3heads26432(মার্কসবাদলেনিনবাদ নিয়ে বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী এবং বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে কোন বিতর্ক না থাকলেও মাওবাদ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কমিউনিজমের জ্ঞান ভাণ্ডারে মাও সেতুঙএর অবদানকে মতাদর্শের পর্যায়ে নেয়া যায় কিনা, বিতর্কটা সেই বিষয়ে। অনেকেই মাওএর অবদানকে স্বীকার করেন, কিন্তু “মাওবাদ” হিসেবে তাকে স্বীকার করেন না। তাদের বক্তব্য এটা চীনের বাস্তবতায় মার্ক্সবাদের সৃজনশীল প্রয়োগ। অপরদিকে, মাওবাদএর সমর্থকদের মতে, মাও সেতুঙএর অবদান মার্কসবাদ, লেনিনবাদের মতোই মাওবাদে উন্নীত হয়েছে এবং এর বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মাওবাদ সাম্যবাদী মতাদর্শকে বিকাশের এক তৃতীয় এবং নতুন স্তরে উন্নীত করেছে। এই আলোচনা শুরু করার আগে আমাদের একটি মানদণ্ডের বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে। সেটা হলো কখন একটি অবদান মতবাদে উন্নীত হয়? মাওবাদীদের বক্তব্য হলো দর্শনঅর্থনীতিরাজনীতিতে মৌলিক অবদান হলেই সেটা মতবাদ হতে পারে। নিম্নলিখিত আলোচনাতে সেটাই দেখানো হয়েছে।

এই বিতর্ক যে শুধু বাংলাদেশেই আছে তা নয়, সারা দুনিয়াজুড়ে এই বিতর্ক চলমান রয়েছে। এই বিতর্কের অংশ হিসেবে তিনটি লেখা আগ্রহী পাঠকদের জন্য দেয়া হলো। প্রথমটি পেরুর কমিউনিষ্ট পার্টি (শাইনিং পাথ)র চেয়ারম্যান অ্যাবিমেল গুজমান গনজালো লেখা; যা দলীয় দলিল হিসেবে প্রকাশিত। এটাই হলো সেই দলিল যেখানে পেরুর পার্টি সর্বপ্রথম মাও সেতুঙএর অবদান, যা মাও সেতুঙ চিন্তাধারা হিসেবে চর্চিত ছিল, তাকে মাওবাদ হিসেবে সূত্রায়ন করেন। দ্বিতীয় লেখাটি নেপালের কমিউনিষ্ট পার্টি সভাপতি প্রচণ্ডএর লেখা। নেপালে মাও বিতর্কের অংশ হিসেবে তিনি এই লেখাটি লিখেছিলেন। আর তৃতীয় এবং শেষ লেখাটি বাঙলাদেশের একজন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি রায়হান আকবরএর লেখা। এই তিনটি লেখার বিষয়বস্তু একই। মতবাদ হিসেবে মাওবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা। আর বিপ্লবী রাজনীতির পক্ষের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই এটি মঙ্গলধ্বনিতে প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় লেখাটি। উক্ত তিনটি লেখা আমাদের সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন নূরুর রহমান। মঙ্গলধ্বনি)

বিপ্লব বলতে আমরা কমিউনিস্টরা বুঝি পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব। যার লক্ষ্য সমাজতন্ত্রকমিউনিজম। এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে পারে সর্বহারাশ্রেণী এবং তার পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি। সেই সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবের বিজ্ঞান হচ্ছে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ (মালেমা)। মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ পৃথক পৃথক কোন বিষয় নয়। মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ হচ্ছে এক অখণ্ড সত্ত্বা।

১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহার ঘোষণা থেকে শুরু ক’রে সর্বহারাশ্রেণীর মতবাদ হিসেবে প্রথমে মার্কসবাদ পরে লেনিনবাদ তারপরে মাওবাদ এসেছে। আর এখন অনিবার্যভাবেই আজকে সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়ার জন্য মালেমা বিকাশের প্রশ্ন আসছে। মোটাদাগে মার্কসবাদলেনিনবাদ নিয়ে কোন বিতর্ক না থাকলেও মাওবাদ নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে এখনো বিতর্ক চলছে। বিশেষভাবে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদকে বোঝা ও তার প্রয়োগ নিয়ে সত্যিকার বিপ্লবীদের সাথে একাডেমিক বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদীদের সাথে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। যাহোক, মাওবাদ আলোচনার আগে মার্কসবাদলেনিনবাদ সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা যাক।

মার্কসবাদ

আদি সাম্যবাদদাসযুগসামন্তযুগ বিলুপ্ত হয়ে প্রগতির ঝাণ্ডা নিয়ে পুঁজিবাদ পৃথিবীর মঞ্চে আবির্ভূত হলো। পুঁজিবাদী সমাজের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী গণতন্ত্রের কথা বললেও আগের যুগের শাসক শ্রেণীর চেয়েও বর্ধিতভাবে শোষণলুণ্ঠন চালাতে লাগল। নব বিকশিত শ্রমিক শ্রেণীকে ২০/২২ ঘণ্টা শ্রম করতে বাধ্য করা হতো। স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিক শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহে ফেটে পড়লো। তারা তাদের এই শোষণের জন্য কলকারখানামেশিনপত্র তথা শিল্পকে দায়ী ক’রে এগুলো ভাঙতে এবং আগুন দিতে লাগলো। সেই বিশৃংখল পরিস্থিতিকে তখন নানাভাবে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন মতবাদ আবির্ভূত হতে লাগলো। কেউ পুরনো সামন্তবাদে ফিরে যাওয়ার কথা বললো, কেউ বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কথা বললো, কেউ অভিজাত সমাজতন্ত্রসহ বিভিন্নরূপী সমাজতন্ত্রের কথাও বললো।

কিন্তু মার্কসের পূর্বকার যে সব সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে তা ছিল অবাস্তব এবং কাল্পনিক। কারণ, তখনও আধুনিক শিল্পকারখানা ও শ্রমিক শ্রেণী বিকাশ লাভ করেনি। তাই শ্রমিক শ্রেণী তখনো পুঁজিবাদের সারবস্তু বুঝেনি। পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যকার শোষণের সম্পর্ক এবং নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পর্কেও তারা বোঝেনি।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্স বলেছেন, “এই ঐতিহাসিক অবস্থা সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতাদের নিয়ন্ত্রিত করেছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অপরিপক্কতা এবং অপরিপক্ক শ্রেণীর অবস্থার সাথে খাপ খায় অপরিপক্ক তত্ত্ব।”কার্ল মার্কস, সিলেক্টেড ওয়ার্কস। ভলিউম, পৃষ্ঠা১৫৫, দ্বিতীয় সংস্করণ, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, মস্কো ১৯৪৬

এই প্রসঙ্গে মাও সেতুঙ লিখেছেন, “পুঁজিবাদের বিকাশ ও সামন্ততন্ত্রের উপর বিজয় ও সচেতন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় শ্রমিক শ্রেণী পুঁজিবাদী সারবস্তু বুঝতে পারে, শ্রেণীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক এবং নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব উপলব্ধি করে। মার্কস ও এঙ্গেল্স একে সারসংকলন করেন এবং মার্কসবাদের জন্ম দেন।” মাও, চারটি দার্শনিক প্রবন্ধ, পৃ

সেই সময়ে ইউরোপে বিশেষত জার্মানীতে দার্শনিক জগতেও চলছে তুমুল বিতর্ক। পুঁজিবাদের আবির্ভাবের সেই ঝড়ো বিশৃংখল পরিস্থিতিতে কার্ল মার্কস তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্সের সহযোগিতায় প্রথমে “ইতিহাসের বস্তুবাদী শিক্ষা” এবং পরবর্তীতে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিকশিত করেন। সেই মতবাদের ভিত্তিতে তারা মানব জাতির বিকাশের মৌলিক নিয়মগুলো আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে মার্কসএঙ্গেল্স দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দার্শনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্যক্তিমালিকানাধীন সমাজ ব্যবস্থাকে সামাজিক মালিকানায় তথা সমাজতন্ত্রে পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৮৪৮ সালে “কমিউনিস্ট ইশতেহার” রচনা করেন। এবং ১৬ বছর নিরলস সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করেন।

মার্কস শ্রমিক শ্রেণীর উপর পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার শোষণ এবং তার অন্তর্নিহিত নৈরাজ্য ও দ্বন্দ্বসমূহের রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক বিজ্ঞানকে আবিষ্কার করেন। শ্রমিকের “উদ্ধৃত্ত মূল্য” শোষণের মাধ্যমে কিভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তা মার্কস সবিস্তারে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর অমর কীর্তি “ক্যাপিটাল” গ্রন্থে।

কার্ল মার্কস তাঁর বিপ্লবী তত্ত্বগুলোকে বিকশিত করেন আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগের ভিত্তিতে এবং তাতে অংশগ্রহণ ও সেবা করার উদ্দেশ্যে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় ১৮৭১এ “প্যারী কমিউনে”র প্রতি গভীর মনোযোগে। মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের ৭০ দিন পর “প্যারী কমিউন” পরাজিত হলে মার্কস তার সারসংকলন করেন।

তিনি প্যারী কমিউনের ঐতিহাসিক সারসংকলন ক’রে দেখিয়েছিলেন যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য সর্বহারাশ্রেণীকে অবশ্যই তার নিজস্ব রাজনৈতিক পার্টিতে সংগঠিত হতে হবে। এমন একটি পার্টির নেতৃত্বে শোষকদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ ক’রে নিজ শ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্র তথা শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবিপ্লবী বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বলপ্রয়োগ করেই তা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করতে হবে। বিগত শতাধিক বছরের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মার্কস রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাজ কেন্দ্রীভূত করলেও তার সহযোদ্ধা এঙ্গেল্স প্রকৃতিবিজ্ঞানসহ অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক কাজ করেছেন। প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা, পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বানর থেকে মানুষে রূপান্তরে শ্রমের ভূমিকাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন। শুধু তাই নয়, মার্কসের মৃত্যুর পর “ক্যাপিটাল”এর সম্পাদনা করেন এবং সুবিখ্যাত “এ্যান্টি ডুরিং” পুস্তকের মাধ্যমে ডুরিংয়ের বক্তব্যকে পরাজিত ও কবরস্থ করেন, যে কিনা মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গিকে উল্টে ফেলেছিল। এভাবে মার্কসের দর্শন ও তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ১৮৮৯ সালে দ্বিতীয়

আন্তর্জাতিক গড়ে তোলেন। বাস্তবে মার্কসএঙ্গেল্স যৌথভাবে কাল্পনিক সমাজতন্ত্র এবং অন্যান্য বিভিন্ন আকৃতির অবৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন, বৈজ্ঞানিক সামজতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

মার্কসের মৃত্যুর পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষামালা ও কর্মপদ্ধতি “মার্কসবাদ” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। যদিও ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্সের কর্মযজ্ঞকে মার্কসবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে মার্কসএঙ্গেল্সের সম্মিলিত গবেষণাবিশ্লেষণদৃষ্টিভঙ্গিকর্মপদ্ধতি হচ্ছে মার্কসবাদ। এঙ্গেল্স নিজেও “মার্কসবাদ” সূত্রায়নকে সমর্থন করেছেন।

লেনিনবাদ

মার্কসএঙ্গেল্সের মৃত্যুর পর মহামতি লেনিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি ছাড়া দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা কাউট্স্কিবার্নষ্টাইনের নেতৃত্বে সব পার্টি মার্কসবাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এরা সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বলপ্রয়োগের লাইনকে পুরোপুরি বাতল ক’রে দেয়। শুধু তাই নয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্রমিক শ্রেণীকে নসিহত করেছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের স্বার্থের পক্ষ অবলম্বনের। ফলে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন মহাসংকটে পড়ে। সেই সংকটকালে রাশিয়ান তরুণ বলশেভিক কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন একদিকে রাশিয়ায় শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলা অন্যদিকে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের বিশ্বাসঘাতক দিকপালদের বিরুদ্ধে জীবনমরণ সংগ্রাম পরিচালনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি রুশ বিপ্লবকে সংগঠিত করার প্রতিই বেশি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন। যার লক্ষ্য বাস্তব শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীদের উন্মোচন করা।

রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি যার তখনকার নাম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি লেনিন সেই পার্টির অভ্যন্তরে অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে তত্ত্বগত ও অনুশীলনগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। এই অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তিনি রচনা করেন বিখ্যাত “কি করতে হবে” পুস্তকখানি। যে বইয়ে রাশিয়ায় অর্থনীতিবাদের মূর্তরূপকে বিশ্লেষণ ও তার বিপরীতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী রাজনীতিকে তুলে ধরেন।

এছাড়া পার্টি গড়ে তোলার প্রশ্নে লেনিন গণতান্ত্রিককেন্দ্রীকতার সাংগঠনিক নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করেন। যে নীতিমালা ছাড়া মতপার্থক্যসহ কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

লেনিনের অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিককেন্দ্রীকতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে পার্টিতে যারা বিরোধিতা করে তারাই পরবর্তীতে মেনশেভিক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই মেনশেভিকদের পরাজিত করেই রাশিয়ায় লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে লেনিন রাশিয়ায় মার্কসবাদী লাইন প্রতিষ্ঠা এবং তার ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলায় নেতৃত্ব প্রদান করেন।

তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কসবাদের সারবস্তুকে সংশোধন করার অপরাধে লেনিন ১৯০৯ সালে “বিশ্বাসঘাতক কাউটস্কিনামক রচনার মাধ্যমে তাদের সংশোধনবাদী আত্মসমর্পণবাদী লাইনকে উন্মোচন করেন।

সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম ছাড়াও লেনিন পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় সাম্রাজ্যবাদের বিকাশকে বিশ্লেষণ করেন। লেনিন বলেছেন, “সাম্রাজ্যবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় কয়েকটি বৃহৎ শক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতা।” তিনি দেখান সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ। পৃথিবীতে গুটিকয়েক সাম্রাজ্যবাদী দেশ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত জাতি ও জনগণকে কিভাবে ভাগবাটোয়ারা ক’রে নিচ্ছে। এই ভাগবাটোয়ারা ও বণ্টনপুনর্বণ্টন নিয়ে অব্যাহতভাবে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। তাই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার ধ্বংস ব্যতীত এ থেকে জনগণ মুক্তি পাবে না।

লেনিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো মার্কসবাদের আলোকে রাশিয়ায় শ্রেণী সংগ্রামকে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে রুশ বিপ্লবের লাইন বিনির্মাণ এবং ১৯১৭ সালে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল। বুর্জোয়া শ্রেণী যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে দুঃস্বপ্ন বলেছিল তাকে ভুল প্রমাণ ক’রে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা। প্যারী কমিউনের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রায় ৪৬ বছর পর সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে একটা সফল বিপ্লব সাধন করা। লেনিন বিপ্লবের তত্ত্বকে রাশিয়ার নির্দিষ্ট বাস্তবতায় অনুশীলনে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বিপ্লব সংঘটনের প্রক্রিয়ায় সংগঠন সংগ্রামের অসংখ্য নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করেন। এবং দুনিয়ার বুকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কার্যক্রম শুরু করেন।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম এবং রাশিয়ায় বিপ্লব সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যপী কমিউনিস্ট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই প্রভাবে ১৯২০ সালে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ১৯২১ সালে চীনে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়।

১৯২৪ সালে লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। লেনিনের মৃত্যুর পর যোশেফ স্ট্যালিন রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ সম্পন্ন করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করায় নেতৃত্ব প্রদান করেন। একইসাথে তিনি তৃতীয় আন্তর্জাতিকও পরিচালনা করেন।

রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের সময় স্ট্যালিনকে অব্যাহতভাবে ট্রটস্কি’র বাম রূপের, কিন্তু সারবস্তুগতভাবে ডান লাইনের বিপক্ষে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হয়। স্ট্যালিন লেনিনবাদকে আঁকড়ে ধরে ট্রট্স্কিবাদকে পরাজিত ক’রে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নেন। এভাবে স্ট্যালিন লেনিনের অসমাপ্ত কাজকে সুসংহত ও সমাপ্ত করেন। লেনিন মার্কসবাদকে সার্বিক ও ব্যাপক বিকাশের মাধ্যমে নতুন স্তরে উন্নীত করেছিলেন। যাকে স্ট্যালিন তাঁর বিখ্যাত “লেনিনবাদের ভিত্তি” নামক পুস্তকে সুসংবদ্ধ করেছেন। এ থেকেই সর্বহারাশ্রেণীর মতবাদকে মার্কসবাদলেনিনবাদ নামে অভিহিত করা হয়। যাকে স্ট্যালিন এক কথায় বলেন : লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ।

মাওবাদ

mao-poster-16543মার্কসবাদলেনিনবাদের বিকাশ হচ্ছে মাওবাদ। এই মাওবাদকেই মাও সেতুঙএর নেতৃত্বাধীন চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) “মাও সেতুঙচিন্তাধারা” হিসেবে সূত্রবদ্ধ ও প্রচার করতো। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীও মাও সেতুঙ চিন্তাধারা বলতো। তবে মাওএর মৃত্যুর পর চতুর্থ আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর প্রস্তুতি সংগঠন– “বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন” (আর.আই.এম.) ১৯৯৩ সালের বর্ধিত সম্মেলনে “মাও সেতুঙ চিন্তাধারা” পরিবর্তন ক’রে “মাওবাদ” সূত্রবদ্ধ করে। তারপর থেকে আর.আই.এমএর বাইরেও মাও সেতুঙ চিন্তাধারা অনুসারী পার্টি ও সংগঠনসমূহ “মাওবাদ” সূত্রায়ন গ্রহণ করতে থাকে।

মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে মাওবাদ বলাটা শুধুমাত্র সূত্রায়নের পরিবর্তন নয়। এভাবে সূত্রায়ন সর্বহারাশ্রেণীর মতবাদের তৃতীয় স্তর সম্পর্কে (প্রথম স্তর মার্কসবাদ, দ্বিতীয় স্তর লেনিনবাদ) উচ্চতর উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। যার সাথে কমরেড স্ট্যালিন সম্পর্কে মাওএর সারসংকলন, মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লিউশাওচীলিন পিয়াওতেং শিয়াও পিং বিরোধী সংগ্রামের শিক্ষা এবং মাওমৃত্যু পরবর্তীকালে গণযুদ্ধ সম্পর্কে মাওবাদীদের উচ্চতর উপলব্ধি অর্থাৎ, গণযুদ্ধের সার্বজনীনতা সম্পর্কিত। এসব না বুঝলে মাওবাদ সম্পর্কে উপলব্ধির ঘাটতি থেকে যাবে। অনুশীলনে দেখা গেছে মাও চিন্তাধারা ও মাওবাদের সাথে সারবস্তুগতভাবে পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও এই উচ্চতর উপলব্ধির ভিত্তিতে যারা মাওবাদ গ্রহণ করতে পারেনি তাদের অধঃগতি ও অবিপ্লবী হয়ে পড়া অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া, মাও সেতুঙ চিন্তাধারা এভাবে বললে মার্কসবাদলেনিনবাদের সাথে মাও সেতুঙ চিন্তাধারার যেন পার্থক্য আছে এমন ভুল বোঝার অবকাশ থাকে। অর্থাৎ, “বাদ”এর সাথে “চিন্তাধারা”র পার্থক্য থাকে।

যদিও সিপিসি যখন সর্বহারাশ্রেণীর মতবাদ হিসেবে “মাও সেতুঙ চিন্তাধার”কে সূত্রবদ্ধ করেছিল তখন সেখানে মাও সেতুঙ চিন্তাধারা বলায় সারবস্তুগতভাবে কোন ধরনের পার্থক্য বোঝার অবকাশ ছিল না। নিচের উদ্ধৃতি তাকে স্পষ্ট ক’রে দেয়। সিপিসি বলেছে “সভাপতি মাও চীনের বিভিন্ন জাতির জনগণের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মহান সংগ্রামের নেতৃত্বদানে, আমাদের দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের মহান সংগ্রামের নেতৃত্বদানে, সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিক সংশোধনবাদ ও বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মহান সংগ্রামে মার্কসবাদলেনিনবাদের সার্বজনীন সত্যকে বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলনে সমন্বয় সাধন করেছেন, রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মার্কসবাদলেনিনবাদকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছেন এবং মার্কসবাদলেনিনবাদকে এক সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।” নবম জাতীয় কংগ্রেসে প্রদত্ত রিপোর্ট, বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়; পিকিং, ১৯৬৯। পৃঃ ৭৩

অন্যদিকে চীনে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সেখানকার সংশোধনবাদীরা এখনও “মাও সেতুঙ চিন্তাধারা” ব্যবহার করে। তাদের সাথে সত্যিকার মাওবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পার্থক্য স্পষ্ট করার জন্য এই পরিবর্তন কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।

চীনা পার্টি কিভাবে সূত্রবদ্ধ করলো তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাও সেতুঙ প্রায় অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল চীন বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদনের প্রক্রিয়ায়, বিশ্বব্যাপী আধুনিক সংশোধনবাদীদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবং সর্বশেষ সমাজতান্ত্রিক সমাজে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ও করণীয় নির্ধারণের মাধ্যমে মার্কসবাদলেনিনবাদকে বিপুলভাবে বিকশিত করেছেন। এসব বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মাও দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এই সকল ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রেখেছেন।

মাও সেতুঙ সর্বহারাশ্রেণীর দর্শন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে বিকশিত করেন। দ্বন্দ্বে সার্বজনীনতা বিশ্লেষণ ও প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ধারণের গুরুত্বকে উপলব্ধির বিকাশ নতুন স্তরে উন্নীত করেন। তিনি আরও জোর দেন, দ্বন্দ্বের নিয়ম তথা বিপরীতের একত্ব ও সংগ্রাম হচ্ছে প্রকৃতি ও সমাজকে পরিচালনাকারী মূল নিয়ম। এ উপলব্ধিকে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে প্রয়োগ করেন তত্ত্ব ও অনুশীলনের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণে। তিনি অনুশীলনকে সত্য যাচাইয়ে মানদণ্ড হিসেবে জোর দেন। তত্ত্বঅনুশীলনতত্ত্ব এভাবে তত্ত্বকে বিপ্লবী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মাও সর্বহারা জ্ঞানতত্ত্বকে আরো বিকশিত করেন। যা ১৯৩৭ সালে “অনুশীলন সম্পর্কে” এবং “দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে” নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

দুই মিলে এক হয়”এই সংশোধনবাদী তত্ত্বের বিপরীতে মাও সেতুঙ “এক দুইএ বিভক্ত হয়”এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন যা সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রামে বিপ্লবীদের হাতে একটি ধারালো অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।

জনগণ এবং কেবল জনগণই হচ্ছেন বিশ্ব ইতিাহাস সৃষ্টির চালিকা শক্তি এবং গণলাইনের ধারণাকে মাও আরও বিকশিত করেন। তিনি বলেন, জনগণের ধারণাকে সংগ্রহ করুন, সে সবকে সুসংবদ্ধ করুন এবং তারপর সেই সব ধারণা নিয়ে জনগণের কাছে যান। তাদের নিকট এসব ধারণা প্রচার ও ব্যাখ্যাা করতে থাকুন যতক্ষণ না তারা সে সবকে নিজেদের ধারণা বলে গ্রহণ করছেন এবং অনুশীলনের প্রক্রিয়ায় সে সব ধারণার সঠিকতাকে যাচাই করুন। মাও সেতুঙ বস্তু থেকে চেতনা ও চেতনাকে বস্তুতে রূপান্তরে দ্বন্দ্বের নিয়মকে রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছেন এবং জনগণের কাছে দর্শনকে নিয়ে গেছেন যে কর্তব্য সম্পাদন করতে মার্কসবাদে বাকি ছিল। এভাবে মানব জাতির সকল কর্মকাণ্ডে মানুষের সচেতন গতিশীল ভূমিকার ধারণাকে আরো একধাপ বিকশিত করেন।

রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ

মাওএর এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে উন্নীত হওয়ার পর সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে পুঁজিবাদ জাতীয় এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিতে বিভক্ত হয়ে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক পুঁজি সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে সামন্ততন্ত্রের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে জনগণকে শোষণলুণ্ঠন ক’রে থাকে। পুঁজিবাদের এই নতুন বৈশিষ্ট্যকে উন্মোচনের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রকে বুঝতে সহায়ক হয়েছে।

১৯১৭ সালে রুশবিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর লেনিনস্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রথমে ঔপনিবেশিক প্রশ্নে বিশেষত সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের লাইনের প্রশ্নে অর্থাৎ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বের প্রশ্নে গভীর মনোযোগ দেয়। মাও সেতুঙ লেনিনস্ট্যালিনের জাতি সমস্যা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মার্কসবাদীলেনিনবাদী সার্বজনীন নীতি ও তত্ত্ব¡কে চীনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় আরো বিকশিত করেন। যাকে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব নামে সূত্রায়ন করেন।

এই নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব চেয়ারম্যান মাও ১৯৪২ সালে “নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে” নামক দলিলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বিশ্লেষণ ক’রে দেখান, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে উন্নীত হওয়ার পর আগের মতো সামন্তবাদের সাথে কৃষকের দ্বন্দ্ব বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে মীমাংসা করতে পারে না। বরং বুর্জোয়া শ্রেণী সামন্তবাদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধে। ফলে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত থেকে যায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে মাও সেতুঙ সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট করণীয় নির্ধারণ করেন। যার মূল কথা অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে সম্পন্ন ক’রে অব্যাহতভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশীয় দালাল আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদকে উচ্ছেদ ক’রে বুর্জোয়া বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত ক’রে গণতন্ত্রের পথে আগাতে হবে। তিনি পার্টিবাহিনীফ্রন্ট এই তিন যাদুকরী অস্ত্রের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

সোভিয়েত আধুনিক সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ১৯৬৩ সালে মাও সেতুঙ APOLOGY OF NEW COLONIALISM নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই নিবন্ধে তিনি আফ্রোএশিয়াল্যাটিন আমেরিকার সংগ্রাম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করণীয় নির্ধারণ করেন। যার ভিত্তিতে সত্তরের দশকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে মাও আফ্রোএশিয়াল্যাটিন আমেরিকার আন্দোলকে এমনভাবে সমর্থন করেন যাতে এইসব আন্দোলন বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের লক্ষ্যের দিকে

এগিয়ে যায়। এভাবে তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদী লাইনকে তুলে ধরেন। রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশএই লেনিনবাদী তত্ত্বকে মাও আরও বিকশিত করেন এবং দেখান যে সমাজতান্ত্রিক সমাজে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক লাইনের সঠিকতাই নির্ধারণ করে উৎপাদনের উপায়সমূহ সর্বহারাশ্রেণীর অধিকারে রয়েছে কিনা। তিনি উৎপাদিকা শক্তির সংশোধনবাদী তত্ত্বকে গভীরভাবে সমালোচনা করেন এবং উপসংহার টানেন যে, উপরিকাঠামো ও চেতনা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলে উৎপাদন শক্তির বিকাশ ঘটে। এই সব বিষয়গুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে মাওএর স্লোগানে “বিপ্লব আঁকড়ে ধরো, উৎপাদন বাড়াও”এর মধ্য দিয়ে।

মাও সেতুঙ সর্বহারাশ্রেণীর সামরিক বিজ্ঞানকে ব্যাপকভাবে বিকশিত করেন। শ্রেণী সংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তুলে ধরেন, “বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতিটি শ্রেণীরই নির্দিষ্ট চরিত্র, লক্ষ্য এবং উপায় সম্বলিত যুদ্ধের নিজস্ব ধরণ রয়েছে। যাকে একটিমাত্র কথায় প্রকাশ করা যায় “ তোমরা তোমাদের কায়দায় লড়ো, আমরা আমাদের কায়দায়।” মাও আরও প্রতিষ্ঠিত করেন যে, জনগণকে জাগরিত করা ও সশস্ত্র শক্তিতে বিকশিত করার জন্য তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে ঘাঁটি এলাকা প্রতিষ্ঠা করাটা চাবিকাঠি। ঘাঁটি হলো গণযুদ্ধের সারবস্তু। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধযার নির্ধারক দিক হলো গ্রামে ঘাঁটি গড়ে তোলা অর্থাৎ, গ্রাম মুক্ত করা, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করা এবং শেষে শহর দখল করা। এবং গেরিলা যুদ্ধের রণনৈতিক তাৎপর্য, যা শূন্য থেকে শুরু করতে হয়; ক্ষুদ্র শক্তি পর্যায়ক্রমে বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয় এসব বিষয়গুলোকে তুলে ধরেন। তিনি আরও শিক্ষা দেন, পার্টি বন্দুককে নিয়ন্ত্রণ করবে, বন্দুককে কোনভাবেই পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়া যাবে না। চীন বিপ্লবের প্রায় ৩০বছর প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের তত্ত্ব গড়ে তোলেন। যা আজ সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবে মহামূল্যবান সামরিক বিজ্ঞান।

মাওমৃত্যু পরবর্তীকালে গণযুদ্ধ সম্পর্কে মাওবাদীদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অবস্থা আরও উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়। সেটা হলো গণযুদ্ধের বিশ্বব্যাপী সার্বজনীনতা। যাকে আর.আই.এম. সূত্রবদ্ধ করেছে।

১৯৫৬ সালে স্ট্যালিনের মৃত্যুপরবর্তীতে মাও সেতুঙ রাশিয়ার ক্রুশ্চভব্রেজনেভের আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে রুশচীন মহাবিতর্ক নামে পরিচিত আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। লেনিন যেমনি মার্কসএঙ্গেল্স পরবর্তীতে সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম ক’রে মার্কসবাদকে রক্ষা করেছিলেন ও তাকে বিকশিত করেছিলেন তেমনি লেনিনস্ট্যালিন পরবর্তীতে ক্রুশ্চভব্রেজনেভপন্থী আধুনিক সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম ক’রে মার্কসবাদলেনিনবাদকে রক্ষা ও বিকশিত করেন।

এই সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় মাও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই দেশে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে ইতিবাচক সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভুলের গভীর বিশ্লেষণ করেন। চেয়ারম্যান মাও দ্বান্দ্বিকভাবে স্ট্যালিনের মহান অবদানগুলোকে তুলে ধরার পাশাপাশি তার সীমাবদ্ধতা ও ভুলগুলোকে সারসংকলন করেন।

পার্টি গঠনের প্রশ্নেও মাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি পার্টি সম্পর্কে স্ট্যালিনের মনোলিথিক বা একস্তম্ভী ধরনের অদ্বান্দ্বিক কন্সেপ্টকে সারসংকলন করেন।

এ ক্ষেত্রেও তিনি দ্বন্দ্ববাদকে সঠিকভাবেই প্রয়োগ করেছিলেন। যার মূল কথা দুই লাইনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার্টিকে গড়ে তুলতে হবে। মাওএর দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্টিও হচ্ছে বিপরীতের একত্ব। এখানেও সর্বহারা ও অসর্বহারা দিক রয়েছে, এখানেও সর্বহারা লাইন এবং অসর্বহারা লাইন রয়েছে, এখানেও সঠিক লাইন ও বেঠিক লাইন রয়েছে, এখানেও দুই বিপরীত মতের মতাদর্শের অস্তিত্ব রয়েছে। এবং এ কারণেই এই সব দুই বিপরীতের মাঝে রয়েছে সংগ্রামসংঘাত। মাও দেখিয়েছেন, এই সংগ্রাম আর দ্বন্দ্বটাই হচ্ছে স্থায়ী এবং ঐক্য হচ্ছে আপেক্ষিক, অস্থায়ী। তাই পার্টিকে কখনই “একস্তম্ভীভাবে” দেখা যায় না। আমরা দেখি বা না দেখি পার্টি একস্তম্ভী নয়; তা হতেও পারে না। এটাই হচ্ছে পার্টির ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের নিয়মের প্রয়োগ। “এক দুইএ বিভক্ত হয়” দ্বন্দ্ববাদের এই নিয়মটা পার্টির মধ্যেও প্রযোজ্য।

সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণীর মতাদর্শের ছাপ অব্যাহতভাবে পার্টির মধ্যে প্রবেশ করে। সেই সব অসর্বহারা মতাদর্শের বিরুদ্ধে সক্রিয় মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে, পার্টিসদস্যদের মতাদর্শগত পুনর্গঠনের মাধ্যমে, সমালোচনাআত্মসমালোচনার মাধ্যমে এবং পার্টির মধ্যে সুবিধাবাদ ও বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদী লাইনের বিরুদ্ধে অব্যাহত সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় পার্টির মধ্যে সর্বহারা বিপ্লবী চরিত্র রক্ষা করতে হয়। একেই পার্টির মধ্যে দুই লাইনের সংগ্রাম বলা হয়েছে।

চীন বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ মার্কসবাদলেনিনবাদের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিকশিত করেছেন। কিন্তু এই বিকাশ “মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব” (GPCR)এর মধ্য দিয়ে নতুন স্তরে উল্লেম্ফন ঘটে। অর্থাৎ, মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদে বিকশিত হয়। যেজন্য আজকের দিনে মাওবাদ অস্বীকার ক’রে মার্কসবাদীলেনিনবাদী হওয়া যায় না। মাওবাদকে তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে না মানার অর্থ হচ্ছে মার্কসবাদলেনিনবাদকে না মানা।

মাওবাদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাৎপর্য কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন। স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন সংশোধনবাদী হয়ে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হলো মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলে কার্যকলাপ করে সাম্রাজ্যবাদীদের মতো। এক ঝাঁক পূর্ব ইউরোপীয় দেশ সমাজতন্ত্র থেকে অধঃপতিত হলো, চীনেও সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ নিয়ে লিউশাওচীতেং শিয়াও পিংদের সাথে লাইনগত সংগ্রাম চলছিল। মাও সেতুঙ এসব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদ পুনরুত্থানের সারসংকলনের প্রক্রিয়ায় এবং চীনের শ্রেণী সংগ্রাম থেকে মাও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ক্রুশ্চভব্রেজনেভ বা লিউশাওচীতেং শিয়াও পিং পার্টির মধ্য থেকে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ, পুঁজিবাদের পথগামী নব্য বুর্জোয়ারা সমাজতান্ত্রিক সমাজের বাহির থেকে নয়, পার্টির অভ্যন্তর থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে। তাই মাও সেতুঙ সূত্রবদ্ধ করেন, পার্টিঅভ্যন্তরে পুঁজিবাদী ধ্যানধারণার ধারকরাই হচ্ছে নব্য বুর্জোয়া। এই

যুগান্তকারী আবিষ্কার সমাজতান্ত্রিক সমাজ সম্পর্কে পূর্বে অনুশীলিত ধারণাকে পরিপূর্ণভাবে পাল্টে দিল।

প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নে সাধারণ ধারণা ছিল সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের পর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শ্র্রমিককৃষকের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকলেও বৈরী শ্রেণী নেই। সুতরাং বৈরী শ্রেণী সংগ্রামও থাকে না। যে কারণে স্ট্যালিন ১৯৩৬ সালে ঘোষণা করেছিলেন, রাশিয়ায় আর বৈরী শ্রেণী নেই। চীনেও একই ধারণা বিরাজ করছিল। যেজন্য ১৯৫৬ সালে চীনা পার্টি অষ্টম কংগ্রেসের রিপোর্টে বলেছিল, চীনে বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্বটি আর প্রধান দ্বন্দ্ব নেই। অবশ্য স্ট্যালিন তখন বলেছিলেন যে, বাহ্যিক কারণে অর্থাৎ, বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদীদের উপস্থিতির কারণে রাশিয়ায় সর্বহারা একনায়কত্বের দরকার ছিল। পরবর্তীতে এই মূল্যায়ন ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ, রাশিয়ায় পুঁজিবাদের পথগামী ক্রুশ্চভ চক্রের ক্ষমতা দখল প্রমাণ করে প্রধানত বাহ্যিক কারণে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কারণের জন্যই সমাজতন্ত্র সংকটে পড়েছিল।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক মালিকানা তখা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুরোনো শত্র“ শোষক বুর্জোয়া শ্রেণী উৎখাত হলেও বৈরী দ্বন্দ্ব থাকবে না, শ্রেণী সংগ্রাম থাকবে না; অতীতের এই ধারণা সঠিক নয়। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ হলেও স্ট্যালিনএর সময় এই সমস্যার সমাধান হয়নি। মাও এই প্রশ্নে অগ্রগতি ঘটান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ব্যক্তিমালিকানার সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর হওয়ার পরও শ্রেণী সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। এই শ্রেণী সংগ্রাম পরিচালিত হবে প্রধানত পার্টির মধ্যকার পুঁজিবাদের পথগামী নব্য বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে এই নব্য বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্বটাই সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রধান দ্বন্দ্ব। শ্রেণী সংগ্রামকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরেই উৎপাদন বাড়ানোসহ অন্যান্য কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে সমাজতন্ত্র কমিউনিজমের দিকে ধাবিত হয়, পুঁজিবাদের দিকে নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে ব্যক্তিমালিকানা না থাকায় শ্রমিক শ্রেণী ও নব্য বুর্জোয়া শ্রেণী উভয়েই পার্টির মধ্যে অবস্থান করে। তাহলে তাদেরকে চিহ্নিত করা যাবে কিভাবে? যেহেতু সমাজতান্ত্রিক সমাজে কোন ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে না সেহেতু সম্পদের দ্বারা শ্রেণীশত্র“ তথা সমাজতন্ত্রের শত্র“ নব্য বুর্জোয়াদের চেনা যায় না। নব্য বুর্জোয়াদের সমাজতন্ত্র বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি এ সময়ে প্রকাশিত হয় শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি ধ্যানধারণা রীতিনীতি তথা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। যেজন্য এই সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। যার জন্য এই বিপ্লবের নাম হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লব আকারে শুরু হলেও অতি দ্রুত তা পুঁজিবাদের পথগামী নব্য বুর্জোয়াদের সাথে কমিউনিজমমুখী শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামে পরিণত হয়। অর্থাৎ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব রাজনৈতিক সংগ্রামে কেন্দ্রীভূত হয়। যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাট পুঁজিবাদীদের চিহ্নি‎ত করা, তাদের বিরুদ্ধে লক্ষকোটি জনগণকে সমাবেশিত করা এবং পুঁজিবাদের পথগামীদের উচ্ছেদ করা। মনোযোগের সাথে সংগ্রামসমালোচনারূপান্তর সুসম্পন্ন করা।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল লক্ষ্য সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লব অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া। তাই মাও সেতুঙ ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, “কয়েক বছর পর সম্ভবত আরেকটি বিপ্লব করতে হবে।” সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনে পুঁজিবাদের পথগামীদের ক্ষমতা দখলকে দশ বছর পিছিয়ে দিয়েছিল। এভাবে মাও সমাজতন্ত্রের অধীনে বিপ্লব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, সমাজতন্ত্র সংক্রান্ত অতীত ধারণার বিকাশ ঘটান। যা না বুঝলে মাওবাদ বোঝা যাবে না। বিশ্বব্যাপী প্রায় একতৃতীয়াংশ জনগণ অধ্যুষিত দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর সেই সব দেশ পুনরায় কেন পুঁজিবাদের দিকে গেল তার বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ ও করণীয় নির্ধারণ করাও সম্ভব হবে না।

আমাদের দেশেও কেউ কেউ প্রশ্ন করেন যে, রাষ্ট্র কিভাবে শুকিয়ে মরবে/শুকিয়ে যাবে লেনিন তো সে বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা ভুলে যান রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের প্রথম দিকেই লেনিন মারা যান। বরং লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থার পুরোপুরি উচ্ছেদ হয়। সামাজিক মালিকানা তথা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়। গ্রামাঞ্চলে কৃষক সমবায় ও রাষ্ট্রীয় কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্প ও বাণিজ্য রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই রূপান্তর সম্পন্ন হয়। পুরনো শোষক শ্রেণীর উৎখাত সম্পূর্ণ হয়।

রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইখানি লেনিন লিখেছিলেন রুশ বিপ্লবের পূর্বক্ষণে সর্বহারা একনায়কত্বের ধারণাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। যাকে (সর্বহারা একনায়কত্ব) মার্কসএঙ্গেল্সের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদী নেতারা সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে রাষ্ট্র ও শ্রমিক বিপ্লব সম্পর্কে একটি সংস্কারবাদী মতবাদ ও কার্যক্রমে পরিণত করেছিল। লেনিন শুধুমাত্র মার্কস কর্তৃক প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতা থেকে সর্বহারা একনায়কত্বের ধারণাকে উপস্থাপনই করেননি বরং একে আরো বিকশিত করেন।

সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ করার মাধ্যমে কিভাবে রাষ্ট্র শুকিয়ে মরবে তার আরও বিকাশের প্রয়োজন ছিল। লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন সে প্রশ্নে কোন অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি। বরং তিনি কিছু বিচ্যুতি করেছিলেন। যাকে মাও পরবর্তীতে রাশিয়ার সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ ও পুঁজিবাদের পুনরুত্থানকে সারসংকলনের প্রক্রিয়ায় বিকশিত করেন। এখানেই শেষ নয়। আজকে কমিউনিস্টদেরকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং চীনেও পুঁজিবাদের পুনরুত্থানকে সারসংকলনের প্রক্রিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সমাজকে কিভাবে সাম্যবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে, তথা রাষ্ট্রকে শুকিয়ে মারা যাবে তাকে মূর্ত করতে চেষ্টা করেন। সুতরাং, লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইয়ে যারা আটকে থাকতে চায় তারা সমাজ বিকাশের গতিশীল প্রক্রিয়াকে বুঝতেই অক্ষম।

এক সময়ের হোক্সাপন্থীরাসহ অনেকেই মাওবাদকে বিরোধিতা করার জন্য যুগের প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে “বাদ” হতে হলে একটি সমগ্র যুগের প্রতিনিধিত্ব করা প্রয়োজন। তারা বলেন : মার্কসবাদ পুঁজিবাদী যুগের ফসল, লেনিনবাদ সাম্রাজ্যবাদী যুগের ফসল। কিন্তু মাওএর কোন যুগ নেই, তাই মাওবাদ বলে কিছু হতে পারে না ইত্যাদি।

যারা এই ধরনের যুক্তি উত্থাপন করেন তারা মার্কসবাদকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। জ্ঞানের বিকাশকে একটি যুগের বিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রয়াস একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। একটি যুগের মধ্যে বিজ্ঞান অনেক স্তরে বিকশিত হতে পারে। যারা যুগের প্রশ্ন তোলেন তাদেরকে সমাজ বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যেতে পারে সাম্রাজ্যবাদী যুগও একটি নতুন যুগ নয়, পুঁজিবাদের উচ্চতম ও মুমূর্ষু স্তর মাত্র। তাহলে পুঁজিবাদী সমাজেও “লেনিনবাদ” বলাটাও যথাযথ হয় না। সাম্রাজ্যবাদী যুগের মার্কসবাদ হচ্ছে লেনিনবাদ যখন এভাবে স্ট্যালিন সূত্রবদ্ধ করেছেন তখন কোথাও বলা হয়নি যে, এই সাম্রাজ্যবাদী যুগে অন্য কোন “বাদ” হতে পারবে না। এ ধরনের উত্থাপিত যুগের যুক্তির দেউলেপনা অত্যন্ত স্পষ্ট।

আবার অনেকে বলে থাকেন, মাও সেতুঙ যে সব বিষয়ে কথা বলেছেন সেই সব বিষয়গুলোতে লেনিন আগেই বলেছেন, মাও কেবল নতুন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। তাই মাওবাদ বলার কোন প্রয়োজন নেই। এভাবে যারা বিতর্ক করেন তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করা যেতেই পারে তাহলে লেনিনবাদ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। বাস্তব সত্য হচ্ছে, গতিশীল বস্তুজগতে মার্কসবাদকে যুগোপযোগীভাবে বিকশিত করেছিলেন লেনিন। তেমনি মাও সেতুঙ বহু দশকব্যাপী চীন বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এই সকল ক্ষেত্রে মৌলিক বিকাশসহ বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে সমাগত একগুচ্ছ সমস্যাবলীর সমাধান ক’রে মার্কসবাদলেনিনবাদকে এক নতুনতর স্তরে উন্নীত করেছিলেন। যাকে সংক্ষেপে “মাওবাদ” বলা হয়।

মাওবাদ না বুঝলে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করা যায় না, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য গণযুদ্ধের সামরিক লাইন নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। একটি দেশে বা পৃথিবীতে বিপ্লবের লাইন নির্ধারণ করতে গেলে বহু দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল তার মধ্য থেকে প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ধারণ, সমাজতান্ত্রিক সমাজে কেন ও কিভাবে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঘটলো এবং কিভাবে সেখানে শ্রেণী সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে এমন অসংখ্য বিষয় মাওবাদ আত্মস্থ করা ছাড়া সমাজ বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়া যায় না, সম্ভব নয়।

তাই, সর্বহারাশ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির মতবাদ হচ্ছে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ। সংক্ষেপে “মালেমা”। যাকে আরো বিকশিত করতে হবে। মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ বিভিন্ন ধরনের সংশোধনবাদকে সংগ্রাম ও পরাজিত করেই বিকশিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের দিকে নিয়ে যেতে হবে।।

কৃতজ্ঞতা: আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements
মন্তব্য

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s