মতিন বৈরাগীর কাব্যযাত্রা

Posted: নভেম্বর 15, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: ফরিদ আহমদ দুলাল

matin-bairagi-book-3. আহমদ শরীফ লিখেছেনকবি মতিন বৈরাগী নিজের গুণের দানের জন্যেই বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে সুখ্যাত সুপ্রতিষ্ঠিত। কাজেই তিনি তাঁর নতুন কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা মুহূর্তে কারুর মতের, মন্তব্যের কিংবা তদ্বীরের তোয়াক্কা রাখেন না। তবে আমি যে মলাটমন্তব্য লিখছি, সেকেবল কবি কবিতা সম্বন্ধে আমার মুগ্ধতার অভিব্যক্তি দানের জন্যেই। এ কবি গণমানবের দাসত্বশোষণবঞ্চনাজাত বেদনার কথা বলে, বলে পৃথিবীর হালচাল বদলানোর কথা, বাতলায় মুক্তির পন্থা, দিশা দেয় বিপ্লবের বিদ্রোহের, সন্ধান করে সাহসী সংগ্রমী বীরের, আশা আশ্বাস দেয় মুক্তির; আনন্দের সুন্দরের। কবি মতিন বৈরাগী তাঁর কাব্য সংবেদনশীল মানববাদী মাত্রেরই প্রিয়। আমি এবং অগণ্য অনেকে তাই বৈরাগীর তাঁর কাব্যের শংসায় মুখর। ’ (মতিন বৈরাগীর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ আশা অনন্ত হে’এর ফ্ল্যাপে মলাটমন্তব্য)। সত্তরের দশকের কবিক্রম বিবেচনায় কবি মতিন বৈরাগীর জন্ম হয়তোবা সবার আগে। আদর্শভিত্তিক রাজনীতির কর্মী হিসেবেই রাজনৈতিক দলেরই সাহিত্যসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হতে গিয়ে নিজেকে কবি গোত্রে সামিল করে ফেলেন মতিন বৈরাগী। যে কারণে তাঁর কাব্যজীবন কাব্যচর্চার সাথে উন্মেষ সাহিত্যসংস্কৃতি সংসদের নাম বারেবারে উচ্চারিত হয়। মতিন বৈরাগীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বারোটি। প্রকাশের ক্রমানুসারে সেগুলো হলোবিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’ (১৯৭৭), কাছের মানুষ পাশের বাড়ি’ (১৯৮০), খরা পীড়িত স্বদেশ’ (১৯৮৬), আশা অনন্ত হে’ (১৯৯২), বেদনার বনভূমি’ (১৯৯৪), অন্তিমের আনন্দ ধ্বনি’ (১৯৯৮), অন্ধকারে চন্দ্রালোকে’ (২০০০), দূর অরণ্যের ডাক শুনেছি’ (২০০৫), স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার গল্প’ (২০০৭), অন্য রকম অনেক কিছু’ (২০০৮), খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ (২০১২) এবং দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত’ (২০১৪)। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে নির্বাচিত’ (২০০১), সিলেক্টেড পয়েমস’ (২০০৫) এবং কবিতা সমগ্র’ (২০০৮)। এসব তথ্য ছাড়াও আমাদের হাতে আছে হামিদ রায়হান সম্পাদিত কবিতা বিষয়ক ছোট কাগজ উত্তরপুরুষকবি মতিন বৈরাগী সংখ্যা’।

আদর্শ অনুশীলন করা মানুষ হবার কারণে মতিন বৈরাগীর কবিতায় মাটিমানুষ এবং মানুষের অধিকার বঞ্চনার চিত্র ফুটে উঠতে দেখি। রাজনীতির আগুনে গড়াপেটা মানুষ হিসেবে মতিন বৈরাগীর কবিতায় কখনো তাঁকে আদর্শ এবং নিজের শ্রেণী অবস্থান থেকে বিচ্যুত হতে দেখা যায় না। মার্কসীয় দর্শনসমাজতন্ত্র বস্তুবাদী দর্শনের মুগ্ধ যোদ্ধা মতিন বৈরাগী তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে তাঁর চেতনার কথাতাঁর মুগ্ধতার কথা উচ্চারণ করেছেন অকপটে। তাঁর উচ্চারণে আকৃষ্ট হতে পারেন যে কেউ; এমন কি তিনি যে . আহমদ শরীফের মতো একজন তাত্ত্বিক এবং বহুমাত্রিক লেখককে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন, সে তথ্য নিশ্চয়ই তাঁর বন্ধু সহযোদ্ধাদের অন্তরে ঈর্ষার আগুন জ্বেলে দিতে পারে। মতিন বৈরাগীর কবিতায় নীতির কথাআদর্শের কথাদাবীর কথা উচ্চারিত হয়েছে বারবার কিন্তু দাবীর কথা বলতে গিয়ে তিনি কখনো কবিতার শিল্পমানের গলা টিপে ধরেননি। শ্লোগান করে তোলেননি কবিতাকে; কিন্তু বস্তুবাদী মানুষ হবার পরও তাঁর কবিতায় যখন হতাশানৈরাশ্য আর বেদনামগ্নতার হাহাকার ধ্বনিত হতে দেখি তখনই বুঝতে পারি মানুষ হিসেবে বস্তুবাদী হলেও কবি হিসেবে মতিন বৈরাগী যথেষ্ট আবেগ তাড়িত। তবে তাঁর কবিতার হতাশানৈরাশ্য আর বেদনামগ্নতা ভিন্ন ব্যঞ্জনায় পাঠকের সামনে প্রতিভাত হয়। মতিন বৈরাগীর কবিতায় আদর্শচেতনা এবং বস্তুবাদের পাশাপাশি আবেগের অনুষঙ্গ নিয়েই বর্তমান আলোচনায় মতিন বৈরাগীকে আবিষ্কারের প্রয়াস থকবে।

মতিন বৈরাগীর কবিতায় গণমানুষের সংগ্রামী জীবনের আশাআকাক্সক্ষাস্বপ্ন দুঃস্বপ্নের কথকতা বর্ণিত হলেও তা কখনো নীতিকথায় আবৃত হয়ে যায়নি; বরং কবিতার প্রকরণ বিষয়ে তাঁর সচেতন প্রয়াস এবং মগ্নতা পরিলক্ষিত হয় অনুক্ষণ। তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে প্রেম আসে কিন্তু প্রেয়সীর সপ্রশ্ন আগ্রহের জবাবে নিরণ্ন প্রেমিকের পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়ে এবং মনে করিয়ে দেয় কবির গন্তব্যের কথা। প্রথম কাব্যের প্রেম’ শিরোনামের কবিতাটি আমরা পড়ে নিতে পারি। তাঁর গীতি কবিতার শরীরেও পাঠক একই স্বপ্নের ধ্বনি অনুরণনীত হতে দেখবেন। বক্তব্যের সপক্ষে একই কাব্যের উচ্ছ্বাস’ শিরোনামের কবিতার কথা স্মরণ করছি।

উড়িয়ে দিলাম সোনার পাল

বাঁচি মরি ভাঙুক হাল

বজরাতে

আমিও এবার উঠবো গো

হরহামেশা ছুটবো গো

মাঝরাতে

সবুজ ডালের টিয়েটা

শ্বেত ভালুকের বিয়েটা

ভাঙবে যে

রাত্রিদিন নেই আহার

হানবো আঘাত ভাঙবো দ্বার

ভাঙবো হে

(উচ্ছ্বাস বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন)

সত্তরের দশকের নিভৃতচারী কবি মতিন বৈরাগীর কবিতার ভাষা প্রাঞ্জল, বিষয় মানুষসংশ্লিষ্ট, চিত্রকল্প চিত্তাকর্ষক, আবেগ সংযত, দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ। তাঁর কবিতার প্রধান সুর সনাক্ত করতে চাইলে পাঠক আবিষ্কার করবেন বিষণ্নতাগভীর বেদনার হাহাকার কিন্তু তাঁর বিষণ্নতাতাঁর বেদনা কিছুতেই হতাশাজাত বলা যাবে না। তাঁর বিষণ্নতা স্বপ্ন পূরণ না হবার বিষণ্নতাতাঁর বিষণ্নতা নিরল মানুষের বেদনাক্লিষ্ট মুখ দেখার বেদনায় লীন, তাঁর বেদনা বঞ্চিত মানুষের অধিকার অর্জনের শ্লথগতি প্রত্যক্ষজনিত; কিন্তু তিনি সব বেদনাসব বিষণ্নতাকে পাশকেটে নতুন সংগ্রামের জন্যনতুন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হবার স্বপ্নকে উসকে দিতে পারেন সহজেই; এবং তা তাঁর কাব্য অভিযাত্রার আদ্যপান্ত। এবং এখানেই মতিন বৈরাগীর সচেতন কাব্য প্রয়াসের দৃষ্টান্ত।

মতিন বৈরাগীর কবিতায় নীতির কথাআদর্শের কথাদাবীর কথা উচ্চারিত হয়েছে বারবার কিন্তু দাবীর কথা বলতে গিয়ে তিনি কখনো কবিতার শিল্পমানের গলা টিপে বিষয় বক্তব্যের সাথে সন্ধি করেন নি। শ্লোগান করে তোলেন নি কবিতাকে

অঙ্গীকার বুকে যারা জীবনের বাজি রেখে মাঠে নামে

প্রতিপক্ষবুলেটের মুখে যারা হাসতে হাসতে জীবন রাখে

কালের স্রোত যারা ধরে নেয় দু’বাহুতে

দ্বিধাহীন আমরা সেই সুঠাম পুরুষ

হিম যুগের উত্থান বুকে নিয়ে হেঁটে যাই ক্রমশ দিনের দিকে।

———————-

আমি শঙ্কাহীন বলে দিতে পারি

আসেনি কোনো দিন কোনো দেবদূত পৃথিবীতে

মানুষই এসেছিলো,

রেখেছিলো অঙ্গীকার বাঁচার বাঁচাবার

এবং

তারাই স্পার্টাকাস, গ্যাবরিয়েল পেরী, জুলিয়াস ফুচিক

(আমরা কয়েকজন বিক্রম পুরুষ বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন)

একই কাব্যের অন্য কবিতায় আমরা পড়ে নিতে পারি মুক্তিযুদ্ধদিনের দুঃসাহস সৌর্যবীর্যের কথা, স্মৃতিকাতরতা, মুক্তির আকুতিতে মানুষের চোখে তৃষ্ণার ছবি।

বারীনের বাপ রাজেন

নবজাতকের মুখে চুমু খেয়ে বলেছিলো

আজ আর দেরি করা যাবে নারানী

হাতে সময় নেই

জলপাই বাহিনী লুটে নিচ্ছে গ্রাম

শস্যের মাঠ

আরতো চুপ করে বসে থাকা যায় না

এখন প্রতিরোধের সময়।

সেই যে গেছে রাজেন

আর ফিরে আসেনি

আজ কতো বছর

(রোমন্থন বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন)

মতিন বৈরাগীর কবিতায় বিরহনৈরাশ্য এবং বেদনামগ্নতা প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করা হয়েছিলো সে মন্তব্যের সপক্ষে নিচের কবিতাটি পড়ে নিতে চাই

তবুও নিস্তব্ধতা গাঢ়ো হয়, হতে হয় যেনো

পাখপাখালির আওয়াজ থেমে গেলে এক চিৎকার

দীর্ণ করে রাত্রি, কাতরায়গোঙায় পৃথিবী পাঁজরে

এবং সকল ¯বিমুগ্ধতা ঝেরে ফেলা এক ভোর

পূর্বরাত্রির ক্ষতচিহ্ন নিয়ে জন্মান্ধের মতো চোখ মেলে

হিমস্পর্শের মতো স্মৃতিগুলো নড়ে

যদিও তারপর চাকার ঘর্ঘর ইস্পাত পোড়ে

আরো কতোক রাত্রিকে ভেদ করবে বলে থমকে থাকা

মশারীকে উসকে দিয়ে হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে।

(বিপন্ন এক রাত্রির গল্প॥ দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত)

মতিন বৈরাগীকে প্রকরণঘনিষ্ঠ কবি বলা না গেলেও তাঁর বেশ কিছু কবিতার ছন্দপ্রয়াস পাঠককে আকৃষ্ট করে; বিশেষ করে স্বরবৃত্তের প্রতি তাঁর আকর্ষণ উল্লেখ করার মতো। কিন্তু সব কবিতাতেই তাঁর অঙ্গিকার এবং লক্ষ্য আদর্শ অপরিবর্তিত থাকতে দেখি অনিবার্যভাবে। যে কারণে মতিন বৈরাগীর কাব্যভাষায় এক ধরণের ক্রোধ টের পাওয়া যায়, পাশাপাশি থাকে লক্ষ্য অর্জনের আশাবাদ

জেগে ওঠো সাহসী মানুষ,

খণ্ডি হোক শাসকশোষকত্রাসক

ভাগ করো নিজেকে

যেটুকু লেজুড়বৃত্তি লোভ আর লালসার

ঘৃণ্য জীবন; ভাগ করো তাকে

বিকশিত হবে ভেতরের অমল মানুষ।

তারপরে এসো আবার জ্বলে উঠি

সাহস আর দুঃসাহসের ইতিহাস অন্যরকম হবে

নির্ধারিত হবে আগামী।

(জেগে ওঠো সাহসী মানুষ খরায় পীড়িত স্বদেশ)

মতিন বৈরাগী আশাবাদী এবং স্বপ্নপ্রবণ কবি। তাঁর আশাবাদ এবং স্বপ্নপ্রবণতার শেকড় বহুদূর বিস্তৃত, তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় এবং অনড় বলেই ঘুরে ফিরে বারবার তিনি ফিরে আসেন তাঁর স্বপ্নের কাছেতাঁর আশাবাদের কাছে। বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’ থেকে শুরু করে তাঁর দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত’ প্রতিটি কাব্যেই তাই পেয়ে যাই আশাবাদের কবিতাপেয়ে যাই স্বপ্ন রচনার প্রয়াস। আশা অনন্ত হে’ কাব্যের প্রিয় সমাজতন্ত্রের পক্ষে’, বিশ্বাসের কথা’, স্বপ্নের লাল পাখি’, স্বপ্ন দেখি’ অথবা আশা অনন্ত হে’ সহ বেশ কিছু কবিতায় তাঁর স্বপ্নবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার ব্যক্ত হয়েছে; বেদনার বনভূমি’ কাব্যের ক্ষমতাবানদের প্রতি’, মানুষের লাশ’, স্বপ্ন পাশাপাশি’, এক উপাখ্যান’, সত্যের কুঠার’, স্মৃতির ভেতরে’, কাকের শোক সভা’ সহ বেশকিছু কবিতা পড়েও একই চেতনার সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ কাব্যের অনড় ইতিহাস’, জেগে উঠুক স্বপ্ন আবার’, হে আগামীর ভালোবাসা’, আজ কথা হবে’ সহ অসংখ্য কবিতায় আমরা একই মতিন বৈরাগীর সন্ধান পাই; তারপরও বলি মতিন বৈরাগী স্থবির কবি নন, তিনি নিত্য বিবর্তনশীল কবিপুরুষ; যিনি একই চিন্তাচেতনায় স্থির থেকেও নিত্য পরিবর্তন করে নিয়েছেন নিজের কাব্যভাষা, সে নিজের ঘরানা অটুট রেখে। তাঁর চেতনার সেই অনড় অবস্থান এবং পরিবর্তনশীলতা পাঠ করতে ২০১২তে প্রকাশিত খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ কাব্য থেকে ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্পর্কগুলো’ কবিতাটি পড়ে নিতে পারি। তাঁর চেতনার সেই অনড় অবস্থান এবং পরিবর্তনশীলতা পাঠ করতে ১৯৯৪ প্রকাশিত বেদনার বনভূমি’ কাব্য থেকে একটি এবং ২০১২তে প্রকাশিত খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি’ কাব্য থেকে একটি কবিতা উদ্ধৃত করছি

স্মৃতির ভেতরে কখনো কখনো আচমকাই জ্বলে ওঠে নকশাল বাড়ি

কালের উল্টোরথ ঠেলে এগোয় ইতিহাস কান পাতলেই যেন শুনি

মানুষের প্রস্তুতি

মানুষ কি আসছে?

স্মৃতির ভেতরে নকশাল বাড়ি সহসাই জ্বল জ্বল

যেন এক টুকরো নীল অভ্র দ্যুতিময় শান্ত নীলিমায়

ছড়ায় আলোকচ্ছটা আপাতত দূর থেকে

নকশাল বাড়ি স্মৃতি নয়, কিছুতেই নয়

নকশাল বাড়ি আমার হৃদয়ের গান এদেশের শ্রেষ্ঠ সংগ্রাম।

(স্মৃতির ভেতরে॥ বেদনার বনভূমি)

সম্পর্কগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে ভেঙে যাচ্ছে টুটেফেটে যাচ্ছে

ভাঙছে সব প্রতিশ্রুতি ভালোবাসা

সম্পর্কগুলো জীর্ণ হচ্ছে ক্ষীণ হচ্ছে ক্ষয়ে যাচ্ছে

ছোট হতে হতে ছোট্ট হচ্ছে

সম্পর্কগুলো জমে যাচ্ছে তরল হচ্ছে

ক্ষয়ে যাচ্ছে স্মৃতি হচ্ছে

উড়ছে ধুলির বাতাসে

ফুরিয়ে যাচ্ছে চেনাজানা সকল অনুভব

ভোর থেকে রাত্রি সকল সময়

লোভ এসে দাঁড়িয়ে দরজায় বলছে ভেঙে ফেলো সব

ভাঙছে সম্পর্ক ভাঙছে বিশ্বাস

মানুষ ক্রমশই মানুষ থেকে সরে যাচ্ছে দূর হয়ে যাচ্ছে

বিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে অচেনা এখন

হায়,

আশা আর স্বপ্নগুলো ভেঙে গেলে পর

কোথায় ফিরবে আবার মানুষ!

(ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্পর্কগুলো খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছি)

মতিন বৈরাগীর লেখা দুই সময়ের দু’টি কবিতা পড়ে তাঁর বিভিন্ন সময়ের বিষণ্নতার তথ্য আবিষ্কার অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। জীবনসত্যের গভীর উপলব্ধি আয়ত্ত করেছেন বলেই তাঁর কবিতায় জীবনের গভীর সত্য উচ্চারিত হয়েছে অবলীলাক্রমে। সে সত্যে পৌঁছা আমাদের জন্য সম্ভব না হলেও আমাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পৃথিবীর অগ্রযাত্রার ইতিহাসের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হয়নি বলে মতিন বৈরাগীর স্বপ্নকে কখনো কখনো পরাবাস্তব মনে হলেও মানুষের আকাক্সক্ষার অনিবার্যতা তাঁকেও অনিবার্য করে তুলবে একদিন। যে স্বপ্ন মতিন বৈরাগী ধারন করেছেন অন্তরে সেই স্বপ্নের উচ্চারণের মধ্য দিয়েই তাঁর আলোচনার ইতি টানতে চাই

ইতিহাস আবারো প্রমাণ করবে কোনো মিথ্যে উচ্চারণ নয়!

সময় এসে সুনিশ্চিতির হাত ধরে বলবে

মানুষের জীবন শুধু বেদনার হাহাকার নয়

আরো আরো বিস্ময় জীবন জীবিকায় অনবরত যুদ্ধরত

বিশ্বাসের কণ্ঠে কণ্ঠে উপচে ওঠে সাম্যের গান।

…………………………………..

এখনো আমার বিশ্বাসে চমৎকার উড্ডীন প্রিয় পতাকা

হাজার হাজার লাখো মানুষের রক্তের মতো টকটকে লাল

আমি সমাজতন্ত্রের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছি

হে মানুষেরা শোনো,

জীবনের বিশালে যার আগামীর উপস্থিতি।

(বিশ্বাসের কথা আশা অনন্ত হে)

কবিতায় সমকালকে বাঙময় করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতায় ঋদ্ধ কতিন বৈরাগীর কাব্য প্রয়াশ পূর্বে প্রকাশিত প্রতিটি কাব্যের পাশাপাশি শেষ কাব্য দুঃখ জোয়ারের জলস্রোতে বিস্তৃত। দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত’ কাব্যে তাঁর সাম্প্রতিক সময়ে লেখা কবিতা যেমন স্থান পেয়েছে, পূর্বে প্রকাশিত বিভিন্ন কাব্যের কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতাও সংকলিত হয়েছে, যা তাঁর পাঠককে স্মৃতিতাড়িত হবার সুযোগ করে দেবে।

পৃথিবীর অগ্রযাত্রার ইতিহাসের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হয়নি বলে মতিন বৈরাগীর স্বপ্নকে কখনো কখনো পরাবাস্তব মনে হলেও মানুষের আকাক্সক্ষার অনিবার্যতা তাঁকেও অনিবার্য করে তুলবে একদিন, এমন বিশ্বাস থাকা অযৌক্তিক মনে হয় না। এভাবেই মতিন বৈরাগীর কবিতা পল্লবিত হয়েছে বিষণ্ন প্রহরে দ্বিধাহীন’ থেকে দুঃখ জোয়ারের জলসে’ পর্যন্ত। কবির এই সর্বশেষ কাব্যটি এক অর্থে প্রচলিত অর্থে একটি নতুন কাব্য থেকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। এ কাব্যে কবির সাম্প্রতিক সময়ে লেখা বেশকিছু কবিতার পাশাপাশি পুরোনো যে কবিতাগুলো সংকলিত হয়েছে; সেগুলো অবশ্যই কবির প্রিয় কবিতার তালিকাভুক্ত হওয়াই সঙ্গত। সে বিবেচনায় দুঃখ জোয়ারের জলস্রোতে’ কবির আংশিক নির্বাচিত কাব্যও বলা যায়। এ কাব্যের বৈচিত্র্যের আরও একটি বড় দিক দুঃখ জোয়ারের জলস্রোত এসে কবি মতিন বৈরাগীর কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক চিহ্নিত করা যায়। নতুন বাঁক চিহ্নিত করা গেলেও চেতনার দিক থেকে তিনি যে বিচ্যুত নন তাও স্পষ্ট। যে স্বপ্ন আদর্শকে বুকে ধারণ করে কবি মতিন বৈরাগী তাঁর কাব্যঅভিযাত্রা শুরু করেছিলেন সত্তরের গোড়ার দিকে তা থেকে তিনি কখনোই বিচ্যুত হননি; কখনো হারাননি তাঁর কাব্যমগ্ন চরিত্রটিকেও। কবিতাযাপন তার নিত্য কবিতায় মগ্নতা তার স্বতঃস্ফূর্ত। যে স্বপ্ন মতিন বৈরাগী ধারণ করেছেন অন্তরে সেই স্বপ্ন এবং তাঁর কাব্যমগ্নতার সপক্ষে নিজের লেখা (মতিন বৈরাগীকে উৎসর্গ করা) একটি কবিতা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আলোচনার ইতি টানতে চাই, জানাতে চাই তাকে শুভেচ্ছা।

প্রতিদিন এক কবিতার সঙ্গে রাত সহবাস

কবিতাকে উল্টেপাল্টে দেখা নিজস্ব অমানিবাস,

কবিতার পংক্তিতে বাহুল্য শব্দ পেলে

বিশ্রামের মায়াবী কপাট ভাঙে, অনড় অনিদ্রা মেলে;

এভাবেই জীবনের দীর্ঘ সহবাসগুলো একই পদ্যের সঙ্গে কাটে

এক কবিতার আঙুল আকড়ে ধরে সুদীর্ঘ সড়ক হাঁটে,

এক কবিতার এক অঙ্গে অপরূপ রূপের দ্যুতি

কখনো কবিতা জামদানী পরে কখনো জর্জেটসুতি।

এক কবিতার সঙ্গে মানঅভিমান মন দেয়ানেয়া যতো

এক কবিতার বল্কল ভেঙেছে বুকে সহচর কবিতামতো

এক কবিতার অরূপ বাগানে কবি মগ্নচৈতন্যের মালি

সরোবর জুড়ে হাঁসেরা সাঁতরায় চাঁদ হাসে রাতে এক ফালি,

একই কবিতা বারেবারে লেখা প্রেমে কখনো বিরহে

ক্ষোভেবিক্ষোভে কখনো প্রতিবাদে কখনো বা দ্রোহে।

(কবিতাযাপন মৈমনসিং গীতিকাভাসান পৃষ্ঠা২৬)

ফরিদ আহমদ দুলাল কবি, প্রাবন্ধিক।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s