লিখেছেন: সৌম্য মণ্ডল

mittha-1জাস্ট একটা ন্যানো মিথ্যা, “অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ”, তাতেই নাকি যুধিষ্ঠিরকে একবার নরকে ঢুঁ মেরে যেতে হয়েছিল। তাহলে হে পাঠক, আপনি তো অবধারিতভাবেই ভাজা ভাজা হতে চলেছেন!

নরকের ফুটন্ত কড়াই আর এক বিরাট কাঁটা চামচ হাতে সিং এবং লেজওয়ালা লোকটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। শুধু কি আপনি? দুনিয়া শুদ্ধু লোক নরকে ঢুকতে চলেছে। বিছানায় হিসু করে বাবা বা দাদার ঘাড়ে দোষ চাপানো লজ্জিত শিশু হোক; হল কালেকশান করে নিতান্ত পাস; বা হাতেগোনা কযেকটি প্রশ্ন মুখস্ত করে ফাস্ট ক্লাস বাগানো স্বঘোষিত সবজান্তা হোক; তেলচিটে প্রেমিক বা ঘ্যানঘ্যানে প্রেমিকাকে এড়াতে অহেতুক busy busy হাব ভাব করনেওয়ালারা হোক; ব্রিগেড বা মহামিছিলে লোক সংখ্যা বাড়িয়ে বলা নেতা হোক; বন্যারেল দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা কমিয়ে বলা সরকারি আমলা হোক; যাবতীয় ধরনের মিথ্যাবাদীগণ; বলা ভালো সমস্ত জনগণ নরকে ভাজা ভাজা হবে অবধারিত। যদি না নরক ব্যাপারটা বাস্তবিকই মিথ্যা না হয়ে থাকে।

ঘটনা হচ্ছে এই যে, কোনো দ্বন্দ্বমান দিক একাকী থাকতে পারেনা। বিপরীত দিকের অস্তিত্ব ছাড়া, প্রত্যেকটি দিক তার অস্তিত্বের শর্তই হারিয়ে বসে। ভেবে দেখুন তো, কোনো বস্তুর বা মানুষের মনে কোনো ধারণার কোনো একটা দ্বন্দ্বমান দিক কি স্বাধীনভাবে থাকতে পারে?” – মাও সেতুঙ

মিথ্যা এবং সত্যি একে অপরের উপর নির্ভরশীল, একটা না থাকলে অন্য টার অস্তিত্ব থাকবেনা। সত্যিমিথ্যে, একে অন্য কে জড়াজড়ি করে বেঁচে থাকে, তাই মিথ্যা নিয়ে লিখতে গেলে সত্যি নিয়ে না লিখে পারা যায় না।

২০০৬ সালে United Nations যখন বিশ্বায়নকে jobless growth, ruthless growth, voiceless growth, rootless growth, and the futureless growth বলছে; তখন বাংলার সরকারি কমিউনিস্টরা বিশ্বায়নের হাত ধরে লক্ষলক্ষ বেকারের চাকরির কথা বলছেন। বোঝানো হয়েছিল এ পথে গুজরাট এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের এগুতে হবে। ক্ষমতার বাধ্যবাধকতা মোদীর গুজরাট মডেল আর বামএর বেঙ্গল মডেলকে মিলিয়ে দিল বোঝা গেল, তথাকথিত “বাম বিকল্পের” আসল তাত্পর্য। তৃতীয় বিশ্বের যাবতীয় শাসক স্বৈর বা গণ, কেন্দ্র বা রাজ্য, এসিও বা ল্যাটিন সবাইকে মিলিয়ে দিল উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মিথ্যের আড়ালে উচ্ছেদ, শ্রমিককর্মচারী ছাটাই, কৃষক আত্মহত্যা, গণহত্যা, লুম্পেন বুর্জোয়ার দাপাদাপি, কিছু একটা করে বেছে থাকা লুম্পেন সর্বহারার বিস্তারের সত্যি।

কৃষির উন্নয়নের মিথ্যের আড়ালে বহুজাতিক কোম্পানির সার, বীজ, কীটনাশক, সংকর মুরগী, গরু, শুয়রের বাজার তৈরী, দেশীয় প্রজাতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস, বিষাক্ত খাবারের সত্যি। আর এই পরিবেশের গণ্ডগোল ও বিষাক্ত খাবারের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বহুজাতিকের অসুধ ব্যবসা, চারিদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ব্যবসায়িক হাসপাতালের সত্যি। আর এই সত্যি আবার সেঁধিয়ে থাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের মিথ্যার মধ্যে।

উন্নয়নের মিথ্যার আড়ালে বহুজাতিক পুজির আগ্রাসনের সত্যি মেনে না নিলে নির্বাচন প্রচারে ফান্ড না পাওয়া বা সরকার উল্টে যাওয়ার সম্ভবনার সত্যি। আর এতসব সত্যিমিথ্যে জড়িয়ে থাকে সরকার গঠনের সত্যির সাথে। যা মানুষকে দেখায় চাইলেই সরকার বদলানো যায়, কিন্তু আড়াল করে স্থাইএলিট আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। গণতন্ত্রের মিথ্যের আড়ালে শ্রেণী একনায়কত্বের সত্যি। বৃহত্তর গণতন্ত্রের মিথ্যার আড়ালে গ্রামাঞ্চলে গান ফাইট, কারখানায় বা ইউনিভার্সিটিতে গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি প্রতিবাদ করলে ছাঁটাই, সাসপেনসন, অসহিষ্ণুতা, মিথ্যা মামলার সত্যি। প্রগতি, সুপার পাওয়ার, শাইনিং ইন্ডিয়া আড়ালে আধাসামন্ততান্ত্রিক, আধাঔপনিবেশিক সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনৈতিক শোষণের সত্যি।

স্বাবাভিক চাপ ও তাপে কোনো প্রাপ্তমনস্ক মানুষ পুলিশকে বিশ্বাস করে কী? বিশ্বাস করে কী মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্ট, বিচারব্যবস্থা, ইউনিভার্সিটি ভিসি কাউকে??

মানুষ কি কম দিনে বিপুল সুদের ভেলকি, চিটফান্ড বিশ্বাস করে চোখ বন্ধ করে? না করলেও টাকা রাখে। কারণ প্রলোভনের ফাঁদে পা দেওয়ার বাস্তবতা সমাজে উপস্থিত। যার ফলে চিটফান্ড হোক; ভোটবাজ নেতা হোক; লিঙ্গবর্ধক যন্ত্র হোক; বা তাবিকব সে বিশ্বাস করতে চায় “যেন এটা সত্যি হয়”!

এক ধরনের উঁচুদরের মানুষ জোরের সঙ্গে “সবই আপেক্ষিক” বলতে ভালবাসেন। কথাটা একেবারেই অর্থহীন। কারণ, সবই যদি আপেক্ষিক হতো তাহলে আপেক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করার মতো কিছু থাকতো না…”বার্ট্রান্ড রাসেল

মানুষ অজ্ঞানতা বা মিথ্যার ধাঁধাঁকে ভেদ করে বারবার সত্যিকে জেনেছে। আর সেই প্রাকৃতিক অনিবার্যতার সত্যজ্ঞানকে কাজে এগিয়ে সে তার নিজস্ব স্বাধীন দুনিয়া গড়েছে। চাকা বানিয়ে গরগর করে এগিয়ে গেছে, লাইটার বানিয়ে আরামসে বিড়ি ধরিয়েছে, গ্র্যাভিটিকে জিভ ভেঙচিয়ে আকাশে উড়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। যতো দিন গড়িয়েছে, পুরোনো সত্যের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষ এগিয়েছে, আরো গভীর সত্যের দিকে। নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা যখন বস্তুর স্বরূপ, বস্তুর অস্তিত্ব, সত্যজ্ঞানের সম্ভাব্যতার বিষয়ে যখন ঘেঁটে লাট, তখন এই দার্শনিক সংকট থেকে বস্তুবাদকে রক্ষা করলো লেনিনএর বিখ্যাত বই “মেটিরিয়ালিসম এন্ড ইম্পেরিয় ক্রিটিসিম”।

লেনিন দেখালেন, সত্যি হলো পিঁয়াজের অনন্ত খোসা ছাড়িয়ে আরো গভীর থেকে গভীরে যাত্রা করার মতো। মানুষ অনেক কিছু জানতো না, যা জেনেছে; অনেক কিছু এখনো জানে না, যা জানবে।

সত্যি হলো মানব চেতনা, যা প্রয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষিত। মানুষের মনে সত্যের সৃষ্টি হলেও, সত্য সবসময় বস্তুগত। কারণ, সত্যের ভিত্তি হলো জাগতিক বাস্তবতা, যা মানব চেতনার বাইরে অবস্থান করে।

কোনো কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বা বদলাতে হলে, সেই সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের প্রয়োজন। আর যদি বোঝানো যায় যে, সঠিক জ্ঞান সম্ভব নয়; বা জগ হলো মায়া; বা সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই; তাহলে সেটা স্থিতাবস্থার পক্ষে, রক্ষণশীলতার স্বার্থ রক্ষা করে নাকি?

সত্যিকে না জানা হলো ভুল জানা। অথবা সত্যিটা যতোটুকু জানি, বাকিটা জানিনা বা ভুল জানি। কিন্তু বাস্তব জগতে মিথ্যের অস্তিত্ব নেই। সত্যিকে ইচ্ছাকৃতভাবে যখন লুকোনো হয়, তখন সেটা মিথ্যা। কিন্তু কেন মিথ্যার প্রয়োজন হয়? সত্যি যখন ব্যক্তি বা শ্রেণী স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন অসঙ্গতিকে এড়াবার জন্যই প্রয়োজন হয় মিথ্যার।

মানুষ তাদের কাণ্ডজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তাকে যে ব্যবহার করছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এমন একটা জায়গায় ব্যবহার করছে, যার কোনো অর্থ নাই এবং অর্থ নাই বলেই এর এতো বৃদ্ধি। জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান করার কোনো ক্ষমতা নাই বলেই, তারা অর্থহীনতায় মগ্ন। কারণ, ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে অন্যকোথাও।” নোম চমস্কি

আফ্রিকার সেই কাফির বা ডারউইনএর দ্যাখা অস্ট্রেলিয়ার সেই আদিবাসীরা বা উন্নত জটিল উত্পাদন ও বন্টন ব্যবস্থার থেকে দুরে থাকা সেইসব মানুষেরা; যাদের মধ্যে শিকারীরা শিকার করে আগে গোষ্ঠির সবাইকে খাওয়ায়, তারপর নিজে খায়; বা যাদের একটা প্যান্ট উপহার দিলে সেটা সবাই মিলে কেটে কেটে ভাগ করে নেয়; যেখানে ব্যক্তি একে অপরকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেনা তাই A এবং B একে অপরকে আদর করলে C-এর কাছে লুকোবার কোনো কারণ থাকেনা; যেখানে টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রতিদিন শেখানো হয়না যে, হরলিকস না খাওয়ালে তুমি দায়িত্ববান মা নও; তুমি যদি কালো হও, বা দামী স্মার্টফোন, গাড়ি, ক্ষমতাবান বা সেলিব্রিটি আত্মীয় না থাকলে; বা তোমার অনেক টাকা আয় না থাকলে তোমার অস্তিত্ব সংকট অনিবার্য সেখানে এইসব বিয়ে মিথ্যে বলার প্রয়োজন নেই, না আছে এই বিয়ে সত্যি অনুসন্ধানের প্রয়োজন। সত্যি ঢাকার প্রয়োজন না থাকলে মিথ্যার অবলুপ্তি অনিবার্য। কিন্তু বিশেষ সামাজিক অবস্থা, সামাজিক অসঙ্গতি মানুষের মাথায় মিথ্যাকে অপরিহার্য করে তোলে।

যদি প্রশ্ন তোলা হয় যে, স্কুলপাঠ্য ভূগোল বইয়ে ভারতবর্ষে যেভাবে বনজ, খনিজ, কৃষিজ ইত্যাদি সম্পদ ছড়াছড়ি আছে বলে দাবি করা হয়, তবে দেশের মানুষ গরিব কেন? বা আমরা যা যা ব্যবহার করি, তার সমস্ত উপাদানই প্রকৃতিতে থাকলে এবং সেইসব কাঁচামালের সাথে শ্রম যুক্ত হওয়ার পরেই তা ব্যবহার যোগ্য এবং মুল্যবান হলে; যারা শ্রম করে, তারা কেন সেই মূল্যের নগণ্য অং পায় এবং যারা কিচ্ছু শ্রম করে না, তারা মূল্যের অধিকাংশ কিভাবে ভোগ করে?

সামাজিক ব্যবস্থার বুনিয়াদেই যে অসঙ্গতি, তাকে ঢাকতে ভরসা মিথ্যা, ভরসা ধর্মগ্রন্থ, জালিয়াত বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া, আর এইসব কাজ না করলে তখন UAPA স্বৈরকানুন, অপারেশন গ্রীনহান্ট, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মিথ্যার আড়ালে লোক দেখানো গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়ার সত্যি। আর কে না জানে যে, একটা মিথ্যা আরো অনেক মিথ্যার জন্ম দেয়, জন্ম দেয় মিথ্যা জালিকার, রাষ্ট্রীয় স্তর থেকে পরিবার, ব্যক্তিগত স্তরের মিথ্যা। আর একসময় বাড়তে থাকা দ্বন্দ্ব, অসঙ্গতির ফলে মিথ্যার পাহাড় তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যায়। অনেক মিথ্যা বলেও কিছু মিথ্যাকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় জেল, পুলিশ, মিলিটারি দিয়ে আর সত্যের গভীর থেকে গভীরে যাত্রা মানুষকে মানুষ করে তুলেছে, ভেঙ্গে ফেলেছে বহু প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা, শোষকের দাম্ভিক শাসন।

একটা জিনিস আমি বুঝেছি

একটা মিথ্যা কবিতা যত মিথ্যা কথা বলতে পারে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও তা বলতে পারেনা

কিন্তু একটা সত্যি কবিতা

ঘুমন্ত শিশুদের সারা রাত বিমান আক্রমন থেকে আড়াল করে নবারুণ ভট্টাচার্য

——————

সূতানুটি আহীর পত্রিকার ২০১৫ বইমেলা মিথ্যে সংখ্যায় প্রকাশিত।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s