নেইজনগণের লড়াইয়ের মদ্যদিয়ে বিদেশি শাসনের অবসানের মধ্যদিয়ে ক্ষমতাসীন হয়ে হঠাৎ করেই এই শ্রেণীটির আবির্ভাব হঠাৎ আবির্ভূত লুণ্ঠনের কাঁচা গন্ধ মাখা গঠনহীন এই শ্রেণীটি কদাকারভাবে বিশৃঙ্খলবিশেষ করে এই শ্রেণীটির মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকারী অংশের চোখে এর কদাকার রূপটি বেমানানই মনে হয়এই রূপটি ঢাকার জন্য এক ধরণের সাংষ্কৃতিক লেবাসের তাগিদ এদের ভিতর থেকেই তৈরী হয়এই শ্রেণীটির শোষণলুণ্ঠনকে সমাজের ভিত্তিমূলে মিশিয়ে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য এই সাংষ্কৃতিক লেবাসটিকে অবশ্যই “বাঙালি সংষ্কৃতি”র নামেই হতে হয়কিন্তু এরা শেকড়ের টানের কথা যতই বলুক, অর্থাৎ যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই শ্রেণীটির মধ্যে সৃষ্টি হয়, তাতে এদের পক্ষে কথিত ‘শেকড়ের টানে’ এদের দ্বারা কথিত ‘বাঙালি’ সংষ্কৃতির মধ্যে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়

সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ এবং আর্থসামাজিক গতি প্রকৃতির প্রবাহের মধ্যদিয়ে সংষ্কৃতিও বিকশিত হয়ে পরিবর্তিত হয় সেটাই এক স্বাভাবিক ব্যাপারসংষ্কৃতি হলো বৃক্ষের মতবৃক্ষ যেমন তার অঙ্গউপাঙ্গের চিহ্ন রেখে ডালপালাফুলেফলে বিকশিত হয়, সংষ্কৃতিও তেমনইতাই সমাজের স্বাভাবিক বিকাশে সংষ্কৃতি রক্ষার ভার বা দায় কোন শ্রেণীর বা গোষ্ঠীর ওপর বর্তায় নাকিন্তু যখনই কোন গোষ্ঠী বা শ্রেণী সংষ্কৃতি রক্ষার ধূয়ো তোলে, তখন তার একমাত্র কারণ এটাই যে, সমাজের বিকাশ কোন স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না

হঠাৎ প্রাপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই শ্রেণীটির জীবন যাপনে এবং ব্যবহারিক সংষ্কৃতিতে যে পরিবর্তন আনে তার মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং সামঞ্জস্যহীনতা থাকেএই সামঞ্জস্যহীনতা সব সময়ই তাদেরকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়তারা পরিচয় সংকটে ভুগতে থাকেভিতরের পরিচয়হীনতার সন্দেহের শূন্যতাই তাদের মুখ থেকে “সংষ্কৃতি রক্ষার” শব্দ হয়ে নিঃসৃত হয়শুধু নিঃসৃতই হয় না, তাদের মত করে একটি “বাঙালি” সংষ্কৃতি নির্মাণ তাদের নিজেদের পরিচয় সংকটের কারণে অনিবার্য হয়ে ওঠেকিন্তু সংষ্কৃতি তো আর হঠাৎ নির্মাণ করা যায় নাকার্বাইড দিয়ে ফল পাকানো যেমন বিকৃতি “সংষ্কৃতি রক্ষার” নামে হঠাৎ সংষ্কৃতি নির্মাণও তেমনই বিকৃতি

পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন বাঙালির জীবনে আগেও কোন আনন্দের বিষয় ছিল না এখনও নেইতবে আগে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে যে গ্রামীন মেলা অনুষ্ঠিত হতো এখন তা অনেক কমে গিয়েছেঅনেক মেলাই আর অনুষ্ঠিত হয় না এর কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনেতিক ব্যবহারিক সংষ্কৃতির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরী করেছে তার সাথে এই সব মেলা খাপ খাওয়াতে পারেনি“বাঙালি”র ঐতিহ্য বলে কথিত অনেক পেশাও একই কারণে বিলুপ্ত হয়েছেআর্থসামাজিক স্বাভাবিক বিকাশের মধ্যদিয়ে যেসব সংষ্কৃতি এবং ঐতিহ্য বিকশিত হয়ে পরিবর্তিত হতে পারত অসামঞ্জস্যতার কারণে সেসবের অনেক কিছুরই বিলুপ্তি ঘটেছে

পহেলা বৈশাখকে শাসক শ্রেণীর লোকেরা এবং বুদ্ধিজীবীরা একধরণের বিকৃত খাদ্য সংষ্কৃতিতে পরিণত করেছেপহেলা বৈশাখ এ ধরণের কোন খাদ্য সংষ্কৃতির মধ্যে ছিল না তবে বছরের নতুন দিন উপলক্ষে বাসিপান্তা খাওয়ার কোন চল ছিল নাসামর্থ্য যাদের ছিল তারা বাসিপান্তা খেত না তবে ব্যাপক অধিকাংশ গ্রামীন জনগণ সবদিনের মতই সেদিনও পান্তা খেত এই খাওয়া কোন সুখেরও নয়, কোন ঐতিহ্যও নয় যা মানুষ না পেরে বাধ্য হয়ে করে তা কখনোই ঐতিহ্য নয়ইলিশ পান্তাকে এখন যেভাবে বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে তা কখনোই ঐতিহ্য ছিল নাপহেলা বৈশাখে পান্তাইলিশের সংষ্কৃতি হঠাৎ অর্থপ্রাপ্তির ফলে ব্যবহারিক সংষ্কৃতিতে পরিচয় সংকটে পড়া বাঙালির নতুন আবিষ্কারএটা যে অবৈধ লুণ্ঠন অর্থপ্রাপ্তিযোগে নতুন আবিষ্কার, তার প্রমাণ মেলে এ উপলক্ষ্যে তাদের বাজার সন্ত্রাসের মধ্যদিয়েএ যেন লুটের অর্থের সৃষ্ট বৈষম্য প্রদর্শনের এক “বৈধ” দিনএরা যখন একটি ইলিশ মাছ দশ হাজার টাকায় ক্রয় করে, তখন একে বাজার সন্ত্রাস ছাড়া আর কি বলা যায়? সেখানেও কথা আছে এরা একটি ইলিশ কিনছে না সে জন্য বিক্রেতারাও একটি ইলিশের দাম বলে না তারা দাম বলছে প্রতি হালি পঞ্চাশ হাজার টাকা বা ষাট হাজার টাকা! বিকৃত অর্থনীতি কিভাবে বিকৃত সংষ্কৃতির জন্ম দেয়, এ হলো তারই উদাহরণ বিকৃত লুটেরা তঞ্চক অর্থনীতি ধর্মীয়, জাতিগত, সামাজিক সকল ধরণের সংষ্কৃতিকেই বিকৃত করেতাই মাত্রাহীন অর্থনৈতিক বৈষম্য রেখে সর্বজনীন সংষ্কৃতির কথা বলা ভন্ডামির মাধ্যমে সাংষ্কৃতিক বিকৃতিকেই বহন করা ছাড়া আর কিছু নয়

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s