prachanda-nepal-121(মার্কসবাদলেনিনবাদ নিয়ে বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী এবং বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে কোন বিতর্ক না থাকলেও মাওবাদ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কমিউনিজমের জ্ঞান ভাণ্ডারে মাও সেতুঙএর অবদানকে মতাদর্শের পর্যায়ে নেয়া যায় কিনা, বিতর্কটা সেই বিষয়ে। অনেকেই মাওএর অবদানকে স্বীকার করেন, কিন্তু “মাওবাদ” হিসেবে তাকে স্বীকার করেন না। তাদের বক্তব্য এটা চীনের বাস্তবতায় মার্ক্সবাদের সৃজনশীল প্রয়োগ। অপরদিকে, মাওবাদএর সমর্থকদের মতে, মাও সেতুঙএর অবদান মার্কসবাদ, লেনিনবাদের মতোই মাওবাদে উন্নীত হয়েছে এবং এর বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মাওবাদ সাম্যবাদী মতাদর্শকে বিকাশের এক তৃতীয় এবং নতুন স্তরে উন্নীত করেছে। এই আলোচনা শুরু করার আগে আমাদের একটি মানদণ্ডের বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে। সেটা হলো কখন একটি অবদান মতবাদে উন্নীত হয়? মাওবাদীদের বক্তব্য হলো দর্শনঅর্থনীতিরাজনীতিতে মৌলিক অবদান হলেই সেটা মতবাদ হতে পারে। নিম্নলিখিত আলোচনাতে সেটাই দেখানো হয়েছে।

এই বিতর্ক যে শুধু বাংলাদেশেই আছে তা নয়, সারা দুনিয়াজুড়ে এই বিতর্ক চলমান রয়েছে। এই বিতর্কের অংশ হিসেবে তিনটি লেখা আগ্রহী পাঠকদের জন্য দেয়া হলো। প্রথমটি পেরুর কমিউনিষ্ট পার্টি (শাইনিং পাথ)র চেয়ারম্যান অ্যাবিমেল গুজমান গনজালো লেখা; যা দলীয় দলিল হিসেবে প্রকাশিত। এটাই হলো সেই দলিল যেখানে পেরুর পার্টি সর্বপ্রথম মাও সেতুঙএর অবদান, যা মাও সেতুঙ চিন্তাধারা হিসেবে চর্চিত ছিল, তাকে মাওবাদ হিসেবে সূত্রায়ন করেন। দ্বিতীয় লেখাটি নেপালের কমিউনিষ্ট পার্টি সভাপতি প্রচণ্ডএর লেখা। নেপালে মাও বিতর্কের অংশ হিসেবে তিনি এই লেখাটি লিখেছিলেন। আর তৃতীয় এবং শেষ লেখাটি বাঙলাদেশের একজন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি রায়হান আকবরএর লেখা। এই তিনটি লেখার বিষয়বস্তু একই। মতবাদ হিসেবে মাওবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা। আর বিপ্লবী রাজনীতির পক্ষের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই এটি মঙ্গলধ্বনিতে প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বিতীয় লেখাটি। উক্ত তিনটি লেখা আমাদের সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন নূরুর রহমান। মঙ্গলধ্বনি)

শ্রেণীসংগ্রামের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও বিকাশের প্রক্রিয়ার মার্কসবাদ আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবের বিজ্ঞান হিসেবে পরিশ্রুত হয়েছে। সবার কাছে এটা ভালভাবেই জানা ও অবিরাম সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মহৎ এক প্রতিভার যা প্রদর্শন, কার্ল মার্কস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সেই মার্কসবাদী বিজ্ঞানের রয়েছে তিনটি অঙ্গঃ দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। একটি বিজ্ঞান হিসেবে মার্কসবাদের অব্যাহত বিকাশ হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। শ্রেণীসংগ্রামের নয়া অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নের আলোকে লেনিন মার্কসবাদকে তার সামগ্রিকতায় বিকাশের দ্বিতীয়, নতুন স্তরএ উন্নীত করেন অর্থাৎ লেনিনবাদে। আজকে এই বিজ্ঞান সংগ্রামের সেই প্রক্রিয়ায় বিকাশের তৃতীয়, নতুন ও উচ্চতর স্তরে প্রবেশ করেছে। এই তৃতীয়, নতুন ও উচ্চতর স্তরও হচ্ছে মাও সেতুঙ কর্তৃক গড়ে তোলা মাওবাদের স্তর। এভাবে, আন্তজাতিক সর্বহারাশ্রেণীর হাতে আজকে রয়েছে এক সার্বজনীন তত্ত্ব আর সামগ্রিক একক সত্ত্বা হিসেবে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ। আজকের দিনের বিশ্বের মার্কসবাদলেনিনবাদ হিসেবে মাওবাদকে আত্মস্থ না করে কেউই একজন সত্যিকার কমিউনিষ্ট হতে পারেননা। বর্তমান দিনের পৃথিবীর মার্কসবাদলেনিনবাদ হওয়ার কারণেই বিশ্বব্যাপীপ্রতিক্রিয়াশীল ও সংশোধনবাদীরা মাওবাদ ও মাওবাদীদেরকে মারাত্মকভাবে আক্রমন করে চলেছে। মার্কসবাদলেনিনবাদ যেমন সকল প্রকার প্রতিক্রিয়া, সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, একইভাবে মাওবাদ ও কঠিন সংগ্রামের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আমাদের আন্দোলনে, মাওএর অবদানকে মার্কসবাদলেনিনবাদ হিসেবে আত্মস্থ করার চেতনা (স্পিরিট) সত্ত্বেও এসব অবদান ‘মাও সেতুঙ চিন্তাধারা’ সূত্রায়ন দ্বারা বিবৃত হয়ে এসেছে। মাওএর অবদানকে সর্বহারাশ্রেণীর সার্বজনীন তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করে আর “মাও সেতুঙ চিন্তাধারা হচ্ছে আজকের দিনের বিশ্বের মার্কসবাদলেনিনবাদ” এই ঘোষণা করে আমরা প্রতিক্রিয়া ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছি। যাহোক, কমরেড মাওএর মৃত্যু ও চীনের পুঁজিবাদের পুনপ্রতিষ্ঠার পর আর্ন্তজাতিক কম্যুনিস্ট আন্দোলনে ডান সংশোধনবাদের আধিপত্যের সাথে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। আজকে সংশোধনবাদীদের চক্র “মাও সেতুঙ চিন্তাধারা” সূত্রায়ন ব্যবহার করে মাওএর বিপ্লবী শিক্ষার চেতনাকে হত্যা করে আসছে। বর্তমানে একদিকে, সংস্কারবাদীদের দ্বারা ”চিন্তাধারা” শব্দটির প্রকৃত গুরত্ব হিসেবে প্রকল্প অর্থে ”মাও সেতুঙ চিন্তাধারা” সূত্রায়ন ব্যবহৃত হচ্ছে, অপরদিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের দ্বরা সার্বজনীন নীতির অর্থে। এই পরিস্থিতিতে, বৈজ্ঞানিক সূত্রায়ন ”বাদ” তার সার্বজনীন নীতির বিবৃতির গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত থাকা সত্ত্বে ও বিভ্রান্তিকর সূত্রায়ন ”চিন্তাধারা”র ব্যবহার সমেত এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ডান সংশোধনবাদকে পথ প্রদর্শন। তাই, যারা ইতিমধ্যেই ”মাও সেতুঙ চিন্তাধারা” কে আজকের মার্কসবাদলেনিনবাদ হিসেবে আত্মস্থ করে আসছেন, সেই কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের জন্য মাওবাদ সূত্রায়ণ ব্যবহার করা দরকার এখনই ও দৃঢ়ভাবে। চীনে প্রতিবিপ্লবের পর, মাওবাদের উপর ডানপন্থী আক্রমনের ফলশ্রূতিতে প্রাক্তন বিপ্লবীদের অনেকেই ভীত হয়ে ”চিন্তাধারা”কে মাওএর অবদানসমূহের অবমূল্যায়ন অর্থে ব্যবহারে উদ্যত, ও তাকে মার্কসবাদের বিকশের তৃতীয় স্তর হিসেবে ও একটি সার্বজনীন নীতি হিসেবে মানছেন না। সমস্যাটির মূল এখানেই নিহিত। এমন প্রবনতাসমূহ শেষতক সংস্কারবাদ ও সংশোধবাদের দিকে চালিত করে। এই পরিস্থিতির কারণে, মাও কর্তৃক বিকশিত মার্কসবাদের তিন অঙ্গের বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজনীতা আর “মাওবাদ” সূত্রায়নের ব্যবহারের তাত্ত্বিক গুরুত্ব আরো বেড়েছে। তাই, যা মার্কসবাদকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছে, দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে মাও কৃতগুরুত্বপূর্ণ অবদানসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে তুলে ধরা অপরিহার্য।

. দর্শনের ক্ষেত্রে

. দ্বান্দ্বিক বস্তবাদের সারবস্তু হিসেবে এবং প্রকতি, সমাজ ও মানবজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রে দ্বন্দবাদের মৌলিক নিয়ম হিসেবে মাও দ্বন্দ্বের নিময় (ল অব কন্ট্রাডিকশন) প্রাতষ্ঠা করেছেন। দ্বন্দ্বের সার্বজনীনতার বিশ্লেষণ এবং প্রধান দ্বন্দ্ব নিধারণের প্রক্রিয়া ও গুরুত্ব দ্বন্দ্ববাদের উপলব্ধির বিকাশকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে। বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল সূত্রায়নে দ্বন্দ্বের মৌলিক নিয়মের পালনকৃত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বতঃসিদ্ধ।

. শ্রেণীসংগ্রাম, উৎপাদনসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাকে জ্ঞানের উৎস নির্ণয় করে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের যৌক্তিক জ্ঞানে রূপান্তবের প্রক্রিয়ার তাঁর বিশ্লেষনের মাধ্যমে, আর তত্ত্ব ও অনুশীলনের আন্তসম্পর্ক নিধারণ করার মাধ্যমে জ্ঞানের তত্ত্বের জগতে মাওএর বিশ্লেষণ যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে তা তর্কাতীত সত্য।

. সংশোধনবাদবিরোধী সংগ্রামের সময়কালে দ্বন্দ্ববাদের প্রধান দিক হিসেবে এক নিজেকে দুয়ে বিভক্তকরণএর গভীর বিশ্লেষন ও প্রয়োগ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিপ্লবীদের হাতে এক ক্ষুরধার অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।

. ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর আন্তসম্পর্ক সংক্রান্ত আধিবিদ্যক ও একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি সমেত “উৎপাদিকা শক্তির তত্ত্ব” ও “অর্থনীতিবাদ” সংক্রান্ত সংশোধনবাদী বুর্জোয়া চিন্তাকে আক্রমণের মাধ্যমে, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সচেতনতা ও উপরিকাঠামো যে নির্ধারক ভুমিকা পালন করে সেই বিশ্লেষণের দ্বারা ভন্ড বুজোয়াদের উম্মোচন করেছে।

. দার্শনিকদের গ্রন্থাগার ও অধ্যয়ন কক্ষের বাইরে দর্শনকে নিয়ে আসার মাধ্যমে এক অপরাজেয় অস্ত্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয়তার ওপর মাওএর পরীক্ষানিরীক্ষা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনকে এক প্রচণ্ড বন্তুগত শক্তিতে পরিণত করার ভিত্তি যুগিয়েছে।

. রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে

. এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও তার চরিত্র বিশ্লেষন হচ্ছে মাওএর একটি গুরত্বপূর্ণ আবিস্কার। নিপীড়িত দেশগুলিতে সামন্তবাদের সাথে জোট বেঁধে একচেটিয়া পুঁজিবাদের এজেন্ট হিসেবে জনগনের ওপর শোষণ চালায় যে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ তার চরিত্র নিরূপণ একদিকে নয়া উপনিবেশবাদের রূপে সাম্রাজ্যবাদের অমানবিক চরিত্রকে উম্মোচনে সহযোগিতা করেছে, অন্যদিকে নিপীড়িত জাতিগুলির বিপ্লরের নিশানা স্পষ্ট করতে সহযোগিতা করেছে। কেবলমাত্র আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের ধ্বংস ও এ ধরনের সম্পত্তির বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমেই সাম্রাজ্যবাদকে নিপীড়িত দেশগুলি থেকে বিতাড়িত করা যায় ও সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা যায় – এই উসংহারের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ পরিস্কার।

. সমাজতান্ত্রিক স্তরে অর্থনীতির মূল নীতিগুলোর একটি দৃঢ় ভিত্তি গঠনে মাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন (সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতার একটি সমালোচনামূলক অধ্যয়ন সহকারে)। “বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরো, উৎপাদন বাড়াও” এবং “লাল ও দক্ষ” শ্লোগানের বিপ্লবী তাৎপর্য এই দৃষ্টিভাঙ্গী সহকারে তুলে ধরা হয়েছে যে আমলাতান্ত্রিক নির্দেশ দ্বারা নয় বরং জনগনের উদ্যোগ বাড়ানোর মাধ্যমেই (সঠিক অথনৈতিক কর্মনীতির ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে) সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি দৃঢ়ভাবে নির্মাণ করা যায়; এটা স্বতঃপ্রমানিত।

. নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রেক্ষপটে “যে জমি চাষ করে তার হাতে জমি”এর ভিত্তিতে সামন্তবাদকে ধ্বংস করা, সকল দেশী ও বিদেশী একচেটিয়া চরিত্রের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলো বাজেয়াপ্ত করা, জনগনের জীবনকে নিয়ন্ত্রন করেনা এমন ব্যক্তিপুঁজির সীমিতকরণ, নিয়ন্ত্রন ও পরিচালনা, প্রভৃতি অথনৈতিক কর্মনীতিগুলোর যৌক্তিকতা ব্যবহারিকভাবে প্রমানিত হয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মাও যেসব বিকাশ সাধন করেছেন তা ওপরের তথ্যগুলো থেকে সম্পূর্ণ পরিস্কার।

. বৈজ্ঞানিক সামজতন্ত্রের ক্ষেত্রে

. নিপীড়িত দেশগুলিতে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সামগ্রিক ধারণার বিকাশে মাওএর ঐতিহাসিক অবদান সবার কাছে স্পষ্ট।

. সাম্রাজ্যবাদের যুগে শ্রেণীসংগ্রামের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মার্কসবাদী সামরিক বিজ্ঞানের শিখর হিসেবে গণযুদ্ধের তত্ত্বের বিকাশের মাধ্যমে আন্তজাতিক সর্বহারাশ্রেণী এক শক্তিশালী অস্ত্র দ্বারা সজ্জিত হয়েছে। এই তত্ত্ব শক্তিধর শত্রুকে পরাজিত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পরিস্কার করে দেখিয়েছে।

. সমাজতন্ত্রের সমগ্র পর্যায় ধরে অব্যাহত শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্ব আর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবিপ্লবকে মনে রেখে এ থেকে সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে বিপ্লবকে অব্যাহত রাখার যে তত্ত্ব মাও বিকাশিত করেন তা সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে পুঁজিবাদের পুণপ্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ করতে এক প্রচণ্ড শক্তিধর তত্ত্বগত অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সর্বহারা নেতৃত্বের অধীনের পরিচালিত তৃতীয় মহাবিপ্লব হিসেবে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সামগ্রিক পরিকল্পনার সফল প্রয়োগ বিশ্ব সর্বহারাশ্রেণীর জন্য ঐতিহাসিক আলোকবার্তিকা।

. মাওএর এই উক্তি যে “সাম্রাজ্যবাদ ও সকল প্রতিক্রিয়াশীলরা হচ্ছে কাগজের বাঘ” এবং “সামনের ৫০ থেতে ১০০ বছর” বিশ্ব মহা উত্থানসমূহের মধ্যদিয়ে যাবে।”এর তুলনাহীন গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ব সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবের রণনীতির সূত্রায়নে তা মহান অবদান রেখেছে। মাও নিজে রুশ সংশোধনবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় এগুলো ব্যবহার করেছেন।

এভাবে দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রএই তিনটি অঙ্গের সামগ্রিকতায় মাও মার্কসবাদী বিজ্ঞানকে গুণগতভাবে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে, মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদের একক অস্ত্র রূপে সর্বহারাশ্রেণী তার মুক্তির তত্ত্ব অর্জন করেছে।

নেপালী কমিউনিস্ট আন্দোলনে ‘মাওবাদ’ সূত্রায়ন ব্যবহারের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে এমনকি মাওএর অবদানগুলোকে অবমূল্যায়ন করার লক্ষ্য থেকে। তাদেরকে খন্ডন করা ছাড়া সামনের দিকে এগোনো সম্ভব নয়।

প্রাথমিকভাবে সেগুলো নিম্নরূপ

. “যুগ সংক্রান্ত তত্ত্ব”: কিছু লোক বলেন যে একাট “বাদ” গঠিত হতে হলে তাকে একটি সমগ্র যুগকে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। তাদের বক্তব্য অনুসারে, মার্কসবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের যুগের ফল, আর লেনিনবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের যুগের ফল কিন্তু মাওএর কোন যুগ নেই, তাই কোন মাওবাদ পারেনা ইত্যাদি।

যারা এমত ব্যক্ত করেন তারা না বুঝতে পেরেছেন বিজ্ঞানের সাধারন নিয়ম ও বিকাশ প্রক্রিয়া, না মার্কসবাদকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে আত্মস্থ করেছেন। একটি যুগের বিকাশের গতির সাথে বিজ্ঞানের বিকাশকে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে চরমভাবে অবৈজ্ঞানিক ও হাস্যকর। একটি একক যুগে বিজ্ঞান বিভিন্ন স্তরে বিকশিত হতে পারে। সমাজের বিকাশের দৃষ্টিকোন থেকে কেউ যদি সত্যিই যুগের কথা বলেন, সাম্রাজ্যবাদ কোন নতুন যুগ নয় বরং পুঁজিবাদের উচ্চতম ও মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থা। সুতরাং, ‘লেনিনবাদ’ বলাটা সঠিক নয়! যুগের বক্তব্যে অগ্রসর হওয়ার তাদের প্রতারণা এভাবে পরিস্কার হয়।

. কেউ কেউ বলেন, যেহেতু মাওএর কোন আসল অবদান নেই, তাই ‘মাওবাদ’ সূত্রায়ন ব্যবহার করা সঠিক নয়। তাদের বক্তব্য অনুসারে, মাও যা কিছু বলেছেন তা লেনিন আগেই বলেছেন। এই পরিস্থিতি অধিকতর মারা ত্মক রূপ পরিগ্রহ করে যখন ‘চিন্তাধারা’ সূত্রায়ন ব্যবহারের সমর্থনকারীরা এভাবে বলেন। সন্দেহ নেই, যেসব লোক এভাবে কথা বলেন তারা এমনকি ‘মাও সেতুঙ চিন্তাধারা’ বর্জন করার রাস্তা ধরেছেন ও ডান সুবিধাবাদের দিকে যাত্রা করেছেন। মাওএর অবদানসমূহকে ইতিমধ্যেই সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। যাহোক, প্রশ্নটি উঠতে পারে যদি কেউ এভাবে বক্তব্য রাখেন, এটা বলবেন কি যে লেনিন মার্কসবাদকে এক নতুন পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছেন? কেন এ ধরনের লোক মাও সেতুঙ চিন্তাধারকে তাদের পথনির্দেশক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে? উত্তর খুবই সহজ, আর তা হচ্ছে, জনগণকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত করতে। তা না হলে, হয় তাদেরকে মাও সেতুঙ চিন্তাধারকে পার্টির পথনির্দেশক নীতি হিসেবে বর্জন করতে হবে অথবা মাওএর অবদানকে অবমূল্যায়ন করার কাজ বন্ধ করতে হবে।

. কিছু লোককে এভাবে বলতে শোনা যায়: তড়িঘড়ি মাওবাদ বলাটা আমাদের উচিত নয়, কেউ এমন একটি বড় ইস্যুতে আমাদের কথা শুনবেনা, সেই সূত্রায়নের প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব নয়, আর এগুলো অপ্রয়োজনীয় বির্তক সৃষ্ট করবে। এধরণের উক্তি যারা করেন তাদের চিন্তায় যদি সততাও থাকে, এই বক্তব্যগুলো নিজেই মার্কসবাদী পদ্ধতির সাথে অসংগতিপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এবং তড়িঘড়ির না অথবা কোন তড়িঘড়ি নয়। [এ বাক্যটির ইংরেজী অনুবাদ অসম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদক]। এসব বক্তব্য বেঠিক, কারণ তা অপ্রয়োজনীয় আপোষে চালিত করতে এবং বিভ্রম ছড়াতে কাজ করবে।

উপসংহারে, উচ্চতর পর্যায়ে সংশোধনবাদবিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করতে, এক নতুন ধরণের জঙ্গী কমিউনিষ্ট পার্টির বিকাশের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে, আর বিপ্লবী সংগ্রাম ও গণযুদ্ধের বিকাশের কাজে এক নতুন গতি দিতে বিভ্রান্তিকর সূত্রায়ন ‘মাও সেতুঙ চিন্তাধারা’র ব্যবহার নয় বরং বৈজ্ঞানিক সূত্রায়ন ‘মাওবাদ’ পরমভাবে প্রয়োজন।

Advertisements
মন্তব্য

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s