লালন সাঁইজীর মুখে বীজগণিত শব্দ উচ্চারিত হলে কি বীজগণিতের জাত যায়?

Posted: জানুয়ারি 24, 2015 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: ফারুক আহমেদ

lalon-1111এখনও পর্যন্ত সমাজ বাস্তবতা হলো এই যে, অভিজাতের আঙ্গিনায় ঘুরাঘুরি না করলে শিক্ষিত পদবাচ্যে ভূষিত হওয়া যায় না। গ্রামের কৃষিজীবীপেশাজীবী মানুষ, অভিজাতেরা যাঁদেরকে “লোক” বলে অভিহিত করে থাকেন তাঁদের মধ্য থেকে কারো শিক্ষিতের স্বীকৃতি পেতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই অভিজাতের আঙ্গিনায় আসতে হবে। এখনও পর্যন্ত শিক্ষিত পদবাচ্যের স্বীকৃতি দানের মালিক অভিজাতেরা। “লোক” মানুষ যত জ্ঞান চর্চাই করুণ না কেন, হোক সেটা দর্শন কিংবা হোক সেটা বিজ্ঞান অথবা হোক সেটা সমাজ ভাবনা –সেই মানুষ যদি অভিজাতের আঙ্গিনায় না আসেন তবে তিনি আর যাই হোক শিক্ষিতের স্বীকৃতি পাবেন না। এখনও পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সবচেয়ে বিবর্ণ রূপটারও তত্ত্বাবধায়ক অভিজাত শ্রেণি। ধর্ম শিক্ষার নামে মানব মস্তিষ্কের ওপর যে নির্মম পেষণ তা বরাবরই অভিজাতের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতো বটেই এর বাইরে যাঁরা স্বশিক্ষিত রূপে পরিচয় পেয়েছেন তাঁদেরকেও সে পরিচয়টুকু অভিজাতের আঙ্গিনা থেকেই সংগ্রহ করতে হয়েছে। তাঁদের আঙ্গিনার বাইরে কোন শিক্ষা থাকতে পারে তা অভিজাতরা কখনোই মানতে পারেন না।

লোক” মানুষ, যাঁরা “লোক” মানুষদের সাথেই থেকে গেলেন তাঁরা যতই সাধনা করুণ না কেন,স্বউদ্যোগে নিজের এবং সমষ্টির জ্ঞান ভান্ডার পূর্ণ করুণ না কেন অভিজাতরা এসব মানুষকে কখনোই শিক্ষিত বলতে পারেন না। এসব মানুষের জ্ঞান, যুক্তি, দর্শন, বিচারবোধ নিয়ে অভিজাতেরা বিস্মিত হবেন, ‘অলৌকিক’ প্রাপ্তি বলে প্রচার করবেন, প্রয়োজনে মানুষও নাও ভাবতে পারেন অর্থাৎ দেবদবী বা অবতার ভাবতেও অসুবিধা নেই, তবুও শিক্ষিত বলবেন না। এটাই হলো অভিজাতদের আভিজাত্যের বৈশিষ্ট্য। শিক্ষিত বলাতো দুরে থাক এই ধরণের কোন জ্ঞান সাধকের মুখে অভিজাতদের আঙ্গিনার কোন পরিচিত শব্দ উচ্চারিত হলেও তাঁরা কিভাবে ভেঙে পড়েন তারই এক প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল। একজন ‘প্রগতিশীল’ সরকারি আমলা লালন সাঁইজীর একটি গানে “বীজগণিত”, “ইংরেজী”, “বাংলা শিক্ষা” এই তিনটি শব্দের উপস্থিতিতে যে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করলেন তাতে মনে হলো সাঁইজীর মুখে এই শব্দগুলো উচ্চারিত হওয়া মানেই বুঝি তাঁদের আভিজাত্যকেই লন্ডভন্ড করে দেওয়া।

ছোট বেলায় উম্মত ফকিরের কন্ঠে লালন সাঁইজীর গান শোনা আমার নিত্য দিনের ভাল লাগার বিষয় ছিল। সেই থেকে সাঁইজীর প্রতি আমার আগ্রহ। মনে পড়ে অনেক ছোটবেলায় লালন সাঁইজীর গানের একটি বই সংগ্রহ করেছিলাম। আমার জন্য এটা ছিল খুব কঠিন কাজ। ছোট বেলায় উম্মত ফকিরের কন্ঠে যে গান শুনতাম বাড়ীতে এসে সেটা মুখস্ত করে নিতাম। মাঠে যখন কাজ করতে যেতাম,যখন গরু চরাতে যেতাম তখন গলা ছেড়ে গাইতাম। এক সময় শহরের স্কুলে ভর্তি হলাম। সেই থেকে আড়ষ্ঠতায় হোক, আর অভিজাতদের সামনে নিজেকে প্রকাশের অযোগ্যতাই হোক স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও আর অমন করে সাঁইজীর গান গাইনি, যেমন করে মাঠে গাইতাম। কিন্তু মনে মনে থাকতো সাঁইজীর অনেক গান। বছর দুয়েক আগের কথা। একদিন সকল আড়ষ্ঠতা ছুঁড়ে ফেলে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলাম সাঁইজীর গান। দোলা, আমার ছেলে ব্রুণো ওদের ভাল লাগলো। আর ঠেকায় কে ? গাইতে থাকলাম। সেই যেমন করে মাঠে গাইতাম। বিভিন্ন বই থেকে সাঁইজীর গানগুলো পড়ি এবং বিভিন্ন বাউলের গান শুনি। এ আঙ্গিনার সবার পরিচিত টুনটুন বাউল এক তরুণ বাউল নাহিদ হাসানকে সাথে নিয়ে কিছু গান করেছেন যা একটি এলবামে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখান থেকে শুনে এবং আবদেল মান্নানের সম্পাদনায় নালন্দা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া লালন সমগ্র থেকে আমি একটি গান গলায় তুলি। সে গানটি হলো

ও মন কর সাধনা, মায়ায় ভুলো না

নইলে আর সাধন হবে না।

.

সিংহের দুগ্ধ স্বর্ণ পাত্রে রয়

মেটে পাত্রে দিলে ও মন কেমন দেখায়।

মন পাত্র হলে মেটে কি হবে আর কেঁদে কেটে

আগে কর সেই পাত্রের ঠিকানা।।

.

চেতন গুরুর সাথে কর ভগ্নাংশ শিক্ষা

বীজগণিতে পূর্ণমান হবে তাতে পাবি রক্ষা।

মনমতি ভাল হও দীক্ষাশিক্ষা লও

মানসাঙ্ক কষতে যেন ভুল করো না।।

.

বাংলা শিক্ষা কর মন আগে

ইংরেজীতে মন তোমার রাখ বিভাগে।

বাংলা না শিখিয়ে ইংরেজীতে মন দিয়ে

লালন বলে করছ পাশের ভাবনা।।

গত ২০ ডিসেম্বর ২০১৪ একটি আড্ডায় আমি এ গানটি গেয়েছিলাম। আমি গান শিখিনি, সাঁইজীর গান খালি গলায় গাই। সেদিনও তেমনি খালি গলায় গানটি গেয়েছিলাম। এ ক্ষেত্রে আনাড়ি লোকের প্রসংশার অভাব হয় না। সাঁইজীর গান যেখানেই গাই আনাড়ির স্বীকৃতি হিসেবে প্রসংশা পাই। কিন্তু সেদিন প্রসংশার সাথে সাথে ব্যতিক্রম ঘটনাটি ঘটে গেল। এর আগেও লালন সাঁইজীর গানে “বীজগণিত”, “শিক্ষা” ইত্যাদি শব্দের উপস্থিতি নিয়ে ‘শিক্ষিত’ মানুষদের বিস্মিত হতে দেখেছি। কিন্তু সেদিন সেই বিস্ময়টা তীব্রতায়ই শুধু পরিণত হলো না,সরকারি আমলাটি গান শেষ হতে না হতেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলেন-“এটা কোন মতেই লালনের গান হতে পারে না”। তাঁর কথার তীব্রতায় প্রথমেই আমার মনে হলো –আমি বুঝি অন্যায় কিছু একটা করে বসেছি। আমি গবেষক নই। এ গান প্রাপ্তির উৎসের কথা যেমন উল্লেখ করেছি সেই ভরসায় মৃদু আপত্তি করে বলেছিলাম এটা লালন সাঁইজীরই গান। দুই এক কথা পর এটা যে লালন সাঁইজীর গান নয় তার অকাঠ্য প্রমাণ স্বরূপ তাঁর মত জানা গেল। সাথে সাথে এটাও জানলাম যে, তিনি লালন গবেষক নন। তিনি যে যুক্তি থেকে বলছেন সেই যুক্তিও তাঁর একার নয়। পার্থক্য শুধু এই যে, অন্যরা খারিজ করেছেন বিস্ময়ের গন্ডির মধ্যে রেখে আর তিনি সেই গন্ডিটাকেও না রেখে সোজাসুজি খারিজ করলেন। কাজেই এই লেখার বিষয়টি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সূচনা হলেও ব্যক্তি কেন্দ্রীক আর থাকছে না। ব্যক্তির কথা থাকবে কিন্তু সেটা সমষ্টিকে প্রকাশের নিমিত্তে ব্যবহার মাত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

এ গানটি লালন সাঁইজীর কিনা সেটা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করাও এ লেখার বিষয় নয়। এ লেখার বিষয় হবে অভিজাতদের কাছে শিক্ষার ধারণা, “লোক” মানুষের শিক্ষা, শিক্ষিত কেন্দ্রীক। অভিজাতদের বৈশিষ্ট্যের এক মস্তবড় দিক হলো এঁরা ‘যৌপিন’বিহীন পোষাকী। অর্থাৎ আবরণ যেখানে দরকার, সেখানটা অনাবৃত রেখে ‘ঝকমারি’ পোষাকে আবৃত হয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি করাই এদের কাজ। কিন্তু উপযুক্ত সময়ে কারো টানমারা ছাড়াই নিজেদের হাম্বিতাম্বিতেই যখন আকর্ষণী পোষাকটা শরীর থেকে খুলে পড়ে যায় তখন এসব অভিজাতেরা সম্পূর্ণই উলঙ্গ হয়ে পড়েন। লালন সাঁইজী দীর্ঘায়ূ পেয়েছিলেন। তাঁর ১১৬ বছরের জীবনে মানুষের দেহ, মন, দেহমনের সম্পর্ক, সৃষ্টিতত্ত্ব, স্রষ্টার অস্তিত্বঅবস্থান, ধর্ম, মানুষ, সমাজ নিয়ে ভেবেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনের তাঁর কোন সুযোগ ছিল না। তাঁর ভাবনাগুলো সুরের মাধ্যমে গীত হয়েছে। তাই তাঁর ভাবনার বিস্তৃতি শ্রুতিস্মৃতি নির্ভর। সেখান থেকে তাঁর ভাবনার যে পরিচয় মেলে তা কোন জ্ঞান এবং শিক্ষাবিহীন সম্পূর্ণই কল্পনাপ্রসূত ধারণামাত্র নয়। তাঁর গানগুলোর মধ্যে সমসাময়িক,অতীত,স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানের পরিচয় মেলে। অর্থাৎ আমরা তাঁর যে ভাবনাগুলো পাচ্ছি তা নিছকই তাঁর মনগড়া ধারণা নয়। তাঁর ভাবনাগুলো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সমাজসভ্যতা, ধর্ম, বিভিন্ন দেশকাল, সংষ্কৃতির মানুষের চিন্তা চেতনাভাবনা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে কেন্দ্র করে। লালন সাঁইজীর মধ্যে কেউ এসব জ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দেয়নি। তাঁকে এসব প্রভুত জ্ঞান অর্জন করতে হয়েছিল। আর জ্ঞান অর্জনকে যদি শিক্ষা বলা যায় তবে সাঁইজীকে শিক্ষিত হতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শিক্ষার আঙ্গিনা ছিল “লোক” মানুষের মধ্যে। শিক্ষার স্বীকৃতির জন্য তিনি অভিজাতের আঙ্গিনায় যাননি।

লালন সাঁইজী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ‘আধ্যাত্নিক’ সাধনায় মগ্ন কোন মানুষ ছিলেন না। তাঁর সমাজ ছিল “লোক” মানুষের সমাজ। এই সব “লোক” মানুষ দ্বারাই এই জনপদের গ্রামসমাজ গঠিত। এখন গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবর্তন হলেও সে সময়ে গ্রামীন এবং শহুরে অর্থনীতির কেন্দ্রে ছিলেন এসব “লোক” মানুষ। অভিজাত যারা শহরে বসবাস করতেন তাদেরও অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল গ্রাম। আর অর্থনীতির কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন এই সব “লোক” মানুষ। এই সব কৃষিজীবী “লোক” মানুষেরা অভিজাতদের দ্বারা সরাসরি শোষিত হতেন। অভিজাতদের জীবন এবং অভিজাত্য এঁদের শোষণের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। বর্ধিত আকারে শোষণ করতে এখন যেমন শাসক শ্রেণিকে নিম্ন বর্গের মানুষদের জন্য নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হয় তখনকার অভিজাতেরা কৃষিজীবী “লোক” মানুষদের জন্য তেমন ব্যবস্থা করেনি। শোষণের শ্রেণি স্বরূপ গ্রামীন কৃষিভিত্তিক “লোক” মানুষ জানতেন না। তাঁদের পক্ষে তখন সে স্বরূপ জানা সম্ভবও ছিল না। শোষক এবং শোষিত কখনই পরষ্পর বিচ্ছিন্ন নয়, অবশ্যই তারা পরষ্পরের সাথে সম্পর্কিত। শ্রেণি শোষণের স্বরূপ না জানলেও শোষক এবং শোষিতের মধ্যকার এই সম্পর্কের কারণে “লোক” মানুষদেরকে অভিজাতদের খোঁজখবর রাখতে হতো। অভিজাতদের জীবনাচরণ, শিক্ষা ইত্যাদির হদিশ এসব গ্রামীন “লোক” মানুষদের করতে হতো। নিরন্তর শ্রেণি শোষণের স্বরূপ জানা না থাকলেও অভিজাতদের প্রত্যক্ষ অত্যাচার গ্রামীন সমাজের কাছে অপরিচিত ছিল না। কথিত আছে জমিদার এবং অভিজাতদের প্রত্যক্ষ অত্যাচার মুকাবিলা করার জন্য লালন সাঁইজীকে লিঠিয়াল বাহিনী গড়ে তুলতে হয়েছিল। লোকমুখে প্রচলিত আছে কাঙাল হরিনাথ তাঁর গ্রামবার্ত্তায় জমিদারদের অত্যাচারের কথা ছাপায় তাঁর প্রেস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আক্রমনের সন্মুখিন হলে লালন সাঁইজীর লাঠিয়াল বাহিনী তা রুখে দিয়েছিল। দেখা যাচ্ছে লালন সাঁইজী অভিজাতের আঙ্গিনা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও এদিক থেকে অভিজাতদের সাথে সম্পর্কহীন ছিলেন না। শিক্ষা বলতে তখন অভিজাতদের ব্যপার হলেও তার খোঁজখবর থেকে সাঁইজী বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাই কোন শিক্ষা অভিজাতদের কাছে ভীতিকর এবং কঠিন হিসেবে তাদের মুখে মুখে ফিরত তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না তা কি করে বলা যায় ?সে সময় অভিজাতদের কাছে শিক্ষা ক্ষেত্রে কঠিন বলে যা মুখে মুখে ফিরত তার মধ্যে ছিল বীজগণিত অন্যতম। ভগ্নাংশ, বীজগণিত ইত্যাদি ছিল খুব কঠিন বলে পরিচিত। বলা চলে সেটা এখনও আছে। তাই “চেতন গুরু” অর্থাৎ শানিত যুক্তির চেতনায় শিক্ষা গ্রহন করলে যে কোন কঠিন শিক্ষাই পরিপূর্ণভাবে গ্রহন করা যাবে সেটা বুঝাতে লালন সাঁইজী “বীজগণিত”, “ভগ্নাংশ” এসব শব্দ ব্যবহার করতে পারবেন না এর পক্ষে কোন যুক্তি কিভাবে খাটে ?বরং কথিত আমলাটির ‘ঝাঁকমারি’ পোষাকটি খুলে পড়ে তিনি একেবারেই উলঙ্গ হয়ে যান এই কারণে যে,তিনি ভাবছেন ‘বীজগণিত’ বুঝি খুব আধুনিক বিষয়। বীজগণিত মোটেও তথাকথিত কোন আধুণিক বিষয় নয়। লালন সাঁইজীর জীবনাবসান ঘটে ১৮৯০ সালে। তাঁর মৃত্যুর হাজারেরও অধিক বছর আগে মুহাম্মাদ ইবনে মূসা আল খারিজমির (৭৮০৮৫০ খৃ: )তাঁর গণিত বিষয়ক এক আলোচনায় al-jabr w’al-muqabala (যোজনবিয়োজন) থেকে algebra শব্দটি এসেছে। ভারতবর্ষের গণিতবীদ ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮৬৬৫খৃ: )সফলভাবে প্রথম শূন্য ব্যবহার করেন। ভাষ্কর (১১১৪৮৫খৃ: ) অজানা সংখ্যাকে লেটারের সাহায্যে প্রকাশ করেন। এসব থেকে কোনভাবেই বলা যাবে না যে, লালন সাঁইজীর সময় ‘বীজগণিত’ শব্দটি ‘কৃষ্ণ গহ্বরে’ ছিল। আপত্তির জায়গাটা এখানেই তা হলো, লালন সাঁইজীর মত একজন ‘অশিক্ষিত’ ‘লোকে’র মুখে এমন শব্দ মানানসই হতে পারে না যার সাথে অভিজাতদের শিক্ষার স্পষ্ট যোগপরিচয় আছে। এরকম শব্দ যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বলতেন তা হলে নিশ্চয় এসব অভিজাতেরা অবাক হতেন না বা আপত্তি তুলতেন না।

লালন সাঁইজীর পদগুলোতে এমন অনেক শব্দ দেখা যায় যা মানুষের মুখে মুখে ফিরত না। বরং এসব শব্দের সন্ধান পেতে হলে বিভিন্ন ভাষার ওপর প্রভুত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কারণ এগুলো অলৌকিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয় যেমনটি অভিজাতেরা ভাবেন। লালন সাঁইজীর পদগুলোতে সৌদামিনি, সিদরাতুলমোন্তাহা, নূরতাজেল্লা, মাশুক, সফিনা, হায়াতুল মুরছালিন, লেহাজ, হাকিকী, নফিএজবাত, কমন্ডুলু, নলিন, আনকা, করঙ্গ, নফর, ষড়ৈশর্য, অকৈতব, বাদা, গম্ভু, বিরিঞ্চি, প্যারি, দৈয়াদিনী, জুদা, একাঙ্গুরা, খাকের পিঞ্জিরা, সেফাত, শরা এরকম অসংখ্য শব্দ পাওয়া যায়; যা তাঁর ভাষা জ্ঞান, সাহিত্য, সমাজ জ্ঞানের পরিচয় দেয়। অভিজাতেরা এসব শব্দে অবশ্য বিস্ময় প্রকাশ করেন না বা অবাক হন না, যদিও যে কোন বিষয়েই অর্বাচিন এসব অভিজাতদের একমাত্র পরিচিত কাজ হলো বিস্ময় প্রকাশ করা এবং অবাক হওয়া। এখানে অবাক হন না তার করাণ হলো এসব শব্দকে তাঁরা অনাসে ভাববাদের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারেন। অভিজাতদের একটা পরিচিত রোগ হলো লালন সাঁইজীর মত মানুষদের তারা সর্বদাই ভাববাদের মধ্যে আটকে রাখতে চান। এদের কাছে ভাব সংগীত, ভাবের প্রকাশ, ভাব চর্চার সাথে ভাববাদ একাকার হয়ে যায়। এর কারণ হলো অভিজাতদের প্রিয় বিষয় ভাববাদকে এরা সকল কিছুর সাথেই জুড়ে দিতে পারলে যারপর নেই খুশি হন। একদিন আরেক ‘প্রগতিশীলে’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলে বসেছিলাম –লালন সাঁইজী ভাববাদি বলতে যা বুঝায় তা ছিলেন না। আর যাই কোথায়সাথে সাথে তিনি প্রায় ক্ষুব্ধ হয়ে বলে বসলেন –‘খাঁচার ভিতর অচীন পাখি’ তাহলে কি?বুঝলাম তাঁর দৌড় কতটুকু। দৌড় এজন্য বলছি যে,কোন ব্যাক্তি মারা গেলে অনেক প্রগতিশীল মানুষও ‘চলে গেলেন’ কথাটা উল্রেখ করেন। কোথায় চলে যান ? কি চলে যান? অনেক কিছুই প্রশ্ন থেকে যায়। এসব প্রশ্ন কেউ করেন না, করার কোন প্রয়োজনও নেই। কিন্তু লালন সাঁইজী যখন প্রশ্ন তোলেন খাঁচা ভেঙে পাখি আমার কোন খানে লুকায়’ তখন তিনি সেই লুকানোর জায়গাকে স্বর্গনরক বা ইল্লিয়ানসিজ্জিন বলেন না। লালন সাঁইজী বস্তুবাদী ছিলেন না। কিন্তু প্রশ্ন তুলেছেন যা অনেক তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ তুলতে পারেন না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন

আছেন কোথায় স্বর্গপুরে কেউ নাহি সন্ধান জানে

কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা দেখায় আসমানে।।

পৃথিবী গোলাকার শুনি

অহর্নিশি ঘোরে আপনি

তাইতে হয় দিন রজনী

জ্ঞানীগুনি তাই বলে।

.

তার একদিকেতে নিশি হলে

অন্যদিকে দিবা বলে

আকাশতো দেখে সকলে

খোদা দেখে কয়জনে।

আপন ঘরে কে কথা কয়

না জেনে আসমানে তাকায়

লালন বলে কেবা কোথায়

বুঝিবে দিব্যজ্ঞানে।

এর মধ্যে কি ভাববাদের পরিচয় পাওয়া যায়? ভাববাদে বিভোর লোকেরা ভাব চর্চাকে ভাববাদ বলে বরাবরই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। যাইহোক, আলোচনার মূল বিষয়ে ফিরে গিয়ে আবারও বলা যায় কোন পদ লালন সাঁইজীর এবং কোন পদ অন্য কেউ লিখে তাঁর নামে চালাচ্ছেন এবং তার উদ্দেশ্যই বা কি সেসবের যুক্তিতর্ক এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। এ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো “হতে পারে না” যে যুক্তিতে বলা হলো সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে আলোচনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি লালন সাঁইজীর মত একজন জ্ঞান সাধককে যে গন্ডিতে বেঁধে রেখেছে তা আমাদের সমাজের জন্যই শুধু নয় গোটা মানব সমাজের জন্যই মস্তবড় ক্ষতি। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন এবং লালন সাঁইজীর পদগুলো নিয়ে যে তামাশমস্করা চলছে তার বিরূদ্ধে দাঁড়ানো জরুরী। অষ্টম শ্রেণির পাঠ্য বইতে লালন সাঁইজীর একটি সুপরিচিত পদ ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ সম্পূর্ণ বিকৃত করে এবং পরিবর্তন করে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা উল্লেখিত দৃষ্টি ভঙ্গিরই প্রকাশ।

২৩/০১/১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s