Mofakhaffer Ul Chowdhury-1

মোফাখ্খার চৌধুরী

(আমরা সাধারণত “ক্রসফায়ার”এর একমুখী প্রচারপ্রচারণাটাই শুনে থাকি, এমনকি একেই সত্য বলে ধরে নিই, কিন্তু তার অপরদিকের সত্যটা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় না, বা হতে দেওয়া হয় না। এই “ক্রসফায়ার”এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং এর সাথে রাষ্ট্রের রাজনৈতিকতার সম্পর্কটাও তুলে ধরা হয়েছে নেসার আহমেদ সম্পাদিত ক্রসফায়ার’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বইটিতে। বইটি হয়তো অনেকেই পড়েছেন, আবার অনেকেরই হয়তো তা এখনো পড়া হয়নি। আর এ জন্যই এই বইয়ের প্রতিবেদনসমূহ এখানে পর্যায়ক্রমিকভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্পাদক)

প্রতিনিধি পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)

নেসার: আপনার নাম, দলের নাম এবং পার্টিতে আপনার সাংগঠনিক অবস্থান উল্লেখ করে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।

তুষার: আমার নাম তুষার। আমি পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) এর একজন প্রতিনিধি।

নেসার: আমার প্রথম প্রশ্ন মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পর্কে। আপনি তার সম্পর্কে যতটুকু জানেন, সেটা আমাদেরকে জানাবেন আশা করি।

তুষার: উনার সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে ১৯৭৪ সাল থেকে আমি শুরু করতে চাচ্ছি। কারণ ১৯৭৪ সালে উনার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। তার পূর্বের ইতিহাস আমি বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে কিছু কিছু তথ্য অবশ্যই উল্লেখ করব। আমি ১৯৭৪ সালে পার্টির সাথে সম্পর্কিত হই। তার পরপরই উনার সাথে আমার পরিচয় ঘটে। এবং ১৯৭৪ সালে উনি গ্রেফতার হওয়ার মাসখানেক আগের ঘটনা এটা।

যাক, ওই সময় আমি যে এলাকায় পার্টির কাজ করতাম, সেই অঞ্চলে একটা বিপর্যয় ঘটে। ওই বিপর্যয়ের কারণ এবং কিছু কমরেডদের সম্পর্কে তথ্য জানাতে উনি আমার সাথে যোগাযোগ করেন। এভাবেই উনার সাথে আমার পরিচয়। পরিচয়ের এক মাস পরেই উনি গ্রেফতার হন ঢাকা থেকে। ১৯৭৪ সালের সম্ভবত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে। তার গ্রেফতার হওয়ার পিছনে পার্টির মধ্যে একজন শত্রুর চরের ভূমিকা ছিল। তার বাড়ি সিলেটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। চৌধুরী ভাইয়ের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এবং সে পার্টির কাজ করত। ওই সময় ঢাকা শহরে পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তর মেনটেনের জন্য একটা বাসা নেয়া হয়। সেই বাসায় কমরেড শফিক অবস্থান করতেন। আমাদের পার্টির তৎকালীন সম্পাদক কমরেড মনিরুজ্জামান তারা এবং মোফাখ্খার চৌধুরীর একটা প্রোগ্রাম ছিল ঢাকার ওই বাসায়। তবে ওই বাসার তত্ত্বাবধানে ছিল আলোচিত বিশ্বাসঘাতক জুয়েল। চিটাগাং এবং সিলেট অঞ্চল সফর করে মোফাখ্খার চৌধুরী ঢাকা গেলেন। এবং জুয়েলের সাথে দেখা করলেন। জুয়েলই চৌধুরী ভাইকে ওই বাসায় নিয়ে যায়। বাসাটা ছিল মিরপুরে। আর বাসার সামনে চৌধুরী ভিলা নামে একটা সাইন বোর্ড টানান আছে। ওই বাসায় বসে কথাবার্তা বলে, কমরেড মনিরুজ্জামান তারা ও মোফাখ্খার চৌধুরী যখন চলে আসবেন, তখন জুয়েল তাদের বলে, কমরেড শফিকের খাটটা একটু ঠিক করে দেয়া দরকার। খাট ঠিক করতে গিয়ে বেশ কিছুটা সময় চলে যায়। ইতিমধ্যে জুয়েল বলে, আমি একটা সিগারেট খাব। তখন কমরেড শফিক তাকে একটা স্টার সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলেন, নেন খান। কিন্তু জুয়েল বলে, স্টার সিগারেট নয়, একটা ক্যাপস্টান সিগারেট খাব। এই অজুহাতটা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা দরকার ওই বাসার সামনে একটা পানের দোকান ছিল। জুয়েল বের হয়ে যাওয়ার ৫৬ মিনিটের মধ্যেই চৌধুরী সাহেব আছেন, চৌধুরী সাহেব আছেন বলতে বলতে ওই বাসায় প্রবেশ করেন এক দল লোক। প্রথমে উনারা ভেবেছেন চৌধুরী ভিলার খোঁজ নিতে তাদের প্রতিবেশী কেউ হয়ত আসছেন। কিন্তু ওরা ঘরে ঢুকেই তাদের অ্যারেস্ট করে চোখ বেঁধে ফেলেন। তখন মিরপুরের ওই অঞ্চলে আজকের মতো এত বসতি ছিল না। ওই পরিস্থিতিতে চৌধুরী ভাইরা ভাবছেন এটা ডাকাত গ্রুপ হতে পারে। প্রথমত বাসাটা নেয়া হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে এবং তাদের এখানে আসার কথা শফিক ও জুয়েল ছাড়া অন্য কারো জানা নাই। দেখা যাক জুয়েল তো বাইরে গেছে ও আসলে কী ঘটে। এই ঘটনার দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে একজন বলে, স্যার বাসায় তো মাওয়ের লাল বইয়ে ভরতি। তখন ওদের মধ্য থেকে কর্মকর্তাটা বলেন, মাওয়ের লাল বই ছাড়া এখানে অন্য আর কী পাবে? তারা ও চৌধুরী ভাই তখন বুঝে নেন এরা পুলিশের লোক। ওইখান থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে ২৮ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত মালিবাগের এসবি হেডকোয়ার্টারে রাখে।

নেসার: কোন সালে?

তুষার: ১৯৭৪ সালে এবং উইদাউট রেকর্ডে রাখা হয়। ২১ তারিখ মধ্যরাতে ওইখান থেকে তারা ভাইকে বিচ্ছিন্ন করে মেরে ফেলা হয়। অর্থাৎ ২২ তারিখে তারা ভাইকে মেরে ফেলা হয়।

নেসার: মনিরুজ্জামান তারাকে কোন জায়গায় নিয়ে মারা হয়েছিল?

তুষার: তারা ভাইকে মালিবাগ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় সিরাজগঞ্জ। তারপর ওখানকার পার্টি কমরেডরা যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা জানান, তারা ভাইকে হত্যা করে তার লাশ ফেলে রাখা হয়, তার মায়ের কবরের উপরে।

নেসার: মানে মালসাপাড়া কবরস্থানে?

তুষার: হ্যাঁ, মালসাপাড়া কবরস্থানে। ওখানেই তার মায়ের কবর। ওই কবরের উপরে লাশটা ফেলে রেখে আসে। এরপর ওই মাসের ২৫ তারিখে চৌধুরী ভাই এবং কমরেড শফিকের নাম এন্ট্রি করে তাদেরকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে ওই সময়ে শেখ মুজিবের একটা অর্ডার ছিল, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির যদি কোনো নেতা গ্রেফতার হয়, তাহলে, তার নাম এন্ট্রি করার পূর্বে তাকে জানাতে হবে। মোফাখ্খার চৌধুরী ওই যাত্রায় বেঁচে যান যে কারণে, তা হলো, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সেই সময়ে ছিল পাবনা অঞ্চলে। এবং সিলেট অঞ্চলে তার বাড়ি হলেও, ওই সময়ে পার্টির কোনো তৎপরতা ওখানে ছিল না। সিলেট অঞ্চলে তৎকালীন বাকশালের যে সম্পাদক ছিলেন। জয়নুল হোসেন চঞ্চল। মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পর্কে তার কাছে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। সে জানায়, এদিকে ওই পার্টির কোনো অ্যাকটিভিটিজ নাই। আর মোফাখ্খার চৌধুরী তাদের জন্য কোনো ফ্যাক্টর নয়। তখন অন্যান্য জায়গায় ইনফরমেশন চাওয়া হয়। সব জায়গা থেকে রিপোর্ট আসে মোফাখ্খার চৌধুরী কোনো ফ্যাক্টর নয়, ফ্যাক্টর হচ্ছে মনিরুজ্জামান তারা। এসব রিপোর্টের ভিত্তিতে ওই যাত্রায় চৌধুরী ভাই রক্ষা পায়।

এরপর ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবকে হত্যা ও জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের একটা ঘটনা ঘটে। এবং শাসক শ্রেণীর এই অংশটি এন্টি ইন্ডিয়ান প্ল্যান থেকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের জেলখানা থেকে ছাড়তে শুরু করে। কমিউনিস্ট নেতাদের একটা অংশ শাসক শ্রেণীর কাছে মুচলেকা দিয়ে বের হয়। চৌধুরী ভাইকেও ’৭৬ সালের প্রথম দিক থেকেই অন্তত তিনবার মুচলেকা দিয়ে বের হয়ে আসার প্রস্তাব দেয়া হয় শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে। তিনি প্রত্যেকবারই ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সম্ভবত ’৭৭ সালের প্রথমদিকে তাকে জেলখানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি আবার পার্টি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আমাদের পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বলতে, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে অন্য কোনো তথ্য আমার জানা নাই। তিনি এদেশের রাজনীতিতে মতাদর্শগতভাবে মাওবাদের পতাকাকে সব সময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। এবং কমরেড চারু মজুমদারের যে লাইন; সেই লাইন প্রয়োগের মধ্য নিয়ে, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন।

নেসার: আমার জানা মতে, তৎকালীন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) এর নেতাকর্মীদের মধ্যে দুটো প্রশ্ন ঘিরে একটা আন্তঃপার্টি সংগ্রাম হয়েছিল। প্রথমে জেলখানার মধ্যে এবং মোফাখ্খার চৌধুরীরসহ অপরাপর যারা ছাড়া পান; সেই পর্বে আরেকটি আন্তঃপার্টি সংগ্রাম হয়েছিল মাও সেতুঙ ও তেঙ শিয়াও পিঙের লাইন নিয়ে। এই দুই পর্বে মোফাখ্খার চৌধুরীর রাজনৈতিক ভূমিকা কেমন ছিল?

তুষার : হ্যাঁ, দুটো প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে টিপু বিশ্বাস ছিলেন আমাদের পার্টির সম্পাদক। তার আগে পার্টির সম্পাদক ছিলেন আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন পার্টি লাইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শ্রেণী লাইনের বিপরীতে জাতীয় লাইনকে সামনে নিয়ে আসলেন এবং ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) অর্থাৎ হক সাহেবের পার্টিকে মাদার পার্টি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ওই পার্টির সাথে মার্জ করার নামে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল)-এর বিলুপ্তির দিকে নিয়ে গেলেন। তখন পার্টির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা আমজাদ হোসেনের লাইনকে প্রত্যাখ্যান করে টিপু বিশ্বাসকে সম্পাদক নির্বাচন করে পার্টির কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। একটা পর্যায়ে টিপু বিশ্বাস গ্রেফতার হয়ে যান। টিপু বিশ্বাস জেলখানায় যাওয়ার পূর্বে, জেলখানায় অবস্থান করছিলেন ভারতীয় পার্টির একজন তাত্ত্বিক নেতা সুব্রত বল। ওই সুব্রত বলই জেলখানায় একটি রাজনৈতিক লাইন উপস্থাপন করেন। যার মর্মবস্তু ছিল ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে চারু মজুমদারের শ্রেণী লাইন সঠিক নয়। এটা ব্যক্তি খতম এবং ব্যক্তি সন্ত্রাসের লাইন। পার্টিকে আর গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তা নাই। পার্টিকে প্রকাশ্য পার্টি হতে হবে। যাক, আমাদের পার্টিতে ওই সময় সুব্রত বলের এই রাজনৈতিক ভাষ্যটি দলিল আকারে আসে। ভিন্ন নামে। কমরেড ইকবালের নামে। অর্থাৎ টিপু বিশ্বাসের সাংগঠনিক নাম ছিল ইকবাল। পার্টিতে ওই দলিল ইকবালের দলিল হিসেবে পরিচিত। এই দলিলটা নিয়ে পার্টিতে তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম হয়। সেই সংগ্রামে কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী মূল ভূমিকা পালন করেন। যখনই ইকবালের দলিল পরাস্ত হলো তার পরপরই উপস্থাপন হয়েছিল কমরেড শফির লিনপিয়াও সম্পর্কিত আর একটি দলিল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে মাও সেতুঙকে সমালোচনা করে লিন পিয়াওয়ের লাইনকে সেখানে সঠিক বলা হয়। অবশ্য লিনপিয়াওর লাইন কেন্দ্রিক আন্তঃপার্টি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল কমরেড মনিরুজ্জামান তারা জীবিত থাকাকালীন সময়ে। এই সময় কমরেড শফির লাইনের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন কমরেড মনিরুজ্জামান তারা ও মোফাখ্খার চৌধুরী। কমরেড শফি তখন জেলখানায় ছিলেন, ফলে তার লাইনের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম জেলখানার মধ্যেও হয়েছিল। পরবর্তীতে কমরেড শফি জেলখানা থেকে বের হওয়ার পরে তিনি তার লাইনটা প্রত্যাহার করে নেন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জেলখানার মধ্যে লিনপিয়াও প্রশ্নে আমাদের পার্টিতে একটা ভাঙন আসে। লিনপিয়াও সঠিক এ লাইনের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড শফির সাথে কমরেড খাইরুল ও কমরেড খোকন। লিন বিরোধী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড কাজল ও কমরেড শামিম। ওই সময় এভাবে একের পর এক ভাঙনে পার্টি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। জেলখানা থেকে বের হয়ে কমরেড শফি তার দলিল প্রত্যাহার করে নিলেন। তারপর পার্টিকে পুনর্গঠিত করার কাজ শুরু হয়। পার্টি আবার যাত্রা শুরু করে। এই সময়ে একটা পর্যায় পর্যন্ত কমরেড খায়রুল পার্টির দায়িত্বে ছিলেন। এর তিন চার মাস পরেই কমরেড খায়রুল দায়িত্ব পালনে অপরাগতা প্রকাশ করেন। কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন।

আমি যে সময়ের উপরে আলোকপাত করে আলোচনা করছি; সেই সময়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চলছিল একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি। চেয়ারম্যান মাও মারা যাওয়ার পর হুয়াকুয়োফেঙেরএর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তেংশিয়াওপিঙেরের নেপথ্য পরিচালনায় সংশোধনবাদের দিকে যখন যাত্রা শুরু করে এবং মাদাম চিয়াঙ চিঙসহ মাওয়ের লাইনের অনুসারিদেরকে চার কুচক্রী হিসেবে চিহ্নিত করে ত্রিবিশ্ব তত্ত্ব নামে একটা আন্তর্জাতিক লাইন হাজির করে। তখন আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র মোফাখ্খার চৌধুরী ছাড়া অন্য সবাই হুয়া কুয়োফেঙের লাইনসহ ত্রিবিশ্ববিপ্লব তত্ত্বকে গ্রহণ করেন। এই পর্যায়ে কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী পার্টি সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে চাইলেও, তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটি তার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে না। এক্ষেত্রে মোফাখ্খার চৌধুরীর বক্তব্য ছিল, পার্টিতে যে লাইনটি গৃহীত হয়েছে ওই লাইনের প্রতিনিধিত্ব আমি করি না। ফলে এই লাইনের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মধ্য থেকে সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া উচিত। তারপরেও বিশেষ কিছু কারণে তাকে সম্পাদক রাখা হয়। এবং এই মতাদর্শগত সংগ্রামটা চলে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। ওই সময় কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী পার্টিতে একটা দলিল উপস্থাপন করেন। যার শিরোনাম ছিল মাও চিন্তাধারার লাল পাতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন; বিশ্বাসঘাতক তেঙ চক্র নিপাত যাক। ওই দলিলটি পার্টিতে উপাস্থাপনার পর পার্টি তা গ্রহণ করে নেয় [আন্তঃপার্টি সংগ্রামের দলিল হিসেবে]। কিন্তু দলিলটা যখন সর্বস্তরে প্রচারের দাবি আসল, তখন পার্টির তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বললেন যে, না দলিলটি সর্বস্তরে প্রচার করা যাবে না। এবং চৌ এনলাইয়ের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হলো, পার্টির কেন্দ্রীয় সমস্ত নেতৃত্বকে কনভিন্স করেই তবে দলিলটি পার্টিব্যাপী প্রচার করা যাবে। এভাবে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তেঙয়ের লাইনটা পার্টিতে বহাল রাখলেন। তারপর পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের উপলব্ধি এবং পার্টির বিপ্লবী কর্মীদের সংগ্রামের ফলে পার্টি তেঙ লাইনের পাক থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হলো, মাও লাইন পার্টিতে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এটা হচ্ছে আমাদের পার্টির প্লেনাম পূর্ববর্তী পর্যায়ে পার্টির মধ্যকার মতাদর্শগত ও আন্তঃপার্টির সংগ্রামের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ এবং ওই সময়ে মোফাখ্খার চৌধুরীর ভূমিকা।

১৯৮৫ সালে আমাদের পার্টিতে প্লেনাম হয়। প্লেনামে সর্বসম্মতিক্রমে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হয় এবং মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পাদক হন। ওই প্লেনাম থেকেই পার্টিতে আর একটা মতাদর্শগত সংগ্রামের সূচনা ঘটে। সেখানে কমরেড চারু মজুমদারকে এই উপমহাদেশে বিপ্লবের কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করা না করার প্রশ্ন আসে। এবং আরেকটি বিষয় ছিল অদূর ভবিষ্যতে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ গড়ে তোলার প্রশ্ন। এই দুটি প্রশ্নে দ্বিমত পোষণ করেন কেন্দ্রীয় কমিটির জনৈক কমরেড। এবং সেখান থেকে আর একটি মতাদর্শগত সংগ্রামের সূচনা হয়। যদিও প্রথম পর্যায়ে উক্ত কমরেড অন্য কমরেডদের চাপে বলেছিলেন, আমার বিরোধিতা কোনো লাইনগত বিষয় নয়। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে দেখা গেল; উনি উক্ত বিষয়বস্তুকে লাইনগত বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। এটাই হলো পার্টির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ লাইনগত সংগ্রামের ইতিহাস।

নেসার: আমার পরের প্রশ্ন হলো আপনাদের পার্টিতে সর্বশেষ ভাঙনের পূর্বে সম্পাদক পদ থেকে মোফাখ্খার চৌধুরীকে কি অপসারণ করা হয়েছিল?

তুষার: হ্যাঁ।

নেসার: কত সালের ঘটনা এটা?

তুষার: ১৯৯৯ সালে।

নেসার: তখন সম্পাদক কে হন?

তুষার: রাকেশ কামাল।

নেসার: যৌথ পার্টিই তো ছিল তখন?

তুষার: হ্যাঁ।

নেসার: আর আপনাদের পার্টিতে ভাঙনটা ঘটল কত সালে?

তুষার: ভাঙন ঘটে ২০০০ সালে।

নেসার: আপনাদের পার্টিতে এই যে ভাঙন, এটা কি অপরিহার্য ছিল? আর যেসব প্রশ্ন ঘিরে ভাঙন, আপনার বিবেচনায় ওই সব প্রশ্ন নিয়ে যথাযথ আন্তঃপার্টি সংগ্রাম হয়েছিল কি না?

তুষার: আসলে আপনার প্রশ্নের ধরন থেকে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, এ প্রশ্ন নিয়ে আর একটু বিশদ আলোচনা হওয়া দরকার।

নেসার : হ্যাঁ, আপনি বিশদ আলোচনা করতে চাইলে, আপনাকে অবশ্যই স্বাগত জানান হবে।

তুষার: মূলত বিষয়টা হচ্ছে এমন, ১৯৮২ সাল পর্যন্ত যেসব প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছিল, বিশেষত মাও ও তেঙ প্রশ্নে। প্লেনামে এসে দেখা গেল আসলে সবাই মাওকে গ্রহণ করেছে। তারপর ওই যে বললাম ঐক্যবদ্ধ সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষের প্রোগ্রাম। চারু মজুমদারকে উপমহাদেশের বিপ্লবী কর্তৃত্ব হিসেবে স্বীকার করা। এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় কমিটির জনৈক সদস্য দ্বিমত পোষণ করলেও পরবর্তীতে উনি বলেন, না, আমি সভায় উপস্থিত কমরেডদের মান যাচাইয়ের জন্য দ্বিমত করেছি। কিন্তু পরবর্তীতেও উনি উনার মতপার্থক্য বজায় রাখেন। তো প্লেনাম পরবর্তী সময়ে যখন পার্টিকে পুনর্গঠিত করে কাজ শুরু হলো, তখন দেখা গেল খুলনা অঞ্চলে পার্টির কাজের বিকাশ ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৯০ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি একটা সিদ্ধান্ত নিল, বিশেষত খুলনা অঞ্চলে কাজের বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে বলা হয়, খুলনায় পার্টির কাজের যেভাবে বিকাশ ঘটছে, তাতে পার্টির ওই অঞ্চলটি একটা অর্থনীতিবাদী ধারার খপ্পরে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে পার্টিকে বের করে আনতে হবে। এবং তা আনতে গেলে পার্টির যে খতম অভিযান চলছে; ওই অভিযানকে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপরে আঘাতে সম্প্রসারিত করতে হবে। পার্টির এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে গৃহীত হলো। কিন্তু এই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেডরা সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করলেন না। বরং পার্টির ওই শাখা পূর্বের অনুশীলিত লাইনকেই তাদের মতো করে ধরে রাখলেন। এবং ১৯৯৯ সালে এসে তাদের সেই ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলো কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরীর কাঁধে। এর সাথে আরো একটি বিষয় সম্পর্কিত রয়েছে। ১৯৮৫ সালের পরে পার্টিতে একটা লাইন আসে। ঠিক লাইন না একটা বক্তব্য আসে। বক্তব্যটা আসে বিশেষ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৯৭৪ সালে যখন পার্টির বিপর্যয় হয়, তখন পাবনা অঞ্চলে কিছু ঘৃণিত ব্যক্তি আওয়ামী পাণ্ডা, যাদের হাত সরাসরি আমাদের কমরেডদের রক্তে রঞ্জিত; সেই পাণ্ডাদের সাথে আমাদের পাবনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেডের সহঅবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে পার্টি কর্মী ও স্থানীয় জনগণ চাচ্ছিল, ওই পাণ্ডাদের উৎখাত করতে। সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় সদস্য এবং ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেড সহঅবস্থানের লাইন নিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পার্টিতে তখন মতাদর্শগত সংগ্রামের সূচনা ঘটে। এই অবস্থায় কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী পার্টির পত্রিকায় একটা লেখা দেন। যে লেখাটার শিরোনাম ছিল, ‘বদলা নেয়া ছাড়া শ্রেণী সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়া যায় না।’ সে লেখাটা প্রকাশিত হয় মাহমুদ হোসেন নামে। পরবর্তীতে পাবনা অঞ্চলের সেই কমরেড মানস রায় [কামরুল মাস্টার] নামে আর একটি লেখা দেন। যার শিরোনাম ছিল, ‘বদলা নেয়া ছাড়া শ্রেণী সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়া যায় না’ একটা জঘন্য পঁচা সংশোধনবাদী দলিল। এটা প্রকাশিত হয় পার্টির মুখপত্র পূর্ববাংলায়। এর পরবর্তীতে এই বক্তব্যটিকে কেন্দ্র করে কমরেড রশিদ আনোয়ার [ডা. মিজানুর রহমান টুটুল] আর একটা লেখা দেন। এবং তখন সিদ্ধান্ত হয় এভাবে বক্তব্য পার্টি পত্রিকায় উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এতে করে নানারকম বিভ্রান্তি ছড়াবে। তবে পার্টির মধ্যে লাইনগত বিষয় হিসেবে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম চলবে। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় একটা পর্যায়ে কমরেড মানস রায়ের লাইনটি পার্টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়। হওয়ার পরে উনি পার্টিতে একটা সার্কুলার জারি করেন। যা পার্টিতে ২য় সার্কুলার হিসেবে পরিচিত। উনার মতামত গৃহীত হওয়ার পর কমরেড মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এবং সম্পাদক হন কমরেড মানস রায়। কমরেড মানস রায় সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর এবং তার ২য় সার্কুলার গৃহীত হওয়ার পরেও ওই সার্কুলার নিয়ে পার্টিতে মতাদর্শগত সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। এবং এক পর্যায়ে ২য় সার্কুলারের লাইনটা পরাস্ত হয়। তখন কমরেড মানস রায় সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ান। মোফাখ্খার চৌধুরী আবার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবং তিনিও পার্টিতে আর একটি সার্কুলার জারি করেন। যা পার্টিতে ৩য় সার্কুলার নামে পরিচিত। এই ৩য় সার্কুলার জারি হওয়ার মধ্যদিয়ে ২য় সার্কুলারে যেসব বিষয়বস্তু ছিল তার সব কিছু বাতিল হয়ে যায়। এই বাতিল হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে কেউ যদি মতাদর্শগত সংগ্রাম করতে চায়, তাহলে, অবশ্যই কেন্দ্রীয় কমিটিতে জানান উচিত। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটিতে যেহেতু তা আর উপস্থাপন হলো না, যেহেতু প্রশ্নগুলো আর আলোচনার বিষয়বস্তু থাকল না। ফলে বিষয়গুলো চাপা পড়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৯৯ সালে পার্টির ৩৯তম কেন্দ্রীয় বৈঠকে হঠাৎ করে আবার বিষয়গুলো উত্থাপিত হয়। একই সাথে কমরেড নাসির হোসেনের দুটো দলিল ছিল। আলোচ্যসূচি হিসেবে তার উপরেও আলোচনা শুরু হয়। এই আলোচনার এক পর্যায়ে জনৈক কমরেড তার বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, আমরা মনে করি খুলনা অঞ্চলে আজকের যে বিপর্যয় এবং পার্টি কমরেডরা যেভাবে মারা যাচ্ছেন তার জন্য কমরেড সম্পাদকের ব্যর্থতাই দায়ী। অতএব এই সম্পাদককে অপসারণ করা দরকার। এজেন্ডা বহির্ভূতভাবে বা আলোচ্যসূচি বহির্ভূতভাবে এই প্রস্তাবটি আসে। এবং তখনই বিশেষ কীর্তিমানদের চক্রান্তের কারণে পার্টির কেন্দ্রীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তখন ৯ জনের কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল। ৫৩ ভোটে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়ে পার্টির সম্পাদক পরিবর্তীত হয়। তখন অপর একজন কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন জেলখানায়।

ওই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পাদক পদটি ত্যাগ করেন এবং কমরেড রাকেশ কামালকে সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সম্পাদক হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে কমরেড রাকেশ কামাল যে বক্তব্যটি রাখছিলেন তা হলো এই, আমি ৩য় সার্কুলারের পক্ষে। কিন্তু শহিদ ভাই, (শহিদ ভাই হলেন মোফাখ্খার চৌধুরী) আমি তার মতো অত অভিজ্ঞ ও দৃঢ় নই। কমরেড শহিদসহ যদি অপরাপর কমরেডরা আমাকে সহযোগিতা দেন, তাহলে, আমি দায়িত্ব পালন করতে পারব। এই ছিল তৎকালীন অবস্থায় সম্পাদক পরিবর্তিত হওয়ার অবস্থা। এখানে আমি যেটা মনে করি বা আমাদের পার্টি যেটা মনে করে একজন সম্পাদক নির্বাচিত হন, তার লাইনের উপর নির্ভর করে। যিনি লাইনের প্রবক্তা, তিনিই সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আমাদের পার্টিতে লাইনটা ‘ক’ এর। আর সম্পাদক হলেন ‘খ’ বা ‘গ’। এটা আসলেই একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। আপনার প্রশ্নটা তো ছিল সম্পাদক পরিবর্তনের বিষয়?

নেসার: শুধু সম্পাদক পরিবর্তন নয়। আপনাদের যে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম এটা কতটুকু পরিণত হয়েছিল? আর প্রশ্নটার উপরে গুরুত্ব দিয়েছি আপনাদের পার্টিতে ভাঙনের বিষয়টিকে উপলব্ধি করার অবস্থান থেকে।

তুষার: আন্তঃপার্টি সংগ্রামের ম্যাচুরিটির যে প্রশ্ন, এক্ষেত্রে আমি মনে করি ভাঙন যেগুলো ঘটেছে। বিশেষ করে লালপতাকার সাথে যে ভাঙনটা ঘটেছে, এই ভাঙনটা অবধারিত ছিল না। ওই পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যসহকারে মতাদর্শগত বিরোধগুলো পর্যালোচনা করে পরিচালনা করলেই ভাঙন রোধ করা যেত। কিন্তু সেখানে ব্যক্তি ইগো, বিশেষ করে লালপতাকার বন্ধুদের ইগোর কারণে এটা ঘটেছে। এখানে আর কিছু কথা আছে যা ব্যাপক জনসমক্ষে প্রচার করাটা যথাযথ হবে না। আর লালপাতাকা ছাড়াও আরেকটি ভাঙন আমাদের পার্টিতে হয়েছে। সেই ভাঙন সম্পর্কে অল্প বিস্তর কথা বলা দরকার।

লালপতাকার সাথে আমাদের ভাঙনের পর পার্টিকে পুনর্গঠিত করা হলো। এরপর পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তপন গ্রেফতার হন। সে গ্রেফতার হওয়ার পর পার্টিতে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তপনকে শত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনা হবে। পার্টির এই সিদ্ধান্তের সাথে তপনও একমত হন। এরপর পার্টি তপনকে ছিনিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ তপনকে খুলনা জর্জকোর্টে শত্রুর হাত থেকি ছিনিয়ে আনা হয়। দুভার্গ্যজনক হলেও প্রকৃত ঘটনা হলো যা আমরা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে জেনেছি তপন জেলখানায় থাকা অবস্থায় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাথে লাইনআপ হয়ে যায়। তাদেরকে কাজে লাগিয়েই তপন জেলখানা থেকে বের হয়ে আসেন। এবং পার্টিতে আবার যুক্ত হন। পার্টির মধ্যেই আলাদা একটা চক্র গড়ে তোলেন। ওই চক্রের অনেক অনৈতিক কাজ এবং উপদলীয় চক্রান্তের কারণে ২০০৩ সালের সম্ভবত ৩ জুনে পার্টির একটা কেন্দ্রীয় বৈঠক হয়। সেই বৈঠকটা হয়েছিল দীর্ঘ ৩ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত।

ওই বৈঠকে ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) –এর, রাজনীতি ও আমাদের করণীয়’ নামে একটা দলিল গৃহীত হয়। ওই বৈঠকে তপনও উপস্থিত ছিলেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে দলিলটা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল ১০ তারিখে বৈঠকের পরে ওই মাসের ২৭ তারিখে পত্রিকায় কমরেড তপন একটা বিবৃতির মাধ্যমে জানালেন, তারা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং তারা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) জনযুদ্ধ নামে নতুন আর একটা পার্টি গঠন করেছেন। পরবর্তীতে জনযুদ্ধের যে কার্যক্রম সেটা আমাদের মূল্যায়ন করার বিষয় নয়। এদেশের জনগণ ও বিপ্লবী কর্মীরাই মূল্যায়ন করবেন। এখানে প্রশ্ন হলো এটাই ১০ জুন বৈঠকে একমত হয়ে ২৭ জুন আলাদা পার্টি দাঁড় করানোর কী অর্থ থাকতে পারে? একজন কমিউনিস্ট যে নিজের মত দৃৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে পারে না, মতার্দশগত সংগ্রামকে ভয় পায়, সেখানে একটা জিজ্ঞাসা তো থাকেই। মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিক্ষা ছিল নিশ্চিত শির েদ জেনেও আমি আমার মতামত প্রকাশ করব। সেখানে তারা সেটা না করে আপস হয়ে বা একমত হয়ে বৈঠক শেষ করে এসে পরে আর একটি পার্টি বানাল। এটা কিন্তু অনেক প্রশ্নেরই জন্ম দেয়। তপনের এই পার্টি বানানোর বিষয়টিকে আমরা বিপ্লবী রাজনীতিতে চক্রান্ত হিসেবে দেখি। একই সাথে ওই সময়ে তপনের নিয়ন্ত্রণে থাকা পার্টির যাবতীয় সম্পদ সে দখল করে নেয়।

নেসার : তাহলে এটাই হলো আপনাদের সর্বশেষ ভাঙনের অবস্থা?

তুষার: হ্যাঁ।

নেসার : এখন আমার প্রশ্ন হলো সাম্প্রতিক সময়ে এদেশে মাওবাদী নামে পরিচিত দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যাপক বিপর্যয় লক্ষ করছি। এই বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে আপনাদের দলীয় মূল্যায়ন কী?

তুষার: সাম্প্রতিককালে যে বিপর্যয়গুলো হচ্ছে। তার কারণ অনুসন্ধান করলে যে বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়, তা হলো, আমরা যারা মাওবাদী বা মাওবাদের নামে কমিউনিস্ট আন্দোলনের চর্চা করছি। আমাদেরকে যেভাবে শ্রেণী বা শ্রেণী লাইনের উপরে নির্ভরশীলতা অর্জন করা দরকার ছিল। সেটা আমরা করতে পারিনি। শ্রেণী এবং লাইনের প্রতি যে নির্ভরতা সেটা যথাযথভাবে অনুশীলন করা হয়নি। এটাই হলো প্রধান কারণ। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো, শত্রুর শক্তির সাথে আমাদের শক্তির ভারসাম্যহীনতা। যে কারণে তাদের তীব্র এবং হিংস্র আক্রমণ আমরা মোকাবেলা করতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমরা যদি শ্রেণী লাইনের উপর নির্ভরশীল থাকতাম। দৃঢ়ভাবে শ্রেণী লাইনকে আঁকড়ে ধরতাম। তাহলে হয়ত আমাদের বিপর্যয়টা এড়ান যেত। মূলত সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে বিপর্যয় হবেই। বিপর্যয় অভ্যুত্থানেরই ধারাবাহিক রূপ, এটা চেয়ারম্যান মাওই বলেছেন। কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ের মধ্য আমরা পড়তাম না। এখানে ত্রুটি দুইটা।

নেসার: আমার মনে হয় এখানে আরো কিছু প্রশ্ন রয়েছে। যেমন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে শ্রেণী লাইনের সাথে সমন্বিত করে যে মিলিটারি লাইন গড়ে তোলার একটা বিষয় রয়েছে। সেখানে কি কোনো ব্যর্থতা নেই? আপনারা দীর্ঘদিন ধরে যে সামরিক লাইন চর্চা করে আসছেন এবং যে সামরিক স্ট্রাকচার গড়ে তুলেছেন, সেটা তো শ্রেণী শত্রু বা গণশত্রু খতমের লাইন। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা থেকে যে ধরনের সামরিক লাইনের দরকার সেটা কী অনুশীলন করেছেন?

তুষার: আমরা

নেসার: ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মূল্যায়নটা দাঁড় করাবেন?

তুষার: ১৯৭৫ সালের পর থেকে ওই অনুশীলনে যাওয়া হয়নি এ বিষয়টা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য আমরা ২০০৩ সালের পর থেকে, যে বিষয়টা ছিল এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখল এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে রাষ্ট্র শক্তির উপর আঘাত করার লাইন। সেই লক্ষ্যে একটা সামরিক লাইন গ্রহণ করে একটা নিয়মিত গেরিলা বাহিনী দাঁড় করানোর যে প্রক্রিয়া। আমরা ওই অনুশীলনেই যাচ্ছিলাম। অর্থাৎ অনুশীলনটা শুরু করার প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো ওই মুহূর্তে আমাদের সর্বশেষ ভাঙনের কারণে আমরা পুনরায় গুছিয়ে উঠতে পারিনি। তবে আমরা এই লাইনটা গ্রহণ করেছি। এবং আমাদের ডকুমেন্টসও আছে সামরিক লাইনগত প্রশ্নে। অর্থাৎ আজকে আমাদের বাহিনী কীভাবে গড়ে উঠবে। বাহিনী গড়ে তোলার শ্রেণী ভিত্তিটা কী? অনিয়মিত গেরিলা গ্রুপগুলোকে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত বাহিনীতে রূপান্তরিত করা যাবে। এ বিষয়গুলোতে আমরা প্রচেষ্টা শুরু করেছিলাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে আমরা ভাঙন ও ধারবাহিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ি। তবে আমরা আশাবাদী এই বিপর্যয় আমরা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব এবং আমাদের পরবর্তী সংগ্রামের ধরন হবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্য নিয়েই।

নেসার: এবার আমার প্রশ্ন হলো, কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ও রূপান্তরের লক্ষ্যে স্ব স্ব দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার বিশ্লেষণ করে থাকে। বিশেষত সামাজিক শ্রেণীগুলোর বিকাশের লক্ষ্য নিয়েই এটা তারা করেন। একই সাথে ওই সামাজিক শ্রেণীগুলো বিকাশের ক্ষেত্রে বৈরী দ্বন্দ্বগুলো কী? কারা প্রধান শত্রু কারা বন্ধু তারও একটা মূল্যায়ন তারা করেন। এ প্রশ্নে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আপনাদের মূল্যায়নটা কী?

তুষার: আমাদের দেশের আর্থসামাজিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমরা এখানো মনে করি আমাদের দেশটা নয়া উপনিবেশিকআধা সামন্ততান্ত্রিক। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে এটা নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। আমাদের দেশের প্রধান দ্বন্দ্ব হচ্ছে আধাসামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব।

নেসার: সাম্রাজ্যবাদের সাথে?

তুষার: সাম্রাজ্যবাদের সাথেও অবশ্যই জনগণের দ্বন্দ্ব রয়েছে। সমাজ বিকাশের নিয়মই বলে একটা সমাজে একই সময়ে অনেকগুলো দ্বন্দ্ব বিরাজমান থাকে। যেমন সামন্তবাদের সাথে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদের সাথে জাতীয় দ্বন্দ্ব। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে জাতীয় দ্বন্দ্ব। দেশীয় আমলা মুৎসুদ্দিশ্রেণী রয়েছে, তার সাথেও দ্বন্দ্ব রয়েছে। তার মধ্যে সামন্তবাদের সাথে কৃষক জনতার দ্বন্দ্বই প্রধান।

নেসার: এবার আমার জিজ্ঞাসা হলো, গত ৩৫ বছরের বাংলাদেশে তথাকথিত পপুলার গণতন্ত্রের যে ধারা এবং রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছিল তার একটা ধস নামতে দেখছি। বিপরীতে কমিউনিস্ট আন্দোলন যা বিকল্প শক্তি হিসেবে বিকশিত হতে পারত। সেখানেও আমরা বিপর্যয় লক্ষ্য করছি। এই ধরনের সামগ্রিক পরিস্থিতির মধ্যে আপনারা এমন কোনো সম্ভাবনা কি দেখছেন; যা জগণকে আশাবাদী করে তুলতে পারে? অর্থাৎ একটা দেশে বিপ্লবী পরস্থিতি বলতে মার্কসবাদী দার্শনিকরা যা বুঝিয়ে থাকেন। সেটা কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশে বিদ্যমান। বিপরীতে সাবজেক্টিভ কনডিশন হিসেবে রাজনৈতিক যে ধারা এবং শক্তি এখানে বিকশিত হওয়া দরকার ছিল। সেটাও অনুপস্থিত। এই পরিস্থিতিতে আপনি আশাবাদী হওয়ার মত কোনো ধরনের সম্ভাবনা দেখেন কি না?

তুষার: প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে বুর্জোয়া রাজনীতির যে সংকট বা আমাদের দেশের টোটাল রাজনীতির যে সংকট, এর মূল কারণ হলো আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাটা আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। এদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির বিকাশ ঘটবে না এ কারণে, এদেশের বুর্জোয়ারা স্বাধীন বুর্জোয়া নয়। তারা সাম্রাজ্যবাদের উপরে নির্ভরশীল; জনগণের উপরে নয়। যাদেরকে আমরা দালাল বুর্জোয়া বলে থাকি। আর যে দেশের রাজনীতিঅর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে দালাল বুর্জোয়াদের প্রাধান্য থাকে তাদের মধ্য থেকে যে কেউ চীনের ড. সানইয়াৎ সেনের মতো জাতীয়তাবাদী চরিত্র নিয়ে দাঁড়াবে এটা আদতেই আশা করা যায় না। সুতরাং আজকে আওয়ামী লীগবিএনপিজাতীয় পার্টি বা জামায়াতের রাজনীতির যে সংকট, সেটা শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া নিয়ে ওই দালাল শ্রেণীর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সংকট। আন্তর্জাতিক স্তরেই এই সংকট আজ আরো বিকশিত হয়েছে। যাকে আমরা বলছি বুর্জোয়া রাজনীতিরই সংকট।

আর বিকল্প শক্তি হিসেবে কমিউনিস্টদের যে সংকট, সেটা হচ্ছে প্রধানত আমরা যারা কমিউনিস্ট রাজনীতির নামে ঘুরে বেড়াচ্ছি বা কমিউনিস্ট রাজনীতি করতে চাচ্ছি। আমাদের সংকট হলো আমরা বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। আজ আমাদের এত বড় বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে; আমাদেরকে যেদিক আক্রমণের বর্শাফলক নিক্ষেপ করা দরকার ছিল। সেটা আমরা করতে পারিনি।

নেসার : যেমন?

তুষার: যেমন আজকের দিনে সাদামাটা ভাষায় বলতে গেলে শত্রু আমাদেরকে আক্রমণ করেছে। চেয়ারম্যান মাওয়ের একটা কথা আছে – ‘আক্রমণই হচ্ছে আত্মরক্ষার প্রধান উপায়।’ তো চেয়ারম্যান মাওয়ের সামরিক লাইনের এই নীতিগত অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে না ধরে, পরিস্থিতির দ্বান্দ্বিকতাকে বুঝতে সমর্থ না হয়ে শত্রু যখন আক্রমণ করে আমরা পিছু হটি। আমরা যখন আক্রমণ করি শত্রুকে তখন নাস্তানাবুদ করে ছাড়ি। বর্তমানে শত্রুর আক্রমণে আমরা শুধু পিছু হটছি। কিন্তু আত্মরক্ষার প্রধান উপায় যে আক্রমণ। দ্বান্দ্বিকভাবে আমরা এই শিক্ষায় উপনীত হতে পারি নাই। এটাই হলো আমাদের শক্তিশালী না হয়ে ওঠার কারণ। এখানে বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক লাইনের ব্যর্থতা এবং শ্রেণীর উপরে দৃঢ়ভাবে নির্ভরশীলতার লাইনকে আঁকড়ে ধরতে পারিনি। এই পরিস্থিতিটা কাটিয়ে উঠতে পারলে সম্ভাবনার দ্বার আবারো উন্মোচিত হবে। একই সাথে একথাও মনে রাখা দরকার আমরা এখনো বাস করছি শ্রেণীবিভক্ত সমাজে। শ্রেণীশাসন,শ্রেণীবৈষম্য, শ্রেণীআধিপত্যের বিষয়টি দিনকে দিন আরো প্রখর হয়ে উঠছে। এই অবস্থা থেকে জনগণ মুক্তি চায়। এবং জনগণের বিজয়ও অবশাম্ভাবী। এটাই আসামি দিনের সম্ভাবনা।

নেসার : আমাদের দেশে অপরাপর যেসব মাওবাদী দল রয়েছে, তাদের সাথে একদল গঠন বা ঐক্য প্রসঙ্গে আপনাদের লাইনগত অবস্থান কী?

তুষার: ‘ঐক্য’ আজকের দিনে আমাদের কাছে মুখোরোচক একটা শব্দ। এবং সেই ’৭৪ সাল থেকেই শুনে আসছি কমিউনিস্টদের ঐক্য। আসলে সেই ঐক্যটা কী? ঐক্যটা কি দুইজন ব্যক্তির মধ্যে? নাকি ঐক্যটা জনগণের পক্ষের শক্তির মধ্যে প্রশ্নটা এখানেই।

এখানে ঐক্যের ক্ষেত্রে দুটো লাইন আছে। একটা হচ্ছে দুইয়ে মিলে এক। আর অপরটি হচ্ছে এক ভেঙে দুই। তো দুইয়ে মিলে এক হাওয়ার যে লাইন এটা হচ্ছে লিউ শাওচির লাইন। এই লাইনকে আমরা নীতিগতভাবে ধারণ করি না। ফলে এই লাইনের ভিত্তিতে ঐক্যকে আমরা গুরুত্বও দেই না। ঐক্যবদ্ধ হব আমাদের প্রাকটিসের মধ্য দিয়ে। আমরা যদি মনে করি, যেমন ক বা খ যে কোনো একটা পার্টির লাইনকে মনে হলো সঠিক। সেক্ষেত্রে আমি বা আমরা যদি আন্তরিক বিপ্লবী হই, মাওবাদী হই, তাহলে, আমাদের দায়িত্বই হচ্ছে, সেই পার্টির সাথে নিঃশর্তভাবে মার্জ করে যাওয়া। সেই মার্জ করার মানসিকতাই যদি আমাদের না থাকে, তাহলে, যতই কাগুজে ঐক্য করি না কেন, জনগণের পক্ষের শক্তি হিসেবে তার বিকাশ ঘটবে না। ঐক্য হতে হবে এক ভেঙে দুই ঐক্য এর ভিত্তিতে। কারণ যে ঐক্য আজকে হবে। সেই ঐক্যটা গোটা সময়ের জন্য স্ট্যান্ড স্টিল থাকবে না। আজ আপানার সাথে আমার মতাদর্শগত আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে একটা পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আমরা হতে পারি। ঠিক আবার আন্দোলনসংগ্রামের অন্য একটা ফেইজে আপনার সাথে আমার অথবা অন্য কারো মতাদর্শগত সংগ্রাম ঘটতে বাধ্য। এই অন্যতম কারণে কমিউনিস্ট পার্টিতে সব সময় দুই লাইনের সংগ্রাম স্বীকৃত বিষয়। যার মধ্যে একটি ধারা সংশোধনবাদী অপরটি বিপ্লবী। কখনো কখনো পরস্পর এই বিপরীত দুই ধারা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সহাবস্থান করে। কখনো একটি ধারা অপরধারার প্রতিনিধিদের বিতাড়ন করে। তারপর তাদের মধ্যেও ওই সংশোধনবাদ এবং বিপ্লবী ধারার জন্ম নেয়। এটাই হলো পার্টি বিকাশের একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া। সুতরাং আজকে যারা ঐক্যের প্রশ্নটা বড় করে দেখছেন এবং গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছেন ওই ধারাটা হচ্ছে বুর্জোয়া রাজনীতি বা ফ্রন্ট গঠনের রাজনীতির যে ধারা তারই প্রভাব। এ ধরনের ঐক্য কোনোমতেই কার্যকর ঐক্য নয়। কিন্তু কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে হলে আপনাকে অবশ্যই বিরামহীনভাবে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে হবে। এবং মতাদর্শগত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই একটা লাইনকে পরাস্ত করে বিপ্লবী লাইন গড়ে তুলতে হবে। ওই লাইনকে আঁকড়ে ধরতে হবে। বিপ্লবীদের ঐক্য হতে হবে। ফলে ঐক্যের নামে আজকে চারদিকে যে চিৎকার, আমরা এই ধারার সাথে একমত নই। আমাদের কাছে ঐক্যের লাইনটা হচ্ছে এক ভেঙে দুইয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমরা এই লাইনগত অবস্থানের উপরে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করছি।

নেসার: যাক, চারু মজুমদার সম্পর্কে আপনাদের পার্টির বর্তমান মূল্যায়ন কী?

তুষার: কমরেড চারু মজুমদার সম্পর্কে এক কথায় যদি আমরা বলতে চাই, তাহলে, আমাদের মতামত হলো চারু মজুমদার এই উপমহাদেশের বিপ্লবী কর্তৃত্ব। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেন আমরা এই দাবিটা করি। এর উত্তর হলো, আমাদের পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে মার্কসবাদলেনিনবাদ ও মাওবাদ। কিন্তু কমরেড চারু মজুমদারের শিক্ষাকে অস্বীকার করে পূর্ব বাংলার সুনির্দিষ্ট অবস্থায় মাওবাদের প্রয়োগ সম্ভব নয়। এর অন্যতম কারণ হলো ভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে ইতিহাস। বিশেষত আমার সীমাবদ্ধতাসহ আমার জানা মতে, সেটা হলো বারবার জনগণের লড়াইয়ের ইতিহাস। বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টির বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, বিপ্লব করতে গেলে একটি সুনির্দিষ্ট লাইনের ভিত্তিতে একটা কমিউনিস্ট পার্টি দরকার। এবং তার একটা বাহিনী দরকার। জনগণের বাহিনী ছাড়া জনগণের কিছু নেই। আমি যখন বিপ্লব করতে চাই। একটা রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন করতে চাই। একটা ব্যবস্থা বদলে দিতে চাই। সেক্ষেত্রে প্রচলিত রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা টিকিয়েই রাখা হয়েছে শাসক শ্রেণীর সামরিক ক্ষমতাবলে। ফলে ওই সামরিক ক্ষমতা বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতার বিপরীতে যদি জনগণের বাহিনী না থাকে, তাহলে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা ব্যবস্থার বদল করা সম্ভব হবে না। তো এই উপমহাদেশে ১৯২১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছে। কমিনিস্ট রাজনীতি সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। এই কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে তেলেঙ্গানা সংগঠিত হয়েছে। নানকর বিদ্রোহ হয়েছে। তেভাগা আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু কোথাও সফলতা অর্জন করতে পারেনি। তেলেঙ্গানায় দেখা গেছে কমরেডরা লড়াই করছে। জীবন দিচ্ছে। কিন্তু অস্ত্রের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। কেন্দ্র ওই লড়াইকে বিকশিত না করে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তেভাগা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই একই বিষয় কেন্দ্রের দিক থেকে ঘটে। এই সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং ভারতের অতীত কৃষক আন্দোলনের সারসংকলন করে কমরেড চারু মজুমদারই হলেন সেই নেতৃত্ব; যিনি উপমহাদেশে সুনির্দিষ্ট অবস্থায় জনগণের বাহিনী গঠনের একটা লাইন উপস্থাপন করলেন। একই সাথে তিনি আর একটি বিশেষ মাত্রাযুক্ত করলেন। আজকের দিনে কৃষকদের যে সংগ্রাম সে সংগ্রামটা শুধুমাত্র জমি পাওয়ার লড়াই হলে চলবে না লড়াইকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এই যে তত্ত্বায়ন ও রাজনৈতিক লাইন তিনি নিয়ে আসলেন। এটাই হচ্ছে চারু মজুমদারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। যা উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংশোধনবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু আজকে লক্ষণীয় বিষয় হলো এক সময়ের বড় বড় বিপ্লবী এবং এককালের খোদ চারু মজুমদারপন্থিরা এখন প্রচার চালানচারু মজুমদারের লাইন হচ্ছে নিছক ব্যক্তি হত্যা ও ব্যক্তি সন্ত্রাসের লাইন [হাসি]। আমরা তা মনে করি না। আমরা মনে করি উপমহাদেশের বাস্তবতায় চারু মজুমদারের লাইনই হচ্ছে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে শ্রেণী ও গণভিত্তি সম্পন্ন রাজনৈতিক লাইন। মাস লাইন বলতে আমরা কমিউনিস্টরা যা বুঝি তা চারু মজুমদারের লাইনের মধ্যেই রয়েছে।

আমরা যদি আমাদের চারপাশে নজর ফেলি তাহলে দেখব, প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে নানান প্রক্রিয়ায় দুই একজন মানুষ একে অপরের হাতে খুন হচ্ছে। এসব খুনখারাবি নিয়ে কমিউনিস্টদের কিন্তু কোনো মাথাব্যথা নাই। কিন্তু যখন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিতভাবে জনগণের শ্রেণীশত্রু, গণশত্রু জনগণের হাতে খতম হচ্ছে, তখন চিৎকার উঠছে, গেল গেল সব গেল। নকশালরা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ওরা ব্যক্তি সন্ত্রাসবাদ চর্চা করছে। আমাদের শাসকশ্রেণীর কণ্ঠস্বরের সাথে আলোচিত কমিউনিস্টদের স্বর কিন্তু তখন এক হয়ে যায়। খতম অতীততেও ছিল। এখনও আছে। হয়ত শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থায় উত্তরণের পূর্বেও এটা থাকতে পারে। এই খতমের মেথডটার কমিউনিস্টদের আবিষ্কার নয়। এটা শ্রেণী বিভক্ত সমাজেরই ফলাফল। একটা শ্রেণী অপর শ্রেণীকে খতম করেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। শাসক শ্রেণীর হাত থেকে এই একচেটিয়া অধিকারকেই জনগণ কেড়ে নিতে চায়। আমাদের কাছে খতমের অর্থ কোনো ব্যক্তিকে খতম বোঝায় না। তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তিকে ধ্বংস করা বোঝায়। এখন যেমন শাসক শ্রেণী বিপ্লবীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তিকে উচ্ছেদ করতে তারা তাদের খতম অভিযান পরিচালনা করছে। বিপ্নবীদের ও বিপ্লবী জনগণেরও দায়িত্ব হলো এসব ঘৃণিত শত্রুদের খতম করা। নির্মূল করা। এর মাঝামাঝি বা বিকল্প কোনো রাস্তা নাই। অর্থাৎ মাওবাদের ভাষায়, রাজনীতি হচ্ছে একটা যুদ্ধ এবং যুদ্ধই হচ্ছে রাজনীতি। একটা হচ্ছে রক্তপাতহীন; আর একটা হচ্ছে রক্তপাতময়। যেখানে আমরা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি, সেখানে আমরা শত্রুকে খতম করব না। খতম না করেই আমরা ক্ষমতা দখল করব। এটাও একটা রাজনৈতিক লাইন। এর বিপরীতে কমরেড চারু মজুমদার খতমের লাইনটা সামনে নিয়ে আসেন। এই লাইনের মূল কথা হলো জনগণের মধ্যে প্রথমে রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। তার মধ্য দিয়ে ব্যাপক জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। তারপরেও অনেক ধরনের করণীয় রয়েছে। সেগুলো পালনের একটি পর্যায়ে গিয়ে ঘৃণিত শ্রেণী শত্রুকে খতম না করলে আন্দোলন সংগ্রাম বিকশিত করা যায় না। এসব জানাবোঝার পরেও যারা বলেন চারু মজুমদারের লাইন হচ্ছে ব্যক্তি সস্ত্রাস ও ব্যক্তি খতমের লাইন; তাদের উদ্দেশ্যটা কী তা তারা প্রকাশ্যে না বললেও জনগণ কিন্তু সেটা হরহামেশাই প্রত্যক্ষ করছেন। এই সব কিছু মিলিয়ে আমাদের পার্টির মূল্যায়ন হলো কমরেড চারু মজুমদার হলেন ভারতীয় উপমহাদেশে মাওবাদের একজন সফল প্রয়োগবিদ।

নেসার : দেখুন আমার দিক থেকে আরো একটি প্রশ্ন রয়েছে। খোদ চারু মজুমদার জীবিত থাকাকালীনই তার লাইনকে কিন্তু বলা হয়েছিল এটা ব্যক্তি হত্যা ও ব্যক্তি সন্ত্রাসের লাইন। যার সাথে মাওসেতুঙ চিন্তাধারার কোনো সম্পর্ক নেই। তার জবাবও সেদিন চারুপন্থীরা দিয়েছিলেন। তারা হুনানের কৃষক আন্দোলন ও তদন্ত রিপোর্ট থেকে দেখিয়েছিলেন, ব্যক্তি খতম বলতে যা বোঝানো হচ্ছে। সেটা চীনেও ঘটেছে। চীনেও একই পথে কৃষকদের সংগঠিত করা হয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এটা কি চারু মজুমদারের আবিষ্কার না চীনের হুনান থেকে উদাহরণটা নেয়া?

তুষার: দেখেন হুনানের কৃষক আন্দোলনের তদন্ত রিপোর্টটা পড়লেই আলোচিত প্রেক্ষাপটি স্পষ্ট এবং পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, এটা চারু মজুমদারের উদ্ভট মস্তিকপ্রসূত কোনো লাইন নয়। খতম বলতে আমরা যা বোঝাচ্ছি, তা হুনানের কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এবং উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তার নজির রয়েছে। তেলেঙ্গানা, তেভাগা, টংকু নানকরসহ প্রতিটি কৃষক বিদ্রোহে খতমের নজির রয়েছে। চারু মজুমদার এসব ঐতিহাসিক আন্দোলনের সারসংকলন করেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে সংকট বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ সংশোধনবাদী রাজনৈতিক ধারার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া। সেই বৃত্ত ভেঙে আন্দোলনকে গতি দেন। একটা ভবিষ্যত দিক নিদের্শনা হাজির করেন। এটা মাওবাদ পরিপন্থী কোনো লাইন নয়। চীনের ক্ষেত্রে হুনান যে দিক নিদের্শনা দেয় চারু মজুমদারের লাইন উপমহাদেশের ক্ষেত্রে সেই একই কাজটি করে।

নেসার : গণলাইন ও গণসংগঠন সম্পর্কে আপনাদের পার্টির ভাবনাটা আসলে কী? অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির বাইরেও যে জনগণ রয়েছে তাদের সেই সাংগঠনিক শক্তিকে যদি আমরা পিপলস ফোর্স হিসেবে দেখি। যেমন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, নারী সংগঠনসহ অসংখ্য পেশাজীবীদের যে সংগঠন এবং আন্দোলন সে সম্পর্কে আপনাদের ভাবনা কী?

তুষার: গণআন্দোলন ও গণসংগঠন? আমাদের মূল লড়াইটা তো সশস্ত্র সংগ্রাম। এখন প্রশ্নটাকে এভাবেও দেখা যেতে পারে, সশস্ত্র সংগ্রামের শীর্ষে গণআন্দোলনগণসংগঠননাকি গণআন্দোলনগণসংগঠনের শীর্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম? এক্ষেত্রে আমরা মনে করি সশস্ত্র সংগ্রামের শীর্ষেই গণআন্দোলনগণসংগঠন গড়ে উঠবে।

মূলত আমরা গণআন্দোলন ও গণসংগঠন বলতে যা বুঝি, তা হলো, কৃষকের বিপ্লবী কমিটি এটা হচ্ছে কৃষকের গণসংগঠন। আজকের যুগে ট্রেডিসনাল গণআন্দোলনগণসংগঠন দিয়ে বা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন দিয়ে আর যাই হোক, আত্মরক্ষা করাও যায় না। যদি আত্মরক্ষা করা যেত, তাহলে, আর যাই হোক না কেন শত শত মিল কলকারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে বন্ধ করা সম্ভব হতো না। বরং আজকের দিনে শাসক শ্রেণী আরো নগ্ন, আরো সশস্ত্র। বিপরীতে তারা সব গণসংগঠনের মধ্যে বিপ্লবী জ্বিলগুলো আটকে রাখতে চায়। ছাত্রদের মধ্যে একটা মিনি পার্লামেন্টারি প্রথার উদ্ভব ঘটিয়েছে। আমাদের উপমহাদেশে দুইশো আড়াইশো বছরের ইতিহাসে ছাত্রদের একটা উজ্জ্বল বিপ্লব আন্দোলনের ভূমিকা রয়েছে। তারাই সমাজের শিক্ষিত অংশ এবং অগ্রণী অংশ। তারাই পারে আজকে মাওবাদকে আত্মস্থ করে কৃষকশ্রমিকসহ সমস্ত পেশাজীবীদের মধ্যে মুক্তির বাণী নিয়ে যেতে। তো আমাদের দেশে চলমান যে ছাত্র রাজনীতি রয়েছে। এই ধারাটি ছাত্রদের মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ তৈরি করছে। এস্টাবলিস্টমেন্টের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। আজ আপনি দেখেন একজন ছাত্রনেতা বিরাট বিত্তবান। ওটা সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট একটা ধারা। এই ধারার গণসংগঠনের মধ্যে কোনো বিপ্লবী উপাদান পাওয়া যাবে না। সাময়িক কিছু ঝিলিক থাকতে পারে। তার অধিক কিছু নাই। ফলে একটা সঠিক বিপ্লবী লাইনের উপরে ভিত্তি করে গণসংগঠন দাঁড় করান খুবই টাফ ব্যাপার। এবং তা করতে গেলে বিপ্লবী শক্তিকে শত্রুর সামনে উন্মোচন করে দেয়া হবে। ফলে আমরা প্রকাশ্য ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন বা কৃষক সংগঠনের পক্ষে নই। কিন্তু তার অর্থ আবার এমন নয়, আমরা আমাদের নেতৃত্বে এসব গড়ে তুলব না। তারপরেও যেহেতু শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠেছে। ছাত্র সংগঠন, কৃষক সংগঠন গড়ে উঠেছে। সেখানে আমাদের ভূমিকা আসলে কী হবে। আমরা নানামুখি কর্মসূচীর মধ্যদিয়ে এবং মতাদর্শগত সংগ্রামের ভিতর দিয়ে এসব সংগঠনের বিপ্লবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার পক্ষে। ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন নয় বা তার নের্তৃত্ব দখল করারও বিষয় নয়। মৌলিক প্রশ্নটা এসব সংগঠনের বিপ্লবীকরণ করা তাকে লড়াকু সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা। তার মধ্যে পার্টি ইউনিট গড়ে তোলা। এবং পার্টি ইউনিট গড়তে হলে ব্যক্তি সংযোগের মাধ্যমেই তা গড়তে হবে। আজকে ধরুন দেশে অসংখ্য ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন, নারী সংগঠনসহ পেশাজীবীদের সংগঠন রয়েছে। আজ চারপাঁচ বছর ধরে দেশে ক্রসফায়ারের নামে বিপ্লবী কর্মীদেরকে গণহারে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো গণসংগঠন কি এর বিরুদ্ধে শক্তিশালীভাবে দাঁড়াতে পেরেছে? এই দাঁড়াতে না পারার কারণ শত্রুর সশস্ত্র অবস্থান ও সশস্ত্র আক্রমণের মুখে তাদের দাঁড়ানোর মত কোনো মেরুদণ্ড নাই। ফলে শত্রুর সশস্ত্র অবস্থানের মুখে প্রকাশ্যে ও গতানুগতিক ধাঁচে গণসংগঠন দাঁড় করানোর অর্থই হচ্ছে বিপ্লবীদেরকে শত্রুর সামনে উন্মোচন করে দেয়া। এই অন্যতম কারণে ট্রেডিসনাল ধাঁচে আমরা গণসংগঠন দাঁড় করানোর পক্ষপাতী নই। আমরা মনে করি সশস্ত্র সংগ্রাম বিকাশের মধ্য দিয়েই কৃষক তার বিপ্লবী কমিটি গড়ে তুলবে। শ্রমিক তার মিল কারখানা পরিচালনার যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব কাঁধে নেবে। ছাত্ররা তাদের সমস্যাভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলবে।

এখানে প্রশ্ন হলো, এতে করে ব্যাপক কৃষক এবং ছাত্রদের জমায়েত ঘটবে কীভাবে? এই সমাবেশটাও ঘটবে সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশের মধ্য দিয়েই। ভারতের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কৃষক সংগঠনগুলো ওই সময়ের সশস্ত্র আন্দোলনের পিছনে জমায়েত হয়েছে। তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিকরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিল হয়েছে। ছাত্ররা নিজস্ব ব্রিগেড তৈরি করে গ্রামের কৃষকদের সাথে একাত্ম হয়েছে। এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কিন্তু আমাদের সামনে রয়েছে। আজকের শিক্ষাব্যবস্থা যেমন ছাত্রদেরকে ক্যারিয়ারিস্ট হতে শিক্ষা দেয়। এই ধরনের চেতনা তাদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান থাকায় বর্তমানের ছাত্র সংগঠনগুলো কিন্তু এদেশের বিপ্লবী আন্দোলনসংগ্রামকে ঘৃণার চোখেই দেখে।

নেসার: আমার এবারের প্রশ্ন হলো, যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে। আমরা আধা বা নয়াঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মাওকে দেখেছি যুক্তফন্ট্র গড়ে তুলতে। এক্ষেত্রে আপনাদের পার্টির অবস্থান কী?

তুষার: যুক্তফন্ট্র বলতে এখন আমাদের দেশে যা প্রচলিত রয়েছে, তা হলো, বিভিন্ন পার্টির মধ্যে একটা ফ্রন্ট। কিন্তু আমরা মনে করি যুক্তফ্রন্ট হবে শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট। এটা হলো একটা দিক। পাশাপাশি আমাদের দেশে যদি এ মুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ আগ্রসন ঘটে, তাহলে, যুদ্ধের রণনীতি দাঁড়াবে জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং তখন হবে জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধের যুক্তফ্রন্ট। আমাদের মতো নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হতেই পারে। ওই পরিস্থিতিতে যে যুক্তফ্রন্ট সেখানে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে যারা অংশগ্রহণ করবে। তাদের নিয়েও আমরা যুক্তফ্রন্ট করতে পারি। তবে ওই যুক্তফ্রন্ট হবে শর্ত ভিত্তিক। অবশ্যই ওই যুক্তফ্রন্টে কমিউনিস্টদের নের্তৃত্বকে স্বীকার করে নিতে হবে। যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব থাকবে কমিউনিস্টদের হাতে। অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন গণফ্রন্ট বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন মাল্টিক্লাস পার্টি নিয়ে যুক্তফ্রন্ট হতে পারে। মোটকথা কমিউনিস্ট পার্টির নের্তৃত্ববিহীন যে যুক্তফ্রন্টের লাইন রয়েছে। আমরা ওই লাইনের ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট করতে আগ্রহী নই।

নেসার: অতি সম্প্রতি আমরা দেখলাম আফগানিস্তান ও ইরাক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দখল করে নিয়েছে। ইরানের উপরে হামলার পাঁয়তারা চলছে। এর বাইরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের নগ্ন হামলাও সংগঠিত হলো লেবাননের উপরে এবং প্যালেস্টাইনে প্রতিদিনই হত্যা হামলা চলছে। এসমস্ত দেশ আবার প্রধানত মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত। ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে আমরা আজ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে নামতে দেখছি। মুসলিমদের মধ্যে উম্মার ধারণাও একটা ভিন্ন মাত্রা পেতে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো এ সম্পর্কে আপনাদের মূল্যায়ন কী?

তুষার: প্রশ্নটা হলো আফগানিস্তান ইরাকসহ লেবানন ও প্যালেস্টাইনে হামলা হচ্ছে। এভাবে বিষয়বস্তুকে না দেখে ভিন্ন একটা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা যেতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে সমস্ত সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন হামলাকে মোকাবেলা করে, প্রতিরোধ করে এবং তাকে উচ্ছেদের জন্য লড়ে আমরা নৈতিকভাবে ওই লড়াইকে সমর্থন করি। আফগানিস্তানইরাকপ্যালেস্টাইনে যে লড়াইগুলো হচ্ছে, ওই লড়াইকে আমরা কোনো ধর্মীয় আবরণে আচ্ছন্ন করতে রাজি নই। ওই লড়াইগুলো স্পষ্টতই জনগণের লড়াই। জনগণের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই। তারপরেও কথা থাকে। ওই জনগোষ্ঠী যদি ইসলামকে ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদের জন্য লড়াই করে, তাহলেও আমরা ওই লড়াইকে নীতিগতভাবে সমর্থন করি, এখানে আরো একটি কথা পরিষ্কারভাবে আমাদের দিক থেকে বলা দরকার। আফগানিস্তানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই চলছে। আমরা ওই লড়াইকে কোনোভাবেই ধর্মীয় আবরণে আচ্ছন্ন করে তাকে মৌলবাদের উত্থান বা জঙ্গিবাদের উত্থান হিসেবেও দেখতে রাজি নই। এটা সম্পূর্ণতই জনগণের লড়াই। আমরা লেনিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ‘সাম্রাজ্যবাদের সাথে এটাকে নিপীড়িত জাতি ও জনগণের দ্বন্দ্ব’ বলেই মনে করি।

নেসার: দেখুন আমি একটু আগেই সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রেক্ষাপটে ইসলামী উম্মার একটা কথা বলেছি। যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা ভিন্নমাত্রা নিতে যাচ্ছে বলেই আমার ধারণা। একই সাথে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রধান জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলাম হওয়ার কারণে, তাদের মধ্যেও ওই চেতনা ভ্রƒণ আকারে হলেও গঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব ছাড়াই কিন্তু এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান থেকে মাঝে মধ্যে মাঠে নামছে। এখন প্রশ্ন হলো, জনগোষ্ঠীর এই অংশকে আমরা মৌলবাদী হিসেবে দেখব নাকি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখব?

তুষার: আমাদের পূর্ব বাংলায় কিন্তু অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এদেশে ইসলামী গ্রুপগুলো যেসব কাজ করছে তা অবশ্যই প্রশ্ন সাপেক্ষ। এখানে একটা বিষয় খোলামেলা বলা দরকার। প্রথমত তারা যদি প্রকৃত অর্থে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফোর্সই হয়ে থাকে, তাহলে, এদেশে অপরাপর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তিকে হত্যা করার কারণ তাদেরকে ব্যাখ্যা করতে হবে। আবার ইতিহাসে তারাই একমাত্র সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি নয়। ১৯১৭ সাল থেকে কমিউনিস্টরাই প্রধানভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ে আসছে। গোটা পৃথিবী জুড়েই এই ইতিহাসটা রয়েছে। পূর্ব বাংলাতেও আছে। কিন্তু যখনই এদেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফোর্স হিসেবে কমিউনিস্টরা একটা শক্তি অর্জনের পর্যায়ে এসেছে, ঠিক তখনই রাষ্ট্র শক্তির পক্ষ হয়ে তারা কমিউনিস্টদের হত্যা করেছে। তারা তাগুতি আইন মানেন না, কিন্তু এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে রক্ষার জন্যই তো কমিউনিস্টদের বিপক্ষে আবার লড়েন। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের উচ্ছেদের কথা বলেন। আবার পূর্ব বাংলার যে ফোর্সটি ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রেখেছেন সেই কমিউনিস্টদের উচ্ছেদে এরা পিছপা হন না। এভাবে কি প্রকৃত অর্থে সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ বিরোধী ফোর্স হিসেবে নিজেদের দাবি করা যাবে? তারপরেও আমরা মনে করি তারা যদি প্রকৃত অর্থে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কোনো ভূমিকা রাখে বা লড়াই এদেশের প্রেক্ষাপটে করতে চায়, তাহলে, আমরা অবশ্যই সে লড়াইকে অভিনন্দিত করব। কিন্তু কোন বেইজের উপরে দাঁড়িয়ে তারা সেটা করছে, সেখানে একটা প্রশ্ন আমাদের থাকবেই। কারোই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না কমিউনিস্ট পার্টি নীতিগতভাবেই শ্রেণী বেইজের উপরে দাঁড়িয়ে লড়াই করে। আমরা কিন্তু ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের লড়তে দেখেছি। পূর্ব বাংলার প্রেক্ষাপটে যদি ওই লড়াই বিকশিত হয় অবশ্যই আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার ইসলামিক শক্তিগুলো যদি ইসলামকে ভিত্তি করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইকে দাঁড় করাতে পারে, তাহলে, ওই লড়াইকে আমরা মৌলবাদজঙ্গিবাদের সিল লাগাতে যাব না। নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদের লড়াই হিসেবেই দেখব।

নেসার: এই শক্তির সাথে আপনাদের যুক্তফ্রন্ট হতে পারে কি না?

তুষার: সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই প্রধান দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত হলে হতে পারে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ আগ্রাসন হলে হতে পারে।

নেসার: সাম্রাজ্যবাদ যদি প্রত্যক্ষ হামলা না করে, তাহলে নয়াঔপনিবেশিক বিশ্লেষণ ক্যাটাগরি থেকে এই শক্তি যদি সাম্রাজ্যবাদের দোসর অর্থাৎ এদেশের ক্ষমতাসীন শ্রেণী যারা প্রচলিত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখেছে, পরিচালনা করছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। সেক্ষেত্রে কি ফ্রন্ট হতে পারে?

তুষার: দেখুন এক্ষেত্রে ওই শক্তি লড়াই করবে কি না সেটা আমাদের বিচার করতে হবে।

নেসার: যদি তারা সেটা করে?

তুষার: ওই যদির প্রশ্নে আসছি। ধর্মের বেইজ হচ্ছে ফিউডালিজম। ফিউডালিজমের উপরে ভিত্তি করেই ধর্ম টিকে রয়েছে। একই সাথে আমাদের দেশে আধাসামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাম্রাজ্যবাদের যোগসূত্র আছে। ফলে এদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যারা পরিচালনা করে এবং ক্ষমতায় আছে ওই ফিউডালিজমকে আঘাত না করে ওই শাসক শ্রেণীকে আঘাত করা তাদের জন্য টাফ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ ফিউডালিজমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে ওই শক্তি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই করবে, রাষ্ট্র শক্তির বিপক্ষে যাবে এটা দাবি করলেই তো হবে না। তাদের লড়াইটা দাঁড়াক তখন সময়ই গোটা পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসবে।

নেসার : দেখুন আপনি ফিউডালিজমের কথা বলছেন। এটা নিয়ে আমার নিজেরই অনেক কথা রয়েছে। আমি ওই প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে যাব না। তবে ইসলামের মধ্যে কিন্তু একটি ফোর্স রয়েছে। যারা সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানাকে খোদার শেরেকি করা হিসেবে দেখে। যদিও এই ধারাটা আমাদের দেশে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বেশ দুর্বল। তাদের এই বিশ্লেষণ ক্যাটাগরি থেকেও কিন্তু সামন্তবাদের বিরুদ্ধে একটা লড়াই হতে পারে।

তুষার: অর্থাৎ আপনি আবু জর গিফারির ফিলোসফিক্যাল অবস্থানের কথা বলছেন?

নেসার: হ্যাঁ, ইসলামের সুফি ধারার মধ্যে একটা অংশ এই ফিলোসফিটা ধারণ করে।

তুষার: হ্যাঁ, এই ফিলোসফিক্যাল অবস্থানকে প্রায়োগিক রূপ দিতে ইসলামের মধ্যকার কোনো ধারা যদি এগিয়ে আসে, তাহলে, অবশ্যই তাদের সাথে যুক্তফ্রন্ট করতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই। তবে সমাজ বিকাশের নিয়মানুযায়ী তাদের দিক থেকেও কমিউনিস্টদের নেতৃত্ব গ্রহণের প্রশ্ন অবশ্যই থাকে।

নেসার: এবার আমি আর একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে যাব। প্রশ্নটি হলো, মাওবাদীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুটো সংস্থা ‘রিম’ ও ‘কমপোসা’ নিয়ে। আমার জিজ্ঞাসা হলো, আপনাদের পার্টি এই সংস্থা দুটোর সদস্য কি না? এবং এধরনের সংস্থা সম্পর্কে আপনাদের মূল্যায়ন কী?

তুষার: আমাদের দল ‘রিম’ অথবা ‘কমপোসা’ এর কোনোটারই মেম্বার নয়। এসম্পর্কে আমাদের দলের একটা স্পষ্ট বক্তব্য আছে। মূলত তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে যাওয়ার পর; যদি আন্তর্জাতিকের আর কোনো গুরুত্ব থাকত বা করার প্রয়োজনীয়তা থাকত তাহলে, চেয়ারম্যান মাও অথবা কমরেড স্ট্যালিন অবশ্যই সে কাজটি করতেন। আন্তর্জাতিক স্তরে সে ধরনের অবস্থা আজ আর বিরাজমান নয়।

পাশাপাশি একটা দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে অপর আর একটা দেশের কমিউনিস্ট পার্টির যে সম্পর্কটা হবে সেটা হলো ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক। কেন আমরা এই ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রাখতে গুরুত্ব দেব? সম্পর্ক রাখার গুরুত্ব হলো, আমার দেশের বিপ্লবী অভিজ্ঞতা তাকে দেবে। এবং তাদের দেশের বিপ্লবী অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা আমাদের পার্টিকে সমৃদ্ধ করব। এই মৌলিক অবস্থান থেকে আমরা বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষণ করি। ফলে আজকের বিশ্বে বিপ্লবী সংগ্রাম যারা পরিচালনা করে না তাদেরকে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো ফ্রন্ট গঠন করার যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। আর এক্ষেত্রে ফ্রন্ট করার কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারি, বিনিময় করতে পারি।

দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে, রিম এর গঠন প্রক্রিয়া ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন রয়েছে। আজ রিমে অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কয়টি দল সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছে? আমরা যদি এই হিসাবটা করি, তাহলে দলের সংখ্যা দাঁড়াবে একটা কিংবা দুইটা বাকি পার্টিগুলো আর্মস স্ট্রাগল করে না। ফলে একটা সংস্থা দাঁড় করিয়ে বিমূর্তভাবে মার্কসবাদ চর্চা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা কি আদতেই আছে? রিমএর ব্যাপারটা হচ্ছে প্রকৃত অর্থে এটাই। আর কমপোসাকে বলা হচ্ছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মাওবাদীদের সংগঠন। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় কে মাওবাদী আর কে মাওবাদী নয়, তা নির্ধারণ করার মানদণ্ডটা কী? কমপোসা কি এই মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে? অমুক দল মাওবাদী কি না? আমাদের পার্টি মাওবাদী কি না? এটা নির্ধারণ করার একটা মানদণ্ড তো থাকতে হবে। সেই মানদণ্ড নির্মাণের কষ্টিপাথর তারা কোথায় পেলেন? তৃতীয় বিষয়টা হলো, কমপোসার টোটাল কার্যক্রম দেখা যায় নেপাল এবং ভারতকে কেন্দ্র করে। আমরা নিঃসন্দেহে নেপাল ও ভারতের মাওবাদীদের উপর এবং গোটা বিশ্বের বিপ্লবীদের উপর শত্রুর নির্যাতন হত্যার প্রতিবাদ করি। তার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করি। এবং তাদের সাথে আমরা সংহতি প্রকাশ করি। কিন্তু তার অর্থ তো এমন নয় যে, নেপাল এবং ভারতের বিপ্লবীদের হত্যা করা হলে শুধু তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে। আর পূর্ববাংলায় বিপ্লবীদের হত্যা করা হলে নিশ্চুপ থাকবে। এটা তো চলতে পারে না। এটা পদ্ধতি হতে পারে না। আমার জানা মতে কমপোসার পক্ষ থেকে পূর্ব বাংলায় বন্দি অবস্থায় শত শত বিপ্লবীদের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আজও কোনো বিবৃতি আসেনি।

নেসার : দেখুন আমার জানামতে সম্প্রতি কমপোসার পক্ষ থেকে মোফাখ্খার চৌধুরী, কামরুল মাস্টারসহ এদেশের বিপ্লবীদের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটা বিবৃতি কিন্তু তারা প্রচার করেছে।

তুষার: যাক ওটা আমাদের হাতে আসেনি। আমরা দেখিনি। দিলে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই তাদেরকে। কিন্তু এটা এখনো পর্যন্ত আমাদের হাতে আসেনি। প্রশ্ন হলো, বিবৃতিটা মোফাখ্খার চৌধুরী এবং কামরুল মাস্টার শহীদ হওয়ার পরে আসবে কেন। এটা তো ক্রসফায়ারের শুরু থেকেই আসা দরকার ছিল।

আর এক্ষেত্রে সর্বশেষ কথা হলো, আমরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করব অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য। সেখানে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা যদি অধিকাংশ পার্টির না থাকে, তাহলে, কিসের অভিজ্ঞতা বিনিময় হবে? সুতরাং এ ধরনের বিমূর্ত মার্কসবাদ চর্চার আড্ডাখানায় আমরা অংশ নিতে আগ্রহী না।

নেসার : আমার এবারের জিজ্ঞাস হলো, ১৯৭৫ সালের পরে আপনারা নতুনভাবে পার্টিকে পুনর্গঠিত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আপনাদের সংগঠনে সার্বক্ষণিক নারী কর্মী ছিলেন কি না?

তুষার: হ্যাঁ, ছিলেন। তবে সংখ্যা অনুপাতে কম।

নেসার : পার্টিতে তাদের অ্যাক্টিভিটিজ কেমন ছিল?

তুষার: অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের উপরে যতটুকু সাংগঠনিক দায়িত্ব বর্তাত। তারা সেটা যথাযথভাবে পালন করেছেন। এখানে সব থেকে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এটা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার এই মানসিকতা নারী কমরেডদের মধ্যে ছিল এবং আছে।

নেসার: দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এটা কি সব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য নাকি বিশেষ কোনো অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য?

তুষার: না, সব অঞ্চলে নয়। তাদেরকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আমাদেরও যথেষ্ট ত্রুটি ছিল। যে অঞ্চলগুলোতে সংগ্রাম হয়েছে সেখানেই তারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন। কারণ পরিবেশ পরিস্থিতি একটা ফ্যাক্টর। নারী সার্বক্ষণিকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পরিবেশ পরিস্থিতি একটা ফ্যাক্টর। ফলে যেসব অঞ্চলে সংগ্রাম আন্দোলন হয়েছে, সেখানে তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

নেসার: পার্টিতে যেহেতু নারী সার্বক্ষণিক ছিল বা রয়েছে। ফলে প্রেমযৌনতা ও বিয়ের প্রশ্নে আপনাদের নিশ্চয় একটা লাইন রয়েছে। সেটা কী ধরনের?

তুষার: হ্যাঁ, লাইন রয়েছে। খুব সংক্ষেপে এবং স্পষ্টাকারে বলতে গেলে লাইনটা হচ্ছে প্রেম বিয়ে যৌনতা এগুলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এসব প্রশ্নগুলো অবশ্যই আদর্শের অধীন হতে হবে। প্রচলিত ধ্যানধারণায় প্রেম বিয়ে বলতে যা বোঝায় তাকে আমরা প্রেম বিয়ে বলে স্বীকৃতি দেই না। পরস্পরের জানাশোনা এবং বোঝাপড়া তার মধ্যে দিয়ে প্রেম ও বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কটা আবার হতে হবে পার্টির অনুমোদিত। অর্থাৎ একজন কমরেডদের সামগ্রিক জীবন যেমন রাজনীতির অধীন, তেমনি তার যৌন সম্পর্কটাও রাজনীতির অধীন। এখানে আর একটি বিষয় রয়েছে। যেহেতু নারী পুরুষ উভয়ে একই আদর্শের ফলে এখানে নারীকে স্ত্রী হিসেবে দেখার আমরা ঘোর বিরোধী। নারীকে দেখতে হবে কমরেড হিসেবে। এবং কমরেড হিসেবেই তার সমস্ত অধিকার পার্টিতে বহাল থাকবে। শুধু যৌনপ্রেমের বিষয়টা থাকবে ওই নির্দিষ্ট দুইজনের মধ্যে। এটাই হলো আমাদের পার্টিতে প্রেমবিয়ের লাইন।

নেসার : অর্থাৎ রাজনীতির পাশাপাশি এক্ষেত্রে কালচারাল এডজাস্টমেন্ট ও ফিজিক্যাল এডজাস্টমেন্ট এই দুটোই মনে হয় কেন্দ্রীয় বিষয়?

তুষার: অবশ্যই। সেক্সচুয়াল এডজাস্টমেন্ট এবং কালচারাল ইউনিফিকেকে আমরা প্রেম বিয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মনে করি।

তুষার: আমার এবারের প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে একটা সংসদীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি থাকতে আপনারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নে কেন সশস্ত্র সংগ্রামের পথকে ধরলেন?

তুষার: আমরা যদি বিষয়টাকে ঐতিহাসিকভাবে দেখি, তাহলে, এদেশে বা এই উপমহাদেশে নির্বাচন তো কম হলো না। সেই নির্বাচনে জনগণের নানাবিধ সমস্যার ন্যূনতম পরিবর্তন কি করতে পেরেছে? মৌলিক পরিবর্তনের কথা না হয় আমরা বাদই দিলাম। মূলত পার্লামেন্টারি সিসটেমে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকেই নির্বাচন করতে হয়। এবং রাষ্ট্র যেহেতু শ্রেণীশাসন ওশোষণের হাতিয়ার। ফলে রাষ্ট্রেরও একটা সুনির্দিষ্ট শ্রেণী চরিত্র রয়েছে। এই শ্রেণী চরিত্রের উপর ভিত্তি করে সে একটা সংবিধান রচনা করেছে। তার শোষণ কাঠামো বজায় রাখার জন্য আইন রচনা করেছে এবং প্রতিনিয়ত করে। সেই আইন মেনে, তাদের রচিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করে যদি কেউ নির্বাচিত হয়। তাকে আবার শপথ নিতে হবে ওই সংবিধানের অধীনে। ফলে ওই সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসলেই কি তার পক্ষে শ্রেণী শোষণের বিপরীতে কোনো কিছু করা সম্ভব? এটা খুবই সাদামাটা কথা। আমাদের দল মনে করে তা কোনোভাবেই সম্ভব না। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন ‘না ভাঙলে গড়া যায় না’। একটা ব্যবস্থা আমরা পরিবর্তন করব। যে ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের দেশে মুৎসুদ্দিবুর্জোয়ারা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটিয়েছে। ফলে ওই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে কেউ কোনো দিনই জনগণের সপক্ষে একটা আইন তৈরি এবং পাস করতে পারবে না। জনগণের পক্ষে কোনো কাজ করতে পারবে না। উদাহরণ হিসেবে আমরা চিলির কথা উল্লেখ করতে পারি। আলেন্দে সরকার নির্বাচিত সরকার ছিলেন। তিনি সংসদ পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজে তো জীবন দিয়েছেনই, তাছাড়া তার হাজার হাজার কর্মী কচুকাটা হয়েছে। থাইল্যান্ডমালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি সংসদীয় পথ ধরে লাখ লাখ নেতাকর্মীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। এবং ওসব দেশে কমিউনিস্ট পার্টির নামগন্ধ পর্যন্ত মুছে গেছে। অথচ আলোচিত প্রত্যেকটা দেশে শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতিবসু গং সংসদীয় পথে সমাজতন্ত্র গড়তে গিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে অর্থাৎ সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে আপনি চাইলেও জনগণের জন্য কিছুই করতে পারবেন না। সুতরাং এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে, এই ব্যবস্থার মধ্যে জনগণের জন্য মৌলিক পরিবর্তন সাধনের কাজটি হবে না। ফলে আমরা মনে করি নির্বাচনি পদ্ধতি হলো লড়াই সংগ্রামের বিপরীতে জনগণকে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি মোহগ্রস্ত করার একটা পথ। এই ব্যবস্থায় কোনোভাবেই জনগণের অধিকার রক্ষিত হবে না। এটাই হলো নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া প্রশ্নে আমাদের সাদামাটা বক্তব্য।

নেসার: ক্ষমতা দখলের প্রশ্নেও তো গোটা বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্টদের মধ্যে আমরা দুটো লাইনের চর্চা হতে দেখেছি। একটা গণঅভ্যুত্থানের লাইন। অপরটি এলাকা ভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের লাইন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কিন্তু এই দুই লাইনের উপস্থিতি ও চর্চা রয়েছে। সেখানে আপনারা কেন দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পথকে একমাত্র পথ হিসেবে গণ্য করছেন?

তুষার: প্রশ্ন হলো, অভ্যুত্থানভিত্তিক ক্ষমতা দখল কোন দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে? এ ব্যাপারে আমরা পরিষ্কারভাবে রুশ বিপ্লবের উদাহরণ টানতে পারি। প্রথমত রাশিয়া ছিল একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। আমাদের মতো নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নয়। পাশাপাশি রাশিয়াতে একটা স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল। শিল্পীয় সর্বহারা শ্রেণী ছিল বিকাশমান, সংগঠিত এবং শ্রেণীগতভাবেই শক্তিশালী। রাজনীতিতে ডোমিনেটিং ফোর্স তারা। ঠিক এ ধরনের দেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতা দখলের পথ অভ্যুত্থান ভিত্তিক। শিল্পের বিকাশ যেখানে ঘটে সেখানে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেই তা ঘটে। লেনিন রাশিয়াতে কিন্তু ক্ষমতা দখল করেছিলেন ফেব্র“য়ারি বিপ্লবের পরে এসে। অর্থাৎ অক্টোবর বিপ্লবে যাকে তারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলেছেন। যেমন ইয়োরোপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে ক্ষমতা দখলের পথ গণভ্যুত্থানভিত্তিক। কিন্তু আমাদের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশগুলোতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি। এবং অক্টোবর বিপ্লবের পরে বুর্জোয়ারা আর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে না। এটা করতে হবে কমিউনিস্টদের। অর্থাৎ যেখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেনি। শিল্পীয় সর্বহারা শ্রেণীর বিকাশ ঘটেনি। শ্রমিক শ্রেণী যেখানে এখনো ডোমিনের্টিং ফোর্স হিসেবে সামনে আসেনি। এবং দেশটি কৃষিপ্রধান দেশ। এসমস্ত দেশে গণঅভ্যুত্থানের লড়াইয়ের আহ্বান করাই হচ্ছে বিপ্লবকে পিছন থেকে ছুরিকাঘাত করার সামিল। আমাদের দেশের স্তরগতভাবে বিপ্লবটা হচ্ছে কৃষি বিপ্লব। কৃষকরা এই বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি। এবং এখানে সমাজ বিকাশের স্তর অসম। এক এক এলাকার বিকাশ এক এক রকমের। ফলে লড়াইয়ের সূচনা বা ক্ষমতা দখলের সূচনাও হবে এলাকা ভিত্তিক। চীনভিয়েতনামলাওস কিন্তু এপথটি ধরেই সফলতা অর্জন করেছে। এই পথেই তারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছে।

নেসার: সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

তুষার: আপনাকেও ধন্যবাদ।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s