লিখেছেন: অজয় রায়

Communist_International-098একশো পঞ্চাশ বছর পূর্তী হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশনের (আইডব্লিউএমএ), যা প্রথম আন্তর্জাতিক হিসাবেও পরিচিত। ১৮৬৪ সালে লন্ডনে কার্ল মার্কসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক শ্রেণীর এই সংগঠন।[] যা ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলনগুলির সমন্বয় সাধন করে। শ্রমিকধর্মঘটে সমর্থন যোগায় এবং ফ্রান্সপ্রুশিয়া যুদ্ধের সময়ে যুদ্ধবিরোধী প্রচার চালায়। আর শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি ও সমাজবাদের আদর্শের প্রসারে ভূমিকা নেয়। এর মধ্যেই ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউনের মাধ্যমে সর্বহারার প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়।

বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের নীতিতে পরিচালিত আইডব্লিউএমএ’র অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলি অবশ্য নানা মতধারার অনুসারী ছিল। প্রুধো, ব্লাঙ্কি, লাসালপন্থীরা এবং বাকুনিনের অনুগামীরাও ছিলেন। যাদের অবৈজ্ঞানিক মতবাদের বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যেই রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত লড়াই চালান কার্ল মার্কস। কিন্তু শেষ অবধি ১৮৭৬ সালে গোষ্ঠীগুলির অভ্যন্তরীণ বিবাদের দরুন ভেঙে যায় এই সংগঠন।

বিশ্বায়নের প্রথম বিশ্লেষকদের অন্যতম ছিলেন কার্ল মার্কস। শুধু তাই নয়, পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের আক্রমণ মোকাবিলার লক্ষ্যে তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা নেন শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের রণনীতি প্রনয়ণে। যাতে পুঁজিবাদের অধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূলে প্রতিষ্ঠিত চূড়ান্ত মাত্রায় শোষণ থেকে মুক্তির জন্য সাংগঠনিক দিক থেকে একাধারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চরিত্রের শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের বিকাশে জোর দেওয়া হয়। স্পষ্টতই এখনও সংগঠিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে তেমনই জরুরি পুঁজির পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে আপসহীন অবস্থান নেওয়া আর সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ ও সাংগঠনিক কাঠামোর সংহতি। যা মানবসভ্যতার এক উন্নততর বিশ্বজনীন সমাজতান্ত্রিক/কমিউনিস্ট রূপবিন্যাসের উদ্ভবের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

কমিউনিস্ট আন্দোলন হল এক আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন। সকল প্রকৃত কমিউনিস্টদেরই লক্ষ্য হচ্ছে কমিউনিজম। কমিউনিস্টদের এই আন্তর্জাতিকতাবাদী চরিত্র চিহ্নিত করে যে নীতি, তা হল হয় আমরা সকলে পৌঁছাবো, নয়তো কেউই নয়। এটাই সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তি।

সাম্রাজ্যবাদও আন্তর্জাতিক শক্তি। গোড়া থেকেই তার এই চরিত্র। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদ নিজের আরও সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটিয়েছে। আর বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ব্যবহার করে চলেছে আর্থিক ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, বিচারবিভাগীয় ক্ষেত্রে ‘আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত’ এবং সামরিক ক্ষেত্রে ন্যাটোর মতো সংস্থাগুলিকে।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশের জন্যেও আন্তর্জাতিক স্তরে সর্বহারার কেন্দ্রীয় সংস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এই উপলব্ধির ভিত্তিতেই ১৮৪৭ সালে গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্টদের প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিউনিস্ট লিগ’। যার জন্য কার্ল মার্কস ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে রচনা করেন কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার। পরবর্তীকালে কার্ল মার্কসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক। যার ধারাবাহিকতায় ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস এবং লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অবশ্য ফ্যাসিবাদী সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির দাবি মোতাবেক ১৯৪৩ সালে ভেঙে দেওয়া হয় তৃতীয় আন্তর্জাতিক (কমিন্টার্ন)[] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বিনিময় কেন্দ্র কমিনফর্মও ক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

সে সময়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট নেতা হিসাবে উত্থান ঘটে মাও সেতুঙের। তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। যেখানে কিনা তৃতীয় আন্তর্জাতিকের লক্ষ্য ছিল মূলত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে দ্রুত এগোনো আর তারপর স্বল্প সময়ের মধ্যে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা, মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্টরা বিশ্ব পুঁজিবাদের পরিধিতে (এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়) সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে আন্দোলনের এক ভিন্ন ধারণা উপস্থিত করেন লেনিনবাদের উত্তরাধিকারের সঙ্গে বিচ্ছেদ না ঘটিয়েই, বরং তা অতিক্রমণ করে। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করে সমাজতন্ত্র অভিমুখী দীর্ঘ পথের দিশা দেখান। কিন্তু নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া যায়নি তখন। এর পিছনে নিশ্চিতভাবেই কারণ ছিল। তবে এব্যাপারে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এখনও বিতর্ক আছে। এক সময়ে কমিন্টার্নের “বিশ্বের পার্টি” হিসাবে কাজ করা আর “পার্টিগুলির উপরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার” নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তা ফের প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমানে কমিন্টার্নের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নয়, ইতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করেই নতুন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গঠনের ভিত্তি রচনা করার যুক্তিসঙ্গত দাবি উঠছে বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন রাডিকাল সংগঠনের অন্দরে। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিকূল উপাদান রয়েছে। অতীতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল, যা বর্তমানে অনুপস্থিত। প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টিগুলির কোন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রও সক্রিয় নেই। এদিকে সাম্রাজ্যবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকলেও তা চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। আর শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন কোন মহাদেশেই অতীতের মতো তেমন শক্তিশালী নেই। শ্রমিক আন্দোলনের একাংশের মধ্যে আন্তর্জাতিকতাবাদের পুনরুজ্জীবন অভিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ততা রয়েছে। যখন শহুরে দরিদ্র মানুষের যেখানে বিশাল মজুত বাহিনী রয়েছে তেমন দেশগুলিতে স্থানান্তরিত হয়েছে বহু উৎপাদন কাজ। আর দক্ষতার কর্পোরেট মানদণ্ড পরিচালিত নতুন প্রযুক্তি শ্রমিকদের অস্থায়ীকরণঅনিয়মিতকরণ ঘটিয়েছে। যা আরও দুর্বল করেছে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার শক্তি।

তবে এর মধ্যেও লক্ষণীয় যেটা বিশ্বায়িত, আর্থিকীকরণ সম্পন্ন ও সর্বজনীনএকচেটিয়ে পুঁজিবাদের কাঠামোর বিকাশের প্রেক্ষিতে সামাজিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে এবং জনঅসন্তোষ বেড়েছে। আধিপত্যকারী কেন্দ্র ও শাসিত পরিধির মধ্যেকার নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতা আসেনি, বরং উল্টে দ্বন্দ্বসংঘাত বেড়েছে। যখন বিশ্ব অর্থনীতি সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। নয়াউদারবাদী সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের উপর আরও বোঝা চাপানো হচ্ছে। এদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে ফয়দা তুলছে কর্পোরেট সংস্থাগুলি। ক্রমাগত পরিবেশ ধ্বংস করছে। আর বিশ্বের নানা প্রান্তে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিশ্বস্ত শরিকরা ‘মানবাধিকার’ রক্ষার নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করে চলেছে। এর প্রতিবাদে মানুষের বিক্ষোভ আন্দোলনও অবশ্য ক্রমশ বাড়ছে।

তবে যেটা লক্ষণীয়, বর্তমানে সক্রিয় নেই প্রকৃত কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক ভ্রুণকেন্দ্রগুলি। যাদের একাংশের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। কোন কোন সংগঠন ভিন্ন পথে হাঁটছে। নেপালে যেমন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছে পুষ্প কমল দহলবাবুরাম ভট্টরাই গোষ্ঠী। যাদের নয়াসংশোধনবাদী আখ্যা দিয়ে আলাদা হয়ে সেদেশের রাডিকাল আন্দোলনকারী অংশ অবশ্য ইতিমধ্যেই পুনর্সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বব এভাকিয়ান তথাকথিত ‘‘নয়া সংশ্লেষণ’’ তত্ত্ব খাড়া করেছেন। যে সুবিধাবাদী চিন্তাধারা আন্তর্জাতিক রাডিকাল আন্দোলনের উপর “পথনির্দেশক নীতি” হিসাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে; যা বাঞ্চনীয় নয়।

এর মধ্যেই সমস্ত ধরনের সংশোধনবাদের (“দক্ষিণ দিক থেকে সংশোধনবাদ” এবং “বাম দিক থেকে সংশোধনবাদ”) বিরুদ্ধে সংগ্রাম তীব্র করে এমএলএম মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রকৃত কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক স্তরে এক নতুন একক কেন্দ্রে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মূলত বামপন্থী ও প্রগতিশীল জনআন্দোলনগুলির সঙ্গে জোটবদ্ধ ভাবেও এক বৃহত্তর কার্যকর আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার দাবি উঠছে। তবে এক্ষেত্রে ঐক্য/বৈচিত্রের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক যথাযথভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে। যাতে মূলত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনগুলির বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র অভিমুখী সংগ্রামে ক্রমবিকাশের পথ প্রশস্ত হয়। এর জন্যে জরুরি বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তিতে সাধারণ কর্মসূচী প্রণয়ন করা।।

৩১/১২/২০১৪

তথ্যসূত্র

[] Heiko Khoo, “On the 150th anniversary of the 1st International”, September 30, 2014

[] Zhou Enlai, “THE COMMUNIST INTERNATIONAL AND THE CHINESE COMMUNIST PARTY”, in Selected Works of Zhou Enlai, Vol. II, (Foreign Languages Press, Beijing 1989)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s