লিখেছেন: আহমেদ মহিউদ্দিন

felani-21গত ৭ জানুয়ারী ২০১৫ ছিল বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের ১৫ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানিকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের চতুর্থবর্ষ। ফেলানি একটা নাম, যা ২০১১ সালের ৭জানুয়ারী বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত কর্তৃক ঘৃণ্য মনোভাবের করুণতম চিত্র প্রকট করেছিল। সারা বিশ্ববাসীর সামনে এই ঘটনা উলঙ্গভাবে প্রকাশ পেলেও এর এখনও পর্যন্ত হতাশাজনক খবর হচ্ছে ভারতীয় আদালত কর্তৃক খুনি বিএসএফ সদস্যের বিরুদ্ধে কোন প্রমান না পাওয়ার অজুহাতে বেকসুর খালাস প্রদান। যদিও ফেলানির বাবার আপত্তির মুখে এই খুনের মামলার পূণরায় রিভিশন চলছে।

ভারতের মত দেশ, যেখানকার গণতন্ত্র, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের দেশের এনজিওজীবী সুশীলদের মধ্যে এমনকি অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে ভক্তিভাব লক্ষ্য করা যায়। এই ভক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তারা সে দেশের প্রভাবশালী অভিনেতা সালমান খাঁনের অবৈধ হরিণ শিকারের দায়ে শাস্তি পাওয়ার ঘটনাসহ অন্য কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে থাকেন। বর্তমানে তারাও বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশীদেরকে হত্যা ও সেই হত্যার দায়ে আজ পর্যন্ত কোনো হত্যাকারীর বিচার না হওয়ার ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করেন।

শুধু ফেলানি নয়। গত ২০০০ সালের পর আজ পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রায় এক হাজারের উপর বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে সীমান্তে। শুধুমাত্র জানুয়ারী ২০০০ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই ৭ বছরে বিএসএফ ও তাদের সাথে স্থানীয় চোরাকারবারী গুণ্ডারাপাণ্ডারা মিলে সর্বমোট ৬০৭ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বাংলাদেশ সীমানার অভ্যন্তরে। ভিতরে ঢুকে খুন অপহরণ গ্রেফতার জিনিসপত্র কেড়ে নেয়া এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত বিএসফ সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়। সীমান্তের কৃষকরা জমিতে কাজ করা কালে জেলেরা মাছ ধরা কালে ও অন্য নানা প্রয়োজনে হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের শিকার হওয়া সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অথচ হত্যাকাণ্ডের প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনার ব্যপারে ভারতীয় কতৃপক্ষ মিথ্যা বলে থাকেন যে, তারা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে উপায়ান্তর না পেয়ে গুলি চালিয়ে থাকেন। এই সকল ঘটনার ব্যপারে পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্ট পাওয়া যায় তাতে আরো দেখা যায়, প্রায় সময়ই ভিক্টিমগণ গরু নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার সময় বিএসএফ জওয়ানদের হাতে এবং সাথেই থাকেন, এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে বনিবনা না হলে এক পর্যায়ে তারা বেধড়ক পিটুনির শিকার হন, এতে প্রায় সময় তারা মারা যান। সবচেয়ে আশ্চর্য ও হতাশাজনক ব্যাপার হচ্ছে এব্যপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ একই সুরে কথা বলেন অথবা নিরব থাকেন, বড়জোর সীমান্তে একটা ফ্লাগ মিটিং করে লাশ ফেরত দিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করে থাকেন।

পৃথিবীতে সীমান্ত সমস্যা অনেক দেশেই আছে, কিন্তু এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশীদেরকে যেভাবে হত্যা করা হয়, তা করে পার পেয়ে যেতে পারে। এমনকি দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রতিপালিত ইসরাইলিরা পর্যন্ত যথাক্রমে প্রতিবেশী মেক্সিকান ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যা করে থাকে তা আমাদের মত এত ভয়াবহ নয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ভারত বর্তমানে গড়ে প্রতি চারদিনে একজন বাংলাদেশীকে হত্যা করে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের সাথে যে আচরণ বিএসএফ করে থাকে, তার শতভাগের একভাগও এই বাহিনী তার অন্য প্রতিবেশী চীন, পাকিস্তান বা মিয়ানমারের সাথে করার সাহস দেখায় না।

ভারতবর্ষ পৃথিবীর বুকে এক বহু জাতী গোষ্ঠী ধর্ম বর্ণ জাতপাতের মানুষের আবাসভূমি সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে। জাতপাত ছুতঅচ্ছুত ও বর্ণ প্রথা এখানকার বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক জীবনের সাথে ধর্মীয় বিধানসমূহের মাধ্যমে সেই প্রাচীনকাল থেকে জড়িয়ে রয়েছে। এর বিরুদ্ধে এখানকার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসও প্রাচীন। হালে ১৮০০ শতকে ইংরেজ বণিকগণ মোগলদের হাত থেকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং পর্যায়ক্রমে ভারতবর্ষের জনগণের উপর নিজেদের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের জনগণের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব পতিষ্ঠা করার প্রয়োজনে ইংরেজরা এমন সব নীতি ও কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয় যার সাথে তাদের পূর্বেকার শাসক মোগলদের শাসনের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। ইংরেজদের সাথে মোগলদের শাসনের মোটা দাগে পার্থক্য হল; ইংরেজদের শাসন আকাঙ্খার পুরোটাই ছিল বানিজ্যিক, কিন্তু মোগলদের বেলায় রাষ্ট্র শাসনের আকাঙ্খার সাথে যুক্ত ছিল একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় আদর্শের বাস্তবায়ন, এবং সেই আলোকে নীতি প্রণয়ন। কোনো প্রকার আদর্শিক নীতি বিবর্জিত ইংরেজ বণিকগণ শুধুমাত্র নিজেদের বানিজ্যিক কারনে শাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে যা যা নীতি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়েছে তার সবই করেছে, এর মধ্যে বহুল প্রচলিত নীতি হলো এদেরকে “ভাঙো এবং শাসন করো”। অর্থাৎ প্রধানত হিন্দু মুসলমান শিখদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে সব সময় ভারতবাসীর নিজেদের মধ্যে একটা বৈরী অবস্থা তৈরী করে উভয় পক্ষকে নিজেদের পকেটে রাখার ব্যবস্থা করা, অবাধ্য হলে কৌশলে শায়েস্তা করা। সেই ইতিহাস যারা জানেন তারাই সম্মক উপলব্ধি করতে পারবেন সেই প্রক্রিয়ায় ইংরেজরা এখানে দেখিয়েছে ভারতবর্ষের দ্বীনদরিদ্র মানুষের জীবনের মূল্য কত সস্তা! শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ শাসনের অবসান সময়ে ১৯৪৭ সালের আগে পরে তিনপক্ষ, ইংরেজ বণিক, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে পৃথিবীর ইতিহাসের অদ্বিতীয় জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড নারী ধর্ষণ লুটপাট অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মত অমানবিক পরিস্থিতি তৈরী করে, এবং তার উপর দাঁড়িয়েই এখানে হিন্দু মুসলিম দুটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষের মানুষের জীবনে অশান্তিকে আপাত চিরস্থায়ী রূপ দেয়। এর ব্যাপকতা এত সুদুরপ্রসারী যে যার জের ধরে আজও পর্যন্ত ভারতবর্ষের মানুষ নিজেদের জীবনের বঞ্চনার মৌলিক প্রশ্ন বাদ দিয়ে হিন্দু মুসলিম ও অন্য নানা ধর্মীয় পরিচয়ের কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দের দাবার ঘুঁটি হিসাবে জড়িয়ে পড়ে।

একজন ব্যক্তি মানুষের, এমনকি কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের সম্মিলিত বাসিন্দাদের জীবনে হিন্দু মুসলিম বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হওয়া তার বা তাদের জীবনের মৌলিক আর্থনীতিক কোনো সমস্যার সাথে সম্পর্কিত নয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার নামে ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলিমদের জন্য দুটি আলাদা রাষ্ট্রের পত্তনকালে ইংরেজ শাসকগণ কংগ্রেস ও মুসলীগের সম্মিলিত সহায়তায় এখানে কৃত্রিমভাবে যে দ্বন্দ সৃষ্টি করে, তার দ্বারা প্রায় পাঁচ লক্ষ হিন্দু মুসলিম শিখ নরনারীকে হত্যা ও প্রায় চৌদ্দ লক্ষ্য হিন্দু মুসলিম শিখ সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। একে অপরের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও নারী ধর্ষণ হত্যাকাণ্ড ও ভিটেমাটি ছাড়া করার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া এর ভয়ংকরতম চরিত্র সম্মক উপলব্ধি করা সম্ভব কিনা জানিনা। সেই সময় ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ডের শিকার এই সকল নির্দোষ অসহায় মানব শবগুলিকে দাহ বা সমাধিস্থ করার কোন মানুষ ছিল না। সেই দিনগুলিতে ভারত বর্ষের বিভিন্ন শহরে দিনের বেলাতেও অন্ধকার মনে হতো, মানুষের গলিত শব শিয়াল কুকুর ও শকুনে খেত। বলা বাহুল্য ধর্মের নামে এই হত্যাকাণ্ড, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ ও সামগ্রীক ভয়বহতা সমৃদ্ধ পরিস্থিতি দ্বারা এখানকার ইংরেজ বণিক, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কর্ণধারেরাই বানিজ্যিকভাবে সুদুরপ্রসারী লাভবান হন, তাদের অনেকেরই নিজেদের জীবনের সাময়ীক বিয়োগান্তক ঘটনাবলী সত্বেও।

১৯৪৭ সালের কৃত্রিমভাবে তৈরী করা সাম্প্রদায়ীক ভিত্তিতে দেশভাগের ঘটনা ভারতবাসীর জীবনের পরবর্তী দিনগুলিতে কী ধরনের পরিণতি সৃষ্টি করেছে আজও আমরা তার মাশুল তিলে তিলে গুণে চলেছি। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক ভাঙন প্রক্রিয়া যা এখানকার মানুষের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনকে অতিক্রম করে একেবারে ব্যক্তি জীবন পর্যন্ত ব্যপ্ত। ভারতবর্ষের মত এত বড় একটা দেশে যেখানে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় সকল জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে হিন্দু মুসলিম শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করেন। তাদের ধর্ম ও জানমালের হেফাজতের প্রশ্নে দুই পাশে দুটি আলাদা ভূখণ্ড তৈরী করে দিয়ে যে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় এই বোধ যে এই কর্মের কারিগরদের জানা ছিলনা তা ছাগল গরুতেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু ১৯৪৭ এর পর আজ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ের অভিজ্ঞতার পর এখানকার ভুক্তভোগী জনগণের চেতনার স্তর এব্যাপরে কোন পর্যায়ে তা নিরুপণের বিষয়। আগেই বলেছি মানুষের জীবনে ধর্ম পরিচয় কোনো মৌলিক তো নয়ই এমনকি সমস্যাই নয়। নিজেদের শোষণ শাসনের প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে তৈরী করা এই দ্বন্দের উপর ভর করে ষড়যন্ত্রকারীরা এমনভাবে এই কাজটা করেছে যাতে কোনদিনই এই ভূখণ্ডে কোনো শান্তি ও স্থিতি স্থায়ী রূপলাভ না করতে পারে। মানুষের জীবনের সমস্যা মিটে গেলে বণিকদের জন্য বানিজ্যিক লোকসান। কাজেই পরিকল্পিতভাবে তারা এমনভাবে দেশটা ভাগ করলো তা এখানকার মানুষের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী আর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বুকের মাঝখান দিয়ে কেটে আলাদা করে দেয়ার সামিল। বলাই বাহুল্য সেটা একটা অবাস্তব ও অসম্ভব ব্যপার। কিন্তু ইংরেজ বণিকগণ তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় স্বজ্ঞানে সুস্থ মস্তিষ্কে সেই কাজটাই করেছে।

বর্তমানে দক্ষিণের সমুদ্র ছাড়া ডানে বাঁয়ে উপরে তিন দিক থেকে চার হাজার ছিয়ানব্বাই কিলোমিটার শক্তিশালী কংক্রিট ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ভারতীয় সীমান্তের মধ্যে আমাদের বসবাস। পর্যায়ক্রমে তারা কাঁটাতারের এই বেড়াকে ইলেক্ট্রোফাইড করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। হাজার বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যবাহী একটা জাতীকে শাসনের প্রয়োজনে মনস্তাত্বিকভাবে কৃত্রিম ভাঙন সৃষ্টি করে তার বুকের মাঝখান দিয়ে হাই ভোল্টের ইলেক্ট্রোফাইড কাঁটা তারের বেড়া পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয়টা আছে বলে আমার জানা নেই।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s