পিইসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস :: শিক্ষা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ধ্বংসের ভয়াবহ চক্রান্ত

Posted: ডিসেম্বর 4, 2014 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: বি. অনিত্য অনিরুদ্ধ

education-cartoon-1সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ২০১৪এর প্রায় সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সারাদেশে শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ফটোকপি, ইমেইল, মেসেজের মাধ্যমে ফাঁসকৃত প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে। দেখা গেছে, পরীক্ষার শুরুর পর হাতে পাওয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার আগের পাওয়া প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে। আর কয়েকটি বিষয়ে ফাঁসকৃত প্রশ্ন পরীক্ষার দিন মূল প্রশ্নপত্রে ক্রমিক নম্বর এলোমেলো হয়ে কিংবা কয়েকটি প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি হয়ে এসেছে। গত বছরের পিইসি পরীক্ষায়ও কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল।

সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক পরীক্ষা নেয়াটা বাস্তবিকপক্ষে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায় ভীতি তৈরি করা, মানসিক চাপ প্রয়োগ এবং ভোগান্তিতে ফেলার উপায়। এদের একটা অংশ পরবর্তী শিক্ষা জীবনে যাবার আগেই এই পরীক্ষার মাধ্যমে ঝরে পড়ে। এখন দেখা যাক “পরীক্ষার্থীর সংখ্যা” কি নির্দেশ করছে। এবছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে শুধু প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৪ জন, জেএসসিতে ১৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৯৫ জন, এসএসসিতে ১০ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৫ জন, এইচএসসিতে ৯ লাখ ২৪ হাজার ১৭১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এসব পাবলিক পরীক্ষা আসলেই ছাঁকনি বা চালুনির মতো কাজ করছে। তাছাড়া প্লাসের ছড়াছড়ির এই যুগে বাকি যারা প্লাস পায়না তাদের সিংহভাগ স্বভাবতই শৈশবকাল থেকে এক ধরনের হীনমন্যতা নিয়ে বেড়ে ওঠে।

এভাবে একটার পর একটা পাবলিক প্রশ্নফাঁস হচ্ছে দেখেও দেশের সর্বোচ্চ মহল বলতে গেলে একদম নীরবতা পালন করে প্রশ্নফাঁসকে প্রশ্রয় দিয়েছে। যুক্তিযুক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয় প্রশ্নফাঁসের ভয়াবহতা স্বীকার করতেই রাজি নন। তার ভাষায় এসব নাকি গুজব, অপপ্রচার। কর্তৃপক্ষ যদি চোখ বুজে কিছুই জানিনা বলে সমস্যাটিকে পরোয়া না করার ভান করে থাকে, তাহলে কেমন করে এই মারাত্মক সমস্যার সমাধান হবে? দেশের সরকার একটা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা যেখানে দিতে পারছে না, সেখানে পুরো দেশের নিরাপত্তা কিভাবে সেটাই ভাববার বিষয়।

আমরা মাঝেমধ্যেই দেখতে পাই, মুক্তমনা তরুণেরা ফেসবুকে কোন বিষয়ে যৌক্তিক মত প্রকাশ করার কারণে পুলিশ কিংবা ব়্যাবের হাতে ধরা পড়ছে, জেল খাটছে, মার খাচ্ছে। কিন্তু কেউ যখন ফেসবুকে প্রশ্ন প্রচার করে এবং ফেসবুক ব্যবহার করে প্রকাশ্যে যখন ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন নিয়ে বাণিজ্য করে, তখন কখনও তাদের কাউকে ধরার জন্য কেউ থাকে না। অদ্ভুত লাগে, কীভাবে এসব প্রশ্নফাঁসকারী সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়?

একের পর এক প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, “এগুলো গুজব, ভিত্তিহীন অভিযোগ ও তথ্যবিভ্রাটও বটে। এ জন্য এ ধরনের ‘হীন, অসত্য, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সন্দেহমূলক’ সংবাদ প্রচার না করার জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ফেসবুকে পাওয়া প্রশ্ন বা সাজেশন এবং অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা হয় এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে এ ধরনের ঘটনার উদ্ভব কি না তাও পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। সার্বিক পর্যালোচনা শেষে প্রতীয়মান হয় যে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রশ্নের সঙ্গে সমাপনী পরীক্ষায় সরবরাহকৃত প্রশ্নের কোনো সামঞ্জস্য নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের সঙ্গে ফেসবুকে পাওয়া প্রশ্নপত্রের মিল থাকার কথা। কিন্তু তার প্রমাণ মেলেনি।”

ফেসবুকমোবাইল বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শুধুমাত্র সায়েন্স ফিকশন তথা কল্পবিজ্ঞানেই খাটে। গত ২৭ নভেম্বর এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি সংক্রান্ত এক সভায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে প্রয়োজনে পরীক্ষার সময়ে ‘ফেসবুক’ ও ‘মোবাইল ফোন’ বন্ধ রাখা যায় কিনা সেজন্য আইন খতিয়ে দেখতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে। এসব নতুন হট্টগোল নয়। তিনি এরকম রেগেমেগে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে কোন বন্ধ রাখা হবে না, মানে বিরতিহীন পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশে এর প্রতিবাদে আন্দোলনমানববন্ধন হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সহায়তায় ফেসবুকের প্রশ্নফাঁসকারী যেসব পাতা ও গ্রুপ চিহ্নিত করেছে সেসব নিয়ে তদন্তে দেখা গেছে, এসব অ্যাকাউন্টধারী বেশিরভাগই তাদের কনটেন্ট আপলোড করেছেন ময়মনসিংহ ও বগুড়াএ দুটি জেলা থেকে (সমকাল, ৩০ নভেম্বর ’১৪)। পিইসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশন করে ময়মনসিংহে অবস্থিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এবং ছাপা হয় বিজি প্রেস থেকে। তাই সেখান থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না, সেটিও সন্দেহের মধ্যে রাখা যায়। গত বছর প্রাথমিক সমাপনীর প্রশ্নফাঁসের সঙ্গেও নেপের নাম উঠেছিল। প্রশ্নপত্র মডারেশনের দায়িত্বে থাকা একজন শিক্ষকের ময়মনসিংহ শহরে থাকা কোচিং সেন্টার থেকে প্রথমে এ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছিল বলে গতবার সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।

একদিকে, যেসব পরীক্ষার্থী ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ বা অনুসরণ না করে পরীক্ষা দিয়েছে, ভয়ঙ্করভাবে তাদের ভেতর এখন একই সঙ্গে জন্মেছে ক্ষোভ এবং তীব্র হতাশা। তাদের মুখে কথা একটিই, “ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দিয়েই যদি সবাই পরীক্ষা দিয়ে ভালো নম্বর পেয়ে ফলাফল করে, তাহলে সারা বছর এত মনোযোগ দিয়ে পড়েলেও আমাদের কী হবে?” এরকম অনেকে প্রশ্ন না পেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু সবাই এখন তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে নানা রকম কটূক্তি করছে। অন্যদিকে, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রে যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তারা নিজেদের জন্যে নানা ধরনের যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। এভাবে অবক্ষয়ের গহ্বর তাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। তবে এসব খুদে শিক্ষার্থীদের কাউকেই কোনভাবে অভিযুক্ত করা যাবে না। কেননা তাদের কেউ এসবে জড়িত নয়, তাদের হাতেই অন্যরা তুলে দিয়েছে প্রশ্নপত্র।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর এই শিক্ষাব্যবস্থায় যা শেখানো হয়, তার কোনটাকেই “শিক্ষা” বলা চলে না। আর পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র শিশুদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের মাঝে পড়াশোনার প্রতি অনীহা জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রশ্নপত্রের সহজলভ্যতায় তাদের মনে সুবিধাবাদী প্রবণতার পিপাসা জন্মেছে। সে প্রেক্ষিতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে শিক্ষা বিষয়টাকে আস্তাকুরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। শিক্ষা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে ধ্বংসের এক ঘৃণ্য পরিকল্পিত চক্রান্ত এটা।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ১১ ধারায় বিভক্ত। ভাবা যায়! ১৯৭৪ সালে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ১৫৬; ২০১২ সালে এসে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৭২! বিপরীতে বিভিন্ন ধারার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৬ হাজার ৩৪৫। আবার অনেকক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক স্কুল দখল করে হয়েছে মার্কেট, থানা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপাশি অপুষ্টি, ক্লাসরুম সংকট, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, স্কুলের নিরানন্দ পরিবেশ, বাড়তি বেতন ফি ডোনেশন ব্যবস্থা, কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণ, শিক্ষকদের মানবেতর বেতন কাঠামো সবকিছু নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। তাছাড়া, স্কুলকলেজ মানে এখন ক্লাসরুমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়; শিক্ষার্থীদের মাঝে এখন অধিকমাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষার সকল পর্যায় এখন ঘেরাও করে আছে প্রাইভেটটিউশনি, কোচিং সেন্টার ও গাইড বই, হরেকরকম সাজেশন, ভারী ব্যাগ। মুখস্থ এবং নির্মম প্রতিযোগিতার শিকার তারা। কোন উন্নত আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করার উপায়উপাদান নেই তাদের নাগালে।

মূলত, মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা এবং ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার ফলে অপরাধীদেরকে আরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। অবিলম্বে পিইসি সহ সকল পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রফাঁস রোধে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ছাত্রশিক্ষকঅভিভাবকসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। সবশেষে এককথায় বলতে গেলে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও সাম্যবোধই পারে শিক্ষার্থীদেরকে বিকশিত করে গড়ে তুলতে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s