সমালোচনা :: ‘সেদিন ছিল ছুটি’

Posted: ফেব্রুয়ারি 12, 2015 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: মোঃ মাসুদ

sedin-chilo-chuti-1কোথায় যেন পড়েছিলাম, ভুলে গেছি – “সংগীত সর্বোত্তম অনুকরণকারী শিল্প, এতে জীবনের প্রকাশ প্রত্যক্ষ।” কিন্তু আমার মনে হয় এ কথাটা গল্পের ক্ষেত্রেই বেশি খাটে। সঙ্গীত মানুষের মধ্যে নৈতিক সহানুভূতি বৃদ্ধি করে, চিত্ত শুদ্ধ করে; জীবন বাস্তবতায় চলার পথ দেখায় না। কিন্তু গল্প চলার পথ দেখায় এবং শেখায়। চরিত্র, ভাবনা আর উপস্থাপনার নৈপুণ্যে গল্প জীবনের সামান্য থেকে অসামান্য সত্যকে প্রকাশ করতে পারে। কবি ও ছোট গল্পকার স্বপন মাঝির ‘সেদিন ছিল ছুটি’ গল্পগ্রন্থটি পড়ার পর আমার উল্লেখিত ধারণাটি যেন আরও প্রাণ পেল।

নয়টি গল্প নিয়ে উল্লেখিত গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অঙ্কুর প্রকাশনী। ভূমিকা লিখেছেন মহসিন শস্ত্রপাণি। ভূমিকাতে তিনি যা বলেছেন, তা যেন ব্যক্তি স্বপনএরই কথা। কিন্তু তার গল্পের যে প্রয়াস “বাস্তব সত্যকে শৈল্পিক সত্যে উন্নীতকরণ তা উঠে আসেনি। স্বপন মাঝির গল্পগুলিতে ঘটনার উপস্থাপনা মুখ্য হলেও চরিত্র ও ভাবনার যে ছন্দ গল্পের পরতে পরতে তা বিলক্ষণ সামাজিক সংবিৎ সৃষ্টির প্রয়াস। গ্রন্থটির প্রথম গল্প ‘সেদিন ছিল ছুটি’ মূল ভাবনায় ঐশ্বর্যসম্ভোগের মাঝে বসে দুর্ভোগের যে চিত্র তিনি অঙ্কন করেছেন, তাতে শিল্প নৈবেদ্যর ঘাটতি বা কমতি নেই, আছে লৌকিক সত্য আর গল্পের সত্যের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়ার এক অনবদ্য শৈল্পিক চেষ্টা।

তাজিমদের গাড়ীতে রাজীবদের গন্তব্য নাই। এ এক সরল বাস্তবতা। তাই গল্পের শেষ লাইন “শালা, আনলাম ফুর্তি করবার লাইগা, লাগছস আমার পিছে, যা গাড়ী থাইক্যা নাইমা যা।” গল্পের কোথাও প্রবাসী শব্দের উল্লেখ না থাকলেও, আছে অপসংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে নাদেয়া প্রবাসীর যন্ত্রণার ছবি। রাজীবদের চরিত্রে শেকড়ের টানে, সুন্দর অহংকার থাকলেও শেকড় লাপাত্তা। রাস্তায় আধ ঘন্টা হাটাহাটি মানুষ দেখার রূপকে এ যেন শেকড় খোঁজা।

তাঁর প্রতিটি গল্পই এমন। শৈল্পিক ছন্দে ঘটনা আর চরিত্রের যে পার্থক্য, সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় মূল গল্প ও তার বার্তা। মানুষের বিভিন্ন অবদমন জনিত মানসিক সমস্যার কুফল সমাজকে বিপন্ন করে। ব্যক্তি স্বপন মাঝির অবদমন জনিত ভাবনা প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকে সাথে নিয়ে গল্প হয়ে সাধারণ পাঠকের প্রশ্নহীন চিন্তাকে বিপন্ন করে, আনন্দ দেয়। তাই দেখা যায়, তার কোনো গল্পকেই তিনি নাটকীয় (মীমাংসিত বা অমীমাংসিত) ঐক্যে নিয়ে ফেলেননি। অসুন্দর বাস্তবকে অনুকৃত করে নিয়ে ফেলেছেন প্রশ্নে। যে প্রশ্ন ব্যক্তি আমাকে চিনতে শেখায়। আবার কখনো দেখায় সাধারণ বেঁচে থাকার নামে টিকে থাকার অর্থহীনতা। পড়তে পড়তে মনে হয় এ যেন আমারই কথা। তাই দ্বিতীয় বার গল্পগুলি পড়তে পড়তে মনে উকি দিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা

অন্তর মাঝে বসি অহরহ

মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ

মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ মিশায় আপন সুর।

আবার এমন গল্পও আছে যেখানে উপস্থাপনায় শুধুই ভাবনা, লেখক ছাড়া চরিত্রের কোনো বালাই নেই। প্রচলিত গল্পের সংজ্ঞা ভেঙে দিয়ে এ যেন গল্পের এক নতুন ফর্ম। গদ্য কবিতার ঢঙে ভাবনাকে নিপুণ হাতে গল্পে নিয়ে ফেলা। যদি বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেও, সৃষ্টির উদ্দেশ্যটি ভাল বা তার চেয়েও সুন্দর করা সম্ভব হয়, তা হলে সে লঙ্ঘন অবশ্যই সমর্থন যোগ্য। “এই আমি” গল্পটি যেন তেমন সমর্থন আদায়ের শক্তি ধারণ করেই লিখিত।

গল্পের দেহ ও আত্মার পরিচয় যে যথাসম্ভব সুষ্ঠুভাবেই গল্পগুলোতে উপস্থিত, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ গল্পগুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ইচ্ছাপূরণের কোনো আকাঙ্ক্ষা না হয়ে, সমাজ বাস্তবতার ছবি হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। তার আরো দু’টি গল্পগ্রন্থ “সাড়া” এবং “ধর্মহীন বর্ণহীন”এর মতো “সেদিন ছিল ছুটি” গল্পগ্রন্থটিতেও নিজের বিশ্বাসকে, পাঠকের তরল মনোরঞ্জনে শিথিল করেননি তিনি। শিল্পমান বজায় রেখে চেষ্টা ছিল পশ্চাৎপদ সংস্কার ও ভোগের সংস্কৃতিকে আঘাত করার। যা তিনি নিপুণভাবেই পেরেছেন। অঙ্কুরকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ লেখককে সুন্দর নয়টি গল্পের জন্য।।

মোঃ মাসুদ :: গ্রন্থ সমালোচক

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s