পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা মহামারির প্রকোপ ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা

Posted: নভেম্বর 19, 2014 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

ebola-6543শিশু কোলে নিয়েই ফুটপাথে বসে পড়েছেন ইবোলা আক্রান্ত মায়েরা। রাস্তায় পড়ে রয়েছে বহু মৃতদেহ। আর শেষ বারের মতো প্রিয়জনদেরকে একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের কাছে অনুনয় করছেন মানুষজন। ছড়াচ্ছে আতঙ্ক। বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের এটাই বাস্তব চিত্র। ইবোলা রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে, যাতে ইতিমধ্যেই অন্তত ৫১৭৭ জন মারা গেছেন। আটটি দেশে আক্রান্তের মোট সংখ্যা চোদ্দ হাজার ছাড়িয়েছে।[] গত ডিসেম্বরে গিনিতে প্রথম এই রোগের উপসর্গ দেখা যায়। আর তারপর ক্রমশ এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী দেশ লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন ও নাইজেরিয়ায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইবোলা ভাইরাস বহন করে ও মানুষের মধ্যে ছড়ায় বাদুড়। আর শারীরিক সংস্পর্শে দেহরসের মাধ্যমে রোগটির বিস্তার ঘটে। ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছিল অবশ্য চল্লিশ বছর আগে। কিন্তু এরোগ নিরাময়ে কার্যকর কোনও ওষুধ এখনও তৈরি হয়নি। কারণ অলাভজনক বিবেচনায় এব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখায়নি ওষুধ কোম্পানিগুলি।

ফ্রান্সিস আর. বয়েলের মতো বিশষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য বলছেন লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন ও গিনিতে মার্কিন সংস্থা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এবং তুলানে বিশ্ববিদ্যালয় জৈব অস্ত্র বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। যেখানে গবেষণাগারে দুর্ঘটনাজনিত কারণেই ছড়িয়েছে ইবোলা ভাইরাস। যা বর্তমানে আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

এদিকে গত অক্টোবরে সেনেগাল এবং নাইজেরিয়াকে ইবোলা মুক্ত ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিওনে এই রোগ মহামারির আকার নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একাধিক ব্যক্তির শরীরে ইবোলার জীবাণু পাওয়া গিয়েছে। স্পষ্টতই, আফ্রিকার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইবোলা কবলিত অঞ্চলগুলিতে মানুষের জীবনজীবিকার উপর আঘাত নেমে আসছে। অর্থনীতি গতি হারাচ্ছে আর খাদ্যসঙ্কট ঘনাচ্ছে। চিকিৎসা অমিল। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। মানুষ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা ইবোলা আক্রান্তদের আলাদা করে দিতে গেলে দাঙ্গা বাধছে। হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সংক্রমণের আশঙ্কায় স্বাস্থ্যকর্মীরাও অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

ইবোলা সঙ্কটের মূলে আছে আফ্রিকার দেশগুলির ব্যাপক দারিদ্র ও অসাম্য, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সৃষ্ট। গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিওন যেমন প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ; কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে উপেক্ষিত। দীর্ঘ ঔপনিবেশি শাসনের শিকার ছিল এই দেশগুলি। গৃহযুদ্ধ, জাতিগত গণহত্যা এবং অভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত হয়েছে। আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের উপর চাপিয়েছে নয়াউদারবাদী ‘‘কাঠামোগত সংস্কার’’। যা বহুজাতিকের শোষণের পথ প্রশস্ত করেছে। দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কাঠামোও বেসরকারীকরণের ফলে আরো সঙ্কুচিত ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। লাইবেরিয়ার জনসংখ্যা যেমন ৪২ লক্ষ। কিন্তু চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৫১ জন।[] আর সিয়েরালিওনের জনসংখ্যা ষাট লক্ষ। যেখানে মাত্র ১৩৬ জন চিকিৎসক আছেন। এমতাবস্থায় ইবোলার চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন আফ্রিকার উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা।

ইবোলা সঙ্কট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তাও জরুরি। কিন্তু বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। অধিকাংশ দেশই যেসমস্ত সাহায্য দিচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। আর পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ইবোলা মোকাবিলার নামে এঅঞ্চলে সেনা মোতায়েন করছে। লাইবেরিয়ায় যেমন প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা আর সিয়েরালিওনে তিন হাজার ব্রিটিশ সেনা পাঠানো হচ্ছে।[][] যার উদ্দেশ্য হল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির মুনাফার স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। তবে এর মধ্যেও লক্ষণীয় যেটা, লাতিন আমেরিকার ছোট্ট দেশ কিউবার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এঅঞ্চলে ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।।

তথ্যসূত্র

[] “Ebola toll rises, but Liberia’s is revised lower: WHO”, 15 November 2014

[] Farouk Chothia, “Ebola drains already weak West African health systems”, 24 September 2014

[] “U.S. May Send Up to 4,000 Troops to Liberia to Help Contain Ebola”, 3 October 2014

[] Mark Nicol, “Ebola lockdown: British plan to send 3,000 UK troops into Sierra Leone”, 19 October 2014

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s