সারা বিশ্ব জুড়ে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের রাজনীতি :: রূপপুর এবং জনগণের নিরাপত্তা

Posted: জানুয়ারি 24, 2015 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: নেসার আহমেদ

Fukushima-nuclear-disaster২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়া সফর করেন। ওই সফরে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত একটা ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়। যা আমরা কমবেশি সবাই জানি।

ওই একই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে রাশিয়ার আরেকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। যাকে পরমাণুশক্তি নির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প চুক্তি বলা হচ্ছে। যা ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয় যে, রূপপুরে একটি নয় দুই দুইটি পরমাণুশক্তি নির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হবে। যার এক একটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১০০০ মেগাওয়াট করে। তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৪,০০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি করা হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। যার ৯০ ভাগ বহন করবে রাশিয়া। আর ১০ ভাগ বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এখানে যে রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবে তার নাম VVER-1000। যা নাকি সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মধ্যে টিকে থাকতে সক্ষম। এ ভাষ্যটি অবশ্য রাশিয়ানদের।

আলোচনার শুরুতেই বলে নেয়া ভালো যে, নতুন কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক সৃষ্টি করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমাদের মূল জিজ্ঞাসা হলো দেশের জনগণ ও প্রাণবৈচিত্র্যের নিরাপত্তা নিয়ে। অর্থাৎ খোলামেলা ভাষায় বলতে গেলে, যদি কখনো এই প্রকল্পে কোনো দূর্ঘটনা ঘটে, তা হলে তার পরিস্থিতি কি দাঁড়াতে পারে? এবং সেটা সামাল দেয়ার মতো অবস্থা বাংলাদেশের আছে কি না? আমাদের প্রশ্ন সেগুলি ঘিরে। আর প্রশ্নটা আমাদের জন্য এ কারণে জরুরি যে, বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ হলো এমনি একটা রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে প্রথম সারির। আবার প্রযুক্তিগত দিক থেকে সব থেকে পিছিয়ে পড়া দেশের কাতারে পড়ে। ঠিক এরকম একটি দেশে সম্পূর্ণ বিদেশী প্রযুক্তি ও কারিগর নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আদতেই প্রয়োজন রয়েছে কিনা, তা ভেবে দরকার। কারণ নিউক্লিয়ার চুল্লির প্রযুক্তি এখনও কোনো শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নি। বা এটা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে স্থির মাত্রায় পৌঁছাতে পারে নি। অর্থাৎ, তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি যতটা স্থির মাত্রায় বর্তমানে পৌঁছে গেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেই দাবি করা চলে না। নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি ও নকশা বদল করেও পার পাওয়া যাচ্ছে না। এর পরেও দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। এবং এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে নানান দিক থেকে জনজীবনের ঝুঁকি সরাসরি সম্পর্কিত। তার ওপর যে রাশিয়ান প্রযুক্তির উপরে ভর করা হচ্ছে, যে প্রযুক্তি নিয়ে এতো বড়াই করা হচ্ছে, খোদ ওই দেশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পারমাণবিক দুর্ঘটনার ইতিহাস। ফলে আমাদের মতো দেশে যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা দেয়া হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে নানামাত্রিক প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ফলে আলোচনটি আমরা নানামাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তুলে ধরার চেষ্টা করব।

পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং তার রাজনীতি

বর্তমান বিশ্বে আরো আনেক কিছুর মতোই পরমাণু বিদ্যুতেরও একটা রাজনীতি রয়েছে। আলোচনার শুরুতেই এটা আমাদের মাথায় রাখা দরকার। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আমেরিকানরা ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়। অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষকে খুন করা হয়। যা আমরা সবাই কমবেশি অবগত। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো – ‘শহর’ নির্বাচন। আমেরিকানরা কিন্তু জাপানের রাজধানী টোকিওতে ওই বোমা হামলা চালায় নি। অর্থাৎ জাপানের যে শহরে ধনিক শ্রেণীর বসবাস, রাজনৈতিকদের বসবাস, যারা যুদ্ধ পরিচালনা করে, তাদেরকে অক্ষত রেখে এমন দুইটি শহর বেছে নেয়া হয়, যেখানে বসবাস ছিল শ্রমজীবী মানুষদের। এখানে মূলত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করেছিল। এক, শ্রেণীর প্রশ্ন। দু্‌ই, জাপানের শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকে সোভিয়েত বিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক ভাবমানসকে গুড়িয়ে দেয়া।

মার্কিনিরা সেদিন এই পারমাণবিক বোমা হামলা চালিয়ে ছিল জেনেভা প্রোটোকলকে অস্বীকার করে। ১৯২৫ সালে বিশ্বের যে ১৪৬টি দেশ জেনেভা প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেছিল, তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ছিল। ওই প্রোটোকলে বলা হয়েছিল, সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলি যুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস, রাসয়নিক ও জৈব অস্ত্রের ব্যবহার করবে না। এই জেনেভা প্রোটকল ভেঙে মার্কিনিরা জাপানে আক্রমন চালায়।

এর পরে ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘ গঠিত হয়। যার সনদে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করে। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের সাধারণ সভার প্রস্তাব অনুসারে একটা পরমাণু কমিশন (Atomic Energy Commission) গঠন করা হয়। একই বছরের জুন মাসে এই কমিশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বার্নার্ড বারুখ পরমাণবিক অস্ত্রপ্রসার রোধে ও নিরস্ত্রীকরণের জন্য একটি প্রস্তাব পেশ করে। যে প্রস্তাবে বলা হয়, পরমাণুশক্তি সম্পর্কিত যে কোনো কার্যকলাপ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্তৃত্বাধীন থাকবে। পরমাণু শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল থেকে শুরু করে, জনহিতকর কাজে পরমাণু শক্তির ব্যবহারের জন্য গবেষণা ও কর্মসূচী, পারমাণবিক অস্ত্রের বিলোপ ইত্যাদি সমস্ত ব্যপারে এই সংস্থা (International Atomic Development Authority) স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখবে। এই সংস্থার কার্যকলাপে কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। এমন কোনো অবস্থার উদ্ভব হলে সেই দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সংস্থার কর্তৃত্ব অন্যান্য দেশ মেনে নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র ওই সংস্থার হাতে তুলে দিবে। সেগুলির ভবিষ্যত ওই সংস্থা ঠিক করবে।

ওই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো। তিনি পাল্টা প্রস্তাব আনেন। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রের উৎপাদন ও প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হোক। একই সাথে মার্কিনিদের পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্তি করা হোক। আমেরিকানরা এই প্রস্তাবে রাজি হয় নি। ফলে ওই আলোচনা খুব বেশিদূর অগ্রসর হয় নি। ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালের ২৯শে আগস্ট পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় এবং তার মধ্য দিয়ে আমেরিকানদের বারুখ পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। তারপরেও ১৯৫০ সাল থেকে আমেরিকার রণনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অস্ত্রসংবরণ নামে এক তত্ত্বের ওপর জোর দেয়। যাকে তারা নামকরণ করে ‘নিরস্ত্রীকরণ’ প্রক্রিয়া। যার মূল লক্ষ্য হবে বিশেষ অস্ত্রের উৎপাদন হ্রাস। কিছু অস্ত্রের বিলুপ্তি। কিছু অস্ত্রের প্রয়োগ পদ্ধতি অথবা প্রয়োগস্থল এবং পরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। কার্যতঃ মার্কিনিদের এই পরিকল্পনাও বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে নি। এর অন্যতম কারণ হলো ১৯৫১ সালে জাপান ও আমেরিকার মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়। যে চুক্তি অনুসারে, জাপান তার প্রতিরক্ষার জন্য প্রকৃত অর্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। জাপানে মার্কিনিদের সামারিক ঘাঁটি গড়ে ওঠে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে তারা সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করে। এবং ১৯৫১ সালেই আমেরিকা এমন ধরনের বোমারু বিমান আবিস্কার করে, যেগুলি একটানা উড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে বোমাবর্ষণ করে ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়।

এরপর ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘে একটি বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। যে সভার বিষয়বস্তু ছিল – ‘পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ’ ব্যবহার। সভা আহবান করা হয়েছিল আমেরিকার পক্ষ থেকে। প্রধান উদ্যোগী ছিলেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ার। আবার তিনিই ছিলেন সভার মূল বক্তা।

এর পরে ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালে জেনেভায় পর পর দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। যার উদ্যোক্তা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনিদের এই উদ্যোগ দেখে মনে হতে পারে তারা শান্তির জন্য কতোই না প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিল! কিন্তু বিষয়টি আদতেই এমন ছিল না। ১৯৪৯ সালে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণ না ঘটাতো, তা হলে হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ভূমিকা দেখা যেতে না। এর অন্যতম কারণ হলো হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার বিস্ফোণের পর যে আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। সেটা কোনোভাবেই মার্কিন প্রশাসনের পরমাণু অস্ত্রকর্মসূচিকে প্রভাবিত করতে পারেনি। মার্কিনিরা তাদের ‘ম্যানহাটন প্রকল্প’ থেকে সরে আসে নি। তারা স্পষ্টই বুঝেছিল যে, আগামীদিনে পরমাণু অস্ত্রের কর্মসূচীকে চালিয়ে যেতে হলে পরমাণু চুল্লিতে তৈরি হওয়া প্লুটোনিয়ামের ওপর নির্ভর করতে হবে। যেহেতু ইউরোনিয়ামের আহরণ ও সমৃদ্ধিকরণ যেমন ব্যয়সাপেক্ষ এবং তেমনি সময়সাপেক্ষ। দ্বিতীয়ত, একই সাথে পরমাণু চুল্লিতে যে পরিমানে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। তা আর্থিক দিক থেকে লাভজনক না হলেও মোট খরচের একটা অংশ উঠে আসবে। এই পরিকল্পনা সামনে রেখে ১৯৪৬ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের ২২টি কর্পোরেট সংস্থাকে পরমাণু প্রযুক্তি উৎপাদনের লাইসেন্স দেয়। অন্যদিকে, শান্তির ধুয়ো তুলতে থাকে। তাদের এই পরিকল্পনার গোড়ায় পানি ঢেলে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। মার্কিনিরাও জানতো সোভিয়েত ইউনিয়ন পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটাবে। কিন্তু এতো দ্রুত হবে, সেটা তাদের ধারণাতেই ছিল না। ফলে সারা জগতব্যাপী মার্কিনিদের প্রভাব বলয় তৈরির পূর্বেই সোভিয়েতের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ তাদেরকে কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য করে। এর পরপরই মার্কিনিরা ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ এই কর্মসূচিতে হাতে দেয়। ব্যাপক প্রচার ও প্রপাগন্ডা চালায়। ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA) গঠন করতে সমর্থ হয়। যে সংস্থার প্রধান কাজ হলো পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসুচির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এমন এক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ছাড়া অপর কোনো রাষ্ট্র পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসুচি থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসুচিতে যেতে না পারে। একইভাবে এই এনার্জি এজেন্সি গঠন করার ফলে সারা পৃথিবীর ওপর গুটি কয়েক রাষ্ট্রের যেমন আধিপত্য বজায় থাকবে তেমনি পরমাণু চুল্লি রপ্তানির ব্যবসায়ে মার্কিনি কোম্পানিগুলির বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। এবং আমাদের জেনে রাখা দরকার, পরমাণু চুল্লি রপ্তানির বাণিজ্যে এখনও মার্কিনিদের আধিপত্য বজায় রয়েছে। মোটামুটিভাবে এটাই হলো পরমাণু বিদ্যুত প্রকল্পের রাজনীতি।

সারকোফেগাস।

মে মাসের মাঝামাঝিতে কংক্রিটের চাদর দিয়ে চুল্লিটাকে অবৃত করার কাজ শুরু হয়। এই কাজে নিয়োগ করা হয় অসংখ্য কয়লা শ্রমিকদের। শ্রমিকরা প্রথমে প্রচন্ড উত্তাপ্ত চুল্লির অন্তঃস্থলের নিচে শীতল পাটাতন ঢুকিয়ে গলন রোধ করার চেষ্টা করেন। এই কাজটি ছিল ভয়ানক বিপজ্জনক। কাজ করাও হয় অসম্ভব দ্রুত গতিতে। প্রতিদিন ৩ ঘন্টা অন্তর পালা করে ৪০০ কর্মীর এক একটা শিফটে কাজ করানো হয়। পুরো জুন মাস ধরেই কাজ চলে। শ্রমিকদের দিয়ে প্রথমে তৈরি করা হয় ১৬৮ মিটার লম্বা লোহাসিমেন্টের করা একটা সুড়ঙ্গ। দ্বিতীয় ধাপে বিশালপুরু কংক্রিটের পাটাতন ঢালাই করা হয়। এভাবে চুল্লিকে কংক্রিটের চাদরে ঢেকে দিতে প্রয়োজন হয় ৭ হাজার টন ইস্পাত। ৪ লাখ ১০ হাজার ঘনমিটার কংক্রিট। আর চুল্লির আন্তঃস্তল ঠান্ডা করতে ঢালা হয় প্রচুর পরিমানে তরল নাইট্রোজন।

এ বিষয়ে ১৯৯০ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি একজন গুরুতর অসুস্থ শ্রমিক ভাহলদিমির জিলভ, ‘কমসোমলস্কাজা প্রাভদা’ পত্রিকাতে যে সাক্ষাতকার দেন সেখানে তিনি তার জবানিতে যা বলেছিলেন তাহলো, আমি ও আমাদের নভোদজাঝিনস্কাজা খনির সহকর্মীদের বাধ্যতামুলকভাবে যুদ্ধমন্ত্রনালয়ে নাম লেখান হল। যতদুর মনে পড়ে দিনটি ছিল –১৯৮৬ সালের ২০শে আগস্ট। এক বিশাল যাত্রীবাহী সামরিক বিমান An-12করে আমাদেরকে বেলাজা সারকভ শহরে নিয়ে আসা হয়। তারপর আমাদেরকে সামরিক পোশাক পরিয়ে রাতে গাড়িতে করে ইভানকস্কি এলাকার ওরানোঁজ গ্রামে নিয়ে আসা হয়।

চেরনোবিলের এই এলাকায় কোনোরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই আমরা কাজ করতাম। মুখে যাতে সারাসরি তেজস্ক্রিয় ধুলোকনা না ঢোকে, তার জন্য আমাদের শুধুমাত্র একটা কাপড়ের টুকরো দেওয়া হত। আমাদের কাজ ছিল তেজস্ক্রিয় অঞ্চলে। গোটা অঞ্চল ছিল কাটাতার দিয়ে ঘেরা। চারিদিকে সশস্ত্র প্রহরী।

আমরা কেই ধ্বংস স্তুপের ইট সরাতাম। কেউবা ৪ নম্বর চুল্লির দেওয়াল পরিস্কার করতাম। চুল্লির ছাঁদের উপরে উঠে গ্রাফাইটের টুকরো নিচে ফেলতাম। চুল্লির নিচ থেকে বালতিতে করে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যপদার্থ ও তেজস্ক্রিয়যুক্ত পানি সারাতাম। এসব তেজস্ক্রিয় বিকিরনের মাত্রা ছিল খুবই উচু। আবারও বলছি, আমরা কাজ করতাম নূন্যতম নিরাপত্তা বব্যস্থা ছাড়াই। প্রায় এক মাস কাজ করেছি এখানে। এর মধ্যে আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো ডাক্তারি পরীক্ষা হয়নি। বিশেষ কোনো খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। তবে ৪ নম্বর চুল্লিতে কাজ করার পর আমরা একটা নির্দিষ্ট স্থানে স্টিমবাথ নিতাম। প্রতিদিন নতুন বুট জুতো এবং এক ধরনের কাপড় দিয়ে পুরো শরীর ঢেকে দেওয়া হত। এবং তা ছিল খুবই নিকৃষ্ট মানের। কাজ শেষে তা পুড়িয়ে ফেলা হত।

কখনো কখনো আমাদেরকে এমন দূষিত জায়গায় কাজ করতে হতো যেখানে বড় জোর পাঁচ থেকে দশ মিনিট আমরা থাকতে পারতাম। দলের মধ্য সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির উপরে ছিল তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপের ভার। তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেখানে বেশি মাত্রায় ছিল, তার পরিমাণ ছিল ৭০ রেম। পানিতে তার পরিমাণ ছিল ৪৫ রেম। কিন্তু ফোরম্যান খাতায় লিখতেন ঘন্টায় ১.৫ রেম। একবার প্রতিবাদ করা হল। তার উত্তরে তিনি বললেন , অতি উচু মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার কথা লিখতে পারছি না। সত্যি কথা লিখলে আমার উপরয়ালা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে।

ইতিমধ্য সময় বেশ গড়িয়ে গেছে। ইচ্ছা থাকলেও আমরা সন্তানের জন্ম দিতে পারব না। কারণ বিকলাঙ্গ, বিকৃত শিশুর জন্মের সম্ভাবনা খুব বেশি। এখন আমাদের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে। বন্ধুদের নাম ভুলে যায়। আইডেন্টিটি নম্বরও মনে থাকে না। দু পায়ে প্রচণ যন্ত্রনাসহ প্রায়ই ঝিম মেরে থাকতে হয়। আমাদেরকে এখনও পেটের দায়ে কাজ করে খেতে হয়।

সরকারি হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ

তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের হিসাব মতে, চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্র বিস্ফোরণে ১৯৮৬ সালেই নথিভুক্ত উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার যারা হয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ। যে হিসাবের মধ্যে আবার সামরিক বাহিনীসহ কর্মরত শ্রমিকরা তালিকাভুক্ত নন। এর পরে ১৯৮৯ সালে আরো যে প্রায় ৩ লাখ মানুষ তেজস্ক্রিয়তা পরিশোধনের কাজে যোগদান করেছিলেন, তাদেরকেও নথিভুক্ত করা হয় নি।

১৯৯০ সালে ইউক্রেনের ডেপুটি উরি শ্চেরবাক জাতিসংঘের জেনেভা অদিবেশনে জানিয়েছিলেন চেরনোবিলের ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫ লাখ মানুষ তেজস্ক্রিয় বিকিরনের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার শিশুর থাইরয়েড গ্ল্যাণ্ড উঁচুমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আক্রান্ত হয়। এর বাইরে আরো ৬০ হাজার বয়স্ক লোক তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাদেরও নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা চলছে।

ইউক্রেনের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ১৯৯০ সালে দাবি করেছিলেন, ,৫০,০০০ ইউক্রেনবাসীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে তারা সুস্থ। বাদবাকি শতকরা ৩৮ শতাংশ মানুষের চিকিৎসা দরকার। চেরনোবিলের ৫০৯০ কিলোমিটার দূরে নারদিচি জেলার, পার্টির প্রথম সেক্রেটারি ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এক ঘোষণা দিয়ে মহিলারা যাতে কোনোভাবেই গর্ভে সন্তান ধারণ না করেন, সেই পরামর্শ দেন। কারণ ওই অঞ্চলের মহিলাদের শতকরা ৩০ ভাগ ছিলেন ৫ থেকে ১০ কুরি সিজিয়াম১৩৭ এর শিকার। দুর্ঘটনার পর আলোচিত ওই অঞ্চলগুলিতে বসবাসরত মানুষদের ঠোঁট ও মুখের ক্যান্সারের পরিমাণ বেড়ে যায় তিনগুন।

৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের নিষিদ্ধ অঞ্চলের মধ্যে ৭০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি পুরাপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষিকাজের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী আরো দেড় লাখ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মোট ২০ লাখ হেক্টর জমি থেকে তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত করতে হয়েছে। যার মধ্যে ১০ লাখ হেক্টর জমি ছিল মারাত্মকভাবে সিজিয়াম১৩৭ দ্বারা দূষিত। শুধু তাই নয়, আলোচিত অঞ্চলের মাটি এমনই দূষিত হয়েছিল যে, ওপরের স্তর থেকে ১০ লাখ ঘনমিটার মাটি তুলে নিয়ে তাকে অন্যত্রে চাপা দিতে হয়েছে। একটা বিশাল এলাকার গাছপালা ধ্বংস করে ফেলতে হয়। শত শত ঝর্ণাধারার পানি প্রবাহে বাঁধ দিয়ে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। সমগ্র অঞ্চল থেকে ১৩ লাখ গরুভেড়াগাধা ও শুয়োর অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নিতে হয়। প্রায় ১০ হাজার কুয়ার পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এবং এই পরিশুদ্ধকরণ কাজে যে ২,৬০,০০০ মানুষকে যুক্ত করা হয়েছিল। তারাও সমানভাবে তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়ে পড়েন।

চেরনোবিল দূর্ঘটনায় পরিবেশে যে পরিমানে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছাড়িয়েছিল তার সর্বমোট পরিমাণ ৮ থেকে ১০ কোটি কুরি। চুল্লিতে যে পরিমানে তেজস্কিয় পদার্থ ছিল তার ৪ শতাংশেরও কম। যার বেশির ভাগটাই আবার চুল্লির ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে জমা হয়। এছাড়া তেজস্ক্রিয় ভষ্মে যেসব আইসোটোপ ছিল তাতে প্রায় ৩০ রকমের তেজস্ক্রিয় পরমাণু ছিল। যাদের জীবনকাল ১১ ঘন্টা থেকে ৪০ হাজার বছর পর্যন্ত। যার একটা বড় অংশ ইউরোপসহ ২০টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ চেরনোবিলের বিষ্ফোরনের ফলে পরিবেশে যে পরিমানে তেজষ্ক্রিয়া মুক্তি পেয়েছে, সেটা সেখানে জমাকৃত তেজস্ক্রিয়ার মাত্র ৪ শতাংশ। এবং এখন ওই চুল্লির নিচে ১৮০টন ইউরোনিয়াম, ৮৮০ পাউন্ড প্লুটোনিয়াম ও অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়ে গেছে। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো যে কোনো একটা ছোট্ট ভুপিকম্পে এই শবাধারটি ভেঙ্গে পড়তে পারে। আর জার্মান বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো আবার যদি নতুন করে বিপর্যয় হয়, তাহলে তার অর্থ দাঁড়াবে চেরনোবিলের সময়কালের থেকে আরো দ্বিগুণ পরিমানে তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরিবেশে মুক্তি পাওয়া।

মূলত সোভিয়েত টেকনোলজি দিয়ে রাশিয়ানরা সেদিন এই দুর্ঘটনার মোকাবেলা করতে পারে নি। চেরনোবিলের দ্বিতীয় বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ ফ্রান্সের বাউগাস কোম্পানিকে ভাড়া করে। যারা চুল্লি ঘিরে দ্বিতীয় আরেকটি কংক্রিটের শবাধার নির্মানের কাজ করে। ইউক্রেনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পরেও তৃতীয় পর্যায়ের আরেকটি প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। পরে আবারো চতুর্থ স্তরের প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। এভাবে কয়েক বছর পর পর তাদেরকে প্রাচীর নির্মাণের কাজটি অব্যাহত রাখতে হবে। অথচ সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্সের অধিকর্তা এবং নিউক্লিয়ার ইউস্টিটিউটের প্রধান পরিচালক চেরনোবিলের ৪ নং চুল্লি বসানোর সময় অত্যন্ত গর্ব করে বলেছিলেন, ‘এগুলি এতটাই নিরাপদ যে, তা খোদ ক্রেমলিনেও বসান যেতে পারে’। যখন চেরনোবিলে পরমাণু শক্তিকেন্দ্র বিস্ফোরণ ঘটে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে চালু পরামাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ৩৮টি। চেরনোবিলের পর জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে সোভিয়েত সরকার ৩৫টি কেন্দ্র বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এর অন্যতম কারণ ছিল এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলশ্রুতিতে বেলরুশিয়া, ইউক্রেন ও রাশিয়ান রিপাবলিক ভীষনভাবে দূষিত হয়ে পড়েছিল। চরমভাবে দূষিত অঞ্চলের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এসব কেন্দ্রের কাছে ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করতেন। যার মধ্যে ২৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল।

হিরোশিমা ও চেরনোবিলের মধ্যে পার্থক্য

আলেকজান্ডার জ্যাকোভলেব ছিলেন একজন সোভিয়েত ডাক্তার এবং রেডিওলজি বিশেষজ্ঞ। তিনি ওই সময় তথ্যপ্রমানসহ দেখান যে, হিরোশিমা এবং চেরনোবিলের মধ্যে যথেষ্ট ফারাক আছে।হিরোশিমার মানুষ মারা গিয়েছিলেন প্রধানভাবে গামা তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়ে। আর চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয় দূষনের কবলে যারা পড়েছিলেন, তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। সাধারন মানুষ প্রধানভাব দূষিত খাবার ও পানি খেয়ে আভ্যন্তরীণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন।

তিনি আরো একটি বিষয় আমাদের নজরে আনেন। যেটা হলো হিরোশিমার ক্ষেত্রে দূষণ মূলত শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু চেরনোবিলের ক্ষেত্রে দূষিত অঞ্চলের পরিমাণ ছিল অনেক ব্যাপক। চুল্লি থেকে বহুদুর পর্যন্ত দূষিত অঞ্চলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বৃষ্টি ও বাতাসের প্রবাহ নানা দিকে এবং বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন অঞ্চলকে প্রচন্ড মাত্রায় তেজস্ক্রিয় করে তুলেছিল।

তিনি হিরোশিমার সাথে চেরনোবিলের আরেকটি পার্থক্য দেখান। সেটা হলো চেরনোবিলের দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন১৩১ মুক্তি পেয়ে পরিবেশের সাথে মিশে যায়। যা থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে এসে জমা হয়। বিশেষ করে শিশুদের থাইরয়েডে। যাতে কয়েক লাখ শিশু আক্রন্ত হয়। এবং এক পর্যায়ে সেটা সামাজিক সমস্যা হিসাবে দেখা দেয়। কারণ শিশুরা থাইরয়েডের আক্রান্ত হওয়ার পরে সব সময় একটা মানসিক ভীতির মধ্যে থাকতো। একই সাথে তাদের মধ্যে অস্বাভাবিকতা বেড়ে যায়। তাছাড়া, রক্ত পড়া, রক্তশূণ্যতা, রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার ক্রমাবনতি ঘটে। চেরনোবিলের এসব বিষয় ছিল হিরোশিমা থেকে মূলগত ভাবেই পৃথক।

বিদেশে প্রতিক্রিয়া

চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তা সেদিন পৃথিবীর ২০টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলে ওই সব দেশকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়।

জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, দুধ নিরাপদ। কিন্তু শাকসব্জি নিরাপদ নয়। ইটালিয়ানদের বলা হয় তারা যেন দুধ না খায়। এবং খোরগোস দেখলে যেন সাথে সাথেই গুলি করে মারে। এছাড়া নরওয়ে এবং জার্মানির কিছু অঞ্চলে শিশুদের চকলেট খাওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে ব্রিটেনের মেষপালকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হলো ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সুডেনের সরকার তার দেশবাসীকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। পশ্চিম জার্মানি সরকার তার দেশের নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

এখানে মূল বিষয়টি ছিল এমন, ১৯৮৬ সালে দূর্ঘটনার পর যখন তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকে তখন ইউরোপের অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে ইউরোপের অনেক দেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক লাখ বর্গকিলোমিটার জুড়ে যে দূষন প্রক্রিয়া ঘটে, সেখানে ইউরোপীয়ানদের পক্ষে চাষাবাদ ও পশুপালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব অঞ্চলেরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

সিপিএসইউর বিবৃতির অংশ বিশেষ

চেরনোবিল বিপর্যয়ের ফলে বেলোরুশিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়ান ফেডারেশনের এক লাখ মানুষ যে যন্ত্রনার মধ্যে পড়েছেন আমরা সে বিষয়ে গভীরভাবে সচেতন। আমরা, সিপিএসইউর ২৮ তম কংগ্রেসের প্রতিনিধিবৃন্দ এই যন্ত্রনার অংশীদার।

প্রশাসনের কমান্ড সিস্টেম থাকাকালীন দেশের প্রাক্তন নেতৃবৃন্দ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বহু বড় বড় ভুল করেছেন। জরুরী অবস্থায় জনসাধারণের নিরাপত্তার বিষয়েও তারা মারাত্মক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। দ্য মিনিস্ট্রি অব ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার, দ্য মিনিস্ট্রি অব মিডিয়াম মেশিন বিল্ডিং, দ্য মিনিস্ট্রি অব হেলথ, দ্য কমিটি অব হাইড্রোমেটারলজি এন্ড এনভায়রণমেন্টাল কন্ট্রোল, দ্য স্টেট কমিটি ফর সুপারভিশন অব সেফটি অ্যাট ইন নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্য একাডেমি অব সায়েন্সেস এন্ড ইউ এস এস আর সিভিল ডিফেন্সমানুষের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে অপরাগ ও অযোগ্য বলে প্রমানিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় জরুরী ব্যবস্থা নেওয়ার মত কোনো প্রস্তুতি তাদের ছিল না।

নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়, চুল্লির নকশা তৈরি করা, চুল্লি তৈরি করা, এবং তা চালু রাখার কাজে যারা জড়িত সেইসব বিভাগীয় প্রধানদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই এই মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ। ‘পরমাণু চুল্লি সম্পূর্ণ নিরাপদ’ তাদের এই নিশ্চিন্ততার ফলেই জরুরী অবস্থা মোকাবেলা করার মতো তেমন কোনো সরকারি ব্যবস্থা ছিল না। এমন কি তেজস্ক্রিয় দূষণে আক্রান্ত অঞ্চল থেকে লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। এসব কারণে পার্টি ও রাষ্ট্র, সিপিএসইউ সেন্ট্রাল কমিটি এবং সরকারের সন্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। জনগণ বিশ্বাস হারিয়েছে। আক্রান্ত অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। চেরনোবিল বিপর্যয়কে ঘিরে গোপনীয়তা, ক্ষয়ক্ষতির পরস্পরবিরোধী হিসাব, বিশেষত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যপারে জনগণের কাছে সঠিক অবস্থার সংবাদের অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

কংগ্রেস স্বীকার করছে যে, চেরনোবিল বিপর্যয় ঠেকাতে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল তা অপ্রতুল, সন্তোষজনক নয়। এই কংগ্রেস দেশের মানুষের কাছে এবং সমগ্র বিশ্বের কাছে আহবান রাখছে চেরনোবিল বিপর্যয়ের সমস্যার সমাধানে এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে যেন একযোগে সবাই এগিয়ে আসেন।”

মুলত এটাই হলো চেরনোবিলের ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিষ্ফোরিত পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির একটা সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র।

আলোচনার এই পর্যায়ে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। বিষয়গুলি হলো চেরনোবিল দুর্ঘটনা যখন ঘটে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল প্রথম শ্রেণীর পারমাণবিক শক্তিতে উন্নত একটা রাষ্ট্র। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারমাণবিক শক্তি পরিচালনা করা, তাকে সামাল দেয়ার মত দক্ষ জনশক্তি বাংলাদেশের মতো কোনো রাষ্ট্রে গড়ে ওঠে নি। এই প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিষয়টি কয়েকটি দেশেই সীমাবদ্ধ। যা ‘আমরা পারমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তার রাজনীতি’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তার পুরো ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশকে রাশিয়ার উপর নির্ভর করতে হবে সম্পূর্ণভাবে।

দ্বিতীয়ত, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ভূখণ্ডগতভাবে বৃহৎ একটি রাষ্ট্র। ফলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দিতে এক অঞ্চলের মনুষকে অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত ভূখণ্ড তাদের ছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার ওপর বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ একটা রাষ্ট্র। ফলে আমাদের এই ছোট্ট ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র সব সময়ের জন্য একটা বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি হয়েই থাকবে।

তৃতীয়ত, পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের সাথে লিউকোমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার রোগ বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, ১৯৮৩ সালে স্যার ডগলাস ব্ল্যাকের অধীনে ইংল্যাণ্ডে সেলফিল্ড পরমাণু শক্তিকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয়তায় কাছাকাছি গ্রামাঞ্চলে লিউকোমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার বাড়ছে কিনা তার একটা তদন্ত হয়। ওই তদন্তে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় কেন্দ্রের তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিস্কেল গ্রামের অল্পবায়সীদের মধ্যে লিউকোমিয়া রোগীর সংখ্যা ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলেস থেকে কয়েকগুন বেশি। ডগলস ব্ল্যককমিটির রির্পোটের ওপর ভিত্তি করে ইংল্যাণ্ডের অন্যান্য পরমাণুপ্রযুক্তি কেন্দ্রগুলিতেও তদন্ত হয়। হারওয়লে পরমাণুপ্রযুক্তি কেন্দ্রটিকে ‘নিরাপদ’ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু অলডারম্যাসটন ও ব্রাগফিল্ডের পরমাণু কেন্দ্রের ১০ মাইলের মধ্যে ১৪ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের মধ্যে জাতীয় গড়ের থেকে লিউকোমিয়া রোগির সংখ্যা অনেক বেশি ছিল।

১৯৯০ সালে অধ্যাপক মার্টিন গার্ডেনার ও তার গবেষকদল আবিস্কার করেন, যে সব পুরুষ 200 msv বা তার থেকে বেশি তেজস্ক্রিয়তায় আক্রন্ত, তাদের সন্তানদের লিউকোমিয়া রোগ হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণের থেকে ৮ গুণ বেশি।

চতুর্থত, পরমাণুশক্তিকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই শক্তিকেন্দ্রগুলি কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। রিঅ্যাক্টরের কর্মক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে এগুলি ভেঙে ফেলতে হয়। ওই সময় এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর জটিলতা সৃষ্টি হয় ওই ভেঙে ফেলা কেন্দ্রগুলির তেজস্ক্রিয় আবর্জনা সামাল দেয়া নিয়ে। গত শতকের ৯০ এর গোটা দশক ধরে এই বিষইয়ে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অনেক বিশেষজ্ঞদের মতামত ছিল গোটা কেন্দ্রটিকেই কংক্রিটের স্তুপে ঢেকে ফেলা হোক। এভাবেই এগুলিকে রাখতে হবে শত শত বছর ধরে। পরে তার তেজস্ক্রিয়তা ফুরিয়ে গেলে ওই কংক্রিটের স্তুপটিকে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হোক। এবং ধরতে গেলে প্রায় শুরু থেকেই স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার তেজস্ক্রিয় আবর্জনা নানা ধরনের পাত্রে আবদ্ধ করে সমুদ্রে ফেলা শুরু হয়েছে। যেমন ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত এই ২১ বছরে আমেরিকা ৪,০০০ টেরাবেক্যুইরেল ইউনিট তেজস্ক্রিয় আবর্জনা ৯০,০০০টি পাত্রে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে প্রশান্ত মহাসাগর, আটল্যান্টিক মহাসগার ও গালফ অব মেক্সিকোয় ফেলেছে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই ৩৩ বছরে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড ৫৪,০০০ টেরাবেক্যুইরেল ইউনিট তেজস্ক্রিয় আবর্জনা ১৪০,০০০ টন ওজনের বিভিন্ন পাত্রে আবদ্ধ করে উত্তর আটল্যান্টিক মহাসাগরে ফেলেছে। একইভাবে জাপানকোরিয়ারাশিয়াচীন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জন্য সমুদ্রকে ব্যবহার করে আসছে। এই তেজস্ক্রিয় বর্জের প্রধানাংশই হলো পারমাণবিক শক্তিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবর্জনা। বাদবাকিটা হলো রেডিও আইসোটোপ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী কলকারখানা, হাসপাতাল ও গবেষনারগারগুলি থেকে। এই অপকর্ম প্রতিরোধে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তারপরও অতি সঙ্গোপনে তা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

টেকনলজি সম্পর্কে মিথ এবং জাপানের পরমাণু শক্তির বিপর্যয়

সারা পৃথিবীব্যাপী জাপানের যান্ত্রিক সভ্যতা এবং উন্নতি নিয়ে মানুষের মধ্যে যথেষ্ট কৌতুহল ছিল বা আছে। এর অন্যতম কারণ হলো জাপান একটা ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ এবং সেই দেশের উন্নয়ন ও টেকনলজি নিয়ে গবেষকদের নানা রির্পোট সারা বিশ্বব্যাপী একটা মিথ তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে যে সুনামি হয়, তাতে করে অনেকেরই মোহভঙ্গ ঘটে। মিথের ফানুস ফেটে পড়ে। সুনামির পূর্বে বলা হয়েছিল, জাপান প্রযুক্তিগতভাবে এতোটায় এগিয়ে গিয়েছে যে, তাদের পক্ষে ভূমিকম্প ও সুনামিকে প্রতিরোধ করা সক্ষম হয়েছে।

জাপানের হনসু দ্বীপটা রাজধানী টোকিও থেকে উত্তরপূর্বে ৩৭০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। দ্বীপটি ওসিকা অন্তরীপে পড়ে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের এই অঞ্চলে পৃথিবীর চারটি টিকটোনিক প্লেট রয়েছে। যার উপরে আমাদের স্থল্ভাগগুলি ভাসমান। প্রায় ২০০০ কিলোমিটার ব্যপী প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং আমেরিকান প্লেট দুটি ভাসতে ভাসতে কাছাকাছি চলে এলে তাদের মধ্য সংঘর্ষ হয়। তার পরিনতিতে জাপানে ৯ রিখটার মাত্রার সমতুল্য তীব্র ভুমিকম্প হয়। সমুদ্রের তলায় এই সংঘর্ষের ফলে যে ভূচ্যুতি ঘটে তার ফলে ২৩ মিটার উচু সামুদ্রিক ঢেউ, জাপানি ভাষায় যার নাম সুনামি, জাপানের ইয়াতে, মিয়াগি, ফুকুসিমা এবং ইবারাকিতে আঘাত হানে।

প্লেট দুটির সংঘর্ষের ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয়েছিল তার পরিমাপ হলো হিরোশিমাতে নিক্ষিপ্ত বোমার ৬০ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। এই বিপুল শক্তি জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের চারটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ভূচ্যুতি ঘটার ৫৬ মিনিটের মধ্যে সারা জাপান দ্বীপপুঞ্জে কয়েক মিনিট ধরে ৯ রিখটার এর সমতুল্য ভুমিকম্পে কেঁপে ওঠে এবং ২০১৩ সালের সুনামির পরে জানা যায় জাপানের ভুমিকম্প নিরোধক নির্মাণ ব্যবস্থা আসলে ফাঁকা বুলিমাত্র। জাপানের প্রযুক্তি মূলত ওই দেশে নিয়মিত ঘটে যাওয়া অল্পমাত্রার ভুমিকম্পের বিরুদ্ধে সামান্য কিছু প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। যা বড় জোর রিখটার মাত্রার ৬ থেকে ৬.৫ মাত্রাকে সহ্য করতে পারে, কিন্তু ৯ মাত্রার নয়।

দেখা গেছে, আলোচিত সুনামির সময় জাপানের অসংখ্য ব্রিজ ভেঙে গিয়েছে। সমুদ্র ঢেউবাহিত জাহাজ দোতালা বাড়ির ছাদে আটকা পড়েছে। ব্লকের পর ব্লক ভুমিকম্পনিরোধক বাড়ি ভিত সমেত উপড়ে ৫০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটার দূরে ছিটকে পড়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টেলিফোন ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেছে। আগুন নেভানোর স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি কোনো কাজে আসে নি।

সুনামি ও ভুমিকম্পের ধাক্কায় জাপানের ফুকুসিমাসহ ওই অঞ্চলে মোট ১৪ টি পারমাণবিক চুল্লি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাদের সমস্ত সুরক্ষা ও আপাতকালীন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই চুল্লিগুলির মধ্যে ওনাগাওয়ার তিনটি চুল্লি পরিচালনা করতো তোহকু ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন। এর বাইরে ফুকুসিমাদাইচিতে ৬টি চুল্লিসহ ফুকুসিমাদাইনিতে আরো ৪টি চুল্লি পরিচালনা করতো টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি। যার সংক্ষিপ্ত নাম হলো টেপকো। এবং টোকিওতে রয়েছে আরও একটি কেন্দ্র। যা পরিচালনা করতো জাপানের অ্যাটমিক পাওয়ার কোম্পানি বা জাপকো। আর এসব অধিকাংশ চুল্লির নির্মাতা ছিল মার্কিন সংস্থা জিই বা জেনারেল ইলেকট্রিক্স।

বিপর্যয়ের দিনে

১২ মার্চ ফুকুসিমাদাইচি চুল্লির চালকরা দেখেন, হঠাৎ করে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। যে তারের মাধ্যমে চুল্লির বাইরে থেকে বিদ্যুৎ শক্তি আসত। সুনামির ধাক্কায় তা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে আপাতকালীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল, সেটাও সময়মতো ক্রিয়া করে নি। কারণ এই ব্যবস্থাকে আগে কখনোই পরীক্ষা করা হয় নি। এখানেও ধরে নেওয়া হয়েছিল যে ব্যবস্থাটি এতোটাই নিরাপদ ও সুরক্ষিত যে, তাতে করে আপাতকালীন অবস্থার উদ্ভবই ঘটবে না। কিন্তু সুনামির ১ ঘন্টা পর ২০ মিটার উচু ঢেউ সুনামি আটকানোর ১২ মিটার উচু পাচিলের ওপর আচড়ে পড়ে। পুরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা লন্ডভণ্ড করে দেয়। এবং এসব চুল্লি থেকে সিজিয়াম নামে যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ মুক্ত হয়। সেটা আগামি ১২০ বছর পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ক্যান্সারের জন্ম দিবে। একইভাবে বিষ্ফোরনের ফলে যে প্লুটোনিয়াম বায়ুতে ছড়িয়েছে এবং মাটিতে মিশেছে তা স্বাভাবিক হতে লাগবে ২৪ হাজার বছর।

কি মূল্যে পরমাণু শক্তির ব্যবহার

পরমাণু শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত যে ন্যায্যতাগুলি দেয়া হয় তাহলো জলবিদ্যুতের চেয়ে পরমাণুবিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি অনেক নির্ভরযোগ্য, দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সাথে এর সংযোগসম্পর্ক রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু তারপরও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে বা পশ্চিমা বিশ্বে প্রবল জনমতের চাপে সরকারগুলি এই পদ্ধতি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক দেশই আজ পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রগুলি বদ্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলিতে সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

মূলত গত তিন দশক ধরে খোদ বৈজ্ঞানিক মহলেই পরমাণু শক্তি নিয়েই ভাবনা চিন্তার ব্যাপক রদবদল ঘটে গেছে। কারণ গত তিন দশকের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, পরমাণু শক্তি উৎপাদনে বিপদ যতটা ভাবা হয়েছিল, প্রতিক্রিয়ার মাত্রা তার থেকে অনেক বেশি। কারণ এই শক্তি উৎপাদনের সাথে সরাসরি মানবিক ও পরিবেশগত মূল্য যুক্ত। যেমন স্বাভাবিক ক্ষয় প্রক্রিয়ার কারণে ইউরোনিয়াম জাতীয় পদার্থের প্রতিটি অণুর কেন্দ্রীয় মূল অংশ ভেঙে সাধারণত দূই অসম টুকরায় ভাগ হয়ে যায়। বড় টুকরোগুলি তেজস্ক্রিয়। যার ক্ষয় প্রক্রিয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপদজনক।

তেজস্ক্রিয় পদার্থের সাথে মানুষের শারীরিক অসুস্থতার সম্পর্ক ৫০০ বছর পূর্বে প্রথম ধরা পড়ে, পূর্ব ইউরোপের খনি অঞ্চলগুলিতে। সেখানে খনিমজুরদের ফুসফুসে ক্যান্সারের কারণ হিসাবে একটি বিশেষ আকরিকের সম্পর্ক রয়েছে এটা জানা গেলেও তা প্রকাশ করা হয় নি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এই বিশেষ উপাদানকেই ইউরোনিয়াম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরমাণু শক্তিধর দেশগুলির দিক থেকে মজুরদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় নি কোনো কালেই। এছাড়া আমরা সবাই কমবেশি মাদাম কুরি ও তাঁর কন্যাসহ সেই যুগের বহু প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও রেডিওলজিস্টদের মৃত্যুর খবর জানি। তাদের সবার মৃত্যু হয়েছিল এই তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে।

এর পর ১৯৪৫ সালে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পারমাণবিক বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। দুটি শহরেই হাজার হাজার মানুষ প্রথমেই মারা যায়। আরও কিছু লোকের মৃত্যু হয় ধীর গতিতে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাড়ায় ২ লাখ ৪০ হাজার। সেদিন পরমাণু বোমা হামলার পরেও যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, অসংখ্য জাপানিদের ক্যান্সারের কারণ হলো তেজস্ক্রিয় রশ্মি। এবং তার পর থেকে মানব দেহে তেজস্ক্রিয়তার স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব এবং তেজস্ক্রিয়তার সহনীয় মাত্রা পরিমাপের চেষ্টা করা হয়। কাজটি করা হয় আমেরিকার এ্যাটমিক এনর্জি কমিশন এবং ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি’র পক্ষ থেকে। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পরে আরোপিত এই সীমা রেখা বেশ কয়েকবার উঠানামা করানো হয়েছে বিভিন্ন গবেষনা প্রতিষ্ঠানের বরাতে। তার পরেও উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির আদালত এই বিষয়ের ওপর বেশ কয়েকবার হস্তক্ষেপ করে। যেমন আদালতের নির্দেশে আমেরিকার একটি প্রধান পরমাণু কেন্দ্রে নিয়োজিত ১০ হাজার কর্মীর যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ করা হয়, সেটা বিশ্লেষন করেই বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন যে, তেজস্ক্রিয় প্রভাবের যে নির্ধারিত সীমারেখা দাঁড় করানো হয়েছে, যাকে নিরাপদ মাত্রা হিসাবে ধরা হচ্ছে, সেই মাত্রাতেও ক্যান্সারের ঝুঁকি পূর্ণমাত্রায় রয়েছে। বিশেষ করে নিঃশ্বাসের সাথে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ঢুকে এই শিল্পে কর্মরত মানুষের ফুসফুস, পাকস্থলি, অন্ত্র এবং হাড়ের নলিতে জমা হয়। পরবর্তীতে, সেটাই ক্যান্সারের মূখ্য কারণ হয়ে ওঠে। পরমাণুশক্তি নির্মাণশিল্পে কর্মরত শ্রমিক, আশেপাশের মানুষ, পরিবেশ, ইত্যাদি সব কিছুর জন্যই এই কার্যক্রম বিপজ্জনক হিসাবে বিবেচিত হয়।

এছাড়া প্রথমে খননের পর ইউরোনিয়াম আকরকে গুঁড়ো করে শুকানোর ক্ষেত্রে এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়। তারপর আবার তাকে শুকিয়ে ধুয়ে, ছেঁকে একটি ঘনরূপে পরিবর্তিত করতে হয়। যাকে বলা হয় হলুদ কেক। এভাবে শুকানোর সময় প্রচুর পরিমাণে ইউরোনিয়াম বাতাসের সাথে মিশে যায়। আশেপাশের সবকিছুকে দূষিত করে ফেলে। মূল পদার্থের বেশিরভাগ অংশ পড়ে থাকে ঘন এবং পানির মিশ্রনরূপে। এবং আকরের তেজস্ক্রিয়তা অনেকটাই ওই পানির মধ্য থেকে যায়। আলোচিত মিশ্রন বড় বড় খোলা পুকুরে জমা থাকে। যা হাজার হাজার বছর ধরে তেজস্ক্রিয়ই থেকে যায়। এই মিশ্রনের কনা বাতাসে উড়ে গিয়ে মানুষের বিপদ ঘটাতে পারে। ফলে মিশ্রনকে পানির নিচে জমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কোনোভাবে যদি এসব পানির আধার দূষিত হয়ে পড়ে তাহলে তাকে আর পরিশুদ্ধ করা যায় না। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার এই ধরনের একটা মিশ্রন ধরে রাখা একটা বাঁধ ভেঙে গিয়ে ওই পানি একটা নদীতে পড়ে। যার ফলে ১০ মিটার গভীর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানি তেজস্ক্রিয় হয়ে যায়। ওই নদীর পানি পান করে সমস্ত প্রানীরা সংক্রামিত হয়ে পড়ে। এক আমেরিকার অভিজ্ঞতাতেই দেখা গিয়েছে যে, ২০ বছরের মধ্যে একটি মিশ্রণাধার ১৫ বার ভেঙে পড়েছে। সাতটি বাঁধ পানি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। পাইপ ফেটেছে পাঁচবার। বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে দুইবার। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরে তাহলো যে মিশ্রণকেন্দ্রগুলিকে ‘নিরাপদ’ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। প্রকৃত অর্থে সেগুলি মোটেও নিরাপাদ নয়। ১৯৮৬ সালে আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রথম জানানো হয় যে, গত শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে পরমাণু চুল্লির আশেপাশের এলাকাগুলি ভয়ানকভাবে তেজস্ক্রিয় সংক্রমিত হয়ে পড়েছে।

ইংল্যান্ডে ১৯৫৭ সালে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ফলে তেজস্ক্রিয়তার ধোঁয়া শুধু আশেপাশের অঞ্চলেই নয় ডেনমার্ক ও জার্মানিতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে ৭০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের জমিতে সমস্ত ধরনের উদ্ভিদ বিষাক্ত হয়ে যায়। ওই অঞ্চলের গরুর দুধ খাওয়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। অঞ্চলটি ঘনবসতিপূর্ণ না হওয়ার পরেও ৩০০ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

এছাড়া ১৯৫০ সালে রাশিয়ার আণবিক অস্ত্র নির্মাণ কারখানার আবর্জনা রাখবার একটি গুদামে বিস্ফোরণের ফলে শত শত লোকের মৃত্যু হয়। হাজার হাজার বর্গমাইলের মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল।

ভারত ও পাকিস্তান

india-anti-nuclear-protest-2আমরা যদি পাকিস্তান ও ভারতের দিকে তাকায় তাহলে সেই চিত্র আরো ভয়াবহ। এক্ষেত্রে ভারতীয় আণবিক কেন্দ্র সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ১৯৯২৯৩ সালে পর্যন্ত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ‘অস্বাভাবিক’ ঘটনা ঘটেছে ১৪৭টি। অর্থাৎ প্রতি আড়াই দিনে একটি করে।

১৯৯৪ সালের ১৩ মার্চ ‘সানডে টাইমস অফ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকাতে প্রফুল্ল বৈদ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে ছিলেন, ১৯৯৪ সালের পুর্বের ২৭ বছরে ভারতের পারমাণবিকশক্তি কেন্দ্রের ইতিহাস হলো দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন এবং কর্মী ও নাগরিকদের অমঙ্গলের দিকে ঠেলে দেওয়ার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে রাজস্থানের কারখানা থেকে ৮টন ভারি পানি চুঁইয়ে বেরিয়ে আসে। আর ১৯৮২৮৩ সালের পাকিস্তানের আণবিক শক্তি কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ৪০ টন ভারি পানি উপচে পড়ে কানুপে।

রাজস্থানে তেজস্ক্রিয়তা সরাতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ তেজস্ক্রিয়তার শিকার হন। নারোরা কারখানায় ১৯৯৩ সালে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ফলে তেজস্ক্রিয়তা সমস্ত কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনে দাখিল করা পাকিস্তানের একটা দলিলে স্বীকার করা হয় যে, এখানে সেকেলে সরঞ্জাম দিয়ে কাজ চলছে। যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তাদের পক্ষে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

এছাড়া এই উভয় দেশের মধ্যে আরো কিছু মিল রয়েছে। যেমন কানাডাতে নিজেদের তৈরি রিএ্যাক্টর চালু হয় ১৯৬৬ সালে। তাদের সেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভারতের রাজস্থানে কানাডার দেয়া রিএ্যাক্টর বসানোর কাজ শুরু হয়ে যায়। আর পাকিস্তানের কানুপএ কাজ শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। অর্থাৎ নিজ দেশে (কানাডা), নিজেদের তৈরি রিএ্যাক্টর কি ধরনের কাজ করে, সেটা দেখার জন্য ভারতপাকিস্তান অপেক্ষা করে নি। পরে দেখা যায় কানাডার রিএ্যাক্টর মোটেই নিরাপদ নয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তান ও ভারতে যে রিএ্যাক্টর বসানো হয়, তা যথাক্রমে ১২৫ ও ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। অর্থাৎ ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১০০ ওয়াটের ২০ লাখ বাল্ভ জ্বালানো সম্ভব। আবার এই দুই দেশের দুই বিদ্যুতকেন্দ্রে যে পরিমানে টাকা ঢালা হয়েছিল, তা কোনোভাবেই উসুল করা যায় নি। যেমন রাজস্থানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র কখনও একটানা চার মাসের বেশি চালানো সম্ভব হয় নি। মাত্র চার বছর কাজ চলার পরে এটা প্রধানত অন্য কারখানায় বাষ্প সরবরাহ কারার জন্য একটা বিরাট কেতলি হিসাবে ব্যবহার হয়। আর কানুপের অবস্থা আরো খারাপ। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, ১৯৭৯৮০ সালে এক বছরে মাত্র ১৬ ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে কানুপ থেকে। ১৯৮৮৮৯ সালে মাত্র ১০ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এই দুই বছর বাদ দিলে বাদ বাকি ২২ বছরে গড়ে ২ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার ফলাফল

পারমাণবিকশক্তি উৎপাদনের পাশাপাশি যদি আমরা অস্ত্র নির্মাণের দিকে নজর দেই তাহলে, সেখানেও ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাব। যদিও পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে একটা যুক্তি সবসময়েই যুদ্ধবাজদের পক্ষ থেকে তোলা হয়। এখানে বলা হয়ে থাকে, “একটা দেশ তার সামরিক ব্যয় অনেকখানি কমিয়ে ফেলতে পারে, যদি সে তার প্রচলিত ব্যয় সাধ্য বিশাল সেনাবাহিনীর পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ছোট বাহিনী গড়ে তোলে এবং সেই বাহিনী যদি পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়। আর এই পদ্ধতি অবলম্বন করার মধ্য দিয়ে যে টাকা বাঁচবে, তা সামাজিক কাজে ব্যয় করা সম্ভব হবে”। এটা যে কতবড় খোড়া যুক্তি, তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এই পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করতে গিয়ে খোদ আমেরিকাতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা খুবই ভয়াবহ। আমেরিকার নেভাদার অঞ্চলে এবং রাশিয়ার কাজাকিস্তানে তার স্বাক্ষ্য রয়েছে। আমেরিকানরা এই অঞ্চলগুলিকে জাতীয় আত্মাহুতির অঞ্চল বলে থাকে। এখানে পরীক্ষা নির্ভর বোমা বিষ্ফোরণের ফলে দুই দেশের এসব অঞ্চলের মাটিপানি আর খাদ্য, ইত্যাদি সব কিছুই বিষাক্ত হয়ে গেছে। নেভাদা অঞ্চলের মানুষেরা হয় ক্যান্সার, না হয় স্নায়ুবিক ব্যাধিতে ভুগেছেন। মানুষের চুল চামড়া খসে পড়ছে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে মায়েরা সন্তান প্রসব করছে। যা দেখতে খোসা ছাড়ানো এক থোকা আঙুর বা জেলি ফিসের মতো। ১৯৭০ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকার নেভাদা পরীক্ষাকেন্দ্রের ২৫০ মাইলের মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে তেজস্ক্রিয়াতে আক্রান্ত। ২ লাখ ৫০ হাজার সৈনিক তেজস্ক্রিয়াতে আক্রান্ত। এবং পরমাণু অস্ত্র কারখানার সাথে যুক্ত ১০ লাখ আমেরিকান নাগরিকের স্বাস্থ্যহানীর সাথে এই প্রকল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আর সর্বশেষ তথ্য হলো পারমাণবিকশক্তি বা অস্ত্র তৈরিতে যে পারমাণবিক বর্জ্য সৃষ্টি হয়, সেটা নিরাপাদ করাও খুবই ব্যয়বাহুল। যেমন বর্তমান দুনিয়াতে সবচেয়ে নোংরা পারমাণবিক অঞ্চল হিসাবে খ্যাত জায়গার নাম আমেরিকার হ্যানফোর্ডর পরমাণুকেন্দ্র। যা পরিচ্ছন্ন করতে লাগবে কমপক্ষে ২০০ বিলিয়ন ডলার। এবং বিপজ্জনক বর্জ্য কোথায় এবং কোন প্রক্রিয়াতে সরানো হবে, সেটা নিয়ে খোদ আমেরিকান সমাজের মধ্যে হাজারো পদের তর্ক রয়েছে।।

ধন্যবাদ।

৮ জুলাই, ২০১৪ সাল।

তথ্যসুত্র

) চেরনোবিল, প্রদীপ দত্ত, গ্রন্থালয়, প্রকাশকাল জানুয়ারি, ১৯৯৩ সাল, কলকাতা।

) জিজ্ঞাসা পরিবেশদূষণ বিশেষ সংখ্যামাঘচৈত্র, ২০০৩ সাল, কলকাতা।

)মাসিকঅনীক, আগস্ট২০১০ সংখ্যাকলকাতা।

) মাসিকঅনীক, এপ্রিল২০১১ সংখ্যাকলকাতা।

) পারমাণবিক সন্ত্রাস ও শান্তির অন্বেষা, সুলিয়ানা সিওয়াতিবু ও বি ডেভিড উইলিয়াম, ১৯৮২, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীঢাকা।

) মানুষ একটা বিপন্ন প্রজাতি, তারেক মোহন দাস, শৈব্যা প্রকাশন বিভাগ, ডিসেম্বর২০০১ সাল, কলকাতা।

) মানব কল্যাণে পারমাণবিক শক্তি, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, অক্টোবর১৯৯০, কলকাতা।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s