কবি মতিন বৈরাগী ও তাঁর কবিতা :: কল্পমণীষার ভাষিক নির্মাণ

Posted: নভেম্বর 15, 2014 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: হামিদ রায়হান

matin-bairagi-3স্মৃতির ভেতরে কখনো কখনো আচমকাই জ্বলে

ওঠে নকশাল বাড়ি

কালের উল্টোরথ ঠেলে এগোয় ইতিহাসে কান

পাতলেই শুনি

মানুষের প্রস্তুতি

মানুষ কি আসছে?

[স্মৃতির ভেতরে : বেদনার বনভূমি]

মতিন বৈরাগী বর্তমান সময়ের অগ্রগণ্য কবিদরে একজন। গত শতকের ষাট দশকের শেষের দিকে কবিতা লেখা শুরু করলেও এখনও অবধি তিনি সমানভাবে লিখছেন। তাঁর সময়ের অধিকাংশ কবি ক্যালেন্ডারেরর পৃষ্ঠা বদলের মতো অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেছেন, কিন্তু এখনও তিনি সচল প্রাণবন্ত। শ্রেণিচেতনতার ভাষিক নির্মাণ তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও রোমান্টিকতার এক মিষ্টি পরশও সমানভাবে উপস্থিত। শ্রেনিচেতনায় সমর্পিত থাকলেও সমাজের, ব্যক্তিমানুষের অস্তিহীনমানুষের রঙবদলের চিহ্নগুলো দক্ষতার সঙ্গে তিনি এঁকেছেন, যা পাঠকমাত্র সেই দিকে অঙ্গুলি তুলে দেখিয়ে দেয়, যা তাঁর বহু সমাকালিন কবিদের মধ্যে অনুপস্থিত। তবে, তাঁর অধিকাংশ কবিতার মধ্যে একজন সমাজসচেতন মানুষের, একজন দ্রোহি মানুষের দায়বদ্ধতাকে উজ্জ্বলভাবে সরব থাকতে দেখা যায়। এর সঙ্গে যে প্রশ্নটি উঠে আসে, তা হলো, তিনি সমাজের ভেতরের পচনগুলো, অস্তিহীনতা, টানাপোড়েন, প্রমুখ অনুষঙ্গগুলো ব্যজ্ঞনাময়তার সঙ্গে তুলে আনতে পেরেছেন, না এর উল্টোচিত্র মুখোমুখি করে পাঠককে। অবশ্য. এর সঙ্গে আরও একটি প্রশ্নের প্রতি পরিচয় করিয়ে দেয়, তা হলো, তাঁর কবিতা কি আদতে বহিরাঙ্গ উপাত্তগুলোকে প্রকাশ করে, যা পাঠককে অতিসহজে টেনে নিয়ে যায়? প্রশ্নটিও তুলে তুলে উচিয়ে ধরে পাঠকের কাছে। সেক্ষেত্রে, তাঁর কবিতার কাছে পাঠককে দাঁড় করানো যেতে পারে। যেমন

. মিছিল দেখলে রক্তে রক্তে আচমকা হল্কা ওঠে

মিছিল এলে বুট বেয়োনেট বুলেট গুলিও ছোটে

[মিছিল: খরায় পীড়িত স্বদেশ]

. জীবনের সব বাস একে একে ছেড়ে গেলে কখনও

আমরা কয়েকজন বিক্রমপুরুষ

হাত উঁচু কওে জানাবো অঙ্গীকার ভয়হীন

[আমরা কয়েকজন বিক্রমপুরুষ: বিষণ্ন প্রহওে দ্বিধাহীন]

. একটি দীর্ঘ যুদ্ধ এখন আমার চেতনায়

বিস্বাদ বিবর্ণ পৃথিবীর সীমাহীন অন্ধকার হাতড়ে

তুলে আনতে চায় সোনালী মানুষ

যার অগ্নিময় তেজদীপ্ত হাত রাতের আঁধারে ছিঁড়ে

নির্ভুল জন্ম দেবে আরেক স্রোত।

[ রৌদ্রের তরবারি: আশার আবর্তে]

প্রসঙ্গে আহমদ শরীফের বত্তব্যকে স্মরণ করা যায়। এর কারণ, কবি গণমানুষের দাসত্বশোষণবঞ্চনাজাত বেদনার কথা বলে, বলে পৃথিবীর হালচাল বদলানোর কথা, বাতলায় মুক্তির পন্থা, দিশা দেয় বিপ্লবের বিদ্রোহের, সন্ধান করে সাহসী সংগ্রামী বীরের, আশা আশ্বাস দেয় মুক্তির, আনন্দের সুন্দরের।” [দ্রষ্টব্য: হামিদ রায়হান সম্পাদিত উত্তরপুরুষ, কবিতা বিষয়ক ছোট কাগজ, তৃতীয় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০০৩, পৃ. ১১] সন্তোষ ঢালীর কথাও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, কবি মতিন বৈরাগীর কবিতায় তাঁর জীবনবোধের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সমাজ মানুষের প্রতি তাঁর দায় তাঁকে তাড়িত করেছে। তিনি সারাজীবন শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখে এসেছেন।” [দ্রষ্টব্য: , পৃ. ৫৪]

মানুষমাত্র একটি পৃথিবীর ছবি সে আঁকে, যেখানে তার বিশ্বাসের কথকতা, স্বপ্ন স্বপ্নভঙ্গের বৃতান্ত, সমাজের শংসায় মুখরতা, কালিক দূরত্ব দূরত্বহীনতা, ব্যক্তিহীন মানুষের চারপাশের ছবি উশখুশ করে, একীভূত করে এর সংলগ্ন মানুষদেরকে। বৃত্ত থেকে ছিটকে যাওয়া মানুষ কিভাবে মিশে যায় এর বাইরের দূরত্বের সঙ্গে, কিংবা বৃত্তের মানুষেরা কিভাবে বৃত্তের বাইরের মানুষের দ্রবীভূত করে, কখনো আশাবাদের কথা বলে, গণতন্ত্রের কথা বলে, ধর্মের কথা, বিভিন্ন রূপের আদলে। তবে কি মানুষ তার আশা আশাভঙ্গের দোদুল্যমানতায়, টাটাপোড়েনে ভষ্মিভূত হয়ে কতদূ যায় কিংবা যাবে, এরই একটি চালচিত্র উঠে আসে কবি মতিন বৈরাগীর কবিতার পাঠের মধ্য দিয়ে।

ভাষা কি তবে কবির ভেতরের, অর্থাৎ তাঁর সংলগ্ন চারপাশের অলিখিত ভাষাকে তুলে আনছে, না দৃশ্যকে এক এক করে একই সমান্তরালে নির্মাণ করছে, যা ঋজুতায়, হিরণ¥য়তায় তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা তাঁর কবিতার বই অন্ধকারে চন্দ্রালোকে’র ইতিহাসের পরিণতি’ কবিতায় দেখি, যেমন

অত্যাচারী আর অহঙ্কারী যারা তারা ধ্বংস হয়ে যায়/ধ্বংস হয়ে গেছে কত মহা পরাক্রমশীল সম্রাট, সাম্রাজ্য/মহাকালে মিশে গেছে তাদের নামধাম ঠিকানা সম্বল” কিংবা কতো মানুষের অভিমান শুকিয়ে আছে পাহাড়েপর্বতে পাথরে/বহমান নদীর ¯স্রোতের ধারায়” অথবা একই কবিতার বইয়ের গণ্ডিবদ্ধ ভূগোল’ কবিতায় দেখা যায়, যেমনজমাট বাঁধা এই কষ্ট আর এই দুধের দহনদাহ/বেদনার গাঢ় নীল দাগ ঘষে ঘষে তুলে নিতে/ডাকতে গিয়েছি সকালের শুশ্রুষা: হাওয়ারা উড়ে গেছে-/পৃথিবীতে রয়ে গেছে যুদ্ধবিগ্রহ মানুষে মানুষে কলহপ্রিয়তা/রয়ে গেছে লেলিয়ে দেয়া রক্তারক্তির নানা উপাদান/ভয়াবহ মিথ্যের পঙক্তিমালা।”

কী স্তব্ধতা লুকিয়ে রয়েছে লোকালয়ের বাইরে পাহাড়েপর্বতে. এমনকি সেসবের পাথরে, বহমান নদীর স্রোতের জলের প্রবহমাণতায়। কী নিরাভরণ ভাষায় কবি এসব এঁকেছেন, যেখানে অপার মমতায় তাঁর কণ্ঠস্বরগুলো লেপ্টে রয়েছে মানুষের প্রতি, কবির ভালোবাসার প্রতি, ছন্নছাড়া মানুষের প্রতি, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমেওঠা ক্ষতগুলো, শোষণগুলো, মিথ্যের বেসাতি, ইত্যাদি প্রকল্পগুলো আমাদের চেতনায় ডানা মেলা শঠতায়। এত নেতিবাচকতার মধ্যে কবির আশা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নি নিঃশ্বতায়, বরং সমবেদনায় উচকিত হয়েছে তাঁর স্বর, যেমন

. ভালোবাসা ভালোবাসা বলে কাৎরাচ্ছে

বৃক্ষরাজি বনভূমিও

গোঙাচ্ছে মানুষ

[আলোবাসার জন্যে: আশা অনন্ত হে]

. টবের গাছগুলো ককিয়ে উঠলো

জানালার কাপড় আর শার্শিগুলো নড়ে চড়ে স্থির হয়ে রইলো

[ প্রেমের কবিতা: অন্ধকারে চন্দ্রালোকে]

. বিষণ্ন পাইনের মতো নুয়ে পড়ছে মানুষ

করতলে মুখ তার অনন্ত যামিনী

মানুষ নুয়ে পড়ছে পরাজিত পাখিদের মতো

[দৃশ্য : বেদনার বনভূমি]

কবি মতিন বৈরাগী তাঁর কবিতার নানা রকমের অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। এ সব অনুষঙ্গের মধ্যে দিয়ে যে স্বপ্ন তাঁর মধ্যে উপ্ত, এর ডালপালা মেলেছে, তা অভিমানে হোক, দ্বিধাগ্রস্থতায় হোক, উদ্বেলিত রঙের ক্যানভাসে হোক, তা একটি সম্পন্ন মানবিকতায়, পূরিপূর্ণ মানুষের একটি স্বপ্নময় বসতি। এ স্বপ্নকে আঁকড়ে তিনি বহুদূর যেতে যান, যা তাঁর অস্তিময়, চেতনার গহিন জলে সন্তরণরত; এরই চিত্র আমরা দেখি তাঁর অন্ধকারে চন্দ্রালোকে” কবিতার বইয়ের প্রতীতি’ কবিতায়, নিশ্চয়ই সমস্ত অসুন্দরের ভেতরে একদিন সুন্দর জেগে উঠবে/মলিন জীবন আলোকিত হবে আকাশের ধ্রুবতারার মতো/ কেটে যাবে অন্ধকার। /নিশ্চয়ই মানুষ মানুষকে মুক্ত করবে গ্লানিময় জীবন হতে/তার অজ্ঞতা হতে/হৃদয়ে হৃদয়ে ফুটবে কুসুম স্নিগ্ধ সৌরভময়/মানুষই আনবে তার নিজের বিজয়।” তাই কবি তাঁর আদর্শে বিশ্বাসে অটল, অনঢ়। হতাশায়, ক্ষোভে, অভিমানে, স্বপ্নহীনতায় কখনও কখনও তাঁকে নুব্জ করলেও তিনি ভষ্ম থেকে ফিনিক্সের মতো বেরিয়ে আসতে জানেন, আর জানেন বলে তিনি আশাবাদী। কোনো অন্যায়ের কাছে, অসততার কাছে মাথা নত করতে জানেন না। তিনি জানেন, হায়নারা দলে সামান্যই হয়। তবু হায়নার ভয়”। কিন্তু তিনি ভীত নন। আশাবাদী তিনি সত্যের, ন্যায়ের, সুন্দরের, যেখানে শিল্পের তুলনায় জীবনই কবি মতিন বৈরাগীর অন্বিষ্ট লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে তিনি সরলদাগে তুলে আনার যে সম্ভাবনা আমরা দেখি তা কেবল একজন আদর্শবাদী মানুষের পক্ষে, লড়াকু সৈনিকের পক্ষে, এবং একজন কবির পক্ষে সম্ভব। সমস্ত মানুষই একদিন/বিজয়ের লাল পতাকা ওড়াবে” এই প্রত্যয় প্রবহমাণতার সংলগ্নতায় তাঁর কবিতা বৈশিষ্ট্যগুলো অনায়াসে ধারণ করে। তাঁর সময়ের কবিদের মধ্যে তাঁর ভিন্নতার অন্যতম কারণ এই প্রবণতাগুলো। এ প্রেক্ষিতে তাঁর কবিতা আমাদের কাছে অন্য অভিজ্ঞতা ভাষা নিয়ে উন্মোচিত হয়।।

হামিদ রায়হান কবি, প্রবন্ধ লেখক এবং কথাসাহিত্যিক। সম্পাদক: উত্তর পুরুষ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s