আকাশটা ছিলো আকাশের মতো একা

Posted: নভেম্বর 15, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: মাহমুদ কামাল

matin-bairagi-book-1কবিতা লিখতে গিয়ে বোধকরি কবিরা ক্লান্ত হন না। বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে প্রতিদিন যে ভাবে কবিতা জমা হচ্ছে তার কোনও শুমারি না হলেও আমরা বুঝতে পারি প্রায় লেখাতে পরিমিতি বোধ না থাকলেও পরিমান কিন্তু বেড়েই চলেছে। স্মরণযোগ্য পংক্তি থেকে পাঠক বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেক কবিরই সারা জীবনের সমগ্র’ পাঠ করে পরবর্তী সময়ে একটি পংক্তিও স্মরণে আসে না। শুধুমাত্র একটি পংক্তি যদি পাঠকের মনে গেঁথে যায়, ধারণা করি কবির কাব্যচর্চা সার্থক হয়েছে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ কিংবা নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়এই পংক্তি দু’টো ভারতচন্দ্রকে মনে করিয়ে দেয়। সেই বিখ্যাত, শোনহে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাইঅপাঠকের কন্ঠেও কখনও কখনও চন্ডিদাসের এই পংক্তিটি উচ্চারিত হয়। জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ বেশি কবিতা লিখেননি। কিন্তু, আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবেপংক্তি দু’টো কালের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। চন্ডীদাস এবং ভারতচন্দ্র এক বা দুই পক্তির কবি নন। তাঁরা বাংলা কবিতায় স্থায়ী আসনেই বসে আছেন। কিন্তু আমরা কজনই বা জানি নিচের এই পংক্তিগুলোর রচয়িতার নাম। ১.আপেল ঘুমিয়ে আছে তুমি তাকে দাঁত দিয়ে জাগাও (স্বদেশ সেন)

. সিন্দুক নেই ; স্বর্ণ আনিনি

এনেছি ভিক্ষা লব্ধ ধান্য

দুটি চোখের তাৎক্ষণিকের

পাব কি পরশ যৎসামান্য (অরুণ কুমার সরকার)

. মাথার উপর ডাকল পেঁচা, চমকে উঠি আরে!

আধখানা চাঁদ আটকে আছে টেলিগ্রাফের তারে (অশোক বিজয় রাহা)

কবি মতিন বৈরাগীর কাবিতা সমগ্র পাঠের সময় চোখ আটকে গেল, আকাশটা ছিলো আকাশের মতো একা’ পংক্তিটির ওপর। বলাবাহুল্য কবির কাব্যভাষা একেবারেই পরিস্কার এবং তা মেঘমুক্ত আকাশের মতোই। সামজিক প্রতিবেশ, রাষ্ট্রিয় অনাচার, মানুষের কুটিলতা এসব নেতিবাচক বিষয়কে তিনি তুলে এনেছেন কবিতাগুলোতে। মতিন বৈরাগীর কবিতা সমগ্রের ৩২ পৃষ্ঠার, আজ কথা হবে’ কবিতাটির পংক্তি, আকাশটা ছিলো আকাশের মতো একা’ পড়ার পর পাতা যতোই উল্টে যায় ৩৩ থেকে ৭৫ কিংবা ৭৬ থেকে পাতার পর পাতা, তো প্রাগুক্ত পংক্তিটি অন্য পংক্তিগুলোকে হটিয়ে পুনর্বার চিত্রকল্পই মেলে ধরে। মানুষ মূলত একাএই সত্যটি জানিয়ে দেয় পংক্তিটি। কোলাহলের মধ্যে থেকেও মানুষ একা। এই একাকিত্ব যে কোনও মানুষকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে দেয়। কবিরা আকাশের চারিত্র্য উদারের সমার্থক করেন। আমরা বলি, উদার আকাশ কিংবা আকাশের মতো বিশাল হৃদয়। কিন্তু কবি কি বললেনআকাশটা একাই এবং সে তারই মতো। আকাশ ধারণ করে মেঘ, আবার মেঘকে পাঠিয়ে দেয় স্থলে, পৃথিবীতে। কখনও কখনও কালো মেঘ আকাশকে কলুষিত করে।

আকাশ কি মহাশূন্য নাকি শূন্য নাকি মরিচিকার মতো অস্তিত্বহীন? মরিচিকা যদিও পথিককে বিভ্রান্ত করে কিন্তু মহাশূন্যতো মেঘেরই আশ্রয়দাতা। আকাশকে আয়নার সাথে তুলনা করে কবি আশরাফ সিদ্দিকী লিখেছেন, মুখ দেখে আকাশআয়নায়। ’ আমরা অলীক কল্পনাকে বলি আকাশকুসুম। রবীন্দ্রনাথ আকাশকে অনুষঙ্গ করে বহু কবিতা লিখেছেন। যেমন, আমার অনেক দিনের আকাশচাওয়া/ আসবে ছুটে দখিন হাওয়া’ কিংবা চিত্তে নামে আকাশগলা আনন্দিত মন্ত্ররে। ’

কবি মতিন বৈরাগী কবিতাটির শুরুতে লিখেছেন, আকাশটা ছিলো আকাশের মতো নীল’ কবির দেখা সেটি ছিলো নীলকাশ। কিন্তু, এইযে এক আকাশ নিঃসঙ্গতা একই আঙ্গিকে সে তো বহুবর্ণের।

মতিন বৈরাগীর আরও কিছু পংক্তি হৃদয় ছোঁয়া। সেই পংক্তিগুলো পড়ার আগে আমরা বিখ্যাত কয়েক কবির স্মরণযোগ্য পংক্তি পাঠ করি।

. অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

. কত বৃষ্টি হয়ে গেছে

কত, ঝড় অন্ধকার মেঘ

আকাশ কি সব মনে রাখে? (প্রেমেন্দ্র মিত্র)

. শুধু তাই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। (বুদ্ধদেব বসু)

. যে আনন্দে স্বাদ নেই বিষাদে যা তীব্র তীক্ষ্ণ নয় (বিষ্ণু দে)

. প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য। (সুভাষ মুখোপাধ্যায়)

. হে ম্লান মেয়ে, প্রেমে কি আনন্দ পাও,

কী আনন্দ পাও সন্তান ধারণে? (সমর সেন)

. ভালোবাসা, তোমার দ্বিতীয় নাম স্মৃতি। (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

. এখনো দাঁড়িয়ে আছি , আমার এক ধরণের অহংকার। (শামসুর রাহমান)

. এক দশকে সঙ্ঘ ভেঙ্গে যায়। (শঙ্খ ঘোষ)

১০. এক বর্ষায় বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম

এত পথ হেঁটে, এত জল ঘেটে কী তবে হ’লাম? (নরেশ গুহ)

১১. এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। (হেলাল হাফিজ)

১২. ভাত দে হারামজাদা তা না হলে মানচিত্র খাবো। (রফিক আজাদ)

১৩. উঠুন জাগুন দেখুন আগুন

আপনার চারিদিকে

সারা পৃথিবীর কেউ ভালো নেই

স্বাস্থ্য শারীরিকে। (আল মুজাহিদী)

১৪. কেন এই পাসপোর্ট পাসপোর্ট কাটাতার কাটাতার খেলা

পৃথিবী আমার আমি হেঁটে যাবো। (জাহাঙ্গীর ফিরোজ)

১৫. বৃষ্টি পড়ছে, চলো রাস্তায় নামি

তোমার শার্ট কি বৃষ্টির চেয়ে দামী? (অমিতাভ দাশ গুপ্ত)

১৬. পুলিশ:

কবিকে দেখে টুপিটা তুই খুলিস। (তুষার রায়)

১৭. যারা সৎ ছিলো তারা ঠিক সতর্ক ছিলো না। (মৃণাল বসুচৌধুরী)

এবার আমরা মতিন বৈরাগীর কিছু স্মরণীয় পংক্তির খোঁজ করি :

. আমি পথহারা এক ফুল

আমার বাড়ছে শুধু ভুল। (আমি বলতে চেয়েছি: কবিতা সমগ্র পৃষ্ঠা ৩৪

. মানুষ যখন কোনো কিছুর লাগামহীন প্রশংসা করে

তখন বুঝতে হবে সত্য থেকে পিছিয়ে পড়েছো তুমি

কারণ প্রকৃত সত্য প্রশংসার যোগ্য নয় মোটেই। (অনেক কিছু অন্যরকম:২১ সংখ্যক গুচ্ছপৃ ৭১)

. দৃশ্যরা সব দৃশ্যতে উৎসুক। (কবিতা আমার পৃ৩৩)

. কষ্টেরা শুধু একটু একটু হাসে

শরীর তাহার বাড়ছে সর্বনাশে। (কষ্ট সমাচার: পৃ ১১)

উপর্যুক্ত পংক্তিগুলোর প্রাণময়তা পাঠককে মোহমুগ্ধ করে। কিন্তু, যে, আকাশটা ছিলো আকাশের মতো একা পংক্তিটি তারপরও ওঠে আসে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে।।

মাহমুদ কমাল কবি বহুমাত্রিক লেখক এবং সাহিত্য সংগঠক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s