লিখেছেন: মৃণাল বসু চৌধুরী

matin-bairagi-book-4[আগামী ১৬ নভেম্বর, ২০১৪ কবি মতিন বৈরাগীর ৬৮ তম জন্মবার্ষিকী। কবি মতিন বৈরাগী ৭০ দশক থেকে আমাদের কাব্যাঙ্গনে সক্রিয় রয়েছেন। বর্তমান সময় কাল পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যের মধ্যে ১. বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন, . কাছের মানুষ পাশের বাড়ি, . খরায় পীড়িত স্বদেশ, .আশা অনন্ত হে, . বেদনার বনভূমি, . অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি. .অন্ধকারে চন্দ্রালোকে, . দূর অরণ্যের ডাক শুনেছি, . স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার গল্প, ১০. অনেক কিছু অন্যরকম, ১১. খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি, ১২. দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত, ১৩. নির্বাচিত, ১৪. সিলেক্টেড পোয়েমস [ইংরেজী অনুবাদ] কাব্যসমগ্র এবং আরো অনেক অগ্রন্থিত কবিতা। অসংখ্য কবিতা তাঁর ছাপা হয়েছে দেশেবিদেশে বিভিন্ন সাময়িকী, পত্রপত্রিকায়। ইদানিং তিনি কবিতা বিষয়ে প্রবন্ধ, দেশের খ্যতিমান কবিদের কাব্যআলোচনাও করছেন। তিনি নিয়মিত লিখছেন মঙ্গলধ্বনিতে। মঙ্গলধ্বনির পক্ষ হতে কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।।]

কবি মতিন বৈরাগী সংগে আমার ঠিক কবে আলাপ হয়েছিল মনে নেই। তবে মুখোমুখি আলোপের অনেক আগ থেকেই ওঁর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় এখন যেমন বাংলাদেশের কবিতা পড়ার আমরা সুযোগ পাই নিয়মিত বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমাদের সে সুযোগ ছিল না। সে সুযোগ প্রযুক্তি কাছে এনে দিয়েছে দু’দেশের সাহিত্য সংস্কৃতি প্রেমিকদের। তবু সামান্য যে কয়েকটি পত্রপত্রিকা বন্ধুবান্ধবদের সৌজন্যে হাতে আসতো সেখানেই দেখেছিলাম মতিন বৈরাগীর কবিতা।

২০০৬ সালে আমার প্রথম বাঙলাদেশ ভ্রমণ। তখন কবি মতিন বৈরাগীর বয়স প্রায় ৬০। ১৯৭৭ থেকে ২০০৫ এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে আটটি কাব্য। প্রথম কাব্য‘বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭এ। কবির বয়স তখন ৩১। অহেতুক তাড়াহুড়ো নয়, কবিতাকে ভালোবেসে দীর্ঘদিন লালন পালন করেই তাঁর দ্বিধাহীন আত্মপ্রকাশ। তারপর এক এক প্রাশিত হয়েছে কাছের মানুষ পাশের বাড়ি’১৯৮০, খরায় পীড়িত স্বদেশ১৯৮৬, আশা অনন্ত হে১৯৯২, বেদনার বনভূমি১৯৯৪, অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি১৯৯৮, অন্ধকারে চন্দ্রালোকে২০০০, দূর অরণ্যের ডাক শুনেছি২০০৫, অর্থাৎ ২৮ বছওে মাত্র ৮টি কাব্য। এ সময়ের তরূণ কবিরা হয়ত ভাবতেই পারেন না, বা মানতেও পারেন না কাব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘতম অপেক্ষার কার্যকারণ। যা হোক মনে আছে, সক্রেতিস ক্রিতো সংলাপ’ কবিতাটি প্রথম পাঠে খুব আপ্লুত হয়েছিলাম। আনন্দে বিষাদে মনে মনে বরণ করে নিয়েছিলাম এই কবিকে। বুঝেছিলাম এই কবি বি্শ্বাস করেন সবার উপরে মানুষ সত্য ..। ভালো লেগেছিল তার অকপট সত্য ভাষণ ক্ষমতা।

কী অবাক দেখ জ্ঞানার্জনের ক্লেশ করে না কোনো রাজনীতিবিদ

কারণে অকারণে জ্ঞানের বড়াই ছাড়া শেখেনি এককাচ্ছা মিঠেল কথন

শুধু ক্ষমতার লোভ সারাটাজীবন মিথ্যে আস্ফালন চলায় বলায়” সক্রেতিস ক্রিতো সংলাপ’

১৯৮৫ সালে লেখা এই কবিতায় তিনি যে প্রতিবাদের সুর শুনিয়েছিলেন পরবর্তী কালেও তাঁর বিভিন্ন কবিতায় মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তাঁর অক্ষরমালায়। ২০০৬ এর পর কবি মতিন বৈরাগীর আরো চারটি কাব্য প্রকাশিত হয়েছে। স্বপ্ন এবং সাবাধীনতার গল্প২০০৭, অন্যরকম অনেক কিছু২০০৮. খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি ২০১২ এবং দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত ২০১৪. এই কবির কবিতা আমায় মুগ্ধ করে প্রধানত দু’টি কারণে। সহজ সাবলীল ভাষায় তিনি নিন্তর মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সঙ্গী হয়েছেন তাঁদের জীবনযুদ্ধের, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের আলোছায়ায়। ভালো লাগে, তাঁর কবিতায় তিনি কোন আরোপিত দর্শনের সাহায্য না নিয়ে শুধু মাত্র মানুষেরজীবনযাপন, স্বপ্ন স্বাধীনতার গল্প নিয়ে মুগ্ধকরেছেন পাঠক সমাজকে। মানুষ কে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কপট রাজনীতি ব্যথিত করেছে তাঁকে। তার কলম সরব, নির্ভয়।

হায় রাজনীতি, পক্ষ বিপক্ষের বিবৃতি দায় নির্ধারণ

আর পেছনে দাঁড়ানো পুতুলগুলোর মস্তক দোলন।

তুমি ফিরবে না ফিরতে পারবে না আর।

মা কাঁদবে, বাবা ভাঙাবুকে খুঁজবে একটা মুখ

আর প্রিয় বোনটি কেবল থাকবে অপেক্ষায়

একটা শব্দদাদা তুই এলি!

হায়্ মৃত্যু কার জন্যে প্রতিদিন প্রতিটি পালাবদলে? [ জগতটা দাঁড়িয়ে আছে ]২০১৩

সামান্য কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে তিনি সামাজি রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে মানুষর চিরন্তন যন্ত্রণার কথা, অত্যন্ত সহজভাবে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের হৃদয়ে। মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নের স্বাধীনতা নিয়ে কবি মতিন রৈরাগীর লেখনী সতত চঞ্চল:

আমরা হাঁটছি, তুমি কেবলি কী সব বলছ

কিন্তু আমার তো মনে হয় হাঁটাটাই কেবল কাজ নয়

সব পথেই তো উয়াহিয়া টিক্কা নিয়াজিরা

তবুও তুমি বলছ স্বাধীনতা স্বধীনতা

বল: একটা স্বাধীনতা কতবার পেলে তবে স্বধীনতা হয়!

এভাবেই দৈনন্দিন জীবনের সুখদুঃখ স্বপ্ন, স্বপ্ন ভঙ্গ নিয়েই রচিত হয় তার কবিতা। কখনো কখনো তা দুশ্যমান জগতের ধারাবিবরনী। অন্তর্জগতের ভাঙাগড়া, চিরকালীন অলৌকিক আনন্দ নয় তার কবিতায় প্রায়শই বর্হিজীবনের আর্তনাদ বা আর্ত উঠে আসে। অনাবিল পরিপূর্ণতা নয় তাঁর কবিতায় মূর্ত হয় জাগতিক যন্ত্রনার সংহত প্রকাশ।

সাধারণের মুখের ভাষাতেই তাঁর অধিকাংশ কবিতা। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় কিন্তু কেন যেনে মনে হয় পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাবার জন্য তিনি তাদের মুখের ভাষই হাতিয়ার করেছেন।

তারপর পাগলা রমিজ এমনভাবে দাঁড়ালো দেখে মনে হলো তার কাঁধের মাথাটা তার বাহুর বেষ্টনিতে হেলমেটের মতো ঝুলছে। সে বলল: কাগজের মাথা নিয়ে ঘুরিস, এটা খোলাও যায় আবার লাগিয়ে হাঁটাও যায়, বুঝেছিস? [ মাথার গল্প ]

কি সহজ অথচ কি তির্যক! কিন্তু তাঁর সব কবিতা এমন নয়। প্রায চল্লিশ বছর ধরে তাঁর কবিতায় অন্য সুর, অন্য ধ্বনি যে মূর্ত হয়েছে তা তন্মিষ্ঠ পাঠকরা জানেন।

তুমি যে কেবল বলেছ তোমার কথা

আমি ছিলাম নীরব নম্রমুখী

প্রান্তর ছিল আকাশ আলোয় ছেয়ে

তরুপল্লব যেথায় যেমন সুখী’ [তুমিতো কেবল ২০১১]

বা এরকম অনেক কবিতা আছে যেখানে প্রেমই স্পষ্ট হয়েছে তাঁর ভাষায়:

কখনো রয়েছ খুব কাছাকাছি কখনো গিয়েছো দূর

কখনো হৃদয়ে হাহাকার তুলে বাজাও বিষাদসুর

কখনো তোমার তিতির পরান বনের মোহন সাজ

কখনো অমল আশার আলোক বিবেকের কারুকাজ’ [আলোকিত ভালোবাসা, ৮৬]

এই স্বল্প পরিষরে একজন কবির কাব্যকৃতি নিয়ে সম্যক আলোচনা সম্ভব নয়। কেন না তা কবির প্রতি অন্যায় অবিচারই করা হবে। আমি তাই বিশ্লেষনধর্মী কোন আলোচনার মধ্যে না গিয়ে শুধুমাত্র আমার অসীম মুগ্ধতার কথা জানিয়েছি কয়েক ছত্রে। তাঁর অসামান্য একটি পঙক্তির জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিষয়ান্তরে যাবো। দুঃখকে যত্ন দাও সে তোমাকে আলোক দেখাবে’ ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত এই পাঙক্তিটির জন্য কবিকে অনেক আনেক ভালোবাসা।

যখনই ঢাকা গিয়েছি রাইটার্স ক্লাবের আড্ডায় আমরা যেতামই ওখানেই কবি মতিন বৈরাগীর সাথে ঘনিষ্টতা। গতবছর কবিতাবাংলার উদ্যোগে পাঠকসমাবেশে আমার ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল মাতিন বৈরাগী ছিলেন তার সঞ্চালক। সে দিন নানা কারণে ওঁকে নতুন ভাবে চিনেছিলাম। ক’দিন আগে নিত্য উপহারে অনুষ্ঠানের পর আমরা বন্ধুরা বসেছিলাম আড্ডায় রাইটার্সক্লাবে। সেখানে মতিন বৈরাগী কবিতা শুনিয়েছিলেন আরো

আগামী ১৬ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে তার ৬৮তম জন্মদিন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুভ্চ্ছো জানানোর সুযোগ পাওয়া গেল না খারাপ লাগছে। কিন্তু শারীরিক দূরত্বকে অগ্রাহ্য করেই মুক্ত হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম অনাবিল ভালোবাসাএকজন কবির প্রতি আরেকজন কবির মুগ্ধতা।।

১১.১১.১৪

[মেইলে প্রেরিত হাতে লেখা কবির টাইপ করা কপি]

মৃণাল বসু চেীধুরী পশ্চিমবাংলার অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ মুখ্য কবি

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s