bonduk(আমরা সাধারণত “ক্রসফায়ার”এর একমুখী প্রচারপ্রচারণাটাই শুনে থাকি, এমনকি একেই সত্য বলে ধরে নিই, কিন্তু তার অপরদিকের সত্যটা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় না, বা হতে দেওয়া হয় না। এই “ক্রসফায়ার”এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং এর সাথে রাষ্ট্রের রাজনৈতিকতার সম্পর্কটাও তুলে ধরা হয়েছে নেসার আহমেদ সম্পাদিত ক্রসফায়ার’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বইটিতে। বইটি হয়তো অনেকেই পড়েছেন, আবার অনেকেরই হয়তো তা এখনো পড়া হয়নি। আর এ জন্যই এই বইয়ের প্রতিবেদনসমূহ এখানে পর্যায়ক্রমিকভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্পাদক)

মুকুলের বোনের বক্তব্য

লুসি খানম

নেসার: আপনার নাম ঠিকানা আগে বলে নিন।

লুসি: আমার নাম লুসি খানম। বাড়ি খুলনার ফুলতলায় ভূইঞা বাড়ি। বাবার নাম নাসির উদ্দিন ভূইঞা। মা মনোয়ারা বেগম। আট ভাইবোন আমরা। দুই বোন ছয় ভাই। বড় ভাই, তারপরে আমি। তারপর চার ভাই। তারপরে বোন, তারপরে আরেক ভাই।

তো ছোটবেলা থেকেই ভালভাবে চলছি আমরা। স্বচ্ছল পরিবার ও সংস্কৃতিমনা পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছি। বাবা ফুটবল খেলতেন। সরকারি চাকরি করতেন। বেশ সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। আমরাও সেভাবে গড়ে উঠেছিলাম।

ছোটবেলা থেকে আমি দেখেছি আমার বাবা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় কথা বলতেন। প্রতিবাদ করতেন। মানুষটা বেশ ভালো ছিলেন। সব সময়ের জন্য মানে অন্যায় যেখানে দেখতেন, সেখানে কেউ আগাক না আগাক উনি এগিয়ে যেতেন। তা উনার ওই বিষয়গুলো আমার ভালো লাগতো। আমিও তার মতো করেই প্রতিবাদী হয়ে উঠি ছোটবেলা থেকে।

ওই সময় কমিউনিস্ট পার্টির কথা শুনতাম আমি। কমিউনিস্ট পার্টির মানুষজনগুলোকে জ্ঞানত শ্রদ্ধা করতাম। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো।

নেসার: সম্ভবত আপনার এক চাচা মনে হয় কমিউনিস্ট পার্টি করতেন?

লুসি: না, আমার চাচা না। আমার বড় ফুফুর বড় ছেলে। সাকু। সে এক সময় …, ওই সময় নকশালপন্থী ছিলেন। আমার এক ফুপাতো বোনের হাসবেন্ডও ছিলেন। ’৭১এর যুদ্ধের সময় হত্যা করে তাকে।

নেসার: উনার নাম?

লুসি: উনার নাম ছিলো

নেসার: লিচু?

লুসি: না লিচু ছিলেন আমাদের প্রতিবেশি। লিচু মোল্লা। আর আমি ওই নামটা পরে বলছি। দুলাভাইয়ের নামটা। তো তাঁরা সবাই পার্টি করতো। আমার এসব দেখে শুনে খুব …, তাঁদের নীতি, তাঁদের আদর্শ, গরীবের কথা বলতো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তো। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারাই যেত, তাঁদের প্রতি আমার একটা আলাদা শ্রদ্ধাবোধ, একটা ফিলিংস কাজ করতো। ওই সুবাদেই এই পার্টির প্রতি একটা সফট কর্ণার আমার ছোটবেলা থেকেই গ্রো করে।

তো এমনি সময় এসে আমি যখন নাইন টেনে পড়ি, তখন থেকেই আমি একটু লেখালেখি করি। ওই সময়ে ওই বয়েসের মানুষরা তো একটু লেখালেখি করা শুরু করে। আমিও লেখালেখি করি। সেই সময় আপনি হয়তো জানেন নিহার বানু হত্যা, রাজশাহীতে। এটা, এগুলো আমাকে খুব পীড়া দিত। এগুলো নিয়ে খুব ভাবতাম। গ্রামগঞ্জে যেতাম। মানুষের কষ্ট দেখতাম। আমার খুব খারাপ লাগাতো। কেন এরকম অন্যায়অত্যাচার। এই নিয়েই লেখালেখি করতাম। পত্রিকাতে লিখতাম। গান গাইতাম। পার্টির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিলো। কিন্তু পার্টিতে জড়িয়ে পড়িনি তখন। এমনি ভালো লাগতো। কিন্তু চলতাম আমার মতোই। পড়ালেখা, গানবাজনা, রেডিওতে মাঝে মধ্যে প্রোগ্রাম করতাম। অবশ্য আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। এভাবেই চলছিল।

এমনি এক সময়, মানে ডাক্তার, আমার ফুপাতো ভাই। যার সঙ্গে পরবর্তীতে আমার বিয়ে হয়েছিল। তো ওর সঙ্গে যখন আমার আরো যোগাযোগ হলো। ফুপাতো ভাই যদিও।

নেসার: বিয়েটা কি আপনারা নিজেরাই করেছিলেন?

লুসি: না ফ্যামিলিতে, নিজেদের মধ্যে হয়েছিল। পরে ফ্যামিলি থেকে বিয়ে হয়েছিল। এটা আলাদাভাবে না। ফ্যামিলির দিক থেকে হয়েছিল। তো ও তখন ছাত্রমৈত্রী করতো। রাজশাহী মেডিকেলের ছাত্র। ওর উৎসাহে আমি তখন পলিটিক্সের প্রতি আরো ইনভল্ব হয়ে পড়ি। এবং জানার সৌভাগ্যটা হয়। আমারও একটা সফট কর্ণরা ছিলো। তারপরে ওর সংস্পর্শে এসে পড়াশোনা, বইপত্র দিত। পড়তাম। প্রশ্ন ছিলো অনেক। কমিউনিস্ট পার্টি একটি দেশে একটি এবং একটি নীতিতে যারা থাকবে, তখন দেখতাম যে অনেকগুলো দল। ১৪টা দল। কেন এটাএই প্রশ্নগুলো যখন করতাম, তখন ওই ডাক্তারই আমাকে বিভিন্ন মানুষের ঠিকানা দিত।

বলতো যে, তুমি এদের সাথে যোগাযোগ করে দেখতে পার। পড়াশোনা করতে পার। তখন সেই সুবাদে আমি টুটুভাই, খুলনার আশরাফুল আলম টুটু, সাইফুল ইসলাম, মেজবাহ কামালবিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জাস্ট জানার জন্য আর কি। কি, কেনকেন এত দল? কেন এতগুলো ভাগ। একই কমিউনিস্ট নীতি, এত কেন দল হবে। যাক পড়াশোনা করতাম। এদিকে এদেরটাও পড়তাম। জানার চেষ্টা করতাম। এরকম এক সময় আমার সঙ্গে ইনভল্ব হয়ে পড়ে, আমার ছোট ভাই শিমুল।

কিন্তু মুকুল, আমার আর এক ভাই ছিলো মুকুল। মুকুল এত পড়াশোনা, এত কিছুর মধ্যে ছিলো না। ওর ছিলো একটা অন্য জগৎ। মুকুল লেখাপড়া করত। বেশ ভাল ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিলো। আব্বা এজন্য ওকে খুবই পছন্দ করতেন। কারণ পড়াশোনায় খুবই ভাল সে। আর একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এদিকেওদিকে বেড়াতে যাবে। তার নিজের একটা জগৎ ছিলো। সেই জগৎ নিয়ে ও থাকত। কারাতে শেখার প্রতি বেশ আগ্রহ ছিলো। কারাত শিখতো।

যাই হোক, মুকুলের যে বিষয়টি বলতে চাচ্ছিলাম। সেটা হচ্ছে যে, মুকুল স্কুলে যেত। পড়াশোনা করতো। এর মধ্যে স্কুলে …, আমাদের এলাকায় কাশেম নামে এক লোক ছিলো। মারা গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি মেরে ফেলেছে। পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি। তো ওই লোক ছিলো, কি বলবো, খুবই বাজে লোক। এহেনো খারাপ কাজ নেই, যা সে করেনি। ছোটবেলায় শুনতাম কাসেম বদ। নারী লোলুপ। ওর সামনে দিয়ে কোনো নারী চলাফেরা করতে পারে না। শুনেছি ৩৫টা বিয়ে করেছে। তার মধ্যে কিছু ছিলো প্রকাশ্যে। কিছু ছিলো পর্দার আড়ালে। কাশেমের বাবা ছিলো মিলের দারোয়ান। কাশেম লেখাপড়া তো শেখেইনি। ছোটবেলা থেকে বখাটে। মেয়ে মানুষের চিমটি কাটা, ডাকাতি করা, চুরি করা এগুলো। শুনেছি ট্রেন ডাকাতিও করতো। ’৭১এর যুদ্ধের সময় সে রাজাকারও হয়েছিল। লুটপাট করছে সোনাদানা ও হিন্দুদের সম্পত্তি। এরকম অনেক সংবাদ পেপারেও দিয়েছিল। অনেক আগে। পাঁচ কন্যার সম্পত্তি দখলএরকমও একটা ব্যাপার ছিলো। এরকম আর কি, ডাকাতি আর ’৭১ সালে লুটপাট করে টাকা পয়সার মালিক হওয়াতে অর্থনৈতিকভাবে রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠলো কাশেম। পরে আর্মস ও বডিগার্ড নিয়ে চলতো। তো দেখেনবাংলাদেশের পরিস্থিতি, যে ’৭১ সালে লুটেরা আর রাজাকার ছিলো। সে বাংলাদেশ হওয়ার পরে আবার বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স করতে পারলো। অবৈধ অস্ত্র নিয়েও চলতো। ’৭১এর পরে প্রাইভেট কারে ঘুরে বেড়াতো। তো এভাবেই চলতো, দাপটের সঙ্গে। কেউই ভয়ে কথা বলতে পারত না। মেয়েদের অনেক ঘটনা আছে, অনেক। আমার দুই বান্ধবীকেও একবার রেইপ করার চেষ্টা করেছিল, ’৭১এর অনেক পরে এসে। মানে এরকম জঘণ্য মানসিকতার মানুষ ছিলো কাশেম। সাধারণত এই কারণেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে …, আমাদের পরিবার সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে। এলাকায় অন্য মানুষদের দেখেছি আমি, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েনি। নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলেছে। কিন্তু আমার বাবা কখনো এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। আমরা ভাইবোনগুলোও ওরকমই হয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনো স্বার্থ নেই, কোথাও? তারপরেও অন্যের সমস্যায় ঝাঁপায় পড়েছি। সে কারণে অনেকের কাছে খারাপ হয়েছি। এ সমস্ত কারণেই পারিবারিকভাবে ওদের সাথে [কাশেম] আামাদের শত্রুতা শুরু হয়ে যায়। তো চলতে ছিলো ওভাবেই।

এর মধ্যে শিমুল তো ছোটবেলা থেকেই পুরাপুরি পলিটিক্সে ইনভল্বড হয়ে গেছে। আর মুকুল ওভাবেই চলছে। চলতে চলতে একটা সময় নাইনটি ফোরে, এইটটি ফোরে সরি, বাড়িতে আম্মা নাই। আমি বাড়িতে আছি। আমার বাবা আর মুকুল। ওই সময় জানেন তো ছাত্রমৈত্রী সারা দেশে রাতে বোম্বিংটোম্বিং করল। পরদিন সকালবেলায় ওরে আমি বললাম, বাজার করে আনতে। বাজার করে এসেই, বাজারের ব্যাগটা দিয়েই ও রুমে ঢুকলো। রুমে ঢোকার এক মিনিটের মধ্যেই বোম বাস্ট হলো একটা। প্রচণ্ড আকারে শব্দ। হৈচৈ।

নেসার: মুকুল তখন কোন ইয়ারে পড়ে।

লুসি: ও তখন ফার্স্ট ইয়ারে। ছোট্ট বাচ্চা ছেলে। তারপর ও যখন ঘর থেকে বের হলো, তখন এক বীভৎস দৃশ্য। দেখা যায় না। তার দুই হাতে সমস্ত আঙ্গুলগুলো পড়ে রয়েছে ঘরের মধ্যে। হাতের মাংশগুলো দুই হাতের ঝুরি হয়ে ঝুলছে। বুকের মাংশ ঝলছে গেছে। পায়ের থাই ক্ষতবিক্ষত। ওই অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরে পুলিশ আসলো। তদন্ত করলো। তারপর খুলনায় নিয়ে যাওয়া হলো অর্থপেডিক্সের কাছে। হাতদুটো কব্জি থেকে কেটে ফেলা হলো। পুলিশ বেড়ি পরিয়ে রাখলো। তারপর একটা সময় পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারলো। না ওনা, বোমাটা কুড়িয়ে পাওয়া। খুলতে গিয়ে বাস্ট হয়েছে হাতের মধ্যে। এরপরে কেস ওটা থাকলো না। যাক এই অবস্থায় ছয় মাস ওকে হাসপাতালে রেখে, ওর মানসিক সাহসশক্তি যুগিয়ে, যাতে একটা সময় এসে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, এভাবে আমি আর কি আহত হওয়ার দিন থেকে ওর নার্স বলেন, আমি ওর সাথে আর কী আর বোন বলেন ওর সাথে থেকে সাহস যুগিয়েছি। যাতে পরবর্তীতে ও মানসিক শক্তি বলে উঠে দাঁড়াতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, আমার অন্যান্য ভাইয়েরা বাবামা বা আমাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে। কিন্তু মুকুল কখনো, অবাক কাণ্ড যে কখনো আমাদের কারো কাছ থেকেই, মানে সে কারো করুণা চায় নি। এই একটা মানসিক শক্তি তার মধ্যে আসছিল। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই পরে বিয়েশাদী করেছে। সংসার হয়েছে। কাজ করে খেয়েছে। বিএ পাশ করেছিল। ও তো আগে সাইন্সে ছিলো। পরে আর্টসে নেওয়া হলো। প্রাকটিক্যাল করতে পারবে না বিধায়।

তো সেই মুকুল যুবদলে ছিলো। ওরা হাত দুটো কেটে ফেলার পরেও কারাতে প্র্যাকটিস করতো নিয়মিত। ব্লাক বেল্ট পায়। টিভিতে দেখায়। ও তখন কলেজে পড়ে।

ওই যে আমি কাশেমের কথা বলছিলাম? কাশেমের কিছু ছেলেপেলে আছে। কাশেমের নিজের ছেলে। মিঠু নাম করে। ও কাশেমের মতই। স্কুলে যখন যেত, স্কুল থেকেই মুকুলদের সঙ্গে ভালো রিলেশন ছিলো না। কারণ ওরা বখাটে ধরনের ছেলেপেলে। মেয়েদেরকে টিজ করতো। এগুলো ওরা পছন্দ করতো না। এটা নিয়েই স্কুলজীবন থেকেই সম্পর্ক ভাল ছিলো না? দুই পক্ষ মতো একটা ছিলো আর কি ওর সাথে। তারপর কলেজে এসে কী যেন একটা ঘটনা ঘটে। ঘটলে, মিঠুই লোকজন পাঠিয়ে দেয় ওকে মারার জন্যে। তখন মুকুল কারাতে জানতো বিধায়, বেঁচে আসছিল একাই দশজনকে মোকাবেলা করে। এরকম করে মুকুলের সাথে শত্রুতা গড়ে ওঠে।

এর মধ্যে আমারো বিয়ে হয়ে যায়। এইটটি সিক্সে বিয়ে হয়ে যায়। শিমুলও পলিটিক্সের সঙ্গে ভালভাবে জড়ায় যায়। পুরোপুরি। তারপরে ইমরান মার্ডার কেস। শিমুলের জেল হয়ে যায় যাবৎজীবন। তারপর অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। যাই হোক মুকুলের বিষয়টাও। মুকুল তখন ফুলতলার যুবদলের প্রেসিডেন্ট হিসাবেই ছিলো। পলিটিক্স করতো। এদিকে যখন যে ক্ষমতায় আসে, কাশেমের দল সেই দলেই ঢোকে। কাশেমরা আর কি। যে ক্ষমতায় আসবে, তাদের দলে ওরা যাবে। এটা নিয়ে মুকুলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ঘটে। মিঠু যুবদলে ঢুকতে চায়। মুকুল বলে যে, এ ধরনের বাজে লোক যুবদলে ঢুকলে আমি যুবদলে থাকব না। এরকম একটা কোন্দলের মতো সৃষ্টি হয়। ওদের ছিলো অনেক টাকা। থানাতে টাকা দিয়ে থানাকে বশ রাখত। ওদের অন্যায় কোনো অন্যায় নয়। অন্যদের অন্যায় না থাকলেও, তাদের দাবিয়ে রাখতে পারত তারা। এই টেনডেন্সি মিঠুদের ছিলো। তো এই রকম একটা সময়ে এসে কি একটা ঘটনা নিয়ে, আমি তো তখন ওখানে ছিলাম না, পরে জেনেছি। সেটা হচ্ছে যে, আমাদের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে হয়। পাশেই, আমাদের একই সাথে একই জায়গায় বাড়ি। ওই মঈনুল নাম করে। কি একটা দ্বন্দ্ব সম্ভবত ভিতরে ভিতরে ছিলো। ওরা তখন এক ব্যাচ ছিলো। কাশেমের ছেলে মিঠু আলাদা ছিলো। আর মুকুল, মঈনুল, শিপলু এরা একসাথে থাকতো। শিপলু ছোট, সবারই ছোট। শিপলুও পড়াশোনায় ভাল। স্টার মার্ক পাওয়া ছেলে। ওরা সব এক সঙ্গে থাকতো। কোনো এক ঘটনার কারণে মঈনুলকে মিঠু তুলে নিয়ে যায়। তুলে নিয়ে আটকায় রাখে। তখন খবর আসে ওকে ধরে নিয়ে গেছে। আর যেহেতু ভাইয়ের ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে, মুকুল ফুলতলা বাজারে ছিলো। এটা বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। মুকুলের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ে হয়ে গেছে। মুকুল বাড়িতে থাকে। চাকরি করে। সেই অবস্থায় তখন ওই রকম একটা ঘটনা ঘটে। মঈনুলকে তুলে নিয়ে যায়। কাশেমের ছেলে মিঠু। এই খবর পেয়েই তখন ওরা সাথে সাথে কি করে, কাশেমের ছেলে ছিলো আরেকটা, নাম সম্ভবত সেলিম। ওরা তখন বাজারে ওকে পায়। ওকে ওরা আটকায় রাখে। এবং বলে যে, ওকে না ছাড়লে একেও ছাড়বো না। কাশেম তখন আবার ওই এলাকার চেয়ারম্যান। কাশেম সাথে সাথে আবার এদের নামে মামলা করে। মুকুলরা কোনো মামলা করে না। তারপরে যাই হোক দুই পক্ষের আলোচনার মধ্যে দিয়ে উভয় গ্র“প উভয়কে ছেড়ে দেয়। কিন্তু মামলাটা তারা উঠায় না। পুলিশ প্রায়ই তাদের তাড়া করতো। এবং ওই কেসটা এখনো আছে। স্টিল নাও, ওই কিডন্যাপের কেসটা। তো এই ঘটনার পরে ভালোমতো শুরু হলো গ্যাঞ্জাম। এ রকম অবস্থা চলতে লাগলো। চলতে চলতে কাশেমের ছেলে মিঠু প্রকাশ্যে হুমকি দিল মুকুলকে হত্যা করবে। এবং আর্মস গ্র“প নিয়ে বিভিন্নভাবে এ্যামবুশ করা শুরু করলো। মুকুলকে হত্যা করবে। মুকুলও ভয়ে থাকে। ভয়ে মানে কি, মুকুলও লোকজন নিয়ে থাকে। কোথাও বের হয় না। আর ওদিকে কাশেমের ছেলে, সে থানার সাহায্যে মুকুলকে হ্যারেজ করতে শুরু করলো। এটাসেটা নিয়ে মামলা করা শুরু করলো। আবার মুকুলের বউ ছিলো, ওখানকার মেম্বার। কাশেম চেয়ারম্যান, মুকুলের বউ মেম্বার। এর মধ্যে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি কাশেমকে মৃত্যুদণ্ড দিল। এই মৃত্যুদণ্ড যখন দেয়, তখন শিপলু, ছোট ভাইটা, ঢাকায় আমার এখানে। কিন্তু শিপলুর নামেও মামলা দিল। শিপলুর নামে মামলা করলো, মুকুলের নামে মামলা করলো, মুকুলের বউয়ের নামে মামলা করলো। শিমুলের নাম তো আছেই। শিমুল তখন তো জামিনে বের হয়ে এসেছে। হাইকোর্ট থেকে জামিন হয়ে বের হয়ে এসেছে ওই মামলায়। ইমরান গাজীর মামলা থেকে। শিমুলের নামেও মামলা দিল। মোটামুটি আমাদের পরিবারের সবাইকে ইনভল্বড করে ফেলল। অথচ যারা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তাদেরও কেউ কেউ গ্রেফতার হয়। কিন্তু আমাদের পরিবারের সদস্যদের নামে মামলা থেকেই যায়। অবশ্য এর পূর্বে ওরা আমার আব্বাকে গ্রেফতার করায়। আমাদের বন্দুক সিজ করায়। কাশেমের তখন অনেক টাকা। তার উপরে আবার চেয়ারম্যান হয়েছে। ফলে আইন তার বশেই থাকে। আব্বাও আমাদের ভাইবোনদের রাজনীতি করাটা মেনে নিতেন না। শিমুল রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার ফলে তাকে তেজ্যপুত্র ঘোষণা করলো। আমার সাথেও আর ভাল রিলেশন ছিলো না। আব্বা চাইতেন না যে, আমরা রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি।

তারপরে একদিন কেউ নেই বাড়িতে। আব্বা একা আছেন। আর বড় ভাইয়ের বউ বাড়িতে রয়েছেন। মুকুলরা কেউ নেই ওদিন বাড়িতে। তো ওইদিন আমাদের বাড়ির ছাদে কয়েকজন বসেছিল। ওরা মূলত মুকুলের নিরাপত্তার বিষয়ে পাহারা দিত। ওই যে কাশেমের ছেলে হুমকি দিয়েছে মুকুলকে হত্যা করবে। ফলে মুকুলও নিজের মতো করে তার নিরাপত্তার ব্যাপারটা দেখতে থাকে। আব্বা জানেও না, আমাদের ছাদের উপরে, মেঝ ভাইয়ের ঘরের ছাদের উপরে, ওই রকম লোক আছে। তো কাশেমের লোকজন থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে হামলা করে। বোমা ফুটায়, গোলাগুলি করে। তারপরে পুলিশ দিয়ে ছাদের উপরে বসে থাকা ছেলেদের গ্রেফতার করায়। আব্বা কিছুই জানে না। আব্বা ঘরের মধ্যে একা ঘুমায় আছে। তারপরে আব্বাকে গ্রেফতার করে। প্রচুর মারধোর করে পুলিশ। তারপরে আব্বার হাতে একটা আর্মস ধরিয়ে দিল। সেটার ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপালো। দেখেন আমাদের দেশের পুলিশের অবস্থা। এত বড় একজন সম্মানী ব্যক্তিকে ধরে প্রচুর পরিমাণে মারধোর করলো। তার হাতে আর্মস ধরিয়ে পেপারে ফ্লাশ করলো পরের দিন। তারপর ছয়মাসএক বছর পরে তাকে কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়। কিন্তু ওই ঘটনায় আব্বা মেন্টালী শকড হয়। স্ট্রোক করে। পরে এ্যাবনরমাল হয়ে পড়েন। যাই হোক, তারপরে কাশেম মার্ডার কেসের আসামী যখন হয়ে গেল সবাই, তখন তো সবাই বাড়ি ছাড়া। বাড়িটা শ্মশানে পরিণত হলো।

এভাবে চলতে চলতে মুকুল কোর্টে গিয়ে স্যারেন্ডার করলো। কাশেম মার্ডার কেসে স্যারেন্ডার করলো। আর শিপলু তো আমার এখানে (ঢাকায়)। আমি শিপলুকে তখন ভর্তি করে দিয়েছি ন্যাশনাল ইউনিভারসিটির কমপিউটার সায়েন্সে। আইইউবিএটিতে। এখানেই পড়তো সে। যাক মুকুল স্যারেন্ডার করলো। জামিন নিয়ে বের হয়ে আসলো। শিমুল আবার গ্রেফতার হলো। এরপরে পুরা কেসে যখন হেয়ারিং হলো, মুকুল বেকসুর খালাস পেয়ে গেল। পরে শিপলুও স্যারেন্ডার করেছিল। ওই মামলায় শিমুল ও শিপলু ছাড়া পেল না। ওরা এখনো জেলে আছে।

আর মুকুল তো এভাবেই চলতে লাগল। পরে মুকুল আর যুবদলে থাকেনি, দল থেকে বের হয়ে আসে। পরে সে ওই খুলনাতে বাসা নিয়ে থাকত। বউ বাচ্চা নিয়ে। ওর একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ছেলেটার বয়স এখন ১৩ বছর। মেয়েটার পাঁচ বছর। ও ওর সংসার নিয়ে খুলনাতে থাকে। মাছের ব্যবস্যা করে। আর এদিকে বাসের স্টার্টারি, এই করে সে বেঁচে ছিলো তার মতো করে। কেসটেস মিটে গেছে। চিন্তা ছিলো বাড়িতে চলে আসবে। বাড়ির ঘরগুলো ঠিকঠাক করবে। আমি এর মধ্যে বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে তখন দেখা হয়। আমিও বলি বাড়িতে চলে আয়। আমাদের পুকুরেই মাছের চাষ কর। এভাবে সব প্লানপ্রোগ্রাম ঠিক। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন …, আমি এখন চাকরি করি কেয়ারে। আমার কর্মস্থলে টেলিফোন পেলাম মুকুলকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। কেন, কে ধরেছে, কি জন্য ধরেছে, কেউ কিছু বলতে পারছে না। ও ওর বন্ধুর মায়ের চল্লিশার দাওয়াতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। পথিমধ্যে একটা সাদা মাইক্রো বাস ওকে দাঁড় করিয়ে তাতে তুলে নিয়ে যায়।

এটা শোনার পরে আসলে ওইভাবে ভাবিনি । মুকুলকে কী করবে? তার নামে তো মামলা নেই। কোনো রাজনীতির সাথেও নেই। আর ক্রসফায়ারে তাকে হত্যা করবে এটা আমরা একবারও ভাবিনি। ভাবার কোনো অবকাশও নেই। নয়দিন ওকে আটকায় রাখলো। আর টাকা। প্রথমে ২০ হাজার টাকা পাঠালাম। পরে আরো ৪০ হাজার টাকা পাঠালাম। এভাবে টাকা চেয়ে পাঠালো। যে টাকা দিলে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমি নিজেই টাকা পাঠালাম। আমি আমার কর্মস্থল থেকে খোঁজ খবর নিচ্ছি। আর জানছি টাকা খাওয়ার জন্য ওকে ধরেছে। টাকা খেয়ে ছেড়ে দিবে। আমি টাকাগুলো পাঠিয়েছি। ওরা তা দিয়েছে। কোথায় তাকে রাখছে, প্রথমদিকে জানতে পারিনি। পরে জানছি যে লবণ চরায় তাকে রাখা হয়েছে। মুকুল একজনকে রাজি করিয়ে, তাকে দিয়ে তার বউয়ের কাছে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল। তখন জানতে পেরেছি, ওকে ওখানে আটকে রেখেছে। তো মুকুলের বউ ওখানকার পুলিশ অফিসারদের হাতপা ধরেছে। ওকে ছেড়ে দিন। ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখিয়েছে। ওরা বলেছে না ছেড়ে দিব। তো আট দিনের দিন রাতে, মুকুলের বউ তাদের আবার ধরছে। তাকে তারা বলেছে যে কালকে ছেড়ে দিব। কাল সকালে সে চলে যাবে। কোনো অসুবিধা নাই। কালকে সকালে বাসায় পৌঁছে যাবে। মানে ৯ দিনের দিন বাসায় পৌঁছে যাবে। ওই দিন ভোরেই তো ওকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলল। পরে আমরা শুনেছি যে, ওদের ভিতর থেকে কেউ একজন আমাদের বলেছে যে, ওই রাতেই কাশেমের ছেলে মিঠুর তরফ থেকে বড় অংকের টাকা দেওয়া হয়। যে মুকুলকে মেরে দাও। এটার স্বাক্ষ্য ও তথ্য আছে। জেনুইন তথ্য। তো সেই রাত্রিই আর কি মিঠুর কাছ থেকে বড় অংকের টাকা পায় তারা। টাকা পেয়ে ভোর সকালে মেরে দিল আর কি ? তা ছাড়া, মুকুলের মেরে দেয়ার পিছনে সে শিমুলের ভাই, এই ব্যাপারটাও আছে। তা না হলে মুকুল এত টার্গেট হবে কেন? শিমুল তো এখনো একটা ফ্যাক্টর। যেটা আমরা মনে করি। আমি না, শিমুল হচ্ছে মেইন। শিমুলের ভাইকে বাঁচিয়ে রাখা, যদি সব ভাইকে মেরে ফেলা যায়, শিপলুকেও জেলে দিয়ে দিয়েছে। যে তিনটা ভাই সচলশিমুলশিপলুমুকুল; সেই তিনটাকে যদি শেষ করে দেওয়া যায়, তাহলে, তো আমাদের পরিবার আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না। পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রথম দিকে ওই ফর্মে যা আমি আগেই বলেছি, মিঠুর সঙ্গে ছিলো। পরে এটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দাঁড় হয়েছে। শিমুলের ভাই, শিমুল যেহেতু পার্টি করে, খুন করিয়ে দিতে হবে। সেভাবেই বিষয়টি দেখেছে তারা। আর সত্যিকার অর্থেপ্রশাসনের কোনো ইন্টারেস্ট থেকে থাকে, তাহলে, শিমুলের ভাই হিসাবেই মুকুলকে ক্রসফায়ারে মেরেছে। একজন টাকা দিল, আর ক্রসফায়ারে দিয়ে দিল, এটা মেলাতে পারি না, কি ভাবে এটা সম্ভব?

নেসার: এমনি তে মনে হয় পরে রাজনীতির সাথে মুকুল আর যুক্ত তো ছিলো না।

লুসি: মুকুল, না ও কোনো দলের সাথেই আর যুক্ত না। সে যখন যুবদল থেকে সরে আসলো। তারপর থেকে আর কোনো পার্টির সাথেই ইনভল্ব না। এমনি একজন সাধারণ মানুষ। আপনি আমি পার্টির কথা আলোচনা করি না? এ দল কেমন? ওদল কেমন? এরকম। তাছাড়া, দল করার সময়টুকু তো তার ছিলো না। জীবনজীবিকার জন্য খুব খাটতে হয়েছে। তার তো বড় কোনো ছেলে নেই। পরিবার থেকে সে একদিনও কারো কাছ থেকে একটা পয়সাও নেয়নি। আমি মোটামুটি সব ভাইদেরকে হেল্প করেছি। স্টিল নাও করেও যাই। কিন্তু ও ওই ধরা পড়লেই যে টাকাটা দিয়েছি। তাছাড়া, ওকে কখনোই কোনভাবে হেল্প করিনি। নিজেই নিজের …, মানে বললাম তো, ওর ওই দুটো হাত চলে যাওয়ার পর ও আরো বেশি যে, না আমি কারো হেল্প নিব না। আমি কারো করুণার পাত্র হব না। এবং ওকে আমরা কেউ কিছু দিতেও ভয় পেতাম। যাতে ও নিজেকে আবার ছোট মনে না করে।

আর ও পার্টির সাথে ইনভল্বমেন্ট ছিলো না। এটা একদম সত্যি কথা। কোনোভাবেই কোনো ইয়ের সাথে, এমনি জাস্ট শিমুল তার ভাই। সেই হিসাবে এটা তো স্বাভাবিক একটা পরিবারের যে বিষয়টি থাকে, একটা সফ্ট দিক, সেই হিসাবে কথাবার্তা। কিন্তু কোনোভাবেই ইনভল্বমেন্টটা, এটা ছিলো না।

নেসার: আপনাদের পরিবারে আপনিই তো প্রথম রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হন?

লুসি: হ্যাঁ, আমিই আমাদের পরিবারে প্রথম রাজনীতিতে ইনভল্ব হই। এবং আমার পরে শিমুল।

নেসার: আপনার রাজনীতি তো ছাত্রমৈত্রী দিয়েই শুরু।

লুসি: ছাত্রমৈত্রী দিয়েই শুরু করেছিলাম।

নেসার: পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে

লুসি: হ্যাঁ, পরে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হই। যেহেতু ডাক্তার টুটুল ছিল আমার হাসবেন্ড। সুতরাং বুঝতেই পারছেন। মোটামুটি খুলনা অঞ্চলে আমাকে দিয়েই শুরু হয়েছিল। পরে শিমুল। শিমুল আমি মিলিয়ে ভাল একটা অবস্থানে নিয়ে এসেছিলাম দলকে। পরে আমি খুলনা থেকে চলে গেলাম রাজশাহী।

নেসার: রাজশাহী কি পড়তে ?

লুসি: না, বিয়ে হল। ওর সাথে চলে গেলাম। রাজশাহীতে গিয়ে একসাথেই থাকতাম। গ্রাম পর্যায়ে। পরবর্তীতে আমি আর ওভাবে সরাসরি পার্টির সাথে থাকতে পারিনি। কারণ প্রেগনেন্ট হয়ে যাই। পরে চাকরিতে আমি নাইনটি ওয়ানে চলে আসি। চাকরিতে এসে তারপর থেকে আমি, এমনি হেল্প করেছি নাইনটি সিক্স পর্যন্ত। নাইনটি সিক্স পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছিলো। কিন্তু সরাসরি রাজনীতির যে অবস্থানে থাকার কথা ছিলো; তা করিনি। ওই সময়ের পরে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে ফেলি।

নেসার: পরবর্তীতে ডাক্তারের সাথেও তো আর সম্পর্ক টেকেনি।

লুসি: না টিকেনি। এই পলিটিক্সের কারণেই, যখন আমি দেখলাম সে একজন উঁচু স্তরের নেতা। তার যে মানসিক চাহিদা, বলতে গেলে তার যে চাহিদা, স্বাভাবিক কারণে তার যিনি অর্ধাঙ্গিনী হবেন। সেও তার সাথে থেকে, পাশাপাশি থেকে ওই পর্যায়ে পার্টিকে আগায় নিয়ে যাবে। সে রকম একটা মেন্টালিটি তার মধ্যে ছিলো। আমারও ছিলো। যাই হোক, কোনোভাবেই সেটা আর, নিজেদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি। তারপর ওইভাবে না আগিয়ে, মানে ওইদিকে আর আগাতে পারিনি আমি। মোটামুটি দুটো বিপরীত দিকে, বিপরীত বলবো না। মানে আমার দিক থেকে বিষয়টি থমকে গেছে। তার দিক থেকে তার যে মানসিক চাহিদা, সেই চাহিদা আমি মেটাতে পারিনি। যার ফলে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে যায়। একটা বড় ধরনের গ্যাপের সৃষ্টি যখন হয়ে যায়, তখন আমার দিক থেকেই আমি সরে আসি। আমি নিজেই সরে আসি যে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর রাজনীতি একসাথে চলতে পারে না। তার যে চাহিদা, মানে পার্টির জন্য তার সাথে আমার বিয়ে। মূলত পলিটিক্সের ওই আদর্শটা নিয়েই বিয়েটা হয়েছে। তো সেই আদর্শে আমি যখন সরাসরি সম্পর্কিত থাকতে পারছি না, তখন আমার দিক থেকেই আমি সরে আসি। তার দিক থেকে না, আমি আমার দিক থেকেই সরে আসছি। না, সে তার পলিটিক্স করুক, আমি যেহেতু থাকতে পারছি না। মানে পলিটিক্সে, ওই পর্যায়ে, নেতার স্তরে যাইতে পারছি না। তার আশা ছিলো সেভাবেই যাওয়ার। আমারও ছিলো। যাই হোক, কোনো একটা গ্যাপের কারণে এক পর্যায়ে ওটা আর সম্ভব হয়নি। এবং সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেছে।

পাশাপাশি আমার পরিবারের উপরে যে ঝড়ঝাপটা, সেদিক থেকে আমার পরিবারের হালও আমাকে ধরতে হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে। কঠিনভাবে হাল ধরতে হয়েছে। এখনো। এখনো ধরছি, দেখতেই পাচ্ছেন। বোনভাই, সেদিকেই চলছি যুদ্ধ করে। মানে দুটো দিক একসাথে আমি সামলাতে পারিনি।

১৭ই সেপ্টেম্বর, রোববার, ২০০৬ সাল, সময় সকাল ১২টা

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s