হিন্দি ভাষা-শিক্ষার পক্ষে শিশির ভট্টাচার্য্যের ওকালতি

Posted: ফেব্রুয়ারি 25, 2015 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

cultural-aggressionদৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত গতকালকের (২০ ফেব্রুয়ারি) এক নিবন্ধে শিশির ভট্টাচার্য্য লিখেছেন: শৈশব আর বাল্যকাল হচ্ছে ভাষা শেখার আসল বয়স। …. জনসংখ্যার অতিবৃদ্ধির কারণে বাঙালি জাতি ধীরে ধীরে সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। হিন্দিউর্দু জানলে উপমহাদেশের অন্য দুটি দেশে কাজ পেতে, সেখানে গিয়ে সেখানকার জনগণের সাথে মিশে যেতে সুবিধা হবে। হিন্দি শিখে নিলে আখেরে বাঙালির লাভ ছাড়া ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বলিউডের কল্যাণে বাঙালিসহ উপমহাদেশের প্রায় সব জাতির বিনোদনের ভাষায় পরিণত হয়েছে হিন্দি। যাঁরা হিন্দি বুঝবেন না, তারা বিনোদনের একটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। কর্তৃপক্ষ হিন্দিতে ডাব করা জাপানি ডোরেমন বাদ দিতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে কোন বিনোদন দেবে শিশুদের? [বাংলা ভাষার প্রকৃত সমস্যা ও এর প্রকৃত সমাধান, ২০/০২/২০১৫]

সাধারণভাবে ধরলে হিন্দি কেন, পৃথিবীর কোনো ভাষাশিক্ষার ওপরই কোনোপ্রকার বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়। উপরন্তু বিভিন্ন ভাষা শিখলে যেকোনো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সামনেই অর্থনীতিরাজনীতিসংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিকাশ ও উন্নতিলাভের সুযোগ খুলে যায়। কিন্তু ভাষাশিক্ষার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট ভাষার প্রতি ওকালতির তাৎপর্য অনুধাবন করাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা যখন আধিপত্যের বাহন হয় তখনই সেই ভাষা আয়ত্ত করার নামে এ ধরনের উদ্ভট যুক্তির অবতারণা করার জন্য ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দ্যায়।

সাম্রাজ্যবাদ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়, কিংবা এটা একটি দেশ কর্তৃক আরেকটি দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসনের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। একে বুঝে নিতে হয় সামরিকবেসামরিক আধিপত্য, সম্পদের ওপর দখলদারিত্ব, জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও সংস্কৃতিগত প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিরব আধিপত্যকারী ভূমিকার দ্বারাও। ভারতীয় বড় পুঁজির সেবক সে দেশের শাসক গোষ্ঠী নিজেদের পুঁজিস্বার্থে শুধু ভারতের বিভিন্ন প্রদেশই নয়, পার্শ্ববর্তী বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ওপর তার সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। এ কাজ করতে গিয়ে তাকে নিজস্ব ধরনে সৃষ্ট তথাকথিত সংস্কৃতিরও প্রসারপ্রচারে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হচ্ছে। হিন্দি ভাষা এবং সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধশালী। এ ভাষায় সাহিত্যসঙ্গীতের ভাণ্ডার বিপুল, এবং এ কথা ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু ভারতীয় পুঁজিবাদ তার নিজস্ব পুঁজির বিকাশের স্বার্থে হিন্দি ভাষাকে পরিণত করেছে আধিপত্যের হাতিয়ারে। মুম্বাইকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র শিল্প (‘industry’ অর্থে) এই ভাষার প্রসারপ্রচারের অন্যতম বাহন। এর সাথে আছে হিন্দিভাষী বিভিন্ন ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল। হিন্দি চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে এ দেশের নতুন প্রজন্মের এক বড় অংশের মানুষের হিন্দি ভাষার সাথে এক ধরনের পরিচয় ঘটছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় ভাষাশিক্ষা বলতে সাধারণভাবে যা বোঝায় তেমন কিছু হচ্ছে না। হিন্দি ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ এসব কোনো কিছুই এর মাধ্যমে আয়ত্ত হয় না, হিন্দি সাহিত্যের সাথেও কোনো পরিচয় ঘটে না। প্রকৃতপক্ষে যা হয় তাহলো কিছু নতুন শব্দ জানা যার ফলে হিন্দি চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতে ব্যবহৃত বাক্যের অর্থ কিছুটা বোঝা সম্ভব, কিন্তু এর অধিক কোনো কিছু এক্ষেত্রে অর্জিত হওয়ার কথা নয়। এটা ভাষাশিক্ষার কোনো স্বীকৃত পদ্ধতি যে নয় সেটা বলাই বাহুল্য। বাণিজ্যিক হিন্দি চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের হাত ধরে ঘটে ভারতীয় বড় পুঁজির উৎপন্ন বিভিন্ন পণ্যের বাজারের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ যা আমরা আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাচ্ছি।

হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখে সেই ভাষায় জ্ঞানলাভ করে এর বদৌলতে এ দেশের জনগণের ভারতে গিয়ে চাকরির সুযোগ ঘটবে এ ধরনের কথা ভাড়াটে লোকজন ছাড়া অন্য কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। প্রথমত ভারতের কোনো উঁচুদরের চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষা জানা অত্যাবশ্যকীয় নয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের অধিবাসীরাই চাকরির ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে বাক্যবিনিময়ে বেশির ভাগ সময় ইংরেজি ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া, হিন্দি অনুষ্ঠান দেখে যেটুকু ভাষাজ্ঞান হতে পারে সেটা কখনোই ঐ ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট ভাষা শিক্ষার জন্য ঐ ভাষার শব্দভাণ্ডার আয়ত্ত করা যেমন জরুরি তেমনি বাক্য গঠন প্রক্রিয়া, ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব ইত্যাদি জানা এবং লিখিত সাহিত্যের সাথেও পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় আলোচনার বাইরে রেখে হিন্দি অনুষ্ঠান দেখে ভাষা শিখে ভারতে গিয়ে চাকরির সুযোগ লাভের কথা বলে বাক্যজাল বিস্তারের মর্মার্থ হচ্ছে ভারতীয় বড় পুঁজির স্বার্থের বাহক বলিউডি চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের বাণিজ্য এবং সেই সাথে এর হাত ধরে ভারতীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা। একই সাথে ভাষাগত আধিপত্যের হাতিয়ার ব্যবহার করে এ দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একাংশকে ভারতীয় বড় পুঁজির স্বার্থের জোয়ালে বেঁধে রাখা।

চাকরির প্রলোভন এবং উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে এ দেশে এবং ভারতেও পুঁজিবাদী স্বার্থ উদ্ধারের ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়। সুন্দরবনের রামপালে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, রূপপুরে রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, তেলগ্যাস সহ খনিজ সম্পদ বিদেশে পাচার, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিপ্রভৃতি প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে আছে আকর্ষণীয় চাকরি আর উন্নয়নের গালগল্প। ভারতেও শাইনিং ইন্ডিয়া নামে সেজ (SEZ – Specialized Economic Zone) প্রকল্পের জন্য আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়কে ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নন্দীগ্রামসিঙ্গুরে টাটা আর সালেম কোম্পানির কারখানা স্থাপনের জন্য জোরপূর্বক কৃষকের জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে বহু ক্ষেত্রেই নিম্নবিত্তমধ্যবিত্ত জনগণের সামনে চাকরি ও উন্নয়নের মুলো ঝোলানো হয়। এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রদানের সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু এসব ঘটনা যে হারে ভারতে, বাংলাদেশে এবং বিশ্বের তুলনামূলক পশ্চাৎপদ অন্যান্য দেশে ঘটছে তার বিষময় ফলাফল এসব দেশের জনগণের নিত্যদিনকার অভিজ্ঞতায় নির্মমভাবেই উপলব্ধ হচ্ছে।

ভাষাগত সঙ্কীর্ণতা ও গোঁড়ামিবাদকে অতিক্রমের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা শেখার দ্বার উন্মুক্ত হোক সেটা আমরা চাই। সে জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন দেশে এর উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। শিলা কি জওয়ানি কিংবা মুন্নী বদনামএর হাত ধরে ভারতীয় পুঁজির সংস্কৃতিগত আধিপত্য নয়, বরং একে মোকাবেলা করেই হোক ভাষাশিক্ষার সুস্থ পথচলা।।

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s